প্রধান মেনু খুলুন

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অধুনালুপ্ত একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক দল যা সচরাচর বাকশাল নামে উল্লিখিত। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীবলে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং দেশের সমগ্র রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল নামক এই একক রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। একই বৎসর ১৫ আগস্ট একটি সফল সামরিক অভ্যূত্থানে শেখ মুজিবের মৃত্যু হলে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-এর সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীেতে, ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুন:প্রবর্তনের উদ্যোগ নিলে বাকশালের কুশীলবরা পূর্বতন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা তথা পুনরুজ্জীবিত করে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাকশাল নামক রাজনৈতিক দলের পুনারাবির্ভাব হয় নি।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ
প্রতিষ্ঠা২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫
ভাঙ্গন১৫ আগষ্ট ১৯৭৫
একীভূতকরণআওয়ামী লীগ এবং কৃষক শ্রমিক লীগ
সদর দপ্তরঢাকা, বাংলাদেশ
মতাদর্শবাংলা জাতীয়তাবাদ,
সমাজতন্ত্র
বাংলাদেশের রাজনীতি
রাজনৈতিক দল
নির্বাচন

পরিচ্ছেদসমূহ

বাকশাল ব্যবস্থার প্রবর্তনসম্পাদনা

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উত্থাপন করেন।[১] এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে প্রচলিত সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে বাকশাল ব্যবস্থা চালু করা হয়। সংসদে উত্থাপনের মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে এই বিল সংসদে পাশ হয়। বাকশাল ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়ে 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) নামে জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু নিজে এবং সম্পাদক হন এম মনসুর আলী।[২]

পটভূমিসম্পাদনা

১৯৭৪ সালে সারাদেশ যখন দুর্ভিক্ষ চলছে তখন কর্নেল তাহের একটি গোপন সশস্ত্র বিপ্লবী-গণবাহিনী গড়ে তোলেন। জাসদ প্রতিটি সেনানিবাসে গড়ে তোলে তাদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। ১৯৭৩ সালের জাসদের প্রথম জাতীয় অধিবেশনেই মার্কসবাদ, লেনিনবাদ ও মাওপন্থী চিন্তাধারাকে তাদের আদর্শ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে লক্ষ্যে স্থির করে শেখ মুজিব সরকারকে একটি 'বুর্জোয়া শোষক শ্রেণি' সরকার বলে আখ্যায়িত করা হয়।[৩] অপরদিকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রেণিমুক্ত ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা’ গঠন করার লক্ষ্যে আরেক স্লোগানধারী সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির ক্যাডারেরা ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে কমপক্ষে ৪৯২৫টি গুপ্তহত্যা করেছিল। ১৯৭২-৭৩ সালের এ সময়টাতে পাকিস্তানপন্থী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পিডিপিসহ বেশির ভাগ মুসলিম ভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলো গোপনে জুলফিকার আলীর পরামর্শে ‘মুসলিম বাংলা’ কায়েমের লক্ষ্যে তাদের সর্বশক্তি নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। মাওলানা ভাসানী এদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন।

সাড়ে তিন বছরের প্রতিটি বৈরী কর্মদিবস দূর্নীতি, লুটতরাজ ও নাশকতা পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করতে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহকে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে শেখ মুজিবর রহমান অনুরোধ করেন। বাকশালকে তিনি ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।[৩][৪]

গঠনতন্ত্রসম্পাদনা

বাকশাল ব্যবস্থায় দলের চেয়ারম্যানই সর্বক্ষমতার অধিকারী। [৫] দলের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি হচ্ছে-

  • কার্যনির্বাহী কমিটি
  • কেন্দ্রীয় কমিটি
  • কাউন্সিল

চেয়ারম্যানের পরেই সবচেয়ে ক্ষমতা সম্পন্ন হচ্ছে, একজন সাধারণ সম্পাদক সহ ১৫ জন সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটি। চেয়ারম্যান সাধারণ সম্পাদক সহ ১৫ জনকেই মনোনীত করবেন। ( বাকশাল গঠনতন্ত্রের দশম ধারার ২ উপধারা)।কেন্দ্রীয় কমিটির এক তৃতীয়াংশ চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত হবেন ( দ্বাদশ ধারার ৪ (ঙ) উপধারা)। কোন সংগঠন, সংস্থা বা কমিটির কোন সদস্য পদ শুন্য হলে, তদস্থলে চেয়ারম্যান নতুন সদস্য নিয়োগ করবেন (চতুর্বিংশ ধারা ২ উপধারা)। দলীয় কাউন্সিলে চেয়ারম্যান ৫০ জন পর্যন্ত মনোনয়ন করতে পারবেন (দ্বাদশ ধারার ১ (চ) উপধারা)। কাউন্সিলে প্রতিনিধি প্রেরণের ব্যাপারে বিভিন্ন জেলা ও অঙ্গ সংগঠনের কোটা চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত কার্যনির্বাহী কমিটি ঠিক করবে (দ্বাদশ ধারার ১ (গ) উপধারা)। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারি বা আধাসরকারি দফতর বা প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন, স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা এবং সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীসমূহের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যাপারে দলের চেয়ারম্যানের ইচ্ছাই প্রধান (দশম ধারার ১০ উপধারা ও ষোড়শ ধারার ২ (খ) উপধারা)। চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে গঠনতন্ত্রের যে কোন ধারা পরিবর্তন, সংশোধন ও পরিবর্ধন করতে পারবেন এবং একমাত্র চেয়ারম্যানই গঠনতন্ত্রের ব্যাখ্যা দান করতে পারবেন (দ্বাবিংশতি ধারার ১ ও ২ উপধারা)। [৫]

সদস্যপদ প্রাপ্তিসম্পাদনা

বাকশাল ব্যবস্থায় দলের সদস্য প্রাপ্তির ব্যাপারটিও দলের চেয়ারম্যানের ইচ্ছাধীন। কারণ কার্যনির্বাহী কমিটির হাতেই সদস্যপদ প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। (ষষ্ঠ ধারা ৫ (গ) উপধারা)। এই ব্যবস্থায় সরকারী ও আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীবৃন্দ এবং পুলিশ মিলিটারি সদস্যরাও দলের সদস্য হতে পারবেন। কিন্তু কে সদস্য হতে পারবেন আরে কে পারবেন না তা সম্পূর্ণ রূপে চেয়ারম্যানের ইচ্ছাধীন (দশম ধারার ১০ উপধারা)। এইসব ক্ষেত্রে কোথায় প্রাথমিক ইউনিট করার অধিকার দেওয়া হবে এবং প্রাথমিক ইউনিটের সদস্য সংখ্যা কত হতে পারবে, তা ঠিক করবে চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত কার্যনির্বাহী কমিটি। [৫]

অঙ্গ-সংগঠনসম্পাদনা

বাকশাল ব্যবস্থার অধীনে কোন অদলীয় শ্রেণী ও পেশাভিত্তিক সংগঠন এবং গণসংগঠন করার কোন অধিকার নেই। ট্রেড ইউনিয়ন মাত্রই তাকে বাকশালের অঙ্গদল শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এই ব্যবস্থায় জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় মহিলা লীগ, জাতীয় যুবলীগ এবং জাতীয় ছাত্রলীগ বাদে কোন শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, যুব ও ছাত্র সংগঠন থাকতে পারবে না। আর উপরিউক্ত সংগঠনগুলি হচ্ছে বাকশালেরই অঙ্গ সংগঠন (অষ্টাদশ ধারা)। [৫]

নির্বাচনসম্পাদনা

বাকশাল ব্যবস্থায় দেশে বাকশাল চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত এক উপকমিটি দ্বারা মনোনীত না হলে কেউ মনোনীত হতে পাররে না (দশম ধারার ৭ উপধারা)। কিন্তু, এই দলের চেয়ারম্যান কিভাবে নির্বাচিত হবেন তার কোন উল্লেখ গোটা গঠনতন্ত্রে নেই। [৫]

সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসম্পাদনা

৬ জুন, ১৯৭৫ বাকশাল ব্যবস্থায় দেশে চারটি দৈনিক ছাড়া আর সকল সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়। ঐ চারটি ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ টাইমস্‌, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার।

ফলাফলসম্পাদনা

বাকশাল গঠনের অব্যবহতি পরে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হলে এ প্রক্রিয়া থেমে যায়। তাঁর হত্যার পরে এর ভবিষ্যৎ বিচার প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি আইন জারি করা হয়। রাষ্ট্রের সকল গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে দেখানো, বঙ্গবন্ধুর কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ২০ বছর রেডিও টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুকে দেখানো হয়নি। সামরিক শাসকের দল সেখানেই থেমে থাকেনি, তারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নামে নানান মিথ্যে ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্যে ভরা গল্প চারদিকে ছড়িয়ে দিল। সামরিক শাসকদের পালিত কিছু বুদ্ধিজীবী এই প্রচারের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন খুব নিষ্ঠার সাথে। আর সেসব মিথ্যা ও বিভ্রান্তি দেশের আনাচকানাচে ঘুরতে থাকে বছরের পর বছর। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল; সুদীর্ঘ ২০ বছর একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে এই সব মিথ্যা এবং বিভ্রান্তির গল্প শুনে। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সকল কীর্তিকে মুছে ফেলতে যত চেষ্টা করা দরকার তারা সব চেষ্টাই চালিয়েছে।[৩] এই বিতর্কিত শাসনব্যবস্থা যেহেতু আলোর মুখ দেখেনি, তাই এর ফলাফল আজও অজ্ঞাত।

সূত্রসম্পাদনা

  1. রাষ্ট্রের মালিকানা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; পৃষ্ঠা- ৩৭
  2. নবম-দশম শ্রেণি, চতুর্দশ অধ্যায় (অক্টোবর ২০১২)। বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা। পৃষ্ঠা ১৭৯। 
  3. মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭)। "বঙ্গবন্ধু, বাকশাল ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস"দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মে ২০১৮ 
  4. বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মান। হাসান মোরশেদ। 
  5. রাজনীতির কথা প্রসঙ্গে, হায়দার আকবর খান রনো; পৃষ্ঠা- ২৭৯ থেকে ২৮২

বহিঃ সংযোগসম্পাদনা