শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সংঘটিত হত্যাকাণ্ড
(বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে পুনর্নির্দেশিত)

স্থানাঙ্ক: ২৩°৪৫′০৬″ উত্তর ৯০°২২′৩৬″ পূর্ব / ২৩.৭৫১৭° উত্তর ৯০.৩৭৬৭° পূর্ব / 23.7517; 90.3767

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল সদস্য সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। পরে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন।[১] শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো সামরিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটে।[২] হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশের আদর্শিক পটপরিবর্তন বলে বিবেচিত।

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড
Sheikh Mujibur Rahman after he had been killed by the majors.jpg
হত্যার পর নিজ বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তাক্ত মৃতদেহ
স্থানঢাকা, বাংলাদেশ
তারিখ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
ভোর ৫:৩০–৭:০০
লক্ষ্যশেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবার[টীকা ১]
হামলার ধরনসামরিক অভ্যূত্থান[টীকা ২]
নিহত২০ জন (শেখ মুজিব, তার স্ত্রী ও তিন পুত্রসহ):
আহত২ জন
হামলাকারী দলডজনসংখ্যক সামরিক অফিসার ও ১৭০ থেকে ৭০০ জন সাধারণ সৈনিক [টীকা ৩]

পটভূমিসম্পাদনা

শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতিত্বসম্পাদনা

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। পরে তিনি যুক্তরাজ্য এর লন্ডন ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর মুজিব ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী তিন বছর উক্ত পদে আসীন থাকেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন।

বাংলাদেশের যুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত অবস্থাসম্পাদনা

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিচালিত নয় মাস ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর সমগ্র বাংলাদেশ বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল।[টীকা ৪][৩][৪] প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব এই ধ্বংসযজ্ঞকে “মানব ইতিহাসের জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ” উল্লেখ করে ৩০ লাখ মানুষ নিহত ও ২ লাখ নারীর ধর্ষণ হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের উচ্চ আশা-আকাঙ্ক্ষা মুজিব সরকারের জন্য পূরণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়তে থাকে।

রক্ষীবাহিনী বিতর্ক ও সেনাবাহিনীর অসন্তোষসম্পাদনা

জাতীয় রক্ষীবাহিনী একটি নিয়মিত আধা-সামরিক বাহিনী যা নবপ্রতিষ্ঠ বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে রক্ষীবাহিনী আইন ১৯৭২ দ্বারা গঠন করা হয়।[৫] শুরুতে মুজিব বাহিনীকাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনীর পত্তন করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এই বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. নূরুজ্জামানকে রক্ষীবাহিনীর প্রধান করা হয়। বিদ্রোহ দমন এবং আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গঠিত হয়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রাজনৈতিক মিলিশিয়া বাহিনী যা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনুগত ছিল।[৬] এটি বেসামরিক জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য গঠিত হলেও অনেকের মতে এটি প্রকৃতপক্ষে মুজিবের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে।[৭] এর কর্মীদের বিরুদ্ধে জনসাধারণ ও আওয়ামী লীগ বিরোধীদেরকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। সামরিক শক্তির প্রভাবের কারণে পাকিস্তান আমলে বাজেটের বেশিরভাগই সামরিক খাতে ব্যয় হত[৮]। তবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সে বরাদ্দ কমতে থাকে এবং ১৯৭৫-৭৬ সালের বাজেটে মুজিব সরকার রক্ষীবাহিনী সৃষ্টির জন্য প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করে সেনাবাহিনীর বরাদ্দ ১৩%-এ নামিয়ে আনে, যা পাকিস্তান আমলে ছিল ৫০-৬০ শতাংশ।[৯][১০] এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।[১১] এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক সেনাকে তাদের আশানুরূপ পদোন্নতি না দেওয়ায় তারা মুজিব সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হন।[১২] এ সকল কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ঘনীভূত অসন্তোষ মুজিব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। তার মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যাগত জওয়ানদের সংখ্যা ২৪ হাজার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ান ও নতুন করে রিক্রুটদের মিলিয়ে মোট ছিল ২৭ হাজার। পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের সংখ্যা ছিল ১১ শত[৮]। রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিল ২০ হাজার।[৮]

রক্ষীবাহিনী বিষয়ে কে এম শফিউল্লাহ বলেন,

স্বাধীনতার পর দেশের আইন শৃঙ্খলার কিছু অবনতি ঘটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়। কাজেই অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব আর্মিকে দেওয়া হতো। ওই সময় আমি এই দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম। সেটাকে লক্ষ্য রেখে পুলিশকে শক্তিশালী করার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়।[টীকা ৫] এই বাহিনী সম্বন্ধে কিছু মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বলে যে, রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গঠিত হয় এবং এ মর্মে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। রক্ষীবাহিনীকে কার্যকর করার জন্য পার্লামেন্টে আইন পাস হয়, যাতে রক্ষীবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে অপপ্রচার হয় এবং সামরিক বাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দেয়।’[১৩]

বাংলাদেশী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এবিষয়ে নিম্নলিখিত মতামত বিবৃত করেনঃ

  • পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসাররা এক কথায় ভারত বিদ্বেষী, রক্ষণশীল, মুসলিম বিশ্বের প্রতি অনুরক্ত ছিল। যার ফলে তারা মুজিব সরকারকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেনি।[৮]
  • মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কৃতিত্ব স্বরূপ দুই বছরের সিনিয়রিটি গ্রহণ করে।[৮] ফলে প্রত্যাগত অফিসারগণ ক্ষুব্ধ হয়।
  • অনেক অফিসার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের অনেক বেশি প্রাপ্য বলে মনে করত। তাই তা অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়[৮]
  • পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় হলেও সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে সংকটকালীন অবস্থায় বাজেটের ১৩% এর বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করা জাতীয় নীতির সহায়ক নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। তাই তা অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।[৮]লে. কর্নেল. এম এ হামিদ শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাতে মুজিব বলেন,

    … কর্নেল সাহেব কী বলব! আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে complain করে। অমুক এই করেছে - সে এই করেছে। আমার পোস্টিং, আমার প্রোমোশন…। বলুন তো কী হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়াকামড়ি করলে, ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কী করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো, না দেশ চালাবো?… আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, (তা) কেউ ভাবতে চায় না

অফিসারদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মুজিব সরকারের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌছায়[১৪]

  • পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১০ হাজার সেনা সদস্যের আবাসিক বাসস্থানের সুযােগ ছিলাে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ে সেনাবাহিনীর সংখ্যাই ছিলাে প্রায় ২০ হাজার। তার উপর পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক বাহিনীর আরাে প্রায় ২৫ হাজার সদস্য সেনাবাহিনীতে যােগদান করে। এরূপ অবস্থায় রাতারাতি প্রায় ৪০ /৪৫ হাজার সৈন্য বাহিনীর আবাসিক সুবিধা প্রদান শুধু মাত্র কথার কথা ছিলােনা। ঢাকা , চট্টগ্রাম , যশােহর , সৈয়দপুর , রংপুর এবং কুমিল্লায় সেনানিবাসগুলিতে তাদের সাময়িক আবাসিক সুবিধার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয় মুজিব সরকার। ফলে সামরিক সদস্যগণ ক্ষুব্ধ হন[১৫]
  • অনেক সামরিক কর্মকর্তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে তারা যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন তাঁরা (আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ) ভারতে নিরাপদে অবস্থান করছিলো। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা অসন্তোষের অন্যতম কারণ।[৮]
  • সেনাবাহিনীতে সীমাহীন অপপ্রচার এবং ভুল বোঝাবুঝির ফলে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। এমতাবস্থায় গ্রুপিং-দলাদলি প্রভৃতি কারণে সেনাবাহিনীতে ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর ততপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। [৮] [১৬]
  • রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ সুশৃঙ্খলিতভাবে ডিউটিতে নিয়োজিত থাকতো এবং নিরবতা পালন করতো। এই সুযোগে রটিয়ে দেয়া হয় যে রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ ভারতীয়।[৮][১৭] তাদের জলপাই রঙের পোষাক এই ধারণাকে জনমনে বদ্ধমূল করে।

সেনাবাহিনীতে জিয়া-শফিউল্লাহ বিভেদসম্পাদনা

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে নানা কারণে বিভেদ-বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক আফিসারদের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সেনাপ্রধান নিযুক্তকরণ নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও মুজিব, জিয়ার পরিবর্তে শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেন।[টীকা ৬] কে এম শফিউল্লাহ আদালতের জবানবন্দিতে বলেন,

১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল আমাকে চিফ অব আর্মি স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি এই নিয়োগের প্রতিবাদ করি। কারণ জিয়াউর রহমান ও আমার একই রকম যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি বাই নম্বর-এ আমার আগে ছিলেন অর্থাৎ আমার ১ নম্বর সিনিয়র ছিলেন। আমি মেজর রবকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে এই প্রতিবাদ জানাই। প্রতিবাদ দেওয়ার ব্যাপারে প্রায় দুই ঘণ্টা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি আমার সব কথা শোনার পর বললেন, ‘তোমার সব কথা শুনেছি। দেয়ার ইজ সামথিং কলড পলিটিক্যাল ডিসিশন। [এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে কিছু আছে]’ উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘ফ্রম টুডে অ্যান্ড নাউ অনওয়ার্ডস; আই অ্যাম এ ভিকটিম অব সারকামাস্টেন্স [আজ থেকে এবং এখন থেকে; আমি পরিস্থিতির শিকার]।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোমরা বড় বড় কথা বলো, যাও কাল থেকে তুমি জেনারেল ওসমানীর নিকট থেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে নাও।’ জিয়াউর রহমানকে টেলিফোনে আমার দায়িত্ব পাওয়া ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপের বিস্তারিত জানাই। জিয়া তখন বলেন, ‘ওকে সফিউল্লাহ। গুড বাই।’[১৩]

এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,[৮] যার ফলে জিয়া ব্যক্তিগতভাবে মুজিব-সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হন। এর ফলে জিয়াউর রহমানকে. এম. শফিউল্লাহর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

কর্নেল শাফায়েত জামিল বলেন,

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ সতীর্থ ছিলেন। জিয়াউর রহমান সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু তাঁকে চিফ অব স্টাফের পদ দেওয়া হয় নাই। এতে দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না।’[১৩]

কে. এম. শফিউল্লাহ আরো বলেন,

‘আমি যখনই কোনো অফিসারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে ব্যবস্থা নিয়েছি, তখন ওই সব অফিসার জেনারেল জিয়ার নিকট শেল্টার নিয়েছে।’[১৩]

সেনাবাহিনীতে বিভেদ সৃষ্টির জন্য মীর শওকত আলী জিয়াউর রহমানকে দায়ী দাবি করে বলেন,

সেনাবাহিনীতে অশুভ কিছু ঘটলে তার দায় পড়তো শফিউল্লাহর ওপর কিন্তু ভালো কিছু ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে প্রচার হয়ে যেত যে, তা জিয়ার জন্য হয়েছে।[৮][১৬]

অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মতে, সবসময়ই সেনাবাহিনীতে প্রচার চলত যে, ‘‘সকল গুণ ও মেধার আকর জিয়াউর রহমান’’।[১৫] অনেকের মতে, পাকিস্তান প্রত্যাগত ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দ্বন্দ লাগাবার জন্য জিয়াউর রহমান দায়ী ছিলেন।[টীকা ৭][৮][১৬]

এসকল বিষয়ের পাশাপাশি, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও বিভেদ ছিলো। জিয়াউর রহমানের ’জেড‘ ফোর্স এবং খালেদ মোশাররফের ও শফিউল্লাহর ‘কে’ ও ‘এস’ ফোর্সের সদস্যদের মধ্যে বনিবনা ছিলোনা।[১৪] জিয়া, খালেদ ও শফিউল্লাহর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। [টীকা ৮] যদিও ‘কে’ ও ‘এস’ ফোর্সের সদস্য সৈনিকদের সেনাবাহিনীতে আধিপত্য বেশি হওয়ার কারণে জিয়ার সঙ্গে খালেদ ও শফিউল্লাহর মধ্যে সুসম্পর্ক ছিলোনা।[১৪]

স্বজনপ্রীতি ও পারিবারিক দুর্নীতির অভিযোগসম্পাদনা

শেখ ফজলুল হক মনি অত্যন্ত প্রভাবশালী যুবনেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের ভাগ্নে। ১৯৬২ সালে সংঘটিত শিক্ষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুজিববাহিনীর নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠিত হলে তিনি এর অন্যতম সম্পাদক নিযুক্ত হন। মুজিব-বিরোধীগণ একে সুবিধাবাদী পদমর্যাদা আখ্যা দেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] তার বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে বেসরকারি বাণিজ্যে (মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ) শেখ মুজিবের পৃষ্ঠপোষকতায় জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সমালোচক তাকে শেখ মুজিবের বংশতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একটি অংশ বলে অভিযোগ করেন।[১৮] তবে মুজিবের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অনেক বিশ্লেষক নাকচ করে দেন।[১৯] সাংবাদিক পরেশ সাহা লিখেছেন,

...ইতিপূর্বে বাজারে রটিয়ে দেয়া হয়ছিল যে শেখ মুজিবুর রহমান স্বজন পোষণ করছেন, তিনি বাংলাদেশে ‘শেখ শাহী’ প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাই তিনি তার আপনজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিচ্ছেন।... শেখ মনি ছিলেন খুবই প্রভাবশালী যুবনেতা। রাজনৈতিক পড়াশোনাও তার ছিলো বিস্তর। ভালো লিখতে পারতেন, বলতে পারতেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন মুজিবের ভাগ্নে, অন্যদিকে তাঁর একজন বিশ্বস্ত সহকর্মী। যার কারণে তার দলে একটি বিশেষ স্থান থাকবে। ছিলোও। শেখ মুজিব তাকে জাতীয় দল ‘বাকশাল’ এর অন্যতম সম্পাদক মনোনীত করেছিলেন। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহল ধরে নিয়েছিলো, শেখ মুজিব তার ভাগ্নে শেখ মনিকে পাদ-প্রদীপের আলোর সামনে এগিয়ে নিয়ে আসবেন। তার (শেখ মুজিবের) অভাবে শেখ মনিই হবেন বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা[২০]

১৯৭৩ এর শেষের দিকে শেখ কামাল একটি গুলিবর্ষণে জড়িয়ে পড়েন যাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। গুলিবর্ষণ কীভাবে ঘটে সে সম্পর্কে একাধিক দাবি রয়েছে। অনেকের দাবি, শেখ কামাল এবং তার বন্ধুরা একটি ব্যাংকের ডাকাতির চেষ্টা করার সময় এই গুলিবর্ষণ হয়েছিল।[২১] বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দাবি করেছেন যে এটি আসলে বন্ধুত্বপূর্ণ গুলিবর্ষণের ঘটনা।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] পরেশ সাহার মতে,

আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি, আওয়ামী লীগের সব নেতা-কর্মীই যে ধোয়া তুলসী পাতা - সে কথা বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা - হাফ নেতা কিংবা সাব নেতার বাড়ি সত্যি সত্যি দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ আছে। কিন্তু তাই বলে যারা বলেন, শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামাল ছিলেন পাক্কা দুর্নীতিবাজ, ডাকাতি করে ফিরতেন, তাদের সেই ‘উড়ো কথা’কে সত্য বলে মেনে নিতে আমার নিশ্চই আপত্তি থাকবে। কারণ দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর পুত্র যেখানেই হাত বাড়াবেন, সেখান থেকেই টাকা আসবে। একটু মাত্র ইঙ্গিত পেলেই টাকা হুড়হুড় করে তার দিকে ছুটবে, সে জন্য তাকে ডাকাতি করতে হবে কেন? মুজিবের বড় ছেলে হওয়া ছাড়াও শেখ কামালের একটা পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন প্রথম সারির যুব নেতা। তিনি কি জানতেন না, ব্যংক বা অন্য কোথাও ডাকাতি করার মানে হলো নিজেদের মুখেই কলংকের কালি লেপন করা? কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা তারই দলের হাতে। সুতরাং শেখ কামাল সম্পর্কে যারা দুর্নীতির বা উচ্ছৃঙ্খলতার অভিযোগ তোলেন, তাদের মতলব সম্পর্কে আমি সন্দেহ না করে পারিনে[২২]

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে, বাংলাদেশী সুরক্ষা বাহিনী গোপনে সংবাদ পেয়েছিল যে, বামপন্থী বিপ্লবী কর্মী সিরাজ সিকদার এবং তার বিদ্রোহীরা ঢাকার আশেপাশে সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাগণ পূর্ণ সতর্ক ছিলেন এবং ঢাকার রাস্তায় সাধারণ পোশাকে টহল দিচ্ছিলেন। শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা সশস্ত্র অবস্থায় সিরাজ সিকদারকে খুঁজছিল, এবং একটি মাইক্রোবাসে শহরটিতে টহল দিচ্ছিল। যখন মাইক্রোবাসটি ধানমন্ডিতে ছিল তখন পুলিশ শেখ কামাল ও তার বন্ধুদের বিদ্রোহী বলে মনে করে এবং তাদের উপর গুলি চালিয়ে দেয়, ফলে শেখ কামাল আহত হয়।[২৩] তবে, এটিও দাবি করা হয় যে শেখ কামাল এবং তার বন্ধুরা ধানমন্ডিতে গিয়েছিল তার বন্ধু ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সম্প্রতি কেনা একটি নতুন গাড়ি চালানোর পরীক্ষা করতে।[২৪] ঢাকায় যেহেতু পুলিশ ভারী টহল দিচ্ছিল, তাই তৎকালীন শহরের এসপি মহামুদ্দিন বীর বিক্রমের কমান্ডের অধীনে পুলিশ বিশেষ বাহিনী যাত্রীদেরকে দুর্বৃত্ত বলে ভেবে গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল।[২৫] তবে এ ঘটনার পর সর্বোত্র প্রচারিত হয়ে যায় যে শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

মুজিবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অপপ্রচার বলে অনেকের মতামত।[২৬] [২৭]

বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থানসম্পাদনা

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে উদীয়মান বামপন্থী শক্তি মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল বলে মনে করা হয়।[২৮][২৯][৩০] বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে বিভক্ত হয়ে একটি অংশ নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়।[৩১]

মুজিবের নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে অবাধ গণতান্ত্রিক অধিকার সন্নিবেশিত হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো অবাধ রাজনীতির অধিকার অধিকার লাভ করে। কিন্তু এই ‘অবাধ গণতন্ত্রের’ সুযোগ গ্রহণ করে অতি উগ্র বামপন্থী দলগুলো গোপনে সশস্ত্র দল, স্কোয়াড গঠন করতে থাকে। থানা, ব্যংক লুট করা হয়। খুন-হত্যা, রাহাজানি, ডাকাতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সৈনিক সংস্থার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৪৭ টি থানা লুটের ঘটনা ও মুজিব হত্যায় নিজেদের দায় স্মীকার করেন।[৮]

সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশকে ভারতের তাবেদার রাষ্ট্র আখ্যায়িত করে জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানায়[১৭]

জাসদের উদ্যোগে প্রতিটি সেনানিবাসে অত্যন্ত গোপনে গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। এর ফলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা চরমভাবে বিনষ্ট নয়। কর্নেল আবু তাহেরহাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদের সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী, সরকারের সমর্থক, আওয়ামী লীগের সদস্য ও পুলিশদের হত্যার মাধ্যমে অভ্যুত্থানে লিপ্ত হয়।[৩২][৩৩] এর ফলে দেশের আইন শৃঙ্খলায় সম্পূর্ণ ভাঙন ধরে[৩২] এবং মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়।[৩৪]

মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানপন্থী হিসেবে, চীনাপন্থীগণ ভারতবিরোধী হিসেবে, জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী অনেক নেতা-কর্মী মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেননা বলে তারা সবাই কোন রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। এ অবস্থায় সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ গঠিত হলে উপরিউক্ত রাজনৈতিক দলে অনেকে আশ্রয় গ্রহণ করেন[৩৫]

প্রধানত মুক্তিবাহিনীমুজিববাহিনীর যুবকদের একটি বিরাট অংশকে নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জাসদ হয়ে দাঁড়ায় শেখ মুজিবের সরকারবিরোধী যে কোন ধরন ও চরিত্রের লোকের আশ্রয়স্থল। ফলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করার জন্য যে জাসদের জন্ম তা পরিশেষে হয়ে দাঁড়ায় এক বহুশ্রেণিভিত্তিক সংগঠন। এমনকি দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেশনের পদচ্যুত কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতারা জাসদ- এ যোগ দেন।[৩৬]

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন,

১৯৭২ সনে গৃহীত শাসনতন্ত্রের উক্ত মৌলিক অধিকারের সুযোগ নিয়ে ঐ সমস্ত দল ও চক্র অজস্র বানোয়াট মিথ্যাচারসমূহ বিভিন্নভাবে প্রচার করে জনগণকে সার্বিকভাবে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়…স্বাধীনতা বৈরি পুঁজিপতি, শোষক শ্রেণি ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহ স্ব স্ব স্বার্থে জাসদকে অর্থ, সম্পদ, সাহায্য ও সহযোগীতা দিতে থাকে।

[৮] চীনাপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতীয় দুশমন’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে ‘খতম’ করার ঘোষণা দেয়[১]। চীনাপন্থী সিরাজ সিরাজ সিকদার, হক, তোয়াহা, মতিন, দেবেন শিকদার, শান্তি সেন, অমল সেনদের চীনাপন্থী গ্রুপগুলো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করে[১]। মাওলানা ভাসানী মুজিব সরকারকে উৎখাত করে ‘নতুন পতাকা ওড়াবার’ হুমকি দেন।[৩৭]আবু সাইয়িদ বলেন,

মাওলানা ভাসানী বহুদিন ধরে প্রগতিশীল রাজনীতির কথা, নির্যাতন ভোগ করেছেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অতি উগ্র ডান ও বামপন্থীদের হাতে এবং জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে গেলেন…স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্ণনাতীত ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে যেখানে প্রয়োজন ছিল সহায়তা, সেখানে প্রকাশ্য জনসভায় তিনি হুংকার দিতে থাকলেন: আমি এদেশে প্রতিবিপ্লব ঘটাবো

[৮] মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের নেতা আবদুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করে অস্ত্র সহায়তা চেয়ে এক চিঠি লেখেন। চিঠির ভাষা ছিল নিম্নরূপ:

[৩৮]

গোলাম আযম লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে আবার এই ভূখন্ডকে পাকিস্তানের অংশে পরিনত করার পরিকল্পনা করেন।[৩৯]

পাকিস্তানচীন প্রদত্ত অস্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন চক্র মুজিবকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছিল বলে অনেকে ধারণা করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

সংবাদপত্রের ভূমিকাসম্পাদনা

স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের বেশ কিছু সংবাদপত্র, মুজিব ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদ ও জনমত প্রচারে ভূমিকা পালন করে।[৪০][৪১]

এম আর আখতার মুকুলেরমতে, মুজিব হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্রের ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন,

বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে ষড়যন্ত্র করে আইনসম্মত সরকারের পতন ঘটানো ও প্রতিটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সাথে সেই দেশের শক্তিশালী সংবাদপত্রের ও সাংবাদিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।[৪২]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়া মৃত্যুবরণ করেন এবং এর পর ইত্তেফাকের দায়িত্বলাভ করেন তাঁর দুই পুত্র ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরেশ সাহার মতে,

…কিন্তু, ইত্তেফাকের ‘মুরুব্বি’ (পৃষ্ঠপোষক) ছিল, সে মুরুব্বি আমেরিকা। আমেরিকার সুপারিশেই পাকিস্তানের ইয়াহিয়া সরকার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ (পাকিস্তানের গ্রামে গঞ্জে যখন বাঙালিদের হত্যা করছে) তখন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে পশ্চিম জার্মানি ও লন্ডনে যেতে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য: ইত্তেফাকের জন্য মুদ্রণযন্ত্র খরিদ করা। সেই যন্ত্র এনে ইত্তেফাককে যখন নতুন কলেবরে বের করা হল, তখন তার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।

[২৬] নতুন করে প্রকাশিত ইত্তেফাক, পাকিস্তানের সমর্থক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী সংবাদ পরিবেশন করতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর মুজিব তাদের ক্ষমা করে দিলেও, সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ইত্তেফাক মুজিব-বিদ্বেষী জনমত গড়ে তুলতে থাকে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতে,

তবে একটা কথা মানিক মিয়ার মৃত্যুর ১৯ বছর পর কঠিন সত্য বলে মনে হচ্ছে, এই কথাটা হলো, এই ইত্তেফাক মানিক মিয়ার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাক নয়, মানিক মিয়ার ইত্তেফাক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ভস্মীভূত হয়েছে, শহীদ হয়েছে। শহীদ হয়েছেন মানিক মিয়ার উত্তরসূরি ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন এখন যে ইত্তেফাক তা ইত্তেফাকের ভস্ম থেকে জেগে ওঠা প্রেতাত্মা, এ প্রেতাত্মা বাংলার জনগণের কণ্ঠ নয়; এই পত্রিকা স্বৈরাচারীর ও গণশত্রুদের সেবাদাস, পদ ও অর্থের ক্রীতদাস।

[৪১]

উপসম্পাদকীয় - প্রবন্ধ প্রভৃতির মাধ্যমে ইত্তেফাক জনগণকে বিক্ষিপ্ত করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, মুজিব হত্যার পর এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে একটি উপসম্পাদকীয়তে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একে ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘ঐতিহাসিক সূচনা’ বলে আখ্যা দেন।[৮]

সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকাও সমালোচিত ভূমিকা পালন করে। এটি এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও নিবন্ধের মাধ্যমে মুজিব সরকারকে বিচ্ছিন্ন করতে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে সরকারকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়,

[৪১]

পত্রিকা সমূহের কয়েকটি অভিযুক্ত সংবাদের শিরোনামসমূহ:

হককথা’ পত্রিকার প্রকাশিত বিশেষ বুলেটিনের শিরোনামঃ[৪৩]

মুখপাত্র’ লিখেছিলো[৪৩]

চট্রগ্রামের দেশবাংলা’ পত্রিকায় বলা হয়,[৪৩]

খবরটি সম্পূর্ন ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে অনেকে দাবি করে থাকেন।[৪৩]

হলিডে পত্রিকা অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য তাজউদ্দীন আহমদের সমালোচনা করতে থাকে এবং সমালোচিত ভূমিকা রাখে।[৪১]বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার সহকারি সম্পাদক নিযুক্ত হন মাহবুবুল আলম যিনি ১৯৭১ সালে মুজিবের বিরুদ্ধে অন্যতম রাজসাক্ষী ছিলেন। তিনি করাচীর ডন পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করেন।[৪১]

সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে কিন্তু স্বাধীনতার পর তা নিয়মিতভাবে মুজিবকে প্রশংসা করে বিশেষ কলাম প্রকাশ করে।[৪১]

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্বাধীন বাংলাদেশে সংবাদপত্রের গণবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করে সংবাদপত্র গুলোকে মিথ্যাচারের বাহন বলে অভিহিত করেন।[৮]

ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের অভিযোগে মুজিব-সরকার ১৯৭৫ সালের ১৬ই জুন ৪ টি বাদে সকল পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করে। প্রথমে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৪টি বাদে সকল পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়, যার সংখ্যা ছিল ৩৪০টি। এর ২৪ ঘণ্টা পর নিষিদ্ধ তালিকার অন্তর্ভূক্ত ১২৬টি পত্রিকা ও সাময়িকীর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বাকি ২১৪ টি পত্রিকার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা করা হয়।[৪৩][৪৪][৪৫][৪৬]

ডালিম-মোস্তফা সংঘর্ষসম্পাদনা

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গাজী গোলাম মোস্তফা মেজর শরিফুল হক ডালিম ও তার স্ত্রীকে ঢাকা লেডিজ ক্লাব থেকে একটি তর্ক করার পরে অপহরণ করে। মেজর ডালিমের আত্মীয় তাহমিনার সাথে কর্ণেল রেজার বিয়ে হচ্ছিল, সেখানে এই ঘটনা ঘটে। তর্কের বিষয়ে অন্তত ২টি সংস্করণ চালু আছে। একটিতে বলা হয় যে মোস্তফার ভাই নিম্মির প্রতি অশালীন মন্তব্য করায় বচসার সূত্রপাত হয়। এতে মোস্তফার দুই ছেলেও জড়িয়ে পড়েন।[৪৭] আরেক সংস্করণে বলা হয় এই বিয়েতে ডালিমের স্ত্রী নিম্মি'র ভাই বাপ্পী এসেছিলেন কানাডা থেকে অতিথি হিসেবে। বিয়ের অনুষ্ঠানটি হচ্ছিল লেডিজ ক্লাবে। গাজী গোলাম মোশ্তফার ছেলে বসেছিলেন বাপ্পীর ঠিক পেছনের সারিতে এবং তিনি বাপ্পীর চুল ধরে টান দেন। এতে বাপ্পী ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে তার পেছনের সারি থেকে সরে যেতে বলেন। মোস্তফার দুই ছেলে ছিলেন শেখ মুজিবর রহমানের ছেলে শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা আরও কয়েকজন সহ তখন মেজর ডালিম তার স্ত্রী নিম্মি, কর্ণেল রেজার মা এবং ডালিমের আরও ২জন বন্ধুকে উঠিয়ে একটি রেড ক্রিসেন্টের মাইক্রবাসে করে অপহরণ করেন। [৪৮] গাজী মোশ্তফা এবং তার ছেলেরা প্রথমে তাদেরকে রক্ষীবাহিনী সদর দফতরে নিয়ে যান। এরপর সবাইকে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় নিয়ে যান। তবে ইতোমধ্যে ডালিমকে অপহরণের খবরে বেঙ্গল ল্যান্সার্স মোস্তফার বাড়িটি আক্রমণ করে এবং সবাইকে জিম্মি করে। সারা শহরে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট বসানো হয় প্রতিটা গাড়ীতে ডালিমদেরকে খুঁজে উদ্ধারের জন্য। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানকে ডাকিয়ে, তার সামনে সেখানে শেখ মুজিবর রহমান বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।[৪৯] তবে পরবর্তীতে এর বিচারে কিছু বেঙ্গল ল্যান্সার্স সেনা কর্মকর্তা সাময়িক বা সম্পূর্ণ চাকরি হারান। মেজর ডালিমের পরে পোস্টিং হয় ঢাকার বাইরে, যেটাকেও তিনি শাস্তি হিসেবে দেখেছিলেন।[৫০] বেঙ্গল ল্যান্সারস এবং মেজর শরিফুল হক সহ জড়িত অফিসাররা অনেকেই পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আগস্ট অভ্যুত্থানের অংশ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন। [৫১][৫২]

সিরাজ শিকদারের উত্থান ও হত্যাসম্পাদনা

১৯৭১ পরবর্তী সময়ে মাওবাদী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিস্তৃতির এক পর্যায়ে সিরাজ শিকদার নামক মাওবাদী নেতা আলোচিত হয়ে ওঠেন ও পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামক একটি সমালোচিত সশস্ত্র দল গড়ে তোলেন। তার দলের বিভিন্ন বিক্ষুব্ধ ও সশস্ত্র কার্যক্রমকে সরকার নিজেদের জন্য আক্রমণাত্বক ও অস্থিতিশীল বলে বিবেচনা করা শুরু করে এবং বিভিন্নভাবে তাকে ও তার দলকে আটক ও প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে সিরাজ শিকদার আত্মগোপন করেন।[৫৩] কী অবস্থায় সিরাজ সিকদার পুলিশের হাতে শেষপর্যন্ত আটক হন, এবং ঠিক কখন কোথায় কীভাবে তাকে নির্বিচার হত্যা করা হয়-সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা রয়েছে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ গ্রন্থে বলেছেন, সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা (টেকনাফ) থেকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন।[৫৪] অনেকের মতে ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে গ্রেপ্তার করেন। আবার অন্য তথ্যমতে তিনি চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেফতারকারী জানতেন না যে তিনি সিরাজ সিকদার। সেই দিনই তাকে বিমানে ঢাকায় আনা হয়। পরদিন শেরেবাংলা নগর থেকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে হত্যা করে।।[৫৫][৫৬] আবার জাকারিয়া চৌধুরীর[৫৭] বলেন, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখবাঁধা অবস্থায় ঢাকাস্থ রমনা রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।[৫৮] অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস বলেন, সিরাজের ছোট বোন শামীম শিকদার তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করেছিলেন।[৫৮]

দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও বাকশালসম্পাদনা

১৯৭৫ সালের ৭ জুন শেখ মুজিব অবিলম্বে সকল রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লব নামে আখ্যা দেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে তার এক দলের শাসনের ঘোষণার পর সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও সকল রাজনৈতিক দল বিরোধিতা করে। দেশের চলমান অনৈক্য অস্থিতিশীলতা দুর করতে বাকশাল গঠন করা হলেও, বাস্তবে তা আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী আর প্রশাসনের লোকজনের মাঝে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও তখন দেশে চরম দুরবস্থা বিরাজ করছিল। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট শেখ মুজিবের গোচরে ও অগোচরে ক্রমান্বয়ে অধিক থেকে অধিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। শিল্পকারখানাগুলোর রাষ্ট্রীয়করণও চলমান অর্থনীতিতে লক্ষণীয় উন্নতি আনয়নে ব্যর্থ হয়। ১৯৭৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ের সময় অব্যবস্থপনার ফলে দেশে একটি বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে চার লক্ষ (মতান্তরে ১০-১৫ লক্ষ) মানুষ মারা যায়।[৫৯] উক্ত দুর্ভিক্ষকেও অনেক বিশ্লেষক শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ বলে মনে করে থাকেন।[৬০][৬১] এ ব্যাপারে ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউ পত্রিকায়, ১৯৭৪ সালে লরেন্স লিফশুলতজ লেখেন যে, সে সময় বাংলাদেশে "দুর্নীতি ও অনাচার এবং জাতীয় সম্পদের লুণ্ঠন" বিগত সময়ের সকল দুর্নীতির "সীমা অতিক্রম করেছিল"।[৬২]

ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিরুদ্ধে দলীয় প্রাধান্যসম্পাদনা

রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে বৈষম্যের কারণে সেনাবাহিনী পূর্ব থেকেই শেখ মুজিবের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। তবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ গ্রন্থে শেখ মুজিবের প্রতি চূড়ান্ত অসন্তোষের পেছনে একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করেন, যে ঘটনাটি কর্নেল ফারুক রহমান কর্তৃক বর্ণিত, তা হলঃ টঙ্গীর মোজাম্মেল নামক এক সমসাময়িক আওয়ামী লীগ তরুণ নেতা, যে সেসময় টঙ্গী আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ছিল, সে এক নববিবাহিত গৃহবধুকে গাড়ী থেকে তুলে নিয়ে তার ড্রাইভার ও স্বামীকে হত্যা করার পর তাকে অপহরণপূর্বক গণধর্ষণ করে তিনদিন পর তার রক্তাক্ত লাশ রাস্তায় ফেলে যায়। এতে মেজর নাসের নামে ব্যাঙ্গল ল্যান্সারের একটি স্কোয়াড্রনের একজন অধিনায়ক মোজাম্মেলকে আটক করে পুলিশের হাতে সোর্পদ করলে অনতিবিলম্বে সে ছাড়া পায়। তখন অনেকেই মনে করেন, শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপেই সে অপরাধের শাস্তি হতে মুক্তি পেয়েছিল। এ ঘটনা সেনাবাহিনীতে, বিশেষত কর্নেল ফারুকের ভেতরে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে তাকে হত্যা করতে ফারুকের উপর শেষ মুহূর্তের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।[৬৩][৬৪][৬৫]

ষড়যন্ত্রসম্পাদনা

মোশতাক চক্রসম্পাদনা

খন্দকার মোশতাক আহমেদ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর অঘোষিতভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। [৩৭] কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, মোশতাক অনেক পূর্ব থেকেই মুজিবের বিরুদ্ধে চক্রান্তে জড়িত ছিলেন। মোশতাক ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি চক্রান্তে জড়িত ছিল বলে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ দাবি করেন।[৬৬]

খন্দকার মোশতাক আহমেদ মুজিব মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানখন্দকার মোশতাক আহমেদ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। মুজিব পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হন। মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে মোশতাক পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রী হন, অনেকের মতে, যদিও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং সর্বোপরি মুজিবকে স্বল্পশিক্ষিত বলে মনে করতেন।[২৬] অনেক বিশ্লেষকের মতে, মোশতাক মুজিবের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করতেন এবং মুজিবের মতো জনপ্রিয়তা মোশতাকের ছিলনা। জনৈক সাংবাদিকের ভাষ্যমতে[২৬],

১৯৭১ সালে কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন গঠিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকারের অগোচরে খন্দকার মোশতাক আহমেদ মার্কিন মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি আপোষরফার মাধ্যমে কনফেডারেশন গঠন করার গোপন পরিকল্পনা করেন।[৬৭][৪০][৬৮][৮] কিন্তু আকস্মিকভাবে মোশতাকের পররাষ্ট্র সচিব মাহাবুব আলম চাষীর মার্কিন জনৈক কুটনৈতিককে লেখা একটি চিঠি তাজউদ্দিন আহমেদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়।[৬৭] ফলশ্রুতিতে মোশতাককে নজরবন্দি করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরও মোশতাক মুজিববিরোধী চক্রান্ত অব্যাহত রাখেন।[২৬]

তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মহম্মদ খালেক, মাহাবুব আলম চাষী,আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রমূখ খন্দকার মোশতাকের সাথে চক্রান্তে জড়িত ছিলেন।[২৬] জিয়াউর রহমান, মাহাবুব আলম চাষীর মাধ্যমে মোশতাক-চক্রের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করতেন।[৮]

সামরিক সদস্যগণসম্পাদনা

কর্নেল (সেই সময়ে মেজর) সৈয়দ ফারুক রহমান, খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী এবং রাশেদ চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেজর ছিলেন। বিদেশি গোয়েন্দা ও মোশতাক চক্রের থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তারা মুজিবকে হত্যা করে সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা করে।

মেজর ফারুকসম্পাদনা

এন্থনি মাসকারেনহাস তার বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ বইয়ে ফারুককেই মুজিব হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। উক্ত বইয়ে তিনি বলেছেন, ফারুক প্রথমে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যেমে শেখ মুজিবকে বন্দী করার কথা চিন্তা করেন, কিন্তু পরমুহূর্তে তার মনে হল, এর ফলে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের "নিজের ডেকে আনা ও প্রশ্রয় দেওয়া বিপদ" ভারত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টিকে নিশ্চিতভাবে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, ফলে "বৈরী ও অবনতিশীল" অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না, তাই শেখ মুজিবকে হত্যা করাকেই তার কাছে "শৃঙ্খলিত পরিস্থিতি হতে উত্তরণের" একমাত্র অবিকল্প পথ বলে মনে হল, ফারুকের ভাষ্যমতে যা ছিল, "তাকে চলে যেতেই হবে (মরতেই হবে)" (He must go); এবং এর পর থেকেই তিনি মধ্যরাতে খাকি শার্ট ও লুঙ্গি পড়ে ছদ্মবেশে ধানমণ্ডি এলাকায় শেখ মুজিবের বাড়ির আশেপাশে (ম্যাসকারেনহাসের ভাষায় "শেখ মুজিবের মৃত্যুদুত" হিসেবে) একাকী ঘোরাঘুরি করতেন এবং সবকিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মনে মনে শেখ মুজিব হত্যার পরিকল্পনার ছক কষতেন। এছাড়াও ম্যাসকারেনহাসের মতে, ঘাতকদল, বিশেষত ফারুক সম্ভাব্য ব্যার্থতার কারণগুলো কী হতে পারে তা বিবেচনা করে এবং মুজিব হত্যার পর তাদের অনুমান অনুযায়ী সম্ভাব্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ, আওয়ামী লীগের প্রতিশোধমূলক সশস্ত্র বিরোধিতা ও আওয়ামী লীগ-বিরোধীদের বাড়তি স্বেচ্ছাচারী-বিশৃঙ্খলা দমন এবং সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মুজিবের দল আওয়ামী লীগ থেকে তাদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী এবং চাইলে সময়মত সরিয়ে দেয়া যাবে এমন ব্যক্তিকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কিছুকাল অনুসন্ধানের পর মুজিবের মন্ত্রিপরিষদের আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণে সম্মত হন।[৬৪]

অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে মেজর ফারুক বলেন, তিনি চট্টগ্রামের আন্ধা হাফিজ নামক এক জন্মান্ধ পীরের দিকনির্দেশনা নিয়ে এই হত্যাকান্ড সম্পন্ন করেন[৬৩][৬৪][৬৯] [টীকা ৯] যদিও সাপ্তাহিক বিচিন্তার এক সাক্ষাতকারে আন্ধা হাফিজ এ দাবি অস্বীকার করেন।[৭০]

কর্নেল রশিদসম্পাদনা

কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, খন্দকার মোশতাকের নিকটাত্মীয় (ভাগ্নে) ছিলেন। খন্দকার রশিদই মূলত ঘাতক সামরিক অফিসারগণ ও মোশতাক-চক্রের সাথে সমন্বয় রক্ষা করেন। মুজিব হত্যার আরেক মূল পরিকল্পনাকারী ঘাতক কর্নেল ফারুক রহমান এক সাক্ষাতকারে বলেন, রশিদই তাকে সরকার উৎখাতের কথা বলেছিল।[২৬]

পরেশ সাহার দাবি,

মেজর জেনারেল (অব.) এম খলিলুর রহমান (তৎকালীন বিডিআরের পরিচালক) তার সাক্ষ্যে বলেন, "মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের পর একপর্যায়ে মেজর রশিদ তাঁর স্ত্রীর (জোবায়দা রশীদ) সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার মনে হলো, মেজর রশিদ একটু গর্ব করে বলেন, “ইনি আমার স্ত্রী। আমরা যা করেছি তার প্রধান প্ল্যানার আমার স্ত্রী।”’[১৩]

অন্যান্যসম্পাদনা

কথিত আছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স এবং এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল ইসলাম খান মুজিব হত্যার চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।[৭১]

ষড়যন্ত্র বিষয়ে তাজউদ্দীনের সাক্ষ্যসম্পাদনা

সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তার ১৯৭৮ সালে রচিত "মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র" বইতে লেখেন, বাকশাল গঠনের পর তিনি তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে তার বাড়িতে দেখা করলে তাজউদ্দীন তাঁকে জানান, জিয়াউর রহমান তাজউদ্দীনের কাছে মুজিবকে গৃহবন্দী করার পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন যা তাজউদ্দীন সরাসরি নাকচ করে দেন, এবং তাজউদ্দীনের মনে হচ্ছিল, জিয়া নিজে থেকে আসেন নি, তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন আরও বলেন, মুজিবকে তিনি এই ষড়যন্ত্রের কথা জানালে তার মনে হল মুজিব তার কথা বিশ্বাস করেন নি। তিনি আরও বলেন, ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরের পর থেকেই আওয়ামী লীগের চার পাঁচজন সদস্য এই পরিকল্পনা করে, খন্দকার মোশতাক জেদ্দায় গিয়ে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন, এবং মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফস্টারের সঙ্গেও এ ব্যাপারে গোপনে আলোচনা করেন এবং মার্কিন দূতাবাস ব্যাংক থেকে এজন্য তাদের কাছে তিন কোটি টাকাও আসে। তাজউদ্দীন আরও বলেন, পরিকল্পনায় বিদেশি সহায়তার অন্যতম কারণ ছিল আমেরিকা সবসময় পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, এবং সৌদি আরব, জর্ডান ও লিবিয়াসহ ইসলামী দেশগুলো ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারছিল না, তাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র হোক। এছাড়াও আমেরিকার সি.আই.এ. ও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (মুজাফফর)ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিবর্তে তাদের নিজেদের অনুকূলে সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে চাইছিল, তাজউদ্দীন এ বিষয়টিকে নিজ ভাষ্যে বলেন, "ভারত ছাড়া পৃথিবীর এগারটি বৃহত্তম শক্তিই চাইছে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ভিয়েতনাম বানাতে। এবং তাদের চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছে এই দেশ।"[৭২]

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাসম্পাদনা

গৃহবন্দির পরিবর্তে হত্যা পরিকল্পনা করার পর খুনিচক্রের মধ্যে ফারুক এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে। এন্থনি ম্যাসকারেনহাস বলেন, ফারুক জিয়াউর রহমানকে মুজিব হত্যা পরিকল্পনার বিষয়ে আভাস দিলে জিয়া ফারুককে বলেন,

চলো চলো আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলি।

ফারুক তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিয়াকে বলেন,

... আমরা পেশাদার সৈনিক। আমরা দেশের সেবা করি; কোন ব্যক্তির নয়...আমাদের (মুজিব সরকারকে) উৎখাত করতে হবে, আমরা জুনিয়র অফিসাররা এর প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন আমরা আপনার সমর্থন এবং আপনার নেতৃত্ব চাই।[৮]

এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের মন্তব্য,

(ইংরেজি)

«Zia neither opposed it; nor confirmed it»

(বাংলা)

«জিয়া এর বিরোধিতাও করলেন না, সমর্থনও করলেন না।»

ফারুকের বর্ণনামতে জিয়ার আচরণের ইঙ্গিতের অর্থ ছিল,

ম্যাসকারেনহাসের বইয়ের বাংলা অনুবাদ সংষ্করণে লেখা হয়েছে, ফারুকের মতে, জিয়ার ইঙ্গিতের অর্থ ছিলঃ "আমি দুঃখিত, আমি এ ধরনের কাজে নিজেকে জড়াতে চাই না, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি কিছু একটা করতে চাও, তাহলে তোমাদের নিজেদেরই তা করা উচিত, আমাকে এসবের মধ্যে টেনো না।"[৬৪]

তবে ঘাতক লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদের স্ত্রী ও আসামি জোবায়দা রশীদ জবানবন্দিতে বলেন, "...মেজর ফারুক জেনারেল জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করত ছোটবেলা থেকেই। তিনি (ফারুক) জিয়ার পূর্বপরিচিত ছিলেন। একদিন রাতে মেজর ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে আমার স্বামীকে জানায় যে, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। জিয়া নাকি বলে,

যদি এটি সফল হয়, তবে আমার কাছে এসো, যদি এটি ব্যর্থ হয়, তবে আমাকে (এর মাঝে) জড়িও না।

জিয়া আরো বলেন,

এর কদিন পর মেজর ফারুক আমার বাসায় এসে রশীদকে বলে যে, জিয়া বলেছে, “রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজতে হবে যে দায়িত্ব নিতে পারবে।” সে মোতাবেক রশীদ খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামসি লেনের বাসায়। ১৫ আগস্ট বিকেলে বঙ্গভবনে জেনারেল জিয়াউর রহমান রশীদের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল যাতে তাঁকে চিফ অব আর্মি করা হয়। ১৬ অথবা ১৭ তারিখ প্রাক্তন মন্ত্রী সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, আমার স্বামী ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করার বিষয় ঠিক হয়।"[১৩]

অধিকাংশ বিশ্লেষকগণ উপরোক্ত তথ্য অনুসারে বলেন, জিয়াউর রহমান এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত ছিলেন এবং বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, তিনি খুনিচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদের মদত দেন।[৮][৭৪] অনেক বিশ্লেষকের মতে, জিয়ার এই বিতর্কিত ভূমিকা সামরিক আইনের ৩১ ধারার লঙ্ঘন, সর্বোপরি উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্বের অবহেলা।[৮]

পরেশ সাহা বলেন, খুনিচক্রের সাথে জিয়ার অবশ্যই কোন না কোন 'বনিবনা' ছিল।[২৬] খুনি মেজরগণ প্রবাসে তাদের বিভিন্ন সাক্ষাতকারে জিয়াউর রহমানের সংযুক্তির কথা উল্লেখ করেন।

মেজর জেনারেল (অব.) এম খলিলুর রহমান (তৎকালীন বিডিআরের পরিচালক) তার সাক্ষ্যে বলেন,"জেনারেল জিয়া নম্বরের ভিত্তিতে জেনারেল সফিউল্লাহর সিনিয়র থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সেনাপ্রধান না করায় কিছু আর্মি অফিসার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তখন এই সমস্যা দূর করার জন্য শুনিয়াছি, জেনারেল জিয়াকে আর্মি হতে অবসর দিয়ে অ্যাম্বাসেডর (রাষ্ট্রদূত) হিসেবে বিদেশে পাঠাই দেবে।”’[১৩]

অনেক লেখকের দাবি, জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান না করায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে মুজিব-সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

কর্নেল শাফায়েত জামিল বলেন,

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ সতীর্থ ছিলেন। জিয়াউর রহমান সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু তাঁকে চিফ অব স্টাফের পদ দেওয়া হয় নাই। এতে দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না।’[১৩]

ঘটনাপ্রবাহসম্পাদনা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানরত আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদদাতা সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তার "মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা" বইয়ে লিখেন যে, মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বর্ণনা সবসময় রহস্যে ঘনীভূত থাকবে।[৭৫] শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড একটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণিত হলেও এটি সমগ্র সেনাবাহিনীর কোন অভ্যুত্থান ছিল না। মধ্যম সারির কয়েকজন অফিসারদের দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ততকালীন সেনাপ্রধান কে. এম. শফিউল্লাহর মতে,

পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের ঘটনাবলীকে আমি সামরিক অভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করতে চাই না। যদিও পরবর্তীতে এটি সামরিক অভ্যুত্থান বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আসলে সামরিক বাহিনীর একটি একটি ছোট গ্রুপ, সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে যাদের অবস্থান ছিল তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।…এটা সামরিক অভ্যুত্থান নয়; একটা সন্ত্রাসী কাজ[৮]

হত্যাকাণ্ডসম্পাদনা

শেখ মুজিব পরিবারসম্পাদনা

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা চারটি দলে বিভক্ত হয়। এদের একদল ছিল মেজর হুদার অধীনে বেঙ্গল ল্যান্সারের ফার্স্ট আর্মড ডিভিশন ও ৫৩৫ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা যারা মুজিবের বাসভবন আক্রমণ করেন। সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তার "মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা" বইয়ে লিখেন যে, মুজিবের বাসভবনের রক্ষায় নিয়োজিত আর্মি প্লাটুন প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করে নি। মুজিবের পুত্র, শেখ কামালকে নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় গুলি করা হয়।[৭৬]

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ করার বিষয়ে আদালতকে কে এম সফিউল্লাহ বলেন,

‘আমি যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলি তিনি আমার গলার আওয়াজ শুনে বলে উঠলেন, “সফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।” প্রতি উত্তরে আমি বলেছিলাম, আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অব দ্য হাউস?’ আমি যখন জিয়া ও খালেদ মোশাররফকে ফোন করি তখন তাঁদের তাড়াতাড়ি আমার বাসায় আসতে বলি। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে তাঁরা আমার বাসায় এসে পড়ে। জিয়া ইউনিফরমড ও শেভড। খালেদ মোশাররফ নাইট ড্রেসে নিজের গাড়িতে আসে।[১৩]

মুজিবকে পদত্যাগ করা ও তাকে এ বিষয়ে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। মুজিব সামরিক বাহিনীর প্রধান, কর্নেল জামিলকে টেলিফোন করে সাহায্য চান।[৭৫] জামিল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৈন্যদের সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলে তাকে সেখানে গুলি করে মারা হয়। মুজিবকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুজিবের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (উপরের তলায় হত্যা করা হয়), মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসের, দুইজন চাকর (শৌচাগারে হত্যা করা হয়); শেখ জামাল, ১০ বছর বয়সী শেখ রাসেল এবং মুজিবের দুই পুত্রবধুকে হত্যা করা হয়।[৭৭] শেখ মুজিবের শরীরে আঠারটি গুলি করা হয়েছিল। [৭৮] সেসময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন।[৭৯] তারা ভারত সরকারের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে ভারতে চলে আসেন। তিনি নির্বাসিত অবস্থায় দিল্লীতে বসবাস করতে থাকেন। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ই মে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন করেন।[৮০]

মনি ও সেরনিয়াবাত পরিবারসম্পাদনা

দুটি সৈনিক দল মুজিবের ভাগ্নে ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হককে (মনি) তার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীর সাথে ১৩/১, ধানমন্ডিতে এবং মুজিবের ভগ্নিপতি ও সরকারের একজন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে তার পরিবারের ১৩ জন সদস্যসহ মিন্টু রোডে হত্যা করে।[৮১][৮২] মনির দুই পুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস হত্যাকাণ্ডের সময় নিজেদের জীবন রক্ষার্থে বাড়িতে লুকিয়ে থাকার কারণে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হন।

সাভারসম্পাদনা

চতুর্থ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিকে সাভারে সংস্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত প্রত্যাশিত বিরোধী আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাঠানো হয়। একটি সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর এগারজনের মৃত্যু হলে সরকারের অনুগতরা আত্মসমর্পণ করে।[৮৩]

মোশতাক আহমেদের প্রতিক্রিয়াসম্পাদনা

শেখ মুজিব নিহত হবার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন, এই পদে তিনি মাত্র ৮৩ দিন ছিলেন।। তিনি ক্ষমতা অধিগ্রহণের পরপরই জাতির প্রতি ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের জাতির সূর্যসন্তান বলে আখ্যা দেন।[৮৪] রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্ব নেবার পর তিনি ইনডেমিনিটি বিল পাশ করেন। ঐ বছরের ২৫শে আগস্ট তিনি জিয়াউর রহমানকে চিফ অফ আর্মি স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেন।[৮৫] মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর সেনাবিদ্রোহের দ্বারা অপসারিত হন।

জিয়াউর রহমানের প্রতিক্রিয়াসম্পাদনা

হত্যার দিন সকালে সে সময়ের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি ঘটনার বর্ননায় বলেন, "জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াত জামিলকে জিজ্ঞেস করলেন, 'শাফায়াত কী হয়েছে?' শাফায়াত বললেন, 'অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। (খুবসম্ভব দুটি সেনাদল একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।) বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।' তখন জেনারেল জিয়া বললেন, সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স। গেট ইয়োর ট্রুপ্স রেডি। আপহোল্ড দ্য কন্সটিটিউশন। (তাতে কী? ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা নিতে দাও। রাজনীতি নিয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। তোমার সেনাদল প্রস্তুত কর। সংবিধান বহাল রাখো।)"[৮৬]

মেজর রফিকুল ইসলামের দাবি, মুজিব হত্যার পর উল্লাসিত হয়ে জিয়াউর রহমান মেজর ডালিমকে বলেন[৮],

তারপর জিয়া গভীর আবেগে ডালিমকে জড়িয়ে ধরেন।[৮][৮৭]

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডে খুনি অনেক সামরিক অফিসারকে বৈদেশিক দুতাবাসে সচিব পর্যায়ে চাকুরীতে নিয়োগ করেন।[৮৮][৮৯] শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের এই সকল ক্রিয়াকলাপকে অনেক বিশ্লেষক মুজিব হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত হওয়ার পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে দাবি করেন।[২৬]

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসম্পাদনা

শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা প্রদানের জন্য বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

জিয়াউর রহমানও শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিচার রুদ্ধ করার জন্য সমালোচিত। বিতর্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যা মুজিব হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া রোধ করার জন্য প্রণীত হয়েছিলো, তা জিয়াউর রহমান পুনর্বহাল করেন।[৯০][৭৪][৯১] তিনি অবৈধ ঘোষিত ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তা সংবিধানে সংযুক্ত করেছিলেন।[৮৯][৭৪]

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ হাইকোর্ট সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে।

খালেদ মোশাররফের প্রতিক্রিয়াসম্পাদনা

মেজর ফারুক, মেজর রশিদ এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ-এর অভ্যুত্থানে গড়া সরকারের বিরুদ্ধে কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের সহায়তায় আরও একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ, যিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তীব্র অনুরাগের বশবর্তী হয়ে এই অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৩রা নভেম্বর, ১৯৭৫-এ মোশতাক সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। কিন্তু তার পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরা অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে ইতঃপূর্বে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চার নেতা (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, মুহাম্মদ মনসুর আলী)কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ সে সময় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চার নেতার দ্বারা আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতা লাভের একটি সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, আর তাই ৩ নভেম্বর সকালে অভ্যুত্থানের পূর্বে আওয়ামী লীগের এই চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এর পরপরই একই দিনে অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যার ফলে ৬ই নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ও আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন। এর পর জিয়াউর রহমানকে চিফ-অফ-আর্মি স্টাফ পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিলেন। একারণে তিনি জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখেন, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে তার জনপ্রিয়তার কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাংখী ছিলেন এবং তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন, সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিল না। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও অনেক জনপ্রিয় ছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক। ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাহের জানতে পারেন জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়েছে। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের বিদ্রোহের নির্দেশ দিয়ে তৎক্ষণাৎ চট্টগ্রামে থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় কয়েক শত জাসদ কর্মী তার সঙ্গী ছিল। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান ৭ই নভেম্বর সফল হয়। তিনি জিয়াউর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত করে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির সদরদপ্তরে নিয়ে আসেন। পাল্টা এই অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফকে তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত ১০ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদরদপ্তরে বিক্ষুব্ধ সৈন্যরা হত্যা করে।

প্রতিবাদসম্পাদনা

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর বরগুনায় এর প্রথম প্রতিবাদ হয়। মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব মৃধা বরগুনা এসডিও সিরাজ উদ্দিন আহমেদের সহায়তায় ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির এর নেতৃত্বে ১০-১৫ জন ছাত্রলীগ কর্মীর ঝটিকা মিছিল বের করেন। পরবর্তীতে এতে বরগুনার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা যোগ দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, খুলনা, যশোর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ বিভিন্ন জায়গায় ১৫ই আগস্ট সকালে প্রতিবাদ হয়।[৯২][৯৩]

পরবর্তীতে আবদুল কাদের সিদ্দিকী ১৭ হাজার মুজিব ভক্তকে ৭টি ফ্রন্টে ভাগ করে ২২ মাস প্রতিরোধ যুদ্ধ করেন। এতে ১০৪ জন যোদ্ধা নিহত এবং কয়েকশ আহত হয়। এর মাঝে শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলার ৫০০ তরুণের ‘শেরপুরের ৫০০ প্রতিবাদী’র বিদ্রোহ ও লড়াই আলোচিত ছিল।[৯২][৯৪]

মুফতি নূরুল্লাহ পরদিন জুমার নামাজের খুতবায় এর প্রতিবাদ করেন।[৯৫]

আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভী সৈয়দ, ছাত্রনেতা এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা এস.এম. ইউসুফ প্রতিরোধ করতে শুরু করেন।[৯৬]

১৮ই অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টার ও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। ২০ অক্টোবর প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।[৯২][৯৭]

প্রতিবাদ করায় ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট মুক্তাগাছার প্রতিবাদী ৫ মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী, নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিনকে সেনা অভিযানে হত্যা করা হয়। বেঁচে যাওয়া বিশ্বজিৎ নন্দী নামে কিশোর যোদ্ধাকে আটক করে ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালতে ফাঁসি দেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীসহ প্রভাবশালী বিশ্বনেতার প্রভাবে তাকে যাবজ্জীবন দেয়া হয় এবং তিনি ১৯৮৯ সালে মুক্তি পান।[৯২]

বিচারসম্পাদনা

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যগণকে হত্যার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ১ মার্চ ১৯৯৭ সালে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। ৮ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারক বিচারপতি মােঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি এ.বি.এম খায়রুল হক দ্বিমতে বিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। এরপর তৃতীয় বিচারপতি মােঃ ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। এরপর পাঁচজন আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানীর পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷[৯৮][৯৯] ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে ২৯ দিন শুনানির পর ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘােষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন[৯৯]। ২০১০ সালের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারি চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশনও খারিজ করেন। এদিনই মধ্যরাতের পর ২৮ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা যায় এবং ছয়জন বিদেশে পলাতক রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর বাস্তবায়িত হয়।

রায় কার্যকরসম্পাদনা

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।[১০০] তারা হলেন:

  • লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান
  • লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান
  • মেজর বজলুল হুদা
  • লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি)
  • লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)[৯৯][১০০]

২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয়[১০১] এবং ১২ এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।[১০২]

২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন গ্রেফতার হন। [১০৩]

২০০১ সালের ২ জুন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল আজিজ জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে কথিত আছে। তবে তার মৃত্যু নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।[১০৪]

এছাড়াও এখনো ১২ জনের মধ্যে চারজন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হলেন,

  • কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ
  • লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম
  • লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী
  • লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী[১০৫]

আরও দেখুনসম্পাদনা

টীকাসম্পাদনা

  1. শেখ মুজিবুর রহমান, তার ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি এবং আত্নীয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত - মোট তিনটি বাড়িতে খুনিচক্র হামলা চালায়।
  2. সচরাচর একটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণিত হলেও এটি ছিল একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যসম্পন্ন পূর্বপরিকল্পিত সামান্যসংখ্যক সামরিক ও বহিষ্কৃত অফিসারদের দ্বারা পরিচালিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের পর অন্যান্য সামরিক অভ্যুত্থানের মতো সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ ক্ষমতাগ্রহণ করেনি।ততকালীন সেনাপ্রধান কে. এম. শফিউল্লাহর মতে,

    পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের ঘটনাবলীকে আমি সামরিক অভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করতে চাই না। যদিও পরবর্তীতে এটি সামরিক অভ্যুত্থান বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আসলে সামরিক বাহিনীর একটি একটি ছোট গ্রুপ, সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে যাদের অবস্থান ছিল তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।…এটা সামরিক অভ্যুত্থান নয়; একটা সন্ত্রাসী কাজ

  3. বিভিন্ন বর্ণনায় সংখ্যাটি ১৭০ থেকে ৭০০ এর মধ্যে দাবি করা হয়। ঘাতক মেজর ফারুক রহমান সংখ্যাটি ৭০০ বলে দাবি করেছিলেন
  4. নতুন দেশ, বাংলাদেশের, শুরু হয় পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর অনেক "হামলা এবং ধর্ষণ" দিয়ে। জানুয়ারি ১৯৭২ সালে আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন অনুসারে:

    গত মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তাণ্ডবের পর, বিশ্বব্যাংকের পরিদর্শকদের একটি বিশেষ দল লক্ষ্য করেছিল যে, কয়েকটি শহর "পারমাণবিক হামলার পরের দিনের সকালের মতো" দেখাচ্ছিল। তারপর থেকে, এই ধ্বংসাত্মকতা কেবলমাত্র আরও বেড়েছে। আনুমানিক ৬,০,০০,০০০ বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ১৪,০০,০০০ কৃষক পরিবার তাদের জমিগুলিতে কাজ করার জন্য সরঞ্জাম বা পশু-পাখি নেয়া ছাড়াই চলে গেছে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যাহত। রাস্তাগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, সেতুগুলি ভেঙে গেছে এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলি অবরুদ্ধ রয়েছে। এক মাস আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত এই দেশ ধর্ষণ অব্যাহত ছিল। যুদ্ধের শেষ দিনগুলিতে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের মালিকানাধীন ব্যবসায়গুলি - যার মধ্যে প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল - কার্যত তাদের সমস্ত তহবিল পশ্চিমে জমা করেছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স চট্টগ্রাম বন্দর নগরীতে তার অ্যাকাউন্টে ঠিক ১১৭ রুপি (১৬ ডলার) রেখে যায়। সেনাবাহিনী ব্যাংক নোট এবং মুদ্রাও ধ্বংস করে দিয়েছে, যেন অনেক অঞ্চল এখন নগদ টাকার মারাত্মক ঘাটতির মধ্যে পড়ে। বন্দরগুলি বন্ধ হওয়ার আগেই ব্যক্তিগত গাড়িগুলি রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বা অটো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং পশ্চিম দিকে পাঠানো হয়েছিল।

  5. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রোধে সর্বদা সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত ছিলনা। স্বাধীনতা-উত্তরকালে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ দেশপ্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন শহীদ হন। সেক্ষেত্রে মুজিব নতুন একটি আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীতা অনুভব করেন।
  6. মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহর মধ্যে ক্ষমতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ অব্যাহত ছিলো। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নেতৃত্ব হস্তগত করার জন্য তাজউদ্দীন আহমেদকে ‘কর্নেল ওসমানীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত করার’ পরামর্শ দেন। খালেদ মোশাররফ ও কে. এম. শফিউল্লাহ এর বিরোধীতা করেন। কারণ তাদের মতে তা ছিলো জিয়ার ‘নেতৃত্ব প্রাপ্তির প্রচেষ্টা’। কারণ, ওসমানী অপসারিত হলে জিয়াই সিনিয়রিটি অনুযায়ী সেনাপতি হবেন। জিয়ার এই কুটকৌশলের ফলে জিয়া ও ওসমানীর মধ্যে সম্পর্কের মারাত্বক অবনতি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ওসমানী তিনবার জিয়াকে গ্রেফতারের নির্দেশ পাঠান। জিয়া মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার জন্য ব্যাপক প্রশংসিত হলেও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে একটি ঘোষণায় জিয়া নিজেকে ‘প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট’ তথা ‘হেড অফ দা স্টেট’ ও ‘লিবারেশন আর্মি চীফ’ বলে ঘোষণা দেয়। মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা, ওসমানীর জিয়া সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা, ও নেতৃত্ব গ্রহণের চেষ্টার ফলেই মুজিব জিয়ার তুলনায় শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করাকেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রপতির সেনাপ্রধান নিয়োগে হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি স্বাভাবিক বিষয়।
  7. মীর শওকত আলী লিখেছেন, "সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলতো। মুক্তিযোদ্ধাদের উস্কিয়ে দিত প্রত্যাগতদের বিরুদ্ধে। আবার কিছু প্রত্যাগত অফিসারের আস্থা অর্জন করে ক্ষেপিয়ে তুলত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে।"
  8. মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহর মধ্যে ক্ষমতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ অব্যাহত ছিলো। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নেতৃত্ব হস্তগত করার জন্য তাজউদ্দীন আহমেদকে ‘কর্নেল ওসমানীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত করার’ পরামর্শ দেন। খালেদ মোশাররফ ও কে. এম. শফিউল্লাহ এর বিরোধীতা করেন। কারণ তাদের মতে তা ছিলো জিয়ার ‘নেতৃত্ব প্রাপ্তির প্রচেষ্টা’। কারণ, ওসমানী অপসারিত হলে জিয়াই সিনিয়রিটি অনুযায়ী সেনাপতি হবেন। জিয়ার এই কুটকৌশলের ফলে জিয়া ও ওসমানীর মধ্যে সম্পর্কের মারাত্বক অবনতি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ওসমানী তিনবার জিয়াকে গ্রেফতারের নির্দেশ পাঠান।
  9. তার ভবিষ্যৎ বলার অতিন্দ্রিয় ক্ষমতা ছিল বলে লোকমুখে প্রচলিত ছিল এবং তার স্ত্রী ফরিদা তাকে উক্ত পীরের সাথে যোগাযোগে সহায়তা করেন। সে পীর তাকে ইসলামের স্বার্থে উক্ত হত্যাকাণ্ড করতে বলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ পরিত্যাগ ও সঠিক সময়ে সে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরামর্শ দেয়। যদিও সাপ্তাহিক বিচিন্তার এক সাক্ষাৎকারে আন্ধা হাফিজ উক্ত দাবি অস্বীকার করেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "১৫ অগাস্ট: কী ছিল সেদিনের পত্রিকায়"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ২০১৭-০৮-১৪। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০১৮ 
  2. কল্লোল, কাদির (১৫ ই আগস্ট ২০১৫)। "প্রথম অভ্যুত্থান যেভাবে পাল্টে দেয় বাংলাদেশের গতিপথ"বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  3. "BANGLADESH: Mujib's Road from Prison to Power [বাংলাদেশ: মুজিবের কারাগার থেকে ক্ষমতায় আসার পথ]" টাইম। ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২। সংগ্রহের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ 
  4. Habib, Mohshin (৪ আগস্ট ২০১৭)। "Bangabandhu cared about the poor"The Asian Age। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০১৭ 
  5. Bangladesh; Hossain, Hamza (১৯৭৪)। Jatiya Rakkhi Bahini Act (ইংরেজি ভাষায়)। Khoshroz Kitab Mahal। 
  6. Pike, Francis. (২০১০)। Empires at war : a short history of modern Asia since World War II। London: I.B. Tauris। আইএসবিএন 978-1-4416-5744-2ওসিএলসি 656823453 
  7. Schottli, Jivanta; Mitra, Subrata K.; Wolf, Siegried। A Political and Economic Dictionary of South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃষ্ঠা 337। আইএসবিএন 978-1-135-35576-0। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  8. সাইয়িদ, অধ্যাপক আবু। ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড 
  9. Braithwaite, John; D'Costa, Bina (২০১৮)। Cascades of Violence: War, Crime and Peacebuilding Across South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। ANU Press। পৃষ্ঠা 337। আইএসবিএন 978-1-76046-190-4। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  10. Nyrop, Richard F. (১৯৭৫)। Area Handbook for Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। U.S. Government Printing Office। পৃষ্ঠা 200। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  11. Gandhi, Rajmohan (১৯৯৯)। Revenge and Reconciliation (ইংরেজি ভাষায়)। Penguin Books India। পৃষ্ঠা 346। আইএসবিএন 978-0-14-029045-5। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  12. Ahmed, Salahuddin (২০০৪)। Bangladesh: Past and Present (ইংরেজি ভাষায়)। New Delhi: APH Publishing। পৃষ্ঠা 208। আইএসবিএন 978-81-7648-469-5। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  13. আসাদুজ্জামান। "বস সবকিছুর ব্যবস্থা নিচ্ছেন"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১০-০৮ 
  14. এম এ হামিদ পিএসসি, লে কর্নেল। তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা 
  15. সাইয়িদ, অধ্যাপক আবু। জেনারেল জিয়ার রাজত্ব 
  16. আলী, মীর শওকত। কারাগারের ডায়রি 
  17. "বঙ্গবন্ধুর বাকশাল ও রক্ষীবাহিনী" 
  18. Ahmed, Salahuddin (২০০৩)। Bangladesh : past and present। New Delhi: A.P.H. Publishing Corporation। পৃষ্ঠা 258। আইএসবিএন 9788176484695। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০১৫ 
  19. "বঙ্গবন্ধু, মানুষ কেমন ছিলেন?"সারাবাংলা 
  20. সাহা, পরেশ। মুজিব হত্যার তদন্ত ও রায় 
  21. "Sheikh Kamal: The tale of a tragic hero"The Independent (Bangladesh)। ৫ আগস্ট ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ 
  22. সাহা, পরেশ। মুজিব হত্যার তদন্ত ও রায় 
  23. Askari, Rashid (৫ আগস্ট ২০১৬)। "The story of an unsung hero"The Daily Observer। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুন ২০২০ 
  24. "শেখ কামালের পাশে সেদিন ছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু | বাংলাদেশ প্রতিদিন"বাংলাদেশ প্রতিদিন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৩ আগস্ট ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  25. "Sheikh Kamal the person I knew | banglanews24.com"banglanews24 (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৫-০৯-০৯। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৩ 
  26. সাহা, পরেশ। মুজিব হত্যার তদন্ত ও রায় 
  27. "বঙ্গবন্ধু, মানুষ কেমন ছিলেন?"সারাবাংলা 
  28. "Awami League will have to atone for making a JaSoD leader minister, says Syed Ashraf"bdnews24.com। জুন ১৩, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  29. "Clarify your role in Bangabandhu killing, BNP to Inu"Prothom Alo। আগস্ট ২৪, ২০১৫। ১২ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  30. "No law of 'illegitimate govt' will last, says Khaleda"bdnews24.com। আগস্ট ২৫, ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  31. Hossain, Kazi Mobarak (মার্চ ১৩, ২০১৬)। "Hasanul Haq Inu's JaSoD splits as he names Shirin general secretary"bdnews24.com। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  32. Staff Correspondent। "JS sees debate over role of Gono Bahini"The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ৯, ২০১৫ 
  33. "Inu, Khairul to be tried in people's court: BNP"। The News Today। UNB। জুন ১৫, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  34. "JSD, NAP, left parties also behind the killing of Bangabandhu"The New Nation। আগস্ট ২৬, ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১৩, ২০১৬ 
  35. চৌধুরী, মিজানুর রহমান। রাজনীতির তিনকাল 
  36. মিয়া, এম এ ওয়াজেদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ 
  37. "বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়"মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভ 
  38. "মুজিবকে শান্তিতে থাকতে দেননি ভুট্টো"দৈনিক প্রথম আলো 
  39. "অবিশ্বাসীর জন্য অনুকম্পা"দৈনিক প্রথম আলো 
  40. সাহা, পরেশ। মুজিব হত্যার তদন্ত ও রায় 
  41. মুকুল, এম আর আখতার। মুজিবের রক্ত লাল 
  42. মুকুল, এম আর আখতার। মুজিবের রক্ত লাল 
  43. "সত্য জানুন- বঙ্গবন্ধু মাত্র ১ দিনের জন্য ৪ টি বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করেছিলেন"দেশরিভিউ। নভেম্বর ২২, ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  44. "১২৪টি পত্রিকা পুনর্বহাল"সংগ্রামের নোটবুক 
  45. "বঙ্গবন্ধুর আমলে ২ দিনের জন্য নিষিদ্ধ হওয়া পত্রিকার তালিকা"সংগ্রামের নোটবুক 
  46. "১৬ জুন: ইতিহাসে আজকের এই দিনে"দৈনিক যুগান্তর (ইংরেজি ভাষায়)। ১৬ জুন ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ 
  47. "Bangladesh a Legacy of Blood"Scribd (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১৯ 
  48. "Assassination of Sheikh Mujibur Rahman (1975) - Dalim incident proves a sore point for young army officers - History of Bangladesh"Londoni (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১৯ 
  49. Riaz, Ali। Unfolding State: The Transformation of Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। de Sitter Publications। পৃষ্ঠা 239। আইএসবিএন 9781897160107। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  50. Karsten, Peter (১৯৯৮)। Civil-military Relations (ইংরেজি ভাষায়)। New York: Taylor & Francis, Garland Pub। পৃষ্ঠা 318। আইএসবিএন 978-0-8153-2978-7। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  51. "Shahriar's confession"thedailystar.net। The Daily Star। ১৯ নভেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  52. "Farooq's confession"thedailystar.net। The Daily Star। ১৯ নভেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  53. বসু, অঞ্জলি (নভেম্বর ২০১৩)। বসু, অঞ্জলি; সেনগুপ্ত, সুবোধচন্দ্র, সম্পাদকগণ। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (পঞ্চম সংস্করণ, দ্বিতীয় মুদ্রণ সংস্করণ)। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ। পৃষ্ঠা ৭৮০। আইএসবিএন 978-8179551356 
  54. মাস্কারেনহাস, এন্থনি; শাহজাহান, মোহাম্মদ (১৯৮৮)। বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ। হাক্কানি পাবলিশার্স। পৃষ্ঠা ৫২। আইএসবিএন 984-433-066-1। সংগ্রহের তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  55. Islam, Sirajul (২০১২)। "Sikder, Siraj"Islam, Sirajul; Khan, Muazzam H.। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh 
  56. "NetNewsLedger - Thunder Bay News - January 2 - This Day in History"NetNewsLedger - Thunder Bay News। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৪-১২ 
  57. জাকারিয়া চৌধুরী হলেন সিরাজ সিকদারের ছোটবোন ভাস্কর শামীম সিকদারের স্বামী
  58. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, অ্যান্থনী মাসকারেনহাস, অনুবাদ- মোহাম্মাদ শাজাহান, হাক্কানী পাবলিশার্স, চতুর্থ মূদ্রণ-জুলাই ২০০৬।
  59. Rubin, Olivier (২০১২)। Democracy and Famine By। Roultege। পৃষ্ঠা 56। আইএসবিএন 9780415598224। সংগ্রহের তারিখ ২৮ নভেম্বর ২০২০ 
  60. Hossain, Naomi (২০১৭)। The Aid Lab: Understanding Bangladesh's Unexpected Success। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 114। সংগ্রহের তারিখ ২৮ নভেম্বর ২০২০ 
  61. Ahmed, Nizam। Public Policy and Governance in Bangladesh: Forty Years of Experience। Routledge। পৃষ্ঠা 76। সংগ্রহের তারিখ ২৮ নভেম্বর ২০২০ 
  62. Datta-Ray, Sunanda K. (৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। "Tread Warily to the Dream"The Telegraph (Opinion)। Calcutta, India। 
  63. Mascarenhas, Anthony (১৯৮৬)। Bangladesh: A Legacy of Blood (ইংরেজি ভাষায়)। Hodder and Stoughton। পৃষ্ঠা ৪৮–৫৫। আইএসবিএন 978-0-340-39420-5। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০২০একদিন ঢাকার উত্তরে টঙ্গী অঞ্চলে একটি চিরুনী অভিযানের সময় মেজর নাসের যিনি বেঙ্গল ল্যান্সার্সের আরেকটি স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক ছিলেন, তিনি তিনজন উঠতি কমবয়সী দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন লোক ভেঙে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বিশেষত ভয়াবহ ত্রিভুজ হত্যার গল্প বলে যা আগের বছরের শীতকালের সময়টিতে টঙ্গিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটি ছিল, সদ্য বিবাহিত দম্পতি একটি ট্যাক্সিতে তাদের বাড়িতে যাওয়ার পথে শহরের উপকণ্ঠে পথিমধ্যে আটক হয়। বর ও ট্যাক্সি চালককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদের লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন কটেজে নিয়ে গিয়ে কনেটিকে বারবার তার অপহরণকারীরা ধর্ষণ করে। তিন দিন পরে তার বিকৃত লাশটি একটি ব্রিজের কাছে রাস্তায় পাওয়া যায়। অপরাধে তার নিজের অংশের কথা স্বীকার করে, দুর্বৃত্তটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বলেছিল যে, এই ঘটনাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়, যখন তারা (পুলিশেরা) জানতে পেরেছিল যে এই গ্যাংয়ের রিং-লিডার ছিলেন তার বস মুজাম্মিল, টঙ্গী আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান। ফারুকের মতে, এই স্বীকারোক্তিটি জিজ্ঞাসাবাদকারীকে তীব্র রাগিয়ে দিয়েছিল, যে ছিল ইশতিয়াক নামে একজন কমবয়সী লেফটেন্যান্ট যিনি তখন থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, "তিনি এই ছোকরাটিকে (দুর্বৃত্ত) এতটাই মারতে শুরু করেছিলেন যে, অভ্যন্তরীণ আঘাতের কারণে সে মারা যায়।" মুজাম্মিলকে মেজর নাসের নিজেই ধরে ঢাকায় নিয়ে আসেন যখন পুলিশ রেকর্ড থেকে নিশ্চিত হন যে, দুর্বৃত্তটি সত্য কথা বলছিল। ফারুকের মতে মুজাম্মিল নাসেরকে তার মুক্তির জন্য ৩০০,০০০ টাকা প্রস্তাব করেছিলেন। আওয়ামী লিগার (মুজাম্মিল) তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, "বিষয়টিকে সরকারি পর্যায়ে নেবেন না"। “আজ হোক বা আগামীকাল হোক, আমাকে আপনার ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে কেন টাকা নিয়ে তা ভুলে যাচ্ছেন না?” তাকে ঘুষ দেওয়ার এই নির্লজ্জ প্রয়াসের শিকার নাসের শপথ করেছিলেন যে, তিনি মুজাম্মিলকে বিচারের মুখোমুখি করবেন এবং তাকে তার অপরাধের জন্য ফাঁসিতে দেবেন। তিনি তাকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। ফারুক বলেছিলেন যে শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপে কিছুদিন পর মুজাম্মিলকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে পেরে তারা অবাক হয়ে গেলেন। "আমি আপনাকে টাকা নেওয়ার কথা বলেছিলাম", মুজাম্মিল হুঙ্কার দিয়ে বললেন। “আপনি এতে লাভবান হতেন। এখন আমাকে ঠিকই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আর আপনি কিছুই পেলেন না।” এই ঘটনা ফারুক ও তার সহকর্মীদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। টঙ্গি তাদের জন্য মোর ঘুড়িয়ে দেওয়া ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়। “দেখে মনে হচ্ছিল আমরা কোন অপরাধী সংগঠনের নেতৃত্বাধীন সমাজে বাস করছি। যেন মাফিয়া বাংলাদেশকে দখল করে নিয়েছে। আমরা পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এখানে সরকারপ্রধান নিজেই হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য চরমপন্থি বিষয়কে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, যা থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করার কথা ছিল। এটি মেনে নেওয়ার মত বিষয় ছিল না। আমরা ঠিক করেছিলাম তাকে চলে যেতেই হবে। " "... যখন আশা নিভে যায়, জবাবদিহিতা অস্বীকার করা হয় এবং জনগণের কাছে হারাবার মতো আর কিছুই থাকে না, তখন তারা তাদের অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য সহিংসতার দিকে ফিরে যায়।" 
  64. বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ, এন্থনী ম্যাসকারেনহাস, হাক্কানী পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ৫৪-৬৫
  65. Obaidullah, A. T. M. (২০১৮)। Institutionalization of the Parliament in Bangladesh: A Study of Donor Intervention for Reorganization and Development (ইংরেজি ভাষায়)। Springer। পৃষ্ঠা 32। আইএসবিএন 978-981-10-5317-7। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২০ 
  66. Nagarajan, K. V. (সেপ্টেম্বর ১৯৮২)। "Review: Bangladesh: The Unfinished Revolution by Lawrence Lifschultz"। The Annals of the American Academy of Political and Social Science। Sage Publications। 463: 169–170। জেস্টোর 1043636 
  67. দাশগুপ্ত, সুখরঞ্জন। মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র 
  68. "মোশতাকের গোপন মিশনের চাঞ্চল্যকর বৃত্তান্ত" 
  69. Singh, Ajay; Murtaza Ali, Syed। "CLOSING A BLOODY CHAPTER: A landmark ruling convicts Mujib's assassins"edition.cnn.com। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২০ 
  70. দেওয়ান, অম্লান (২০২০)। আন্ধা হাফিজের সাক্ষাৎকার - অম্লান দেওয়ান। liberationwarbangladesh.org। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২০ 
  71. "Ziaur Rahman informed Sheikh Mujibur Rahman earlier about coup threat"। ৫ জুন ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ মার্চ ২০১৭ 
  72. Dāśagupta, Sukharañjana (জুলাই ২০১৯)। Mujiba hatyāra shaṛayantra (PDF) (Parimārjita dvitīẏa saṃskaraṇa সংস্করণ)। Ḍhākā। পৃষ্ঠা ৫৩- ৫৬। আইএসবিএন 978-984-91335-2-0 
  73. "বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার জড়িত থাকার প্রামাণ্য দলিল" 
  74. "ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের স্বস্তির দিন" 
  75. Dasgupta 1978, p. 64, para 2: "Reports reveal that they did not kill Sheikh Mujib at once. Mujib was asked to step down from power and he was given some time to decide. Mujib summoned Colonel Jamil, the new chief of the Military Intelligence over the phone. Colonel Jamil arrived fast, and ordered the army to return to the barracks ... Then a rapid burst from machine guns mowed down Jamil right in front of the gate."
  76. Dasgupta 1978, পৃ. 65–66: "[soldiers] quickly surrounded Mujib's residence. A couple of rounds were fired. No resistance came from the army platoon guarding the President's house ... The first round of fire had brought Sheikh Kamal hurrying down to the reception on the ground floor ... A short burst, and his body, riddled with bullets sank to the floor."
  77. Dasgupta 1978, পৃ. 67: "The murderers rushed upstairs ... they came across Begum Lutfunnessa Mujib ... Shots rang out again. Begum Mujib lay on the floor, dead ... A group searched the ground floor. In the lavatories they found Sheikh Nasser and a couple of servants and gunned them down. The other group charged into Mujib's bedroom. There they found the two daughters-in-law of Mujib along with Sheikh Jamal and Sheikh Russel ... they, too, were not spared by these butchers."
  78. "বঙ্গবন্ধুর শরীরে ছিল ১৮টি গুলি" 
  79. "Bangladeshi PM Sheikh Hasina requests extradition of Bangabandhu killers from US"Business Standard। Press Trust of India। আগস্ট ৩০, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জানুয়ারি ২, ২০১৭ 
  80. Ahmed, Helal Uddin (২০১২)। "Hasina, Sheikh"Islam, Sirajul; Jamal, Ahmed A.। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh 
  81. Dasgupta 1978, পৃ. 65: "Lieutenant Moalemuddin sped for the residence of Sheikh Mani with three trucks full of soldiers ... while Major Shahriar and Captain Huda went out with some soldiers to get rid of Minister Abdur Rab Sarniabat."
  82. Dasgupta 1978, p. 64, para 3: "At the same time at 13/1 Dhanmandi Sheikh Fazlul Haq and his pregnant wife, and on Mineta Road, Abdur Rab Sarniabat with the 13 members of his family, were butchered ..."
  83. Dasgupta 1978, p. 64, para 1: "[The] fourth group, the most powerful of the lot, proceeded towards Savar, near Dacca, to repel the anticipated counter-attack by the Security Forces. It did run against some resistance at Savar. But once the shelling took toll of eleven people the leaderless Security Force surrendered"
  84. Badrul Ahsan, Sayed (৩ অক্টোবর ২০১৩)। "The Dhaka pattern - Indian Express"The Indian Express। সংগ্রহের তারিখ ২১ আগস্ট ২০২০ 
  85. Gandhi, Rajmohan (৬ নভেম্বর ১৯৯৯)। "Revenge and Reconciliation"। Penguin Books India। সংগ্রহের তারিখ ৬ নভেম্বর ২০১৭ – Google Books-এর মাধ্যমে। 
  86. "শেখ মুজিব হত্যার পর জেনারেল জিয়া যে মন্তব্য করেছিলেন"BBC News বাংলা। ১৫ আগস্ট ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২১ আগস্ট ২০২০ 
  87. ইসলাম, মেজর রফিকুল। সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সংকট 
  88. "বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার: ৩৫ বছরের অপেক্ষার অবসান" 
  89. "২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির সেই জঘন্যতম কালোদিন"দৈনিক কালের কণ্ঠ 
  90. "ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ও কিছু জিজ্ঞাসা"বাংলা ট্রিবিউন 
  91. "ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাঙালীর কলঙ্কজনক স্মৃতি" 
  92. "শোকাবহ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  93. "বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয় বরগুনায়"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  94. "শেরপুরের ৫০০ প্রতিবাদীর লড়াই"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  95. "মুজিববর্ষে কোনও আয়োজন নেই কওমি মাদ্রাসায়"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  96. "মুজিব হত্যার প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা 'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র' মামলার কী হয়েছিল?"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  97. "বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলন"চ্যানেল আই অনলাইন (ইংরেজি ভাষায়)। ৫ আগস্ট ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  98. "News Details" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  99. "বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ 
  100. Pratidin, Bangladesh। "বঙ্গবন্ধুর ৫ খুনির ফাঁসি"Bangladesh Pratidin। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ 
  101. "কে এই ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ?"jagonews24.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৯ 
  102. "বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ফাঁসিতে ঝুললো"। bdnews24। ১২ এপ্রিল ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২০ 
  103. "বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি মোসলেম উদ্দিন ভারতে"risingbd.com। ২০ এপ্রিল ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ 
  104. "6 killers still out of reach"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ আগস্ট ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১৭ 
  105. Titastelegraph.com। "বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরীর আবেদন নাকচ, বহিষ্কারের নির্দেশ"। ২০১৮-০৮-১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫