আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম

চট্টগ্রাম জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, বা হাটহাজারী মাদ্রাসা বাংলাদেশের একটি কওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; যা বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বপ্রাচীন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ সালে (হিজরী ১৩১০ সনে)।[৪][৫] এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠ্যসূচী দ্বারা শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম শিক্ষার অন্যতম একটি অরাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এটি বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহের উম্মুল মাদারিস তথা মাদ্রাসা সমূহের মা হিসেবে পরিচিত।[৬]

আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম
ধরনইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপিত১৮৯৬ (1896) (১৩১০ হিজরী)
আচার্যমজলিশ-ই-শুরা
শিক্ষায়তনিক ব্যক্তিবর্গ
৮০০ (২০১২)[১]
শিক্ষার্থী৫০,০০০ (২০১২)[২]
স্নাতক১৬,৫০০ (২০১২)>[৩]
স্নাতকোত্তর১১,৯০০(২০১২)
অবস্থান
২২°৩০′১৬″ উত্তর ৯১°৪৮′২৮″ পূর্ব / ২২.৫০৪৫৮২° উত্তর ৯১.৮০৭৬৭৫° পূর্ব / 22.504582; 91.807675
শিক্ষাঙ্গনশহর (৪.২৪ একর)
ওয়েবসাইটwww.darululoom-hathazari.com
হাটহাজারী মাদ্রাসার লোগো.jpeg
হাটহাজারী মাদ্রাসা

২০০৯ সালের এশীয় গবেষণার জাতীয় ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী:[৭] "তার অসাধারণ দেওবন্দী প্রশংসাপত্র দিয়ে, অ্যাকাডেমিক মানদণ্ড ও খ্যাতির ক্ষেত্রে উপমহাদেশের শীর্ষ দশটি মাদ্রাসার মধ্যে হাটহাজারী মাদ্রাসা স্থান পায়।

ইতিহাসসম্পাদনা

ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা ১৮৯৬ সালে একটি অস্থায়ী ঠিকানায় প্রতিষ্ঠালাভ করে। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বর্তমান ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়।[৮] এই প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চল তথা সমগ্র বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষাবিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায়।[৯] শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজদের অাগ্রাসনের ফলে এ অঞ্চলের তৎকালীন সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থা ইসলামী চিন্তাচেতনা ও মুসলিম আকিদা'র পরিপন্থি ছিল। মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সামাজিক জীবনে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শিরক-বিদআত এবং মুসলিম সমাজকে বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে, ১৮৬৬ সালে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়।[১০]

এই একই লক্ষ্যে, তার চিন্তা-চেতনা ও মূলনীতির অনুসরণে বন্দর নগরীর কিছু বিখ্যাত উলামা বিদেশী সংস্কৃতি এবং শিরক-বিদআত এর কবল থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষার উদ্দেশ্যে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী মাদরাসা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তটি কার্যকরের জন্য হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর আদেশানুসারে তার প্রিয় অনুসারী ও ছাত্র হাবিবুল্লাহ কুরাইশি রহ. এবং তার সাথে মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালী, সুফি আজিজুর রহমান এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ রহ. এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।[১১] জমিরুদ্দিন আহমদ দীর্ঘ ৩৫ বছর মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

শাইখুল ইসলাম মাওলানা হাবিবুল্লাহ রহ. কর্তৃক ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী মাদরাসা সুদীর্ঘ সোনালীপথ অতিক্রম করে এসেছে। শাহ আবদুল ওয়াহহাব ২য় মহাপরিচালক ছিলেন। মুসলিম উম্মাহের স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছে। হাটহাজারী মাদরাসা–কে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে বহু মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।[৫]

শিক্ষাসেবা ও জাতীয়-সামাজিক পর্যায়ে অবদানের ফলে হাটহাজারী মাদ্রাসা “বিতর্কহীন ভাবে এই দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত মাদ্রাসায়” পরিণত হয়েছে।"[৮]

সংগঠন ও ব্যবস্থাপনাসম্পাদনা

মাদ্রাসাটি বাংলাদেশের প্রধান তিনটি বৃহত্তম মাদ্রাসার মধ্যে অন্যতম। অন্য দুইটি মাদ্রাসা হল পটিয়ার আল-জামিয়াতুল ইসলামীয়া পটিয়া এবং জামিয়া আরবিয়া জীরি। এর সব কয়টি মাদ্রাসা বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অবস্থিত। এই তিনটি মাদ্রাসা একযোগে বাংলাদেশের ৭,০০০ এর অধিক ছোট ইসলামিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।[১২] এই তিনটি বৃহৎ মাদ্রাসা প্রায় একই পরিচালনা পর্ষদের অধীনে।[৯]

প্রকাশনাসম্পাদনা

আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী মাদরাসার প্রকাশনা বিভাগ নিম্নের পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে থাকে:

  • মাসিক মুঈনুল ইসলাম: একটি মাসিক ইসলামি পত্রিকা। এটি মাদ্রাসার মুখপত্র। শাহ আবদুল ওয়াহহাব স্বীয় তত্ত্বাবধানে সাহিত্যিক আলেম আবুল ফারাহ’র সম্পাদনায় ইসলাম প্রচার নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন ১৯৩৪ সাল থেকে। এটিই ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম মাসিক ইসলামি পত্রিকা। পরবর্তীতে এটি মাসিক মুঈনুল ইসলাম নামে ১৯৫২ সাল থেকে আরও পূর্ণাঙ্গ অবয়বে প্রকাশনা শুরু করে।[১৩] চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর বর্তমানে পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন জুনায়েদ বাবুনগরী। ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ক এ পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন মুফতি জসিম উদ্দিন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও রশীদ জামিলসহ খ্যাতিমান অনেক লেখক।[১৪] পত্রিকাটিতে ইসলামের নামে প্রচলিত নানারকম কুসংস্কার নিয়ে নিয়মিত লেখা থাকে।[১৫] ২০১৪ সালে শাহ আহমদ শফী পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণ উদ্ভোদন করেন।[১৬] পত্রিকায় প্রকাশিত ৩০ বছরের প্রশ্নোত্তর নিয়ে ২০২০ প্রকাশিত হয়েছে ফতোয়ায়ে মুঈনুল ইসলাম নামক একটি গ্রন্থ। এছাড়া হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফীকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।[১৭][১৮]
  • বার্ষিক আল মুঈন

প্রাক্তন বিশিষ্ট শিক্ষার্থীসম্পাদনা

আরো দেখুনসম্পাদনা

চিত্রশালাসম্পাদনা

তথ্য উৎসসম্পাদনা

  1. "আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী"। Darululum-hathazari.com। ২০১৩-০৮-১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০৮-১৬ 
  2. "1500 sued for Hathazari thana attack"Bangladesh News। ১৪ এপ্রিল ২০০৮। ৬ মার্চ ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ জুন ২০১২ 
  3. "পরিচিতি"darululum-hathazari.com। ২০০৯-১১-২২। ২০১২-০৩-১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ জুন ২০১২ 
  4. Kabir, Humayun 'Replicating the Deobandi model of Islamic schooling: the case of a Quomi madrasa in a district town of Bangladesh', Contemporary South Asia, 17:4, 415 - 428.
  5. Singh (editor-in-chief), Nagendra Kr. (২০০৩)। Encyclopaedia of Bangladesh (1st সংস্করণ)। New Delhi, India: Anmol Publications। পৃষ্ঠা 259। আইএসবিএন 8126113901 [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  6. "মাদ্রাসা - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-৩০ 
  7. http://www.nbr.org/publications/specialreport/pdf/Preview/PR09_IslamEd.pdf
  8. Ahmad, Mumtaz and Matthew J. Nelson. "Islamic Education in Bangladesh and Pakistan: Trends in Tertiary Institutions." (Preview) NBR Project Report. April 2009. (alternate non-preview version)
  9. Riaz, Ali (২০০৮)। Faithful education : madrassahs in South Asia। New Brunswick, N.J.: Rutgers University Press। পৃষ্ঠা 149। আইএসবিএন 0813543452 
  10. "Madrasa Deoband - by Moulana Yunus Osman"। Beautifulislam.net। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০৮-১৬ 
  11. "আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী"। Darululum-hathazari.com। ২০১৩-০৮-২৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০৮-১৬ 
  12. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ৩১ মার্চ ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ 
  13. হাফেজ আহমদুল্লাহ, মুফতি; রিদওয়ানুল কাদির, মুফতি (ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। (কুতুবুল আলম হাকীমুন নফস, খলীফায়ে থানভী আল্লামা শাহ আবদুল ওয়াহহাব রহ. (১৮৯৪—১৯৮২) - এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত)মাশায়েখে চাটগাম — ২য় খণ্ড (১ম সংস্করণ)। ১১/১, ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০: আহমদ প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৪২। আইএসবিএন 978-984-92106-4-1 
  14. আবুল কালাম সিদ্দীক, কাজী (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। "বাংলা চর্চায় এগিয়ে যাচ্ছেন কওমি আলেমরা"বাংলানিউজ২৪.কম। সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০২১ 
  15. শাকিল, সালমান তারেক (১৮ ডিসেম্বর ২০১৫)। "বিজয়ের মাসে কওমি পত্রিকায় উপেক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা"বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০২ 
  16. "হাটহাজারী মাদ্রাসা ও মাসিক পত্রিকার ওয়েবসাইট উদ্বোধন"প্রথম আলো। ১৯ জানুয়ারি ২০১৪। [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  17. খালিদ হোসেন, আ ফ ম (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। "ভাষা চর্চায় এগিয়ে যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসা"দৈনিক সময়ের আলো। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০২১ 
  18. শাকিল, সালমান তারেক (১৯ ডিসেম্বর ২০১৯)। "বিজয়ের মাসে ইসলামি পত্রিকাগুলো যেমন"বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০২১ 

টীকাসম্পাদনা

গ্রন্থপঞ্জিসম্পাদনা