পর্যায় সারণী

বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে একত্রে উপস্থাপনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ছক।

পর্যায় সারণী হচ্ছে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে একত্রে উপস্থাপনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ছক। আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলসমূহকে তাদের ইলেকট্রন বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে, ধর্মাবলী বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে ও পর্যায়ে বিভক্ত করে মৌলসমূহেের পারমাণবিক সংখ্যার ক্রমানুসারে পর্যায় সারণীতে সাজানো হয়েছে। পর্যায় সারণিতে মোট ১১৮টি মৌল রয়েছে।

Simple Periodic Table Chart-en.svg

বৈশিষ্ট্যসমূহসম্পাদনা

 
পর্যায় সারণি
  • পর্যায় সারণি কতগুলো আনুভূমিক সারি এবং খাড়া স্তম্ভে আছে। সারিগুলোকে "পর্যায়" এবং গুলোকে "গ্রুপ" বলা হয়।
  • পর্যায় সারণিতে ৭টি পর্যায় এবং ১৮টি গ্রুপ বিদ্যমান।
  • প্রতিটি পর্যায় বামদিকের গ্রুপ থেকে আরম্ভ করে ডানদিকে গ্রুপ-৮ পর্যন্ত বিস্তৃত।
  • প্রথম পর্যায় মাত্র দুইটি মৌল বিদ্যমান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় ৮টি করে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায় ১৮টি করে মৌল আছে। ৬ষ্ঠ পর্যায়ে আছে ৩২টি। সপ্তম পর্যায় এখনও অসম্পূর্ণ।
  • মৌলসমূহের ধর্ম তাদের গ্রুপের ওপর নির্ভর করে। একই গ্রুপভুক্ত মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মে যথেষ্ট মিল থাকে, যদিও ধর্মগুলো বিভিন্ন অনুকূমে উপর থেকে নিচের দিকে পরিবর্তিত হয়।
  • একটি পর্যায়ে বামদিক থেকে ডানদিকে মৌলসমূহের ধর্মের ক্রমবিকাশ লক্ষ করা যায়। কোনো গ্রুপে একটি মৌলের সর্বশেষ স্তরের ইলেকট্রন সংখ্যা তার গ্রুপ সংখ্যার সমমানের হয়।
  • গ্রুপ-২ এবং গ্রুপ-৩ এর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানকারী মৌলগুলোকে "অবস্থান্তর মৌল" বলা হয়। এই পর্যায়ের মৌলগুলোকে নিচে আলাদাভাবে ল্যান্থানাইড ও অ্যাকটিনাইড সারির মৌল হিসেবে দেখানো হলেও এগুলো যথাক্রমে ৫ এবং ৭ পর্যায়ের অংশ।[ক]
  • পর্যায়ভিত্তিক মৌল সংখ্যা:
    • পর্যায় ১ এ শুধু ২টি মৌল রয়েছে।
    • পর্যায় ২ এবং পর্যায় ৩ এ ৮টি করে মৌল রয়েছে। (iii)
    • পর্যায় ৪ এবং পর্যায় ৫ এ ১৮টি করে মৌল রয়েছে।
    • পর্যায় ৬ এবং পর্যায় ৭ এ ৩২টি করে মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপভিত্তিক মৌল সংখ্যা:
    • গ্রুপ ১ এ ৭টি মৌল রয়েছে।
    • গ্রুপ ২ এ ৬টি মৌল রয়েছে।
    • গ্রুপ ৩ এ ৩২টি মৌল রয়েছে।
    • গ্রুপ ৪ থেকে গ্রুপ ১২ পর্যন্ত প্রত্যেকটি গ্রুপে ৪টি করে মৌল রয়েছে।
    • গ্রুপ ১৩ থেকে গ্রুপ ১৭ পর্যন্ত প্রত্যেকটিতে ৬টি করে মৌল রয়েছে।
    • গ্রুপ ১৮ এ ৭টি মৌল রয়েছে।
  • একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানের দিকে গেলে মৌলসমূহের ধর্ম ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়৷
  • একই গ্রুপের মৌলগুলোর ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই রকমের হয়।

রূপসম্পাদনা

সংযোজিত তথ্য, বিন্যাস ও জটিলতার ভিত্তিতে পর্যায় সারণীর বেশ কয়েকটি রূপ রয়েছে যথা:

সর্বাধুনিক পর্যায় সারণীসম্পাদনা

১৯৮৯ সালে ইউপ্যাকের (IUPAC - International Union Of Pure And Applied Chemistry)সিদ্ধান্তক্রমে মৌলের সর্ববহিঃস্থস্তরের ইলেক্ট্রন সংখ্যা অনুযায়ী মৌলের শ্রেণীসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। আর এভাবেই সর্বাধুনিক পর্যায় সারণীর পত্তন ঘটে। এতে মোট ১৮টি শ্রেণী এবং ৭টি পর্যায় রয়েছে। এতে পর্যায়সমূহকে ইংরেজি 1,2,3,4,5,6,7 সংখ্যা দ্বারা এবং শ্রেণীসমূহকে রোমান হরফের বদলে ইংরেজি 1,2,3,4,5,6,7,8,9,10,11,12,13,14,15,16,17,18 সংখ্যাগুলো দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

কোন মৌল সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে উক্ত মৌলের নামের উপর ক্লিক করুন

শ্রেণী → ১০ ১১ ১২ ১৩ ১৪ ১৫ ১৬ ১৭ ১৮
↓ পর্যায়

H


He

Li

Be


B

C

N

O

F
১০
Ne
১১
Na
১২
Mg

১৩
Al
১৪
Si
১৫
P
১৬
S
১৭
Cl
১৮
Ar
১৯
K
২০
Ca
২১
Sc
২২
Ti
২৩
V
২৪
Cr
২৫
Mn
২৬
Fe
২৭
Co
২৮
Ni
২৯
Cu
৩০
Zn
৩১
Ga
৩২
Ge
৩৩
As
৩৪
Se
৩৫
Br
৩৬
Kr
৩৭
Rb
৩৮
Sr
৩৯
Y
৪০
Zr
৪১
Nb
৪২
Mo
৪৩
Tc
৪৪
Ru
৪৫
Rh
৪৬
Pd
৪৭
Ag
৪৮
Cd
৪৯
In
৫০
Sn
৫১
Sb
৫২
Te
৫৩
I
৫৪
Xe
৫৫
Cs
৫৬
Ba
*
৭২
Hf
৭৩
Ta
৭৪
W
৭৫
Re
৭৬
Os
৭৭
Ir
৭৮
Pt
৭৯
Au
৮০
Hg
৮১
Tl
৮২
Pb
৮৩
Bi
৮৪
Po
৮৫
At
৮৬
Rn
৮৭
Fr
৮৮
Ra
**
১০৪
Rf
১০৫
Db
১০৬
Sg
১০৭
Bh
১০৮
Hs
১০৯
Mt
১১০
Ds
১১১
Rg
১১২
Cn
১১৩
Nh
১১৪
Fl
১১৫
Mc
১১৬
Lv
১১৭
Ts
১১৮
Og

* ল্যান্থানাইড সারি ৫৭
La
৫৮
Ce
৫৯
Pr
৬০
Nd
৬১
Pm
৬২
Sm
৬৩
Eu
৬৪
Gd
৬৫
Tb
৬৬
Dy
৬৭
Ho
৬৮
Er
৬৯
Tm
৭০
Yb
৭১
Lu
** অ্যাক্টিনাইড সারি ৮৯
Ac
৯০
Th
৯১
Pa
৯২
U
৯৩
Np
৯৪
Pu
৯৫
Am
৯৬
Cm
৯৭
Bk
৯৮
Cf
৯৯
Es
১০০
Fm
১০১
Md
১০২
No
১০৩
Lr

বিশেষ দ্রষ্টব্যসম্পাদনা

  • অ্যাক্টিনাইডল্যান্থানাইড সিরিজের মৌলসমূহকে একত্রে "বিরল মৃত্তিকা ধাতু" নামে অভিহিত করা হয়। এই মৌলগুলোর শ্রেণী সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্যের জন্য এখানে ক্লিক করুন।
  • ক্ষার ধাতু, মৃৎক্ষার ধাতু, অবস্থান্তর মৌল, অন্তঃঅবস্থান্তর মৌল, ল্যান্থানাইড, অ্যাক্টিনাইড এবং দুর্বল ধাতু এই সবগুলোকে একত্রে ধাতু বলা হয়।
  • হ্যালোজেন এবং নিষ্ক্রিয় গ্যসসমূহও অধাতু।

অবস্থাসম্পাদনা

আদর্শ তাপমাত্রা ও চাপ (0°সে. এবং ১ atm) ধর্তব্য

  • যে সমস্ত মৌলের ব্লক red রংয়ের সেগুলো বায়বীয়
  • যে সমস্ত মৌলের ব্লক green রংয়ের সেগুলো তরল
  • যে সমস্ত মৌলের ব্লক black রংয়ের সেগুলো কঠিন

প্রকৃতিগত সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যসমূহসম্পাদনা

  • যে মৌলগুলোর ব্লকে অবিচ্ছিন্ন সীমারেখা আছে সেগুলো আদিম মৌল, অর্থাৎ তাদের যেকোন একটি স্থিতিশীল আইসোটোপের বয়স পৃথিবীর বয়সের চেয়ে বেশি।
  • যে মৌলগুলোর ব্লকে ড্যাশ আকারের সীমারেখা আছে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যান্য মৌলের তেজস্ক্রিয় ভাঙনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এবং এগুলোর এমন কোন স্থিতিশীল আইসোটোপ নেই যেটির বয়স পৃথিবীর বয়সের চেয়ে বেশি। তবে এগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে কিছু তেজস্ক্রিয় আকরিকের মধ্যে খুব সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়।
  • যে সমস্ত মৌলের ব্লকে ডট আকারের সীমারেখা রয়েছে সেগুলো কৃত্রিম মৌল হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ এগুলো প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়না।

দ্রষ্টব্য: ক্যালিফোর্নিয়াম (Cf) নামক মৌলটি যদিও পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়না, তথাপি ক্যালিফোর্নিয়াম এবং এর তেজস্ক্রিয় ভাঙনের মাধ্যমে সৃষ্ট অন্যান্য কিছু মৌল মহাবিশ্বের অন্যান্য স্থানে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সুপারনোভা থেকে প্রাপ্ত * বর্ণালীতে এ মৌলসমূহের তাড়িতচৌম্বক বিকিরণ রেখার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

  • যে মৌলগুলোর ব্লকে কোন সীমারেখা নেই সেগুলো প্রকৃতিতেও পাওয়া যায় না এবং কৃত্রিমভাবেও সেগুলোকে এখন পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

মৌলের অবস্থান চিহ্নিতকরণসম্পাদনা

উপশক্তিস্তর: S G F D P
পর্যায়
1 1s
2 2s 2p
3 3s 3p
4 4s 3d 4p
5 5s 4d 5p
6 6s 4f 5d 6p
7 7s 5f 6d 7p
8 8s 5g 6f 7d 8p
9 9s 6g 7f 8d 9p

ইতিহাসসম্পাদনা

১৭৮৯ সালে রসায়নবিদ অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৩৩ টি রাসায়নিক উপাদানকে ধাতু ও অধাতু, এই দুইভাগে বিভক্ত করেন। যদিও লাভোয়াজিয়ের সমসাময়িক রসায়নবিদগণ আরও উন্নত শ্রেণীবিন্যাসকরণ পদ্ধতির সন্ধান করছিলেন।

১৮২৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ ইয়োহান ভোলফগাং ডোবেরেইনার প্রমাণ করেন, তিনটি করে মৌল একই ধর্ম প্রদর্শন করে। তিনি প্রথমে পারমাণবিক ভর অনুযায়ী তিনটি করে মৌল সাজিয়ে মৌলের একটি সারণি তৈরি করেন। ডোবেরেইনার আরো প্রমাণ করেন, ২য় মৌলের পারমাণবিক ভর ১ম ও ৩য় মৌলের পারমাণবিক ভরের সমষ্টির সমান বা অর্ধেক। একে ডোবেরেইনারের ত্রয়ীসূত্র বলে।

ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড ১৮৬৪ সালে তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলগুলোকে তাদের ভর অনুসারে সাজিয়ে মৌলগুলোর প্রতি অষ্টম মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের মধ্যে মিল পান।

পরবর্তীকালে ১৮৬৯ সালে রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্দেলিয়েভ সকল মৌলের জন্য একটি সাধারণ পর্যায় সূত্র আবিষ্কার করেন, যা হলো- "মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম তাদের পারমাণবিক ভর বৃদ্ধির সঙ্গে পর্যায় ক্রমে আবর্তিত হয়"। উক্ত সূত্রানুসারে তিনি ও জার্মান বিজ্ঞানী ইউলিয়ুস লোটার মাইয়ার মিলে আধুনিক পর্যায় সারণি প্রকাশ করেন। তখন ৬৭ টি মৌল নিয়ে পর্যায় সারণি গঠিত হয়েছিল যার মধ্যে ৬৩ টি আবিষ্কৃত হয়েছিলো। ১৯০০ সালের মধ্যে আরও ৩০ টি মৌল পর্যায় সারণিতে যুক্ত হয়। এভাবেই সূচনা হয় আধুনিক পর্যায় সারণির।

প্রথমদিকে পারমাণবিক ভরের উপর নির্ভর করে পর্যায় সারণি সাজানো হয়েছিল। কিন্তু এতে মৌলের ধর্মের শ্রেণিবিন্যাসকরণে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৩ সালে রসায়নবিদ হেনরি মোসলে পারমাণবিক ভরের পদলে পারমাণবিক সংখ্যা অনুযায়ী মৌলসমূহকে সাজানোর প্রস্তাব দেন।

মৌলের পর্যায়বৃত্ত ধর্মসম্পাদনা

আরো দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

টীকাসম্পাদনা

  1. যে সকল মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ৫৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত এরকম ১৫টি মৌলকে ল্যান্থানাইড সারির মৌল বলা হয়। যে সকল মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ৮৯ থেকে ১০৩ পর্যন্ত এরকম ১৫টি মৌলকে অ্যাকটিনাইড সারির মৌল বলা হয়। ল্যান্থানাইড সারির মৌলগুলোর ধর্ম এত কাছাকাছি এবং অ্যাকটিনাইড সারির মৌলসমূহের ধর্ম এত কাছাকাছি যে তাদেরকে পর্যায় সারণির নিচে ল্যান্থানাইড সারির মৌল এবং অ্যাকটিনাইড সারির মৌল হিসেবে আলাদাভাবে রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা