শরিয়ত

ইসলামের ধর্মীয় আইনশাস্ত্র

শরিয়ত (আরবি: شريعة‎; উচ্চারণ: [ʃaˈriːʕa], শারি'আহ্ বা শারি'আত; "কর্মপদ্ধতি") বা ইসলামি আইন বা শরিয়ত আইন হচ্ছে জীবনপদ্ধতি ও ধর্মীয় আইন যা ইসলামিক ঐতিহ্যের একটি অনুষঙ্গ। ইসলামি পরিভাষাকোষ অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং নবি মুহাম্মাদ যেসব আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-নীতি ও পথনির্দেশনা মুসলমানদের জন্য প্রদান করেছেন, তার সমষ্টিই হচ্ছে শরিয়ত। এটি ইসলাম ধর্মের নিয়ম-কানুন হতে উৎসরিত, প্রধানত কুরআনহাদিস হতে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে যথাক্রমে আল্লাহ (ঈশ্বর) ও মুহাম্মাদের দিগনির্দেশনার উৎস। আরবিতে, স্রষ্টার অমোঘ স্বর্গীয় আইন বুঝাতে শরিয়ত শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

শরিয়ত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-

অতঃপর আমি আপনাকে (মুহাম্মাদকে) কর্মপদ্ধতির উপর (শরিয়তের উপর) প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং আপনি তাই অনুসরণ করুন; আর আপনি মূর্খদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করবেন না।' [সুরাতুল জাসিয়া:১৮][১]

বিষয়বস্তু ও পরিধিসম্পাদনা

ইসলামি কর্মপদ্ধতি বা শরিয়তের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। সকল ধরনের ইসলামি আইন, আদেশ-উপদেশ, বিধিনিষেধ ও অনুশীলনের উৎস হলো শরিয়ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন-

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করলাম (অর্থাৎ শরিয়তে আল্লাহ কর্তৃক সকল বিষয়বস্তু সংযোজন সম্পন্ন হলো), তোমাদের উপর আমার কৃপা পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের [একমাত্র] ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। [সুরাতুল মায়িদা:৩][২]

এতে বোঝা যায়, যে শরিয়তের বিষয়বস্তুর পরিধি এতটা ব্যাপক, যে তা দীর্ঘ ২৩ বছরে পরিপূর্ণ হয়েছে (যেহেতু মুহাম্মাদের নবুয়ত দীর্ঘ ২৩ বছরে সম্পন্ন হয়েছে)। ইসলামি ধর্ম বিশারদগণ শরিয়তের বিষয়বস্তুকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন-

  • আকিদা বা বিশ্বাসগত বিধিবিধান।
  • নৈতিকতা ও চরিত্র সম্পর্কিত নিয়মনীতি।
  • বাস্তব কাজকর্ম সংক্রান্ত নিয়মকানুন।

ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্রে চারটি উৎসকে শরিয়তের স্বীকৃত উৎস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হচ্ছে ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআন, সুন্নাহ, কিয়াস ও ইজমা। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ মাযহাব হানাফি, মালিকী, শাফিঈ, হাম্বলী, জাফরি ইত্যাদি মতবাদে শাস্ত্রীয় উৎস সমূহ হতে শরিয়তের আইন নির্ণয়ের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে, তা ইজতিহাদ নামে পরিচিত। প্রথাগত ব্যবহারশাস্ত্র বা ফিকহশাস্ত্রে শরিয়তের আইনসমূহকে দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এ দুটি বিভাগ হচ্ছে ইবাদত সম্পর্কিত নীতি এবং মুয়ামালা সম্পর্কিত নীতি। শরিয়ত-ভিত্তিক আইনে কোন কর্ম সংঘটনকে বিচারিক বিশ্লেষণ করতে আইনগত অবস্থার পাশাপাশি নৈতিক মানদন্ডেও বিবেচনা করা হয় এবং এ কারণে শরিয়তের সিদ্ধান্তসমূহ ফরজ (আবশ্যিক), ওয়াজিব (প্রণোদনামূলক), নফল (নিরপেক্ষ), হালাল (গ্রহণীয়) ও হারাম (নিষিদ্ধ) – এই পাঁচ শ্রেণির যে কোন একটির অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এ কারণে, শরিয়তের সিদ্ধান্তসমূহের কিছু কিছু ক্ষেত্র পাশ্চাত্যের আইনশাস্ত্রের সিদ্ধান্তসমূহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং অন্যান্য সিদ্ধান্তসমূহ, বিশেষত প্রাত্যহিক জীবনাচার সম্পর্কিত বিষয়গুলো স্রষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

গুরুত্বসম্পাদনা

ইসলামি আদর্শ মোতাবেক, শরিয়ত হলো আল্লাহ ও মুহাম্মাদ প্রদত্ত আদেশ-নিষেধ ও বিধি- বিধান। সুতরাং শরিয়ত মেনে চললে আল্লাহ ও মুহাম্মাদ খুশি হন। অন্যদিকে, শরিয়ত অস্বীকার করা আল্লাহ ও মুহাম্মাদের আদর্শ ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করার নামান্তর, বলে মনে করে মুসলমানরা। এমনকি শরিয়তের এক অংশ পালন করা আর অন্য অংশ অস্বীকার করা কুফর। কুরআনে আছে,

তবে কি তোমরা গ্রন্থের (কুরআন) কিছু অংশ বিশ্বাস করো, আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল হলো পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। আর মহাপ্রলয়ের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। [সুরাতুল বাকারা, আয়াত ৮৫][৩]

শরিয়ত হলো ইসলামি জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা। ইসলাম ও এর সম্পর্কিত সকল বিষয়াদির ধারণা শরিয়ত থেকেই জানা যায়। তাই মুসলমানদের নিকট শরিয়তই হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস। কোনটি হালাল, কোনটি হারাম ইত্যাদি জানা যায়। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ, নফল ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞানও শরিয়তের শিক্ষার মাধ্যমেই লাভ করা যায়।

উৎসসম্পাদনা

শরিয়ত হলো আল্লাহ ও নবি মুহাম্মাদের দিগনির্দেশনার সমষ্টি। অতএব, শরিয়তের প্রধান বা মৌলিক উৎস দুইটি। যথা- আল্লাহর বাণী কুরআন ও মুহাম্মাদের বাণী ও কর্ম সুন্নাহ (হাদিস)।

পরবর্তীতে কুরআন ও সুন্নাহর স্বীকৃতি ও নির্দেশনার ভিত্তিতে শরিয়তের আরো দুইটি নির্ধারিত হয়। এগুলো হলো- ইজমাকিয়াস। সুতরাং, শরিয়তের উৎস মোট চারটি।

১. কুরআন

২. সুন্নাহ

৩. ইজমা

৪. কিয়াস[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

সমালোচনাসম্পাদনা

 
চিত্রটি আফগানিস্তানে ২৬ আগস্ট ২০০১ তারিখে বিপ্লবী মহিলা লীগ গোপনে তুলেছিল, যেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন মহিলাকে বোরকা (মুখমণ্ডল) উন্মোচিত করার জন্য ধর্মীয় পুলিশ জনসাধারণের সামনে লাঠি দিয়ে শাস্তি দেয়, যা নারী নির্যাতনমানবাধিকার বিরোধী।[৪][৫]

কিছু ধ্রুপদী শরিয়ত অনুশীলনে মানবাধিকারের বিরুদ্ধে গুরুতর লঙ্ঘন রয়েছে।[৬][৭] ধর্মীয় যুদ্ধের সূচনা ও সংগঠন; ফলস্বরূপ, যৌন নিপীড়নের জন্য উন্মুক্ত দাস এবং উপপত্নী হিসাবে যারা যুদ্ধের লুণ্ঠন হিসাবে বিবেচিত, বেসামরিক নাগরিকদের ব্যবহারকে যুদ্ধাপরাধ হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে এবং যখন নিয়মিত প্রয়োগ করা হয় তখন তার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে মানবতা।[৮][৯][১০]

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. [কুরআন ৪৫:১৮]
  2. [কুরআন ৫:৩]
  3. [কুরআন ২:৮৫]
  4. "Movies"। Revolutionary Association of the Women of Afghanistan (RAWA)। ২৫ মার্চ ২০০৯ তারিখে মূল (MPG) থেকে আর্কাইভ করা। 
  5. Nitya Ramakrishnan (২০১৩)। In Custody: Law, Impunity and Prisoner Abuse in South Asia। SAGE Publishing India। পৃষ্ঠা 437। আইএসবিএন 9788132117513। ২৭ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুলাই ২০১৯ 
  6. http://www.etc-graz.eu/wp-content/uploads/2020/08/insan_haklar__305_n__305__anlamak_kitap_bask__305_ya_ISBNli_____kapakli.pdf
  7. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি" (PDF)। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ মার্চ ২০২১ 
  8. http://dergiler.ankara.edu.tr/dergiler/38/281/2556.pdf
  9. http://tez.sdu.edu.tr/Tezler/TS02507.pdf
  10. https://yeditepe.edu.tr/sites/default/files/hukuk_dergi/II-2.pdf