নামাজ

মুসলিমদের প্রধান ইবাদাত
(নামায থেকে পুনর্নির্দেশিত)

নামায বা নামাজ[১] (ফার্সি: نَماز‎‎) সালাত বা সালাহ বা (আরবি: الصلوة‎‎ আস-সালাহ, আরবি: ٱلصَّلَوَات‎‎ আস-সালাওয়াত, অর্থ "প্রার্থনা", "দোয়া", "আশীর্বাদ" বা "প্রশংসা"[২]) হল ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত (নির্দিষ্ট নামাযের নির্দিষ্ট সময়) নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ। ফরজ (আরবিতে: فَرْضُ) সাধারণত দুই প্রকার। যথা: ১.ফরজে আইন (আরবিতে: فَرْضُ عَيْنٍ )  ২.ফরজে কিফায়া (আরবিতে: فَرْضُ كِفَايَةٍ)। তন্মধ্যে সালাত (আরবিতে: صَلَاةُ) ফরজে আইন (আরবিতে: فَرْضُ عَيْنٍ )- এর অন্তর্ভুক্ত। নামায ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। ঈমান বা বিশ্বাসের পর নামাযই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।[৩]

নামাজের প্রধান চারটি আসন এবং সম্পর্কিত দোয়া দরূদ।

নামায শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত (ফার্সি: نماز‎‎) এবং বাংলা ভাষায় পরিগৃহীত একটি শব্দ যা আরবি ভাষার সালাত শব্দের (আরবি: صلاة‎‎, কুরআনিক আরবি:صلاة,) প্রতিশব্দ। বাংলা ভাষায় 'সালাত'-এর পরিবর্তে সচরাচর 'নামাজ' শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কী এবং বাংলা ভাষায় একে নামায (ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত) বলা হয়। কিন্তু এর মূল আরবি নাম সালাত (একবচন) বা সালাওয়াত (বহুবচন)। আর বাংলা অর্থ "স্মরণ করা", "মনে করা" বা "খেয়াল করা"।

"সালাত" -এর আভিধানিক অর্থ দোয়া, রহমত, ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি।[৪] পারিভাষিক অর্থ: ‘শরী‘আত নির্দেশিত ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে বান্দার ক্ষমা ভিক্ষা ও প্রার্থনা নিবেদনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদতকে ‘সালাত’ বলা হয়, যা তাকবিরে তাহরিমা দ্বারা শুরু হয় ও সালাম ফিরানো দ্বারা শেষ হয়’।[৫]

ফরজ সলাত তরককারীর (পরিত্যাগকারীর) বিধান যা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রকার ওযর ব্যতীত অলসতা অবহেলা করে করা হয়:

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

সারাংশঃ সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্ তা'য়ালা কোরআন মাজীদে তার বান্দাদের সর্বাধিকবার সালাত কায়িম করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত বলেছেন। যেখানে সলাতের স্থান দ্বিতীয় স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে (দেখুন;সহীহুল বুখারীর ৮ নাম্বার হাদীস)।

আর আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক আল-উকাইলী (রাহি.) বলেছেনঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কোন সাহাবী সালাত ব্যতিত অন্য কোন আমল ছেড়ে দেয়াকে কুফুরী কাজ বলে মনে করতেন না (দেখুন জামে'ঊত তিরমিযীর ২৬২২নাম্বার সহীহ হাদীস)।

অতঃপর মুসলিম উম্মাহর মাঝে সালাত অস্বীকারকারী কাফির হওয়ার উপর ইজমা সাব্যস্ত হয়েছে (দেখুন ইখতেলাফুল আইম্মাতুল 'উলামার ১ম খন্ডের ৭৯ নাম্বার পৃষ্ঠা)। পাশাপাশি এ সম্পর্কে আরেকটি মুসলিম উম্মাহর ইজমা হয়েছে যে, সালাত ত্যাগ করা মানে সালাত অস্বীকার করা (দেখুন;ফিক্বহুস সুন্নাহর ১ম খন্ডের ৯২ নাম্বার পৃষ্ঠা)।

যেমন ইবনু হাজম রাহি. বলেছেনঃ (১)উমার, (২)আব্দুর রহমান বিন আউফ, (৩)মুয়ায বিন জাবাল ও (৪)আবু হুরায়রা (রাদ্বি.) প্রমুখ সাহাবী থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত ফরজ সালাত ত্যাগ করে, শেষ পর্যন্ত সালাতের ওয়াক্ত চলে যায় সে কাফির ও ইসলাম ত্যাগী মুরতাদ। এসকল সাহাবীর মতের কেউ বিরোধী ছিলো বলে আমাদের জানা নেই৷ ইমাম মুনযির রাহি. তারগীব ও তারহীবে এটি উল্লেখ্য করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন, সাহাবী ও তাদের পরবর্তীদের একটি দলের মত হলোঃ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সালাত ত্যাগ করে সালাতের পুরো সময়টা পার করে দেয় সে কাফির। এ দলের মধ্যে রয়েছেন উমার ইবনুল খাত্তাব, (৫)'আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ, (৬)'আব্দুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস, মুয়ায বিন জাবাল, (৭)জাবির বিন আবদুল্লাহ্ ও (৮)আবু দারদা (রাদ্বি.)। আর সাহাবীদের বাইরে যারা রয়েছেন তারা হলেনঃ (১)আহমাদ বিন হাম্বল, (২)ইসহাক বিন রাহওয়াই, (৩)'আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারাক, (৪)নাখয়ী, (৫)হাকাম বিন উতাইবা, (৬)আবু আইয়ুব সাখতিয়া, (৭)আবু দাঊদ তায়ালিসী, (৮)আবু বকর বিন আবি শায়বা, (৯)যুহাইর বিন হারব প্রমুখ (রহঃ) (দেখুন; ফিক্বহুস সুন্নাহর ১ম খন্ডরের ৯৩ নাম্বার পৃষ্ঠা)।

এতভিন্ন এ অভিমত আরো পোষণ করেছেন কিছু শাফেয়ী' আলেম[1] কিছু মালেকি আলেম[2] ও সালাফদের একটি দল[3] এবং অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস[4], সহ এ দিকেই ইমাম ইবনু তাইমিয়া[5] ও ইমাম ইবনু কাইয়্যুম গেছেন[6] বর্তমান সময়ের মধ্যে শায়েখ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ্ বিন বায[7] ও শায়েখ মুহাম্মাদ সালেহ আল উছাইমিন[8] এ মত গ্রহণ করেছেন।

রেফারেন্স সমূহঃ [1]মাজমু' ৩/১৪ নাববী। [2]'হাশিয়া ১/১২০ 'আদী। [3]মাজমু' ৩/১৬ নাববী, মাজমু' ২০/৯৭ ইবনু তাইমিয়া। [4]তা'য়জিমু ক্বদারিস্ সলাত ২/৯৩৬ মারওয়াজী। [5]আল ফাতওয়াতুল কুবরা ২/২২৪ তাইমিয়া। [6]দেখুন আস্ সলাতু অ'আহকামু তারাকাহার ৬৪নাম্বার পৃষ্ঠা। [7] মাজমু' ২৯/১৫৯ ইবনু বায্। [8]মাজমু' ১২/৫১ উষাইমিন।

বিপরীতে ফরজ সলাত তরককারীকে ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ী রহিমাহুমুল্লাহ বলেছেনঃ সে ফাসিক হবে কাফির হবে না (দেখুন হুকুমুত তারাকাস সলাতের ৪নাম্বার পৃষ্ঠা, উছাইমিন)।

অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক আল-উকাইলী রাহিমাহুল্লাহ হতে তিরমিযীতে বর্ণিত ২৬২২ নাম্বার হাদীসের বর্ণনানুসারে যখন প্রমাণিত হলো যে, এই মাসআলাটি তাবেয়ীগণের যুগ থেকে একটি বিরোধপূর্ণ মাসআলা, তখন আবশ্যক হল এটাকে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর সামনে পেশ করা।

কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ وَمَا ٱخۡتَلَفۡتُمۡ فِيهِ مِن شَيۡءٖ فَحُكۡمُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِۚ আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন, তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে (আশ-শুরা ৪২:১০)। তিনি আরো বলেছেনঃ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর (আন-নিসা ৪:৫৯)। অনুরুপ অনান্য আয়াত সমূহ।

তাছাড়া মতভেদকারীগণের একজনের কথাকে অপরজনের জন্য দলীল হিসেবে পেশ করা যায় না৷ কারণ, তাদের প্রত্যেকেই নিজের মতকে সঠিক মনে করে এবং তাদের একজন মত গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে অপরজনের মতের চেয়ে অধিক উত্তম নয়। ফলে এই ব্যাপারে তাদের মাঝে মীমাংসা করার মত একজন মীমাংসাকারীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে; আর সেই মীমাংসাকারী হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ।

(প্রথম দলীল) আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেনঃ (إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِۦ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفْتَرَىٰٓ إِثْمًا عَظِيمًا) নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে (আন নিসা ৪:৪৮)। তিনি অনত্র আরো বলেছেনঃ (فَقَدْ ضَلَّ ضَلَٰلًۢا بَعِيدًا) আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল (আন নিসা ৪:১১৬)।

আর জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসানুসারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ) বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত ছেড়ে দেয়া (মুসলিম ৮২)। অপর সহীহ বর্ণনায় রয়েছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন (بَيْنَ الْكُفْرِ وَالْإِيمَانِ تَرْكُ الصَّلَاةِ) কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হল সলাত ত্যাগ করা (তিরমিযী ২৬১৮)।

সুতরাং উপর্যুক্ত আয়াতদ্বয় ও হাদীস সলাত তরককারীকে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হওয়ার সুম্পষ্ট প্রমাণ এভাবে বহন করে যে, আল্লাহ্ তা'য়ালা তার সাথে শিরিক করা অবস্থায় মৃত বরণ করা ব্যক্তিকে কখনই ক্ষমা করবেন না, আর সহীহ মারফু' হাদীসানুসারে ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ সলাত তরককরা শিরক, ফলে এমতাবস্হায় মৃত ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যাবে।

যেমন শায়েখ মুহাম্মাদ সালেহ আল উছাইমিন (রহঃ) বলেছেনঃ এখানে কুফর (الكفر) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কুফরী যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুসলিম মিল্লাত (সম্প্রদায়) থেকে বের করে দেয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন ও কাফিরদের মাঝে সালাতকে পৃথককারী সূচক বানিয়ে দিয়েছেন। আর এটা সকলের নিকট সুবিদিত যে, কাফির মিল্লাত এবং মুসলিম মিল্লাত একে অপরের বিপরীত। ফলে যে ব্যক্তি এই (সালাতের) অঙ্গীকার পূরণ করবে না, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে (দেখুন শায়েখের হুকুমুত তারাকাস সলাতের ৯নাম্বার পৃষ্ঠা)।

সাধারণ নোটঃ এখানে কোনো প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করতে পারেন যে, সালাত বর্জনকারীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কুফর (الكفر) শব্দটির অর্থ কি কুফরে মিল্লাত (দীন অস্বীকার) না হয়ে কুফরে নিয়ামত (নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা) হওয়ার সম্ভাবনা রাখে না? অথবা তার অর্থ কি বৃহত্তর কুফরী না হয়ে ক্ষুদ্রতর কুফরী হতে পারে না? তা কি হতে পারে না হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীর মত, যাতে তিনি বলেছেনঃ (اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ) দু'টি স্বভাব মানুষের মাঝে রয়েছে, যে দু’টি কুফর বলে গণ্য। বংশের প্রতি কটাক্ষ করা এবং উচ্চস্বরে বিলাপ করা (মুসলিম ১২১)। অথবা 'আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বানীর মতোঃ (سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ) মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী (বুখারী ৪৮)। অথবা অনুরুপ অনান্য হাদীস?

এর জবাবে আমরা বলবোঃ সালাত ত্যাগকারীর কুফরীর বিষয়ে এ ধরনের সম্ভাবনা ও উপমা সাধারণত দুটি কারণে সঠিক নয়। প্রথমতঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতকে কুফর ও ঈমানের মাঝে এবং মুমিনগণ ও কাফিরদের মাঝে পৃথককারী সীমানা বানিয়ে দিয়েছেন। আর সীমানা তার অন্তর্ভুক্ত এলাকাকে অন্যান্য ক্ষেত্রে থেকে পৃথক করে এবং এক এলাকাকে অন্য এলাকা থেকে বের করে দেয়; কারণ, নির্ধারিত ক্ষেত্র দু’টির একটি অপরটির বিপরীত, যাদের একটি অপরটির মধ্যে অনুপ্রবেশ করবে না।

দ্বিতীয়তঃ কুফর (الكفر) শব্দের ব্যাখ্যা বা প্রকাশ-রীতি বিভিন্ন রকম। সুতরাং সলাত বর্জনের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ) বান্দা এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সলাত পরিত্যাগ করা (মুসলিম ৮২)। এখানে আল-কুফর (الكفر) শব্দটি আলিফ লাম (ال) যোগে ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, কুফরের অর্থ হচ্ছে প্রকৃত কুফরী। কিন্তু আলিফ লাম (ال) ছাড়া কুফর (كفر) শব্দটি যখন নাকেরা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে ব্যবহৃত হয় অথবা কাফারা (كَفَرَ) শব্দটি ফেল (ক্রিয়া) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রমাণ করে যে, এটা কূফরীর অন্তর্ভুক্ত অথবা সে এই কাজের ক্ষেত্রে কুফরী করেছে; আর সেই সাধারণ কুফরী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ (বের) করে দেয় না।

স্কুল পড়ুয়া ব্যক্তিবর্গ উক্ত গ্রামাটিকাল বিষয়টি না বুঝে থাকলে এটি অবশ্যই জানেন যে, কেউ শুধুমাত্র Pen শব্দটি উচ্চারণ করলে তা দ্বারা অনির্দিষ্টভাবে যে কোনো কলমকে বোঝায়। কিন্তু এর পূর্বে The আর্টিকেলটি যোগ করলে তা কোনো নির্দিষ্ট কলমকে স্পষ্ট করে। অনুরূপভাবে সলাত পরিত্যাগ কারা শিরক বর্ণিত হাদীসে আল-কুফর (الكفر) শব্দটি আলিফ লাম (ال) যোগে ব্যবহার করায় তা আরবী গ্রামারানুসারে মা'রেফা তথা নির্দিষ্ট হয়েছে বিধায় উহা বড় কুফরকে স্পষ্ট করেছে। একইররূপে যদি হাদীসে আলিফ লাম (ال) ছাড়া কুফর (كفر) শব্দটি ব্যবহৃত হতো তখন তাকে নাকেরা তথা অনির্দিষ্ট হওয়ার ফলে বড় কুফরকে নির্দেশ করতো না যেররূপ (বংশের প্রতি কটাক্ষ করা এবং উচ্চস্বরে বিলাপ করা) হাদীসে কুফর (كفر) শব্দটির উল্লেখ্য রয়েছে (অনুরুপ অন্যান্য হাদীস)। আর এসব কথা এটাই প্রমাণ করে যে, সলাত পরিত্যাগকারী বড় শিরকে পতিত হওয়ায় সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে।

আর ব্যক্তির সালাত তরক করার ফলে শিরিক এভাবেও হতে পরে যে, কুরআনুল কারীমে সর্বাধিক সালাতের উল্লেখ্য রয়েছে কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে সলাত পড়া ও না পড়া উভয়টিরই  কোন গুরুত্ব নেই। যদি গুরুত্ব থাকতো তাহলে তারা সলাতে আদায় করতো। কারণ, এটিই মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পার্থক্যকারী সূচক। যা শরীয়তে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে (তিরমিযী ২৬২১)। সুতরাং কোনো ব্যক্তির এ পার্থক্য ভেঙ্গে ফেলার অর্থ মুসলিমদের গন্ডি থেকে বের হয়ে অমুসলিমদের সাথে মিলে একাকার হয়ে যাওয়া।

এতভিন্ন অন্তরে বিশ্বাস করে তার সত্যতা হিসাবে মুখে স্বীকৃতি দিয়ে তার প্রমাণ স্বরূপ সে অনুযায়ী 'আমল করাকে ইমান বলে (তিরমিযী ২৬২২)। আর সালাতই একমাত্র প্রত্যহ দৈনন্দিন এমন ফরজ ইবাদাত বা দ্বীনের স্তম্ভ (তিরমিযী ২৬১৬), যা ব্যক্তি কোনো শরীয়তি ওজর ব্যতীত তরক করতে না পারায় সলাত তরক করা দ্বারা সে তার ইমানের দাবীর বা বহিঃপ্রকাশের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় তাওহীদ ও শিরিক কখনো একত্রিত না হওয়ার দরুন তার হৃদয়ে শিরকের উপস্থিতির প্রমাণ করে। কেননা তাওহীদ ও শিরকের একটির উপস্থিতিতে অন্যটি বিদায় নেয়। আল্লাহ তা'য়ালা অতঃপর তার রাসূলই সর্বাধিক ভালো জানেন।

(দ্বিতীয় দলীল) আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেনঃ (اِنَّهٗ مَنْ يُّشْرِكْ بِا للّٰهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَيْهِ الْجَـنَّةَ وَمَأْوٰٮهُ النَّا رُ ۗ وَمَا لِلظّٰلِمِيْنَ مِنْ اَنْصَارٍ) যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই (আল মায়িদা ৫:৭২)।

আর আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসানুসারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয (রাঃ) কে বলেছেনঃ مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ (যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনরূপ শির্ক না করে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে)। মু‘আয (রাঃ) বললেন, আমি কি লোকদের সুসংবাদ দেব না? তিনি বললেন, لاَ، إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَتَّكِلُوا‏ (না, আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, তারা এর উপরই ভরসা করে বসে থাকবে। বুখারী ১২৯)। উপর্যুক্ত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত এ হাদীসটি স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'য়ালার সঙ্গে শিরিককারী ব্যক্তি কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যার অর্থ সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। কেননা জান্নাতে যাওয়ার শর্তে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনরূপ শির্ক না করে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর আমরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পেয়েছি যে, সলাত তরককারা শিরিক, যা ব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে দেয়।

যেমন উক্ত রাবী আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকেই অন্যত্র বর্ণিত সহীহ হাদীসানুসারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (لَيْسَ بَيْنَ الْعَبْدِ وَالشِّرْكِ إِلاَّ تَرْكُ الصَّلاَةِ فَإِذَا تَرَكَهَا فَقَدْ أَشْرَكَ) মুমিন বান্দা ও শিরক এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত  বর্জন করা। অতএব যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো, সে অবশ্যই শিরক করলো (ইবনু মাজাহ ১০৮০)।

সুতরাং এখানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায় যে, অত্র হাদীসটি সলাত তরককারীকে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হওয়ার সুম্পষ্ট প্রমাণ এভাবে বহন করে যে, আল্লাহ্ তা'য়ালা তার সাথে শিরিক করা অবস্থায় মৃত বরণ করা ব্যক্তিকে কখনই ক্ষমা করবেন না, আর যেহেতু ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত তরক করা শিরক, ফলে এমতাবস্থায় মৃত ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যাবে।

সাধারণ নোটঃ এখানে কোনো প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে উক্ত সাহাবী মু‘আয (রাঃ) এর অন্যত্র বর্ণনার কি উত্তর হবে যার দ্বারা কিছু আলেম সালাত তরককারীকে ফাসিক বলেছেন। যেমন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন (مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صِدْقًا مِنْ قَلْبِهِ إِلاَّ حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ ‏) যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন (বুখারী ১২৮)। অথবা অনুরুপ অন্যান্য হাদীস সমূহ।

এর জবাবে আমরা বলবোঃ একথা যেমনি বিশুদ্ধ (মুসলিম ৮২) হাদীস বিরোধি যে, সালাত তরক করা শিরিক নয় তেমনি তা বিবেক বিরোধি। কেননা যদি প্রশ্ন করা হয় ঐ ব্যক্তির হুকুম সম্পর্কে যে আল্লাহ ও তার রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উপর ইমানের স্বীকৃতি দিয়ে পূর্ববর্তী অনান্য সকল নাবীদের অস্বিকার করে। অথবা সে আল্লাহ ও তার রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) উপর ইমানের স্বীকৃতি দিয়ে তাকদীরকে অস্বীকার করে। অথবা সে আল্লাহ ও তার রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) উপর ইমানের স্বীকৃতি দিয়ে আখিরাতকে অস্বীকার করে (অথবা অনুরূপ কিছু)। এমন ব্যক্তি কি কখনো জন্নাতে প্রবেশ করতে পারবে?

অতঃপর এর উত্তর কেবল একটিই হতে পারে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) ব্যতীত আল্লাহ তা'য়ালার পুর্ববর্তী সকল নাবী বা তাকদীর অথবা আখিরাতসহ অনান্য অনুরূপ বিষয় অস্বীকারকারী কুরআন সুন্নায় পর্যাপ্ত দলীল-প্রমাণ ও ইজমার ভিত্তি অনুসারে কাফির হিসাবে বিবেচিত হবে। যা স্পষ্ট করে যে, আন্তরিকতার সাথে, আল্লাহ তা'য়ালার সাথে শিরিক না করে ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর রাসূল হিসাবে মানার অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল প্রদর্শিত জীবন বিধান অনুসরণ ও অনুকরণ করা। যা সলাত তরককারীকে গ্রহণযোগ্য ওযর ব্যতীত অন্য সকল অবস্থায় তার সলাত পরিত্যাগ করার হতে বিরত রাখে।

(তৃতীয়  দলীল) আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেনঃ مُنِیۡبِیۡنَ اِلَیۡہِ وَاتَّقُوۡہُ وَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَلَا تَکُوۡنُوۡا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ۙ সবাই তাঁর অভিমুখী হও এবং ভয় কর, সলাত কায়েম কর এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না (আর-রূম ৩০:৩১)।

আর বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসানুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلاَةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ) আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি আছে তা হল সলাত। সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত ছেড়ে দেয়, সে কুফুরী কাজ করে (তিরমিযী ২৬২১)।

সুতরাং উপরিক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা মুশরিকদের আলামতের বর্ণনায় আমাদের ও তাদের মাঝে যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা দ্বারা সলাত তরককারী ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হওয়ার সুম্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আর তা হচ্ছে মুসলিমগণ সলাত আদায় করা জারী রাখার মাধ্যমে তা কায়েম করে থাকেন এবং মুশরিকরা তা পুরোপুরিভাবে বর্জন করে।

বস্তুত আয়াতে কারীমায় দৈনন্দিন ইবাদাত সলাতই যে ছিলো আমাদের ও মুশরিকদের মধ্যে স্পষ্টতর পার্থক্য করে তার প্রমাণ রয়েছে। যা তরককরার ফলে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত করণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়ার মাধ্যমে সলাত তরককারী যে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে শিরিক করেছে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। যা ছিন্ন করার ফলে ব্যক্তি ইসলাম থেকে তেমনি খারিজ হয়ে গেছে যেমনি মুশরিকদের ইসলামের মধ্যে কোনো অংশ নেই (কেননা মুতলাক দলীলে সলাতকেই তাদের ও আমাদের মাঝে পার্থক্যকারী হিসাবে ব্যক্ত করা হয়েছে)।

উপরিক্ত বক্তব্যের পক্ষে আরেকটি সুস্পষ্ট প্রমাণ অন্য একটি সহীহ হাদীসের মধ্যে এভাবে রয়েছে যেঃ মিহজান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি এক সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক মজলিসে ছিলেন। তখন সালাতের সময় হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন, তারপর সালাত আদায় করে এসে দেখলেন মিহজান (রাঃ) সেই মজলিসেই রয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃمَا مَنَعَكَ أَنْ تُصَلِّيَ ؟ أَلَسْتَ بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ ؟ (তোমাকে সালাত আদায় করা থেকে কোন জিনিস বাধা দিল? তুমি কি মুসলমান নও?) তিনি বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু আমি আমার ঘরে সালাত আদায় করে ফেলেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ যখন আসবে, তখন লোকের সাথে সালাত আদায় করে নেবে যদিও পৃর্বে সালাত আদায় করে থাকো (নাসায়ী ৮৫৭)।

সুতরাং অত্র হাদীসের সাহাবীকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই জিজ্ঞাসা যেঃمَا مَنَعَكَ أَنْ تُصَلِّيَ ؟ أَلَسْتَ بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ ؟ (তোমাকে সালাত আদায় করা থেকে কোন জিনিস বাধা দিল? তুমি কি মুসলমান নও?) কোনো রুপ প্রশ্ন ছাড়াই প্রমাণ করে যে, ইবাদাতের মধ্যে সলাতই একমাত্র মুসলিম ও অমুসলিম মধ্যে স্পটতর পার্থক্যের মাপকাঠি। সুতরাং অত্র আয়াত ও হাদীসদ্বয় দ্বারা একথা জোরালোভাবে বলা যায় যে, বিনা ওজরে ফরজ সলাত তরককারী ব্যক্তি কাফির। কেননা, কোনো মুসলিম ব্যক্তিই সলাত আদায় না করে থাকতে পারেনা (কারণ এটা কাফিরদের বৈশিষ্ট্য)।

সাধারণ নোটঃ এখানে কোনো প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করতে পারেন যে, এই কথা বলা কি সঠিক হবে না যে, যেসব দলীল সালাত বর্জনকারী কাফির হওয়া প্রমাণ করে, সেগুলো ঐ ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য হবে, যে ব্যক্তি সালাতের আবশ্যকতাকে অস্বীকারকারী হিসেবে তা বর্জন করে?

এর জবাবে আমরা বলবঃ এটা সঠিক নয়। কেননা, এর ফলে সেই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে উপক্ষো করা হয়, যাকে শরী'য়তপ্রবর্তক গুরুত্বারোপ করেছেন এবং তার সাথে বিধান সংশ্লিষ্ট করেছেন। কারণ, শরী'য়তপ্রবর্তক সালাত ত্যাগ করাকেই কুফরী বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা সালাত অস্বীকার করার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের।কেননা ইসলামের যে কোনো প্রমাণিত বিষয়কে অস্বীকারকারীই কাফের, সেটা সালাতের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হলেও। যা উম্মতের সর্বসম্মত মত। সুতরাং যদি উপরোক্ত কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যসমূহকে সালাত পরিত্যাগকারীর উপর নির্ধারণ না করে সালাত অস্বীকারকারীর জন্য নির্ধারণ করা হয়, তবে সালাতকে নির্দিষ্ট করে এ সব ভাষ্যের কোনো বিশেষত্ব প্রকাশ পায় না। কারণ, অন্যান্য বিষয় অস্বীকারকারীও যদি কাফের হয়ে যায়, তবে সালাতের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের এসব ভাষ্যের প্রয়োজন পড়ে না।

অতএব, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করা কুফরি। যদি না সে ব্যক্তির পক্ষে এ বিষয়টি না জানার কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর না থাকে, চাই সে সালাত আদায় করুক অথবা ত্যাগ করুক। অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে এবং তার নির্ধারিত শর্তাবলী, আরকান (ফরয), ওয়াজিব ও মুস্তাহাবসমূহসহও যথাযথভাবে আদায় করে, কিন্তু সে তার (সালাতের) ফরয হওয়ার বিষয়টিকে বিনা ওজরে অস্বীকার করে, তাহলে সে সালাত বর্জন না করা সত্ত্বেও কাফির বলে বিবেচিত হবে।

সুতরাং এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, উপরে বর্ণিত (সালাত ত্যাগকারী কাফের হওয়া বিষয়ক) শরী‘য়তের ভাষ্যসমূহকে যে ব্যক্তি সালাতের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করে- তার জন্য নির্ধারণ করা সঠিক নয়। বরং সঠিক কথা হল, (এগুলোকে সালাত পরিত্যাগকারীর উপর প্রয়োগ করা হবে, সে হিসেবে) সালাত বর্জনকারী এমন কাফির হিসেবে গণ্য হবে, যা তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়।

তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বলেননি, বান্দা এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হল সালাতের আবশ্যকতাকে অস্বীকার করা, অথবা তিনি বলেন নি, আমাদের ও তাদের মাঝে অঙ্গীকার বা চুক্তি হল সালাতের আবশ্যকতার স্বীকৃতি প্রদান করা, সুতরাং যে ব্যক্তি তার আবশ্যকতাকে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শির্ক ও কুফরির মাঝে পার্থক্য হচ্ছে সালাত ছেড়ে দেওয়া (মুসলিম ৮২) এবং আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি আছে তা হল সলাত (আদায় করা)। সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত ছেড়ে দেয়, সে কুফুরী কাজ করে (তিরমিযী ২৬২১)। অতএব উপরোক্ত বিধান সালাতের আবশ্যকতা অস্বীকার করার উপর নয়, বরং সালাত পরিত্যাগ করাই হচ্ছে কাফের হওয়ার কারণ।

(চতুর্থ দলীল) উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসানুসারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ سَتَكُونُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ (অচিরেই এমন কতক আমীরের উদ্ভব ঘটবে তোমরা তাদের চিনতে পারবে এবং অপছন্দ করবে। যে ব্যক্তি তাদের স্বরূপ চিনল সে মুক্তি পেল এবং যে ব্যক্তি তাদের অপছন্দ করল নিরাপদ হলো। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের পছন্দ করল এবং অনুসরণ করল (সে ক্ষতিগ্রস্ত হল)। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ لاَ مَا صَلَّوْا (না, যতক্ষণ তারা সলাত আদায়কারী থাকবে। (মুসলিমঃ ১৮৫৪)।

উপরিক্ত হাদিসের মধ্যে একথা প্রমাণিত হয় যে, নেতাগণ যখন সালাত কায়েম করবে না, তখন তাদেরকে তরবারি দ্বারা প্রতিহত করা আবশ্যক হবে৷ আর ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা যুদ্ধ করা বৈধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত হবে। এ ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে।

যেমন উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রাঃ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা বাই’আত হলাম। তিনি তখন আমাদেরকে যে শপথ গ্রহণ করান তার মধ্যে ছিলঃ আমরা শুনবো ও মেনে চলব, আমাদের খুশী অবস্থায় ও বিরক্ত অবস্থায়, আমাদের সংকটে ও স্বাচ্ছন্দ্যে এবং আমাদের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিলেও সুযোগ্য ব্যক্তির সাথে আমরা নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল করবো না। তিনি বলেন, যাবৎ না তোমরা তার মধ্যে প্রকাশ্য কুফর দেখতে পাবে এবং তোমাদের কাছে এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আল্লাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকবে (বুখারী ৭০৫৬, মুসলিম ১৭০৯, শব্দ সমূহ মুসলিমের)।

আর এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় তাদের সালাত বর্জন করা সুস্পষ্ট কুফরী বলে বিবেচিত হবে, যার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে তরবারী নিয়ে লড়াই করার বিষয়টিকে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন, যে ব্যাপারে আল্লাহর নিকট থেকে আমাদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে (দেখুন উষাইমিন রহঃ এর হুকুমত তারাকাস সলাতের ১০নাম্বার পৃষ্ঠা)।

সাধারণ নোটঃ এখানে কোনো প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে হাদীসে জীবরিলে ইসলাম ও ইমানের যে পৃথকভাবে বর্ণনা এসেছে তার তা দ্বারা কিভাবে বেসলাতীর হৃদয়ে কোনো ইমান না থাকাকে প্রমাণ করা হবে অথবা তা দ্বারা বেসলাতীর চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকা প্রমাণিত হবে? যেমনঃ ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামার হতে বর্ণিত হাদীসে লোকদের দ্বীন শিখাতে আসা জিব্রীলকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ইসলাম হচ্ছে এই যে, তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ (মাবূদ) নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়িম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে।

এরপর লোকদের দ্বীন শিখাতে জিব্রীল ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ، خَيْرِهِ وَشَرِّهِ ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তার মালায়েককুল, তার কিতাবসমূহ, তার প্রেরিত নাবীগণ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখবে এবং তুমি তাকদীর ও এর ভালো ও মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে (মুসলিম ৮)।

এর জবাবে আমরা বলবোঃ হাদীসে জীব্রিলে  একই সাথে ইসলাম ও ইমানের যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে তাতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্হাপন করা ও তার ইবাদতের মধ্যে অন্য কাউকে শরীক না করার উভয় ক্ষেত্র যেভাবে ওতপ্রোতভাবে উল্লেখ্য করার যে হয়েছে তা স্পষ্টত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করার প্রমাণ হিসাবে তার ইবাদতের মধ্যে শিরিক স্হাপন না করার ঘোষণা করা আবশ্যিক করেছে। সুতরাং ইবাদতের মধ্যে শিরিক করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না করার সুস্পষ্ট নামান্তর। আর যেহেতু সলাত তরককরা হাদীসানুসারে শিরিক (মুসলিম ৮২) সেহেতু এমতাবস্হায় মৃত ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে।

উদাহরণত, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি অবিশ্বাস করে তার ইবাদাতকারী ব্যক্তি সর্বসম্মতিক্রমে কাফির (যদিও তা স্বভাবজাত বিরোধী, কেননা ব্যক্তি যা বিশ্বাস করেনা তার প্রতি আমলও করেনা) বিপরীতে আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাস করে তার সাথে শরিককারী ব্যক্তিও সর্বসম্মতিক্রমে কাফির। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাসের দাবী করবে তাকে সলাত আদায় করতে হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সলাত তরক করাকে শিরিক বলে অভিহিত করেছেন (মুসলিম ৮২) এবং একে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পার্থক্যকারী সূচক হিসাবে ঘোষণা করেছেন (তিরমিযী ২৬২১)। আর এরই মাধ্যমে অত্র হাদীস ও অনান্য হাদীসের মধ্যে যেমন সমন্বয় সাধণ হয় তেমনি তা দ্বারা বিপরীত দলীল গ্রহণ করা বাতিল হয়।

(পঞ্চম দলীল) 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর ইবনুল 'আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সলাত সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বললেনঃ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا كَانَتْ لَهُ نُورًا، وَبُرْهَانًا، وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يُحَافِظْ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ نُورٌ، وَلَا بُرْهَانٌ، وَلَا نَجَاةٌ، وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَأُبَيِّ بْنِ خَلَفٍ যে ব্যক্তি সলাতের হিফাযাত করবে, তা কিয়ামতের দিন তার জন্য জ্যোতি, দলীল ও মুক্তির উপায় হবে। আর যে ব্যক্তি সলাতের হিফাযাত করবে না, তার জন্য এটা জ্যোতি, দলীল ও মুক্তির কারণ হবে না। কিয়ামতের দিন সে ক্বারূন, ফির্'আওন, হামান ও উবাই বিন খালাফ-এর সাথে থাকবে। (আহমাদ ৬৫৭৬ সানাদ হাসান)

উপরিক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনুল ক্বাইয়্যুম বলেছেনঃ (১) যে ব্যক্তি অর্থ সম্পদের মোহে সলাত হতে দূরে থাকে, তার হাশর হবে মূসা (আঃ) এর চাচাত ভাই বখীল ধনকুবের ক্বারূণ এর সাথে। (২) রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক ব্যস্ততার অজুহাতে যে ব্যক্তি সলাত হতে গাফেল থাকে, তার হাশর হবে মিসরের অত্যাচারী শাসক ফেরাঊনের সাথে।(৩) মন্ত্রীত্ব বা চাকুরীগত কারণে যে ব্যক্তি সলাত হতে গাফেল থাকে, তার হাশর হবে ফেরাঊনের প্রধানমন্ত্রী হামান এর সাথে। (৪) ব্যবসায়িক ব্যস্ততার অজুহাতে যে ব্যক্তি সলাত আদায় হতে গাফেল থাকে, তার হাশর হবে মক্কার কাফের ব্যবসায়ী নেতা উবাই বিন খালাফের সাথে। (দেখুন আস-সলাতু ওয়া আহকামু তারাকিহার ৫১ নাম্বার পৃষ্ঠা)

সুতরাং এ কথা দ্ব্যাত্মহীন ভাষায় বলা যায় যে, সলাত তরককারীদের ক্বিয়ামতের দিন কাফের নেতাদের সাথে হাশর হওয়া, তাদের কাফির ও চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকার প্রমাণ। কারণ, এসব কুনেতারা অনন্তকাল ধরে জাহান্নামে থাকবে। আর কেয়ামতের দিন বেসলাতীরা ব্যতীত কোনো মুসলিম এদের সঙ্গি হবে না। কেননা সে দিন একটি ঘোষণার পর সমস্ত মুসলিমররা এক কাতার বদ্ধ হয়ে যাবে (বুখারী ৭৪৩৯)। আর বেসলাতিদেরকে উক্ত নেতাদের সাথে জাহান্নামে পাঠানো হবে। আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের রক্ষা করুন, আমীন)।

সাধারণ নোটঃ এখানে কোনো প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে ঐ হাদীসের কি উত্তর হবে যেখানে অনু পরিমাণ ইমানদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার সানাদ রয়েছে?

এর জবাবে আমরা বলবোঃ ঐ হাদীসে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, যার্রা (অনু) পরিমাণ ইমানের অধিকারী জাহান্নামিরা সলাত তরককারী ছিলো। বরং সে হাদীসে বিপরীত দলীল রয়েছে যে, যার্রা (অনু) পরিমাণ ইমানের অধিকারী জাহান্নামিরা সলাত আদায়কারী ছিলো।

যেমনঃ এটি একটি বৃহৎ হাদীস হওয়ায় পোষ্টটি সংক্ষিপ্তকরণের জন্য আরবী পাঠ গোপন করে উক্ত হাদীস সমূহ হতে প্রামানিক মাসআলা প্রথম ব্রাকের মাঝে আমি পোষ্টকারী বলছি শিরনামে লিপিবদ্ধ করছি।

হাদীসঃ আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ক্বিয়ামাতের দিন আমাদের রবেবর দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেনঃ মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেনঃ সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ‘ইবাদাত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশপূজারী ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তিপূজারীরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ‘ইবাদাতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কিসের ‘ইবাদাত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র (আঃ)-এর ‘ইবাদাত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ‘ইবাদাত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ‘ইবাদাত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর 'ইবাদাতকারীগণ। তাদের নেক্কার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন্ জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ‘ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর মহাক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রবব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবীগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সাজদাহ্য় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সাজদাহ্ করেছিল। তবে তারা সাজদাহর মনোভাব নিয়ে সাজদাহ্ করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে।

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ অর্থাৎ সকলের জাহান্নামে গমনের পর আলোচ্য মাসআলার প্রেক্ষিতে বাকী রয়েছে মাত্র দুই প্রকার ব্যক্তি, যারা সলাত তরককারী ছিলো না। বরং তাদের মধ্যে এক প্রকার লোক হলো তারা, যারা আল্লাহ তা'য়ালার উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করতো এবং অপর দল ছিলো লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সলাত আদায়কারী। কিন্তু এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, ঐসব ব্যক্তিরা সব কোথায় যারা বলতো আমরা সলাত না পড়লেও আমাদের ইমান ঠিকই আছে অর্থাৎ যারা সলাত তরক করতো! উত্তর হলো এরা সেখানে থাকবে যেখানের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সলাতের হেফাযত করল না...সে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন ক্বারূণ, ফেরাঊন, হামান ও উবাই বিন খালাফের সঙ্গে থাকবে (আহমাদ ৬৫৭৬, হাসান)। এরা এসব নেতাদের সঙ্গে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যা আবারো প্রমাণ করে যে সলাত তরককারীরা কাফির। এখানে আবারো প্রশ্ন আসতে পারে যে, ঈমানদারগণ সবাই সাজদাহ্য় পড়ে যাবে তাহলে যারা (সেজদা না দিয়ে দাঁড়িয়ে) থাকবে তাদের কি ইমান শূণ্য?

উত্তর হলো যে, হতে পারে দুর্বল ইমানদার রিয়াকারীগণ দাঁড়িয়ে থাকবে। আবার নাও হতে পারে। কিন্তু এ দুই সুরতই সলাত তরককারীর হৃদয়ে যার্রা পরিমাণ ইমান থাকার প্রমাণ করে না। কেননা যদি প্রথম সুরত হয় তাহলে তার ব্যাখ্যা এই দাঁড়াবে যে, আল্লাহ তা'য়ালা তাদের আজ সিজদা দেওয়ার শক্তি এজন্য দেননি কেননা তারা আল্লাহ তা'য়ালার জন্য দুনিয়ায় সিজদা করেনি। আজ আল্লাহ তা'য়ালা শুধুমাত্র খাঁটি মুসাল্লীর সিজদা দেখতে চান। আর এর মাধ্যমে খাটি মুসাল্লীরা সম্মানিত ও রিয়াকারীরা চরম অপমানিত এবং লজ্জাকর করুণ পরিণতির সম্মুখিন করতে চান। অথবা অনুরুপ কিংবা অনান্য কারণে (অল্লাহু আলাম)। আবার যদি দ্বিতীয় সুরতটি বোঝানোর সুবিধার্তে কয়েক সেকেন্ডের জন্য মেনে নিলেও তার ব্যাখ্যা এই দাড়াবে যে, তারা দুনিয়ায় মুসাল্লী ছিলো যা তাদের বাহ্যিক ইমানের দাবী রাখতো। তাই আজ তারা এখানে অবশিষ্টদের সাথে রয়ে গেছে। আজ তাদের সে বিষয়ে ফয়সালা করা হবে যে তারা রিয়াকারী ছিলো। অর্থাৎ তারা যে লোকদের দেখানোর উদ্দেশ্য সলাত আদায় করতো তা অপমানের পর তা জানিয়ে দেওয়া হবে (অল্লাহু 'আলাম)।

চলমান হাদীসঃ এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সহাবীগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। এ কবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই  মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত?

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ অর্থাৎ এ জাহান্নামিরা সলাত তরককারী ছিলো না, বরং সলাত আদায়কারী ছিলো। যেমনটি জান্নাতি ঈমানদারগণ বলবেন যে, (হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত?)  তবে তারা মুক্তি না পাওয়ার কারণ তাদের পাপের পাল্লা ভারী হওয়ার জন্য অথবা উত্তমরূপে অযু না করে নির্ধারিত সময়ে পূর্ণরূপে রুকু' ও পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে সলাত আদায় না করার কারণে। যেমন 'আব্দুল্লাহ ইবনুস সুনাবিহী (রহঃ) হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসানুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মহান আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করে নির্ধারিত সময়ে পূর্ণরূপে রুকু' ও পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে সলাত আদায় করবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর যে ব্যক্তি এরূপ করবে না, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে কোন প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন অন্যথায় শাস্তি দিবেন (আবু দাঊদ ৪২৫, সহীহ) অল্লাহু 'আলাম।

চলমান হাদীসঃ তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন।

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'য়ালা ঐসব জাহান্নামিদের বের করার অনুমতি দিবেন না যারা সলাত তরককারী ছিলো। বরং জাহান্নাম থেকে বের করে আনার শর্তের মধ্যে সলাত আদায়কারী শর্ত থাকবে। যেমনটা জান্নাতি ঈমানদারগণ বলবেন যে, (হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত (অর্থাৎ মুসাল্লীগণ), সওম পালন কত, নেক কাজ করত?)

চলমান হাদীসঃ আল্লাহ্ তাদের মুখমন্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে।

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'য়ালা এখানেও জাহান্নামিদের বের করার মধ্যে অন্যতম শর্ত সলাত আদায়কারিদের মধ্যে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান শর্ত করে দিয়েছেন যেমনটা এক দ্বীনার পরিমাণের বেলায় ছিলো। তিন দয়াময় আল্লাহ্ এখানে তা অর্ধেক করবেন)।

চলমান হাদীসঃ তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে।

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এখানেই পূর্বের শর্তানুসারে যার মধ্যে সলাত আদায়কারিও ছিলো তাদের বের করে আনতে বলবেন। তবে এবারে তিনি আরো ছাড় দিয়ে অর্ধ দিনারের স্হানে এক অনু পরিমান ইমান দেখবেন। সুব'হানাল্লাহি অবি 'হামদিহি)।

চলমান হাদীসঃ বর্ণনাকারী আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়ঃ (আল্লাহ অণু পরিমাণও যুল্ম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন) (আন্-নিসা ৪:৪০)। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফেরেশ্তা ও মু’মিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফাআতই বাকী রয়েছে।

(আমি পোষ্টকারী বলছিঃ এখানে আল্লাহ তা'য়ালা কোনো বেসলাতীকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন না। বরং তিনি সেই সব মুসল্লীদের তার কঠিন আযাব থেকে মুক্তি দিবেন যারা পাপের পাল্লা ভারি হওয়ার জন্য জাহান্নামে গেছে কিন্তু তারা দূর পাহাড়ে বকরি চরাতো ও সলাত আদায় করতো অথবা অনুরুপ মুসাল্লীবর্গদের সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ তার অসহনীয় শাস্তি থেকে নাযাত দিবেন। অর্থাৎ যাদের কথা কেউ জানেনা তথা যারা সঙ্গত কারণেই একাকী সলাত আদায় করেছেন। কারণ মালায়েক ও জান্নাতি মু'মিণগণের এ শাফায়াত যে, (হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত (অর্থাৎ মুসাল্লীগণ), সওম পালন করত, নেক কাজ করত?) এরপর আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন যে, (এখন শুধু আমার শাফাআতই বাকী রয়েছে)। অর্থাৎ দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাদের দেখা নেক ভাইদের নাযাত দেওয়ার পর এবার এই শ্রেণীর মধ্যে তাদের নাযাত দিবেন যারা তাদের সলাত আদায় সম্পর্কে বেখবর ছিলো (যেমন বিভিন্ন জঙ্গলে থাকা মুসল্লীবর্গ)। এতভিন্ন বিপরীত মতের পক্ষে কোনো উক্তি নেই। কারণ যার্রা (অনু) পরিমাণ ইমানের পর আর কি ইমান বাকি থাকে?

চলমান হাদীসঃ তিনি (আল্লাহ তা'য়ালা) জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গিয়েছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ‘হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদগত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ উদগত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আযাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ‘আমাল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো (বুখারী ৭৪৩৯)।

সিদ্ধান্তঃ ইখতিলাফি মাসয়ালায় বিপরীত চিন্তা ধারক পাঠকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় উপনীত করা কঠিন মনে করা হলেও এক্ষেত্রে ঐ সব কুরআনুল কারিমের আয়াত ও হাদীস সমূহকে যথেষ্ট মনে করছি যেসব স্হানে মতনৈক্যের স্থানে প্রমাণ আসার পর তা মেনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এসব দলীল দ্বারাই ইখতিলাফি কোনো মাসআলায় দলীল স্পষ্ট হলে কুরআন সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে বিপরীত মতকে পরিহার করার ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ) তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাহগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে, তা দাঁত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে থাকবে (আবু দাঊদ ৪৬০৭, সহীহ)।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদানের থেকে সলাত তরককারীকে কাফির হওয়ার ফাতয়া স্পষ্ট করে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রকার ওযর ব্যতীত ফরজ সলাত তরককারী কাফির। যেমনঃ

সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন {ﺑَﻴْﻦَ اﻟْﻌَﺒْﺪِ ﻭﺑﻴﻦ اﻟﻜﻔﺮ ﻭاﻹﻳﻤﺎﻥ اﻟﺼَّﻼَﺓُ ﻓَﺈِﺫَا ﺗَﺮَﻛَﻬَﺎ ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺷْﺮَﻙَ} বান্দার মাঝে ও কুফরের মাঝে ও ইমানের মাঝে পার্থক্য হলো সলাত। সুতরাং যে ব্যক্তি উহা ত্যাগ করলো সে শিরক করলো (শারহুল উসুল ইতিকাদু আহলু সুন্নাহ ওয়াল জাম'আত ১৫২১। হাদীসটির সানাদকে আলবানী (রহঃ) হাসান বলেছেন। দেখুন শায়েখের সহীহ তারগিব ৫৬৬)।

মিসওয়ার ইবন মাখরামা (রহঃ) হইতে বর্ণিত। যে রাত্রে উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) কে ছুরিকাঘাত করা হয়, সেই রাত্রে জনৈক ব্যক্তি উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর নিকট প্রবেশ করিল। উমর (রাঃ) কে ফজরের সলাতের জন্য জাগানো হইল। উমর (রাঃ) বলিলেনঃ (نَعَمْ، وَلَا حَظَّ فِي الْإِسْلَامِ لِمَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ. فَصَلَّى عُمَرُ وَجُرْحُهُ يَثْعَبُ دَمًا) হ্যাঁ, আমি এই অবস্থায়ও সলাত পড়িব। যে ব্যক্তি সলাত ছাড়িয়া দেয়, ইসলামে তাহার কোন অংশ নাই। অতঃপর উমর (রাঃ) সলাত পড়িলেন অথচ তাহার জখম হইতে তখন রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল (মুয়াত্তা আঃ মালেক ৯৩)।

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। (ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳُﺼَﻞِّ ﻓَﻬُﻮَ ﻛَﺎﻓِﺮٌ) যে সলাত আদায় করে না সে কাফির (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী ৬৪৯৯ তাহঃ অপেক্ষাকিত)। আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। (ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳُﺼَﻞِّ ﻓَﻼَ ﺩِﻳﻦَ ﻟَﻪُ) যে সলাত আদায় করে না তার কোন ধর্ম নেই (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকীঃ ৬৪৯৯, তাহঃ অপেক্ষাকিত)৷

এতভিন্ন প্রখ্যাত ইমাম ইসহাক ইবনু রাহওয়িয়াহ (রহঃ) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, সালাত বর্জনকারী ব্যক্তি কাফির। আর অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত আলেমগণের মতে, বিনা ওযরে সালাত বর্জনকারী ব্যক্তি সালাতের সময় অতিক্রম করলে কাফির বলে গণ্য হবে (দেখুন উষাইমন (রহঃ) এর হুকুমুত তারাকুস সালাতের প্রথম পরিচ্ছেদ)।

অতএব আলোচনার সমাপান্তে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেলো যে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোন প্রকার ওযর ব্যতীত অলসতা অবহেলা করে ফরজ সলাত তরককারী কাফির। কেননা সলাত তরককারীর নিকট শরীয়ত সম্মত কোনো প্রকার ওযর থাকলে সে সর্বসম্মত মতে কাফির নয়। বিপরীতে অবহেলা করে সলাত তরক করলে তার অর্থ হবে তাচ্ছিল্য করা (যা তাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেওয়ার জন্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিকট যথেষ্ট) এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত তরক করার অর্থ সলাতকে অবহেলা করা (যা সলাতকে তাচ্ছিল্য করার শামিল হিসাবে গণ্য)। এতভিন্ন সলাতকে অলসতা করে না পড়া বেসলাতীর নিকট কোনো প্রকার শরীয়ত সম্মত ওযর না থাকাকে প্রমাণ করে (যা তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত তরককারী হিসাবে চিহ্নিত করে)।

যা জেনে রাখা জরুরীঃ প্রবল ঘুমের সাথে বারংবার যুদ্ধ করে ফাজরের সলাত তরককারী অবহেলাকারী নয়। কেননা, সে তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে যেরুপ একজন হজ্জ যাত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে অসুস্থার হেতু থমকে দাঁড়ায়। অনুরুপভাবে এই ব্যক্তি যদি ঘুমের কারণে যুহরের ওয়াক্ত পার করে দেয় তথাপি সে অবহেলাকারী নয়। বরং সে একজন ওযরগ্রস্হ ব্যক্তি। অনুরুপভাবে এই ব্যক্তির যদি ইহতিলাম অবস্হায় আসরের সলাতের এমন ওয়াক্তের সময় ঘুম ভঙ্গ হয় যখন তার পক্ষে ফরজ গোসল সম্পন্ন করতে মাগরিবের ওয়াক্ত চলে আসে তথাপি সে অলসতাকারী নয়। কেননা এটা তার জন্য শরীয়ত সম্মত ওযর (যাকে অলসতা নামকরণ করা স্পষ্ট ভুল)। অনুরুপভাবে কেউ যদি তার সাথে মাগরিবের সলাত থেকে শুরু করে ফরজ পর্যন্ত যুদ্ধ করে এবং তাকে হত্যা করে তথাপি সে কাফির নয়৷ কেননা তার ভিতর সলাত আদায় করার প্রবল সংকল্প ছিলো (যদিও সে তা সম্পন্ন করতে অক্ষম হয়েছে)

বিশেষ জ্ঞাতব্য একঃ কোনো আম (তথা সাধারণ) জনতার জন্য একে অন্যকে সলাত তরক করতে দেখলেই কাফির বলে সম্বোধন করা অনুচিত এই জন্য যেন, কেননা হতে পারে তার কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য ওযর আছে। যেমন হতে পারে কোনো ব্যক্তির ফরজের সলাত আদায় না করার কারণ তার ইহতিলাম হতে পারে। আর তার ঘুম এমন সময় ভেঙ্গেছে যে, তার পক্ষে ওয়াক্তের মধ্যে ফরজ গোসল সেরে সলাত আদায় করার মতো সুযোগও নেই। অথবা অনুরুপ অনান্য কারণ। কিন্তু খলিফার জিজ্ঞাসা এর ব্যতিক্রম৷ কেননা খলিফা তাকে জিজ্ঞাসার সহিত আটকে রেখে সলাত আদায় করতে বলবেন৷ যাতে কোনো ওযর যেমন অস্পষ্ট থাকেনা তেমনি তাই সঠিক ইনশাল্লাহ। তাই কারো সলাত তরক করতে দেখলেই আমরা বলি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন প্রকার ওযর ব্যতীত অলসতা অবহেলা করে ফরজ সলাত তরককারী কাফির (তবে নির্দিষ্ট করে বলিনা যে, অমুক ব্যক্তি কাফির। কিন্তু যদি শাসক তথা ইমাম বা তার থেকে কিংবা অনুরুপ মাধ্যম দ্বারা স্পষ্ট হলে ভিন্ন কথা)। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا) যখন কেউ তার মুসলিম ভাইকে হে কাফির বলে ডাকে, তখন তা তাদের দু’জনের কোন একজনের উপর বর্তায় (বুখারী ৬১০৩)। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি যদি কাফির না হয়ে থাকে আর আমি যদি তাকে কাফির বলে থাকি তবে এই সহীহ হাদীসানুসারে তা দুজনের একজনের দিকে ফিরবে, নাউজুবিল্লাহ।

বিশেষ জ্ঞাতব্য দুইঃ যারা ফরজ সলাত তরককারীদের ফাসিক মনে করেন তাদের দাবী শুধুমাত্র একটুকু যে, বেসলাতী অবস্হায় মৃত ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবেন না। বরং কিছু যুগের জন্য (হতে পারে তা ৬৩লাখ বছর বা ৬৩কোটি বছর বা তার থেকেও কিছু কম বা বেশি সময় পর্যন্ত) জাহান্নামের আগুনের আযাবের সাথে অন্য আযাব ভোগ করার পর যে দিনটি আসবে সেই দিনে জন্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু তারা এমন কোনো দলীল উথ্থাপন করতে পারেন না যার দ্বারা আল্লাহ তা'য়ালা হিসাবের দিন এই বেসলাতীকে অনান্য ফাসিকদের মতো ক্ষমা করে দিবেন বলে প্রমাণ করা যায়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সলাতের হেফাযত করল না...সে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন ক্বারূণ, ফেরাঊন, হামান ও উবাই বিন খালাফের সঙ্গে থাকবে (আহমাদ ৬৫৭৬, হাসান)। কারণ এসব ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর তাদের অনুসারী হিসাবে বেসলাতীদেরকেও জাহান্নামে যেতে হবে।

বিপরীতে যারা ফরজ সলাত তরককারীদের কাফির মনে করেন তাদের মতে বেসলাতী অবস্হায় মৃত ব্যক্তি শুধুমাত্র কোটি কোটি বছর জাহান্নামের শাস্তি উপভোগ করার পর কক্ষনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামেই থাকবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সলাতের হেফাযত করল না...সে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন ক্বারূণ, ফেরাঊন, হামান ও উবাই বিন খালাফের সঙ্গে থাকবে (আহমাদ ৬৫৭৬, হাসান)। কারণ এসব ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামি৷ আর তাদের অনুসারীরাও তাদের সাথে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।

অর্থাৎ এ বিষয়ে উভয় শ্রেণী আলেমদের মতে বেসলাতীকে অবশ্যই জাহান্নামে যেতে হবে এবং হাজার কোটি কোটি বছর ধরে জাহান্নামের অসহনীয় শাস্তি তাকে ভোগ করতে হবে৷ অতঃপর কারো মতে বেসলাতী জান্নাতে প্রবেশ করবে আর অন্যদের মতে সে জাহান্নামেই চিরস্থায়ী হবে।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার। কি করবেন আপনি? যেখানে আমরা দুনিয়ার প্রজ্বলিত চুলার আগুনের মধ্যে এক ঘণ্টা নিজের বাম হাত রাখতে পারি না সেখানে হাজার হাজার কোটি বছর ধরে কি জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হয়ে জান্নাতে যাওয়ার ইচ্ছা রাখাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ নাকি মাত্র ১০০ বছর আল্লাহ তা'য়ালার ইবাদাত করে স্বসম্মানে জান্নাতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে!

এছাড়া আপনার এ সলাত পড়াটা দুনিয়ার বুকে খুবিই উপকারী। যা পালনের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তি প্রত্যেক ওয়াক্তের মাধ্যমে সময়ানুবর্তিতা, মহান আল্লাহ তা'য়ালার ইবাদাতের মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি, ইহার পদ্ধতির মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতা ও এতে করা তেলাওয়াতের কারণে ভালো মন্দের জ্ঞান লাভ ছাড়াও জামায়াতে আদায় করার ফলে ঐক্যবদ্ধতা, সাম্য এবং সম্পৃতিসহ অনান্য বহুবিধি কল্যানের জন্য সমাজ, গোত্র রাষ্ট্রসহ পুরো পৃথিবীতে সর্বকালের সর্ব স্হানে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপযোগী মাধ্যম।

ইতিহাসসম্পাদনা

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী মুহাম্মাদ (সা.) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন এবং অব্যবহিত পরে সূরা মু’মিন-এর ৫৫ নম্বর আয়াত স্রষ্টার পক্ষ থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ মুসলিমদের জন্য ফরজ (আবশ্যিক) হওয়ার নির্দেশনা লাভ করেন। তিনি ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে সকাল, সন্ধ্যা ও দুপুরে দৈনিক তিন ওয়াক্ত নামাজের আদেশ লাভ করেন। ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে রজব তারিখে মিরাজের সময় পাঁচওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় যুহর, আসর ও ইশা ২ রাকায়াত পড়ার বিধান ছিল। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহর তরফ থেকে ২ রাকায়াত বিশিষ্ট যুহর, আসর ও ইশাকে ৪ রাকায়াতে উন্নীত করার আদেশ দেয়া হয়।[৬]

শর্তসম্পাদনা

কারো উপর নামাজ ফর‌জ হওয়ার জন্য শর্তগুলো হলো:–

নিম্নের পাঁচটি কারণ সংঘটিত হলে নামাজ বৈধ হয়।[৭]

  • নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হলে। অনিশ্চিত হলে নামাজ হবে না, যদি তা ঠিক ওয়াক্তেও হয়।
  • কাবামুখী হয়ে দাঁড়ানো। তবে অসুস্থ এবং অপারগ ব্যক্তির জন্য এই শর্ত শিথিলযোগ্য।
  • সতর ঢাকা থাকতে হবে। পুরুষের সতর হল নাভির উপর থেকে হাঁটুর নিচ (টাখনুর উপরে) পর্যন্ত, আর নারীর সতর হল মুখমণ্ডল, দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের পাতা ব্যতীত সারা শরীর।[৮]
  • পরিধেয় কাপড়, শরীর ও নামাজের স্থান পরিষ্কার বা পাক-পবিত্র হতে হবে।
  • অযু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।

নামাজের ফরজসম্পাদনা

নামাজের ফরজ মোট 13টি। আহকাম 7 টি। আরকান 6 টি। নামাজের বাহিরের কাজগুলিকে আহকাম বলে। আর নামাজের ভিতরের কাজগুলোকে আরকান বলে।

আহকামসম্পাদনা

  • শরীর পবিত্র হওয়া।
  • কাপড় বা বস্ত্র পবিত্র হওয়া।
  • নামাজের জায়গা পবিত্র হওয়া।
  • সতর ঢেকে রাখা।
  • কিবলামুখী হওয়া।
  • ওয়াক্তমত নামাজ আদায় করা
  • নামাজের নিয়্যত করা।

আরকানসম্পাদনা

  • তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামাজ শুরু করা।
  • দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া।
  • সুরা ফাতিহার সাথে কুরআন পড়া।
  • রুকু করা।
  • দু্ই সিজদা করা।
  • শেষ বৈঠক করা।

নিয়মসম্পাদনা

 
বাংলাদেশের একটি মসজিদে মুসলমান পুরুষদের নামাজের দৃশ্য।

নামাজ দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। নামাজের ধাপ বা অংশকে রাকাত বলা হয়। প্রতি রাকাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা ও অপর একটি সুরা পাঠের পর রুকু করতে হয় অর্থাৎ হাঁটুতে হাত রেখে ভর দিয়ে পিঠ আনুভূমিক করে অবনত হতে হয়। রুকু থেকে দাঁড়িয়ে তারপর সিজদা দিতে হয়। তিন বা চার রাকাতের নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে সিজদার পর বসে "আত্তাহিয়াতু(তাশাহুদ)" দোয়া পড়তে হয়। নামাজের শেষ রাকাতে সিজদার পর বসে "আত্তাহিয়াতু(তাশাহুদ)" দোয়ার সাথে "দরূদ শরীফ" পড়তে হয়। নামাজের শেষভাগে দুই দিকে সালাম ফেরাতে হয়। এর পর দলবদ্ধভাবে মুনাজাত বা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। নামাজের কিছু নিয়ম পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

ওয়াক্ত ও রাকাতসম্পাদনা

 
১ ফযর, ২ যোহর, ৩ আসর, ৪ মাগরিব, ৫ ইশা

প্রতিদিন একজন মুসলিমকে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। প্রথম ওয়াক্ত হল "ফজর নামাজ" সুবহে সাদিক হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত এর ব্যপ্তিকাল। এরপর "যুহর ওয়াক্ত" বেলা দ্বিপ্রহর হতে "আসর ওয়াক্ত"-এর আগ পর্যন্ত যার ব্যপ্তি। তৃতীয় ওয়াক্ত "আসর ওয়াক্ত" যা সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত পড়া যায়। চতুর্থ ওয়াক্ত হচ্ছে "মাগরিব ওয়াক্ত" যা সূর্যাস্তের ঠিক পর পরই আরম্ভ হয় এবং এর ব্যপ্তিকাল প্রায় ৩০-৪৫ মিনিট। "মাগরিব ওয়াক্ত" এর প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর আরম্ভ হয় "ইশা ওয়াক্ত" এবং এর ব্যপ্তি প্রায় "ফজর ওয়াক্ত"-এর আগ পর্যন্ত।

উপরোক্ত ৫ টি ফরজ নামাজ ছাড়াও ইশা'র নামাজের পরে বিতর নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি সুন্নত নামাজ ও মুসলিমরা আদায় করে থাকে।

কোন ওয়াক্ত-এর নামাজ কয় রাকাত তা দেয়া হল :

নাম সময় ফরযের পূর্বে ফরয ফরযের পর
ফযর (فجر) ঊষা থেকে সূর্যোদয় ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ২ রাকাত -
যুহর (ظهر) ঠিক দুপুর থেকে আসরের পূর্ব পর্যন্ত ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ৪ রাকাত ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
আসর (عصر) যোহরের শেষ ওয়াক্ত থেকে সূর্য হলুদ বর্ণ পূর্ব পর্যন্ত অন্য মতে সূর্যস্তের পূর্ব পর্যন্ত ৪ রাকাত সুন্নাতে গায়ের মুয়াক্কাদা ৪ রাকাত -
মাগরিব (مغرب) সূর্যাস্তের পর থেকে গোধূলি পর্যন্ত - ৩ রাকাত ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
ইশা (عشاء) গোধূলি থেকে অর্ধ রাত পর্যন্ত ৪ রাকাত সুন্নতে গায়ের মুয়াক্কাদা ৪ রাকাত ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
বিতর (وتر) ইশার পর থেকে ফজরের পূর্র পর্যন্ত ১ বা ৩ বা ৫ বা ৭ বা ৯ বা ১১ বা ১৩

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন এ নামাজগুলো পড়তেন।

শুক্রবারে জুমা যুহর নামাজের পরিবর্তে পড়তে হয়

এশা নামাজ আদায় করার পর বেজোড় সংখ্যক রাকাত বিতর এর ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হয়।

অন্যান্য নামাজসম্পাদনা

ফরয নামাজ ছাড়াও মুসলমানগণ আরো কিছু নামাজ আদায় করে থাকেন। সেগুলোকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়ে থাকে। তবে শ্রেণিবিভাগ অনুসারে ফরয ছাড়া বাকি নামাজগুলোকে ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল এই তিনভাগে ভাগ করা যায়।

ওয়াজিব নামাজসম্পাদনা

অধিকাংশ আলেমের মতে, নিয়মিত ওয়াজিব নামাজ হচ্ছে বিতর নামাজ, তবে বিতর নামাজ ওয়াজিব নামাজ হিসেবে সর্বসম্মত নয়। সালাফি আলেমগণের মতে এটি ওয়াজিবের পরিবর্তে সুন্নত নামাজের অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেকদিন এশার নামাজের পর হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত এই ওয়াজিব নামাজের সময় থাকে। এছাড়া কোন নফল নামাজের নিয়ত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। এছাড়া দুই ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব ।

সুন্নাত নামাজসম্পাদনা

নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যেই নামাজগুলো আদায় করতেন, তাকে সুন্নাত নামাজ বলে। সুন্নাত নামাজ দুই প্রকার। ১. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ২. সুন্নাতে যায়েদাহ

  • সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলতে ঐসব নামাজকে বুঝায়, যেগুলো নবী (সা:) নিয়মিত আদায় করতেন।
  • সুন্নাতে যায়েদাহ বলতে বুঝায়, ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সা:) যেসব সুন্নাত নিত্য আদায় করতেন না।

নফল নামাজসম্পাদনা

১. নফল নামাজ হলো এক প্রকার ঐচ্ছিক সুন্নত নামাজ। ২. বিভিন্ন প্রকারের নফল নামাজ আদায়ের প্রমাণ হাদিস সমূহে বর্ণিত আছে। ৩. নফল নামাজ সমূহ সাধারণত ২ রাকাত করে আদায় করতে হয়।

জানাযার নামাজসম্পাদনা

জানাযা একটি বিশেষ প্রার্থনা যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সচরাচর এটি জানাযার নামাজ নামে অভিহিত হয়। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মামলম্বীদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া বা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব অর্থাৎ কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অবশ্যই জানাযার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো এলাকা বা গোত্রের পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।

জানাযার নামাজ একজন ইমামের নেতৃত্বে জামাতের সাথে বা দলবদ্ধভাবে হয়। অংশগ্রহণকারীরা বেজোড় সংখ্যক কাতাতে বা সারিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করেন। এটি ৪ তকবিরের নামাজ। দাঁড়িয়ে এ নামাজ আদায় করতে হয় এবং সালাম ফেরানোর মধ্য দিয়ে এ নামায শেষ হয়। জানাযা শেষে মৃতব্যক্তিকে অবিলম্বে গোরস্থানে নিয়ে যেতে হয় এবং ইসলামী রীতিতে কবর তৈরী করে মাটিতে দাফন করতে হয়।

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নামাজসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Farrokhian, Mahmoud Reza; Arefian, Abdulhamid; Jahromi, Gholmreza Saber (২০১৬-০৭-১৩)। "A Reanalysis of Social - Cultural Impacts and Functions of Worship: A Case Study on Salah (Namaz)"Mediterranean Journal of Social Sciences (ইংরেজি ভাষায়)। 7 (4 S1): 249। আইএসএসএন 2039-2117 
  2. Lane, Edward William (১৯৬৮)। An Arabic-English Lexicon। Beirut, Lebanon: Librairie du Liban। পৃষ্ঠা 1721। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মে ২০২০ 
  3. "Salat - Oxford Islamic Studies Online"www.oxfordislamicstudies.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  4. Murata, Sachiko; Chittick, William C. (১৯৯৪)। The vision of Islam (ইংরেজি ভাষায়)। Paragon House। আইএসবিএন 978-1-55778-516-9 
  5. "ছালাতুর রাসূল (ছা:)- ছালাত বিষয়ে জ্ঞাতব্য"www.at-tahreek.com। ২০১৯-১১-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  6. "রাসূলুল্লাহ সা:-এর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি"। ২৯ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জানুয়ারি ২০১৩ 
  7. Ramzy, Sheikh (২০১২-০৭-২৩)। The Complete Guide to Islamic Prayer (Salāh) (ইংরেজি ভাষায়)। Author House। আইএসবিএন 978-1-4772-1465-7 
  8. Salīm, ʻAmr ʻAbd al-Munʻim (২০০৫)। Important Lessons for Muslim Women (ইংরেজি ভাষায়)। Darussalam। আইএসবিএন 978-9960-732-35-0