আল্লাহ

আরবি ভাষায় মুসলমানদের উপাস্যের নাম

আল্লাহ (আরবি: الله‎‎, আইপিএ: [ʔaɫ.ɫaːh] (এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন))) একটি আরবি শব্দ। এটি ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহে ঈশ্বর বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষায়, শব্দটি সাধারণত ইসলাম ধর্মে ঈশ্বরকে বুঝায়।[১][২] "আল্লাহ" শব্দটি "আল" ও "ইলাহ" এর সংক্ষিপ্ত রূপের সমন্বয়ে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়, যার অর্থ "ঈশ্বর"। এটি ভাষাগতভাবে হিব্রুআরামীয় ভাষায় ঈশ্বরের প্রতিশব্দ "এল" (এলোহিম) ও "এলাহ" এর সাথে সম্পর্কিত।[৩]

আবরি ক্যালিগ্রাফিতে 'আল্লাহ' শব্দটি

ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে আরবের বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা "আল্লাহ" শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। সুনির্দিষ্টভাবে, এই শব্দটি "ঈশ্বর" এর একটি পরিভাষা হিসেবে মুসলমানগণ (আরব ও অনারব উভয়) ও আরব খ্রিস্টানগণ ব্যবহার করে থাকে। বাহাই, মাল্টাবাসী, মিজরাহী ইহুদি এবং শিখ সম্প্রদায়ও "আল্লাহ" শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।[৪][৫] পশ্চিম মালয়েশিয়ায় খ্রিস্টান ও শিখদের "আল্লাহ" শব্দটির ব্যবহার সম্প্রতি রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।[৬][৭][৮][৯]

ইসলামের নবী মুহাম্মদ বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলার মোট ৯৯টি গুনবাচক নাম রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে এ সকল নামের মাধ্যমে তার নিকট দোয়া প্রার্থনা করতে আদেশ করেছেন।[১০][১১] যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র এ গুণবাচক ৯৯টি নাম মুখস্থ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'যে ব্যক্তি ৯৯টি গুণবাচক নাম মুখস্থ করবে এবং সর্বদা পড়বে, সে অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে।' ---সহীহ মুসলিম[১২][১৩]

ব্যুৎপত্তিসম্পাদনা

 
আরবি ভাষায় লিখিত "আল্লাহ" নামের অংশসমূহ:

"আল্লাহ" শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে ধ্রুপদী আরব ভাষাতত্ত্ববিদগণ ব্যাপক আলোচনা করেছেন।[১৪] বাসরা বিদ্যালয়ের ব্যাকরণবিদগণ এই শব্দটিকে "স্বতঃস্ফূর্তভাবে" গঠিত শব্দ বা "লাহ" (ক্রিয়ামূল "লিহ" থেকে আগত) এর একটি নির্দিষ্ট রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন।[১৪] অন্যরা ধারণা করেন শব্দটি সিরিয়াক বা হিব্রু থেকে এসেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ভাষাতত্ত্ববিদ আরবি ভাষার নির্দিষ্ট পদাশ্রিত নির্দেশক "আল" ও "ইলাহ" এই দুটি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপের সমন্বয়ে "আল্লাহ" শব্দটি উদ্ভূত বলে মনে করেন।[১৪] আধুনিক পণ্ডিতদের অধিকাংশই এই তত্ত্বটি সমর্থন করেন এবং সিরিয়াক বা হিব্রু থেকে আগত হওয়ার ধারণাটি সন্দেহের সাথে দেখেন।[১৫]

"আল্লাহ" শব্দটির সমজাতীয় (একই মূল বিশিষ্ট) শব্দ হিব্রু ও আরামীয় ভাষাসহ অন্যান্য সেমিটিক ভাষায় বিদ্যমান।[১৬] শব্দটির আরামীয় রূপ হলো "এলাহ" (אלה), কিন্তু নির্দিষ্ট রূপ "এলাহা" (אלהא)। এটি প্রাচীন আরামীয় ভাষায় "এলাহা" (ܐܠܗܐ) ও সিরিয়াক ভাষায় "আলাহা" (ܐܲܠܵܗܵܐ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যা আসিরীয় খ্রিস্টানগণ ব্যবহার করে। কিন্তু উভয় ভাষাতেই এর অর্থ "ঈশ্বর"।[১৭] প্রাচীন হিব্রু ভাষায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বহুবচন "এলোহিম" (אלהים‬) এবং কদাচিৎ একবচন "এলোয়া" (אלוהּ‬) ব্যবহৃত হয়েছে। গুরু গ্রন্থ সাহিব অর্থাৎ শিখদের ধর্মগ্রন্থে "আল্লাহ" (ਅਲਹੁ) শব্দটি ৩৭ বারের চেয়ে বেশি বার ব্যবহৃত হয়েছে।[১৮]

উচ্চারণসম্পাদনা

"আল্লাহ" শব্দের দ্বিতীয় অক্ষর লাম (ل) কয়েক ভাবে উচ্চারিত হয়। এই শব্দটির পূর্ববর্তী অক্ষরে যবর বা পেশ থাকলে 'লাম' ভাবগম্ভীর স্বরে উচ্চারিত হয়। আবার যদি পূর্ববর্তী অক্ষরে যের থাকে তাহলে 'লাম' হালকা স্বরে উচ্চারিত হয় (যেমন-বিসমিল্লাহ)।[১৯]

আরবিতে ব্যবহারসম্পাদনা

ইসলাম-পূর্ব আরবসম্পাদনা

ইসলাম-পূর্ব আরবে, মক্কাবাসী পৌত্তলিকরা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা দেবতা হিসেবে ধারণা করতো, এবং খুব সম্ভবতঃ সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতা হিসেবে।[২০] কিন্তু একক এবং অদ্বিতীয় ঐশ্বরিক শক্তি হিসেবে নয়। বরং পৃথিবী-সৃষ্টিকারী এবং বৃষ্টি-দানকারী সত্তা হিসেবে। আল্লাহর প্রকৃত স্বরূপ তাদের ধারণায় খুব পরিষ্কার ছিল না।[২১] তাদের ধারণা ছিলো যে, আল্লাহর আরো সঙ্গী-সাথী আছে, যাদেরকে তারা অধীনস্থ দেবতা হিসেবে পূজা করতো। তারা আরো ধারণা করতো যে, আল্লাহর সঙ্গে জ্বিনজাতির আত্মীয়তা-ধরনের কোনো সম্পর্ক আছে[২২] তারা আল্লাহর পুত্র বলেও সাব্যস্থ করেছিলো [২৩] এবং তৎকালীন আঞ্চলিক দেবতা লা'ত, উজ্জা, মানাতকে তারা আল্লাহর কন্যা সাব্যস্থ করেছিলো [২৪]। খুব সম্ভবতঃ, মক্কার আরবরা আল্লাহকে ফেরেশতা বা স্বর্গীয় দূত হিসেবে ধারণা করতো।[২৫][২৬] যার কারণে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় তারা আল্লাহ ডাকতো।[২৬][২৭] এমনকি নিজেদের নামকরণেও তারা আব্দুল্লাহ(অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দা বা গোলাম) শব্দটি ব্যবহার করতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মুহাম্মাদের পিতার নাম ছিল ʿAbd-Allāh(عبدالله ) আব্দুল্লাহ'[২৬]

ইসলামসম্পাদনা

 
তুরস্কের, ইস্তানবুলের, হাগিয়া সফিয়ায় একটি মেডেলে "আল্লাহ" শব্দটি লিখিত
 
তুরস্কের পুরাতন মসজিদের বাইরে "আল্লাহ" শব্দটি লিখিত

ইসলামিক ভাষ্যমতে, আল্লাহ হলো একমাত্র প্রশংসাযোগ্য ও সর্বশক্তিমান সত্তার প্রকৃত নাম,[২৮] এবং তার ইচ্ছা এবং আদেশসমূহের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।[২৯] "তিনি এক এবং অদ্বিতীয় , সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একক সৃষ্টিকর্তা, এবং সমগ্র মানবজাতির বিচারক"[৪][২৯] "তিনি একক (wāḥid) এবং অদ্বিতীয় (ʾaḥad), পরম দয়ালু এবং সর্বত্র বিরাজমান"[২৯] কুরআনের "আল্লাহর বাস্তব সত্তা, তার অপরিমেয় রহস্য, বিভিন্ন নাম, এবং সৃষ্টিজগতের জন্য তিনি যা করেন" তার ঘোষণা দেয়।[২৯]

ইসলামিক ভাষ্যমতে, আল্লাহর গুণবাচক অনেক নাম রয়েছে, যার সংখ্যা কুরআনহাদিস মিলিয়ে একশতেরও অধিক, যাদের কে একত্রে আসমাউল হুসনা (অর্থাৎ, সুন্দরতম নামসমূহ) বলা হয়। তন্মধ্যে, একটি প্রসিদ্ধ হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহর ৯৯ টি নামের একটি বিশেষ তালিকা আছে, (al-ʾasmāʾ al-ḥusnā lit. meaning: "The best names") যার একেকটি আল্লাহর এক-একটি গুন বা বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে।[৪][৩০] এবং এই সব কয়টি নামই একক সত্তা আল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করে, যা কিনা তার সর্বপ্রধান নাম।[৩১] এই সমস্ত নামসমূহের মাঝে, সবচেয়ে পরিচিত এবং বহুল ব্যবহৃত হলো, "পরম দয়ালু" (আর-রহমান), "অতিশয় মেহেরবান" (আর-রহীম) এবং "অতিশয় ক্ষমাশীল’’ (গাফুর) ।[৪][৩০]

মুসলিমগন ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পিত কাজের ব্যাপারে আলোচনা করলে তার আগে বা পরে ইনশাল্লাহ (অর্থাৎ "যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন") কথাটি ব্যবহার করেন[৩২]। ইসলামিক পরিভাষায়, যে কোন কাজ শুরু করার পূর্বে একজন মুসলিমের বিসমিল্লাহ (অর্থাৎ "আল্লাহর নামে(শুরু করছি)") বলে শুরু করা উচিত, যাতে করে সেই কাজটা আল্লাহ পছন্দ করেন, এবং তাতে সাহায্য করেন[৩৩]

এগুলো ছাড়াও সবসময় আল্লাহকে অধিক স্মরণ করার উপায় হিসেবে মুসলিমদের মধ্যে আল্লাহর প্রশংসামূলক আরও কিছু বাক্য বহুল প্রচলিত, তন্মধ্যে "সুবহানাল্লাহ" (সমস্ত পবিত্রতা আল্লাহর), আলহামদুলিল্লাহ(সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর), প্রধান কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) এবং আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সুমহান)।[৩৪] সূফী সাধকদের মধ্যে একটি বহুল-প্রচলিত সাধনা হলো, আল্লাহযিকর, যেটায় সূফীরা নিজেদের শ্বাস-প্রশ্বাস কে নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে মনোযোগ সহকারে আল্লাহ শব্দ অথবা তার কোনো এক বা একাধিক গুণবাচক নাম একাধারে অজস্রবার পাঠ করতে থাকে।[৩৫]

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, "আল-কুরআন জোরালোভাবে ঘোষণা করেছে, মুসলিমরা বিশ্বাস করে, এবং ঐতিহাসিকরা নিশ্চিত করেছেন যে, মুহাম্মাদ এবং তাঁর অনুসারীরা সেই একই উপাসনা করতেন, যার উপাসনা ইহুদিরা করতো (২৯:৪৬)। এবং কুরআনের আল্লাহ এবং ইব্রাহিমের আল্লাহ এক এবং অভিন্ন"।[৩৬]

ইসলামিক ভাষ্যমতে আল্লাহর প্রধান কয়েকটি নামসম্পাদনা

আল্লাহর নাম (আরবি) অর্থ কুরআনে যেখানে আছে
আল্লাহ আল্লাহ ১:১,৩:১৮, ৫:১০৯, ৬:১২৪, ৭:১৮০, ৮:৪০, ১৬:৯১, ২০:৮, ৫৭:৫, ৬৫:৩, ৭৪:৫৬, ৮৫:২০
আল খবীর যিনি গোপন ও প্রকাশ্য, ঘটিত ও অঘটিত সবকিছু সম্বন্ধে অবহিত আছেন ২:২৩৫, ১৭:৪৪, ২২:৫৯, ৩৫:৪১
আস সালাম ত্রুটিমুক্ত, সম্পূর্ণ, শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত ৫৯:২৩
আল ওয়াদুদ যিনি সীমাহীন ভাবে ভালোবাসেন এবং ভালোবাসা পান ১১:৯০, ৮৫:১৪
আল মুমিন বিশ্বস্ত, ওয়াদা পালনকারী ৫৯:২৩
আল হক্ক সত্য ৬:৬২, ২২:৬, ২৩:১১৬, ২৪:২৫
আল হাই চিরঞ্জীব ২:২৫৫, ৩:২, ২৫:৫৮, ৪০:৬৫
আল গণী যার কোন অভাব নেই ৩:৯৭, ৩৯:৭, ৪৭:৩৮, ৫৭:২৪, ৯:২৮
আল মুগণী যিনি সব ধরনের অভাব দূর করেন ৯:২৮
আস সাবুর ধৈর্য্যধারণকারী
আল গাফুর অসীম ক্ষমাশীল
আল মুইয সম্মান ও মর্যাদা দানকারী
আল দার শাস্তি দানকারী
আর রাহমান অপার করুণাময়
আল কারিম অসীম দাতা
আস সুবহান সর্বত্রুটিমুক্ত বিধায় পরম পবিত্র

খ্রিস্টধর্মসম্পাদনা

আসিরীয় খ্রিস্টানদের ভাষায়, ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার জন্য আরামাইক শব্দ হলো ʼĔlāhā, বা en:Alaha। খ্রিস্টান এবং ইহুদিরা সহ আব্রাহামীয় সকল ধর্মের আরবি-ভাষী লোকই, ঈশ্বরকে বুঝাতে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করে থাকে।[৫] বর্তমান যুগের আরবি-ভাষী খ্রিস্টানদের ব্যবহারের জন্য ঈশ্বরকে ইঙ্গিত করতে আল্লাহ ব্যতীত উপযোগী অন্য কোনো শব্দই নেই।[৩৭] (এমনকি আরবি-বংশোদ্ভূত মাল্টাবাসী, যাদের অধিকাংশই রোমান ক্যাথলিক, ঈশ্বরকে বুঝাতে Alla(আল্লা) শব্দ ব্যবহার করে)। তবে আরব খ্রিস্টানরা অনেক সময়ই তাদের ত্রিত্ববাদ অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা বুঝাতে Allāh al-ʾab (الله الأب) অর্থাৎ, পিতা ঈশ্বর, ঈসা বা জিসাসকে বুঝাতে Allāh al-ibn (الله الابن) অর্থাৎ, পুত্র ঈশ্বর, এবং জিবরাঈল বা গেব্রিলকে বুঝাতেAllāh ar-rūḥ al-quds (الله الروح القدس) অর্থাৎ,পবিত্র আত্মা কথাগুলো ব্যবহার করে। (খ্রিস্টান ধর্ম-বিশ্বাস অনুযায়ী ঈশ্বরের ধারণার বিস্তারিতের জন্য দেখুন খ্রিস্টান ধর্মে ঈশ্বরের ধারণা)।

লেখার সময় আরব খ্রিস্টানদের মধ্যে দুই ধরনের প্রচলন পাওয়া যায়, মুসলিমদের থেকে গৃহীত বিসমিল্লাহ এবং অষ্টম-শতক থেকে নিজেদের ত্রিত্ববাদই ধারণার বিসমিল্লাহ[৩৮]। মুসলিমদের থেকে গৃহীত বিসমিল্লাহর অর্থ করা হয়, আল্লাহর নামে, যিনি পরম দয়ালু এবং অতিশয় মেহেরবান। অপরপক্ষে, ত্রিত্ববাদই বিসমিল্লাহর অর্থ করা হয়, এক ঈশ্বরের নামে যিনি পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা। তবে সিরিয়ান, ল্যাটিন বা গ্রিক প্রার্থনার মধ্যে এক কথাটি যুক্ত করা হয় না। এই এক কথাটি যুক্ত করা হয় ত্রিত্ববাদের এক ঈশ্বর ধারণাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য এবং কিছুটা মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য রূপ দেয়ার জন্য[৩৮]

কারো মতে, ইসলাম-পূর্ব আরব-এ কিছু কিছু আরব খ্রিস্টান সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহর সম্মানে কাবায় যেত, তবে তৎকালীন কাবা ছিলো মূর্তি পূজারীদের প্রার্থনাস্থল।[৩৯]

ইহুদীধর্মসম্পাদনা

যেহেতু আরবি এবং হিব্রু খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত সেমিটিক ভাষা, এটি বহুল প্রচলিত মতামত যে, আল্লাহ(আরবি শব্দমূল: ইলাহ) এবং বাইবেলে বর্ণিত ইলোহিম এর আদিশব্দ একই। ইহুদি ধর্মগ্রন্থে, ইলোহিম শব্দকে ঈশ্বরের (ইহুদি মতানুযায়ী যাকে ইয়াওহে বা জেহোবা বলা হয়) একটি বর্ণনামূলক নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার একই সাথে শব্দটিকে সময়ের বিবর্তনে এক সময়ে পৌত্তলিকদের দেবতাদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যান্য ভাষায় ব্যবহারসম্পাদনা

ইংরেজি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায়সম্পাদনা

ইংরেজি ভাষায় "আল্লাহ" শব্দের ব্যবহার খুব সম্ভবত ১৯ শতকে শুরু হওয়া তুলনামূলক ধর্মালোচনার গবেষণার প্রভাবে যুক্ত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, টমাস কার্লাইল (১৮৪০) কখনও কখনও আল্লাহ শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তা গড থেকে আলাদা কিছু হিসেবে নয়। তবে তিনি তার রচিত (১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত) মুহাম্মাদের জীবনতে সর্বদা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যদিও তার বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, মুহাম্মাদের বর্ণিত আল্লাহ ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বর্ণিত ঈশ্বরের থেকে ভিন্ন।[৪০]

কিছু কিছু ভাষা আছে যেগুলোতে ঈশ্বরকে বুঝাতে আল্লাহ শব্দটিকে ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু কিছু কিছু প্রচলিত কথার মধ্যে তা পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, আন্দালুস-এ সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনামলের কারণে স্প্যানিশ ভাষায় ojalá এবং পর্তুগীজ ভাষায় oxalá শব্দগুলো পাওয়া যায়, যেগুলো মূলতঃ আরবি (إن شاء الله) (ইনশাল্লাহ) কথা থেকে উদ্ভূত। এই কথাটির আক্ষরিক অর্থ যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন (অনেকটাই আশা করি বুঝাতে)। [৪১]

জার্মান কবি সিগফ্রিড মালমান সর্বকর্তৃত্ত্বময় ঐশ্বরিক শক্তিকে নিয়ে লেখা কবিতার শিরোনাম হিসেবে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তিনি কতটুকু "ইসলামিক" আল্লাহকে বুঝাতে চেয়েছেন তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

মুসলিমরা সাধারণত ইংরেজিতে Allah শব্দটিকে সরাসরি ব্যবহার করে থাকেন।[৪২]

আল্লাহ শব্দটি লিখিত বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকাসম্পাদনা

মুদ্রণবিদ্যাসম্পাদনা

 
আল্লাহ শব্দের বিভিন্ন ভাষার প্রতিবর্ণীকরণ

ইউনিকোডসম্পাদনা

ইউনিকোডে আরবি "আল্লাহ" শব্দের জন্য একটি বিশেষ কোড, = U+FDF2, সংরক্ষিত আছে।[৪৩][৪৪] অনেক আরবি ফন্টেও শব্দটিকে একটি অখণ্ড অক্ষর হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে।[৪৫][৪৬]

ইরানের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত আল্লাহ শব্দের ক্যালিগ্রাফিক রূপটি ইউনিকোডে বিভিন্ন প্রতীকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যার কোড U+262B (☫)।

আল্লাহর বৈশিষ্ট্যসমূহসম্পাদনা

ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহর কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:[৪৭][৪৮][৪৯][৫০][৫১]

  • আল্লাহর কোন অংশীদার নেই, কোন সমকক্ষ নেই এবং কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই;
  • তার কোন সন্তান বা স্ত্রী নেই এবং তিনি কারও সন্তান নন;
  • তার উপাসনা অথবা সহায়তা প্রার্থনার জন্যে কাউকে বা কিছুর মধ্যস্থতার প্রয়োজন নাই;
  • তার কাউকে উপাসনার প্রয়োজন হয় না;
  • তিনি সার্বভৌম অর্থাৎ কারো নিকট জবাবদিহি করেন না;
  • তিনি কোন ব্যক্তি বা জিনিসের উপর নির্ভরশীল নন, বরং সকলকিছু তার উপর নির্ভরশীল;
  • তিনি কারো সহায়তা ছাড়াই সবকিছু সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন;
  • কিছুই তার উপরে বা সঙ্গে তুলনীয় নয়;
  • বিদ্যমান কিছুই নেই যা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর পরাধীন নয়;
  • কেউ প্রতিরোধ করতে পারেন না, যা আল্লাহ প্রদান করে, আর কেউ প্রদান করতে পারেনা যা তিনি প্রতিরোধ করে;
  • শুধুমাত্র আল্লাহই কারো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে, এই ক্ষমতা অন্য কেউ রাখে না;
  • তার কোনও অভাব নেই, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন;
  • নিদ্রা, তন্দ্রা ও ক্লান্তি আল্লাহকে স্পর্শ করে না;
  • তার অনুরূপ কেউ নেই

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "God"Islam: Empire of Faith। PBS। ২৭ মার্চ ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ মে ২০২১ 
  2. Gardet, L. (২০১২-০৪-২৪)। "Allāh"Encyclopaedia of Islam, Second Edition (ইংরেজি ভাষায়)। 
  3. Leaman, Oliver (২০০৬)। The Qur'an: An Encyclopedia (ইংরেজি ভাষায়)। Taylor & Francis। আইএসবিএন 978-0-415-32639-1 
  4. আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিশ্বকোষ, আল্লাহ
  5. কলম্বিয়া এনসাইক্লোপিডিয়া, আল্লাহ
  6. "Sikhs target of 'Allah' attack"NZ Herald (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৫-০২ 
  7. "Malaysia court rules non-Muslims can't use 'Allah'"NZ Herald (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৫-০২ 
  8. "Malaysia's Islamic authorities seize Bibles as Allah row deepens"। ১৬ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ মে ২০২১ 
  9. "The 'Allah'/Bible issue, 10-point solution is key to managing the polarity"www.thestar.com.my। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৫-০২ 
  10. সাঈদ আবদুল্লাহ্ , The Qur'an: An Introduction, pg. 63. London: Routledge, 2008. আইএসবিএন ৯৭৮১১৩৪১০২৯৪৫
  11. ইবনে্, তামিয়াহ (২০০৩)। The Goodly Word: al-Kalim al-Ṭayyib। Islamic Texts Society। পৃষ্ঠা 72আইএসবিএন 1-903682-15-0 
  12. সহীহ মুসলিম, ৩৫:৬৪৭৫ (ইংরেজি)
  13. ইবনে মাজাহ, Book of Duʿa; মালিক ইবনে আনাস, মুয়াত্তা ইমাম মালিক.
  14. MacDonald, D. B. (২০১২-০৪-২৪)। "Ilāh"Encyclopaedia of Islam, Second Edition (ইংরেজি ভাষায়)। ডিওআই:10.1163/1573-3912_islam_sim_3526 
  15. Encyclopaedia of the Qur'an̄ : EQ। Jane Dammen McAuliffe। Leiden: Brill। ২০০৬। আইএসবিএন 90-04-13668-1ওসিএলসি 1158420266 
  16. Columbia Encyclopaedia says: Derived from an old Semitic root referring to the Divine and used in the Canaanite "El", the Mesopotamian "ilu", and the biblical "Elohim" and "Eloah", the word Allah is used by all Arabic-speaking Muslims, Christians, Jews, and other monotheists.
  17. "The Comprehensive Aramaic Lexicon – Entry for ʼlh"। ১৩ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ মে ২০২১ 
  18. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  19. "How Do You Pronounce Allah Correctly?"Arabic For Nerds (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৫-০৪ 
  20. See Qur'an ১৩:১৬ ; ২৯:৬১–৬৩; ৩১:২৫; ৩৯:৩৮)
  21. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; EoI নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  22. See Qur'an ৩৭:১৫৮)
  23. See Qur'an (৬:১০০)
  24. See Qur'an (৫৩:১৯–২২ ; ১৬:৫৭ ; ৩৭:১৪৯)
  25. See Qur'an (৫৩:২৬–২৭)
  26. Gerhard Böwering, God and his Attributes, Encyclopedia of the Qur'an
  27. See Qur'an ৬:১০৯; ১০:২২; ১৬:৩৮; ২৯:৬৫)
  28. Böwering, Gerhard, God and His Attributes, Encyclopaedia of the Qurʼān, Brill, 2007.
  29. Britannica Concise Encyclopedia, Allah
  30. Bentley, David (১৯৯৯)। The 99 Beautiful Names for God for All the People of the Book। William Carey Library। আইএসবিএন 978-0-87808-299-5  অজানা প্যারামিটার |month= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  31. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Tao-Islam নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  32. Gary S. Gregg, The Middle East: A Cultural Psychology, Oxford University Press, p.30
  33. Carolyn Fluehr-Lobban, Islamic Society in Practice, University Press of Florida, p.24
  34. M. Mukarram Ahmed, Muzaffar Husain Syed, Encyclopaedia of Islam,Anmol Publications PVT. LTD, p.144
  35. Carl W. Ernst, Bruce B. Lawrence, Sufi Martyrs of Love: The Chishti Order in South Asia and Beyond, Macmillan, p.29
  36. F.E. Peters, Islam, p.4, Princeton University Press, 2003
  37. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Cambridge নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  38. Thomas E. Burman, Religious Polemic and the Intellectual History of the Mozarabs, Brill, 1994, p.103
  39. Marshall G. S. Hodgson, The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization, University of Chicago Press, p.156
  40. William Montgomery Watt, Islam and Christianity today: A Contribution to Dialogue, Routledge, 1983, p.45
  41. Islam in Luce López Baralt, Spanish Literature: From the Middle Ages to the Present, Brill, 1992, p.25
  42. F. E. Peters, The Monotheists: Jews, Christians, and Muslims in Conflict and Competition, Princeton University Press, p.12
  43. "FAQ - Middle East Scripts"www.unicode.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৩-৩১ 
  44. "Unicode Standard 5.0" (PDF)। ২৮ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩০ মার্চ ২০২১ 
  45. Arabic fonts and Mac OS X ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১০ মার্চ ২০০৮ তারিখে
  46. Programs for Arabic in Mac OS X ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৬ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে
  47. Hossein Nasr The Heart of Islam, Enduring Values for Humanity (April., 2003), pp 3, 39, 85, 27–272
  48. "The Noble Qur'an - القرآن الكريم"quran.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-০৯-২৫ 
  49. "My Mercy Prevails Over My Wrath"www.onislam.net। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-১০-০৪ 
  50. "Surah Yunus - The Noble Qur'an - القرآن الكريم"quran.com 
  51. "The Ninety Nine Attributes of Allah"al-islam.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৫-৩১ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

Typography