একজন মুক্তিযোদ্ধা (ইংরেজি: Freedom fighter) হল এমন একজন ব্যক্তি যিনি তার দেশের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বর্বর অত্যাচার থেকে মুক্তির লক্ষ্যে যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে থাকেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা বলতে এমন একদল জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা নিজেদের বা অন্যকারো রাজনৈতিক মুক্তি বা স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিরোধ আন্দোলনে সংগ্রামরত রয়েছে। [১] যদিও সাধারণভাবে "মুক্তিযোদ্ধা" বলতে "মুক্তির জন্য লড়াইরত" বোঝায়, তবুও সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের নির্দেশ করতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বিপরীতে শান্তিপূর্ন পন্থায় আন্দোলনকারীর ক্ষেত্র তা ব্যবহারগতভাবে একিভূত করা হয় না।

শব্দটির ব্যবহারসম্পাদনা

সাধারণভাবে বলা যায়, শারীরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনরতদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপ এম.কে. (Umkhonto we Sizwe)-এর সদস্যদের কথা বলা যায়; এরা উভয়ই তাদের সমর্থকদের নিকট "মুক্তিযোদ্ধা" হিসেবে পরিচিত।

অপরদিকে, শান্তিপূর্ন পন্থায় আন্দোলনরতরা আদর্শগতভাবে "মুক্তিযোদ্ধা" হরেও তাদেরকে বরং রাজনৈতিক কর্মী বা মানবাধিকার কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ, মহত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন বা কালোদের অধীকার আদায়ের আন্দোলন।

বিপরীতার্থক ব্যবহারসম্পাদনা

মুক্তিযোদ্ধারা যে সরকার বা সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, সেই দল এবং তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছান্নতাবাদী, দুষ্কৃতিকারী, আতঙ্কবাদী, নৈরাজ্যবাদী বা সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই কারণেই বলা হয়, "একজনের জন্য যে সন্ত্রাসী অন্যের জন্য সে মুক্তিযোদ্ধা"।[২]

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাসম্পাদনা

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে যাঁরা অস্ত্র হাতে সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন কেবল মাত্র তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয় তা নয়। সেই সঙ্গে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ত্রাণ বিতরণসহ যাঁরা বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন তারা, কলকাতায় স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালকমণ্ডলী, সাংবাদিক, ভাষ্যকার ও শিল্পী, প্রমুখকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসাব তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যারা অস্ত্র হাতে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তাদের চার ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা:[৩]

(ক) তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর নিয়মিত সদস্যবৃন্দ। এরা আগে থেকেই অস্ত্র ব্যবহারে এমনকী সম্মুখ সমরাভিযানে প্রশিক্ষিত ছিলেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ‘নিয়মিত বাহিনী’র সদস্য ছিলেন।

(খ) দ্বিতীয়ত: সাধারণ মানুষ যাঁরা বাংলাদশে ত্যাগ করে ভারতে গিয়েছিলেন এবং ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অস্ত্রচালনা, বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবহার ও গেরিলাযুদ্ধের কলাকৌশলে প্রশিক্ষণ লাভের পর দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেগুলো ব্যবহার করেছিলেন। সংখ্যাই এরাই সর্বার্ধিক। এদের বলা হতো ‘গণবাহিনী’। সামরিক প্রশিক্ষণের পরই এদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ।

(গ) টাঙ্গাইলের বঙ্গবীর আব্দুল কাদেরর সিদ্দীকীর (বীর উত্তম) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীর লোকজন। এদের অধিকাংশই প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাননি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ল্যান্স নায়েক কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে দেশের ভেতরই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন;

(ঘ) কেবল ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নতুনভাবে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কিন্তু দেশাভ্যন্তরে না-ফিরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। এদের পৃথকভাবে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মুজিব বাহিনী’।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা