প্রধান মেনু খুলুন

হুমায়ুন আজাদ

বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক

হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ - ১১ আগস্ট ২০০৪) বা (১৪ বৈশাখ ১৩৫৪ - ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন একজন বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার।[১] তিনি বাংলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক যিনি ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান- ও সংস্কারবিরোধিতা, নিরাবরণ যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য ১৯৮০-র দশক থেকে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গতানুগতিক চিন্তাধারা তিনি সচেতনভাবে পরিহার করতেন। তার নারী (১৯৯২), দ্বিতীয় লিঙ্গ (২০০১) এবং পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪) গ্রন্থ তিনটি বিতর্কের ঝড় তোলে এবং নারী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।[১]

হুমায়ুন আজাদ
হুমায়ুন আজাদের আলোকচিত্র
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ
জন্মহুমায়ুন কবীর
(১৯৪৭-০৪-২৮)২৮ এপ্রিল ১৯৪৭
রাঢ়িখাল গ্রাম, বিক্রমপুর (এখন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলাতে)
মৃত্যু১১ আগস্ট ২০০৪(2004-08-11) (বয়স ৫৭)
মিউনিখ, জার্মানি
সমাধিস্থলরাঢ়িখাল
ছদ্মনামহুমায়ুন আজাদ
পেশাঅধ্যাপক, কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী
ভাষাবাঙলা, ইংরেজি
জাতীয়তাবাংলাদেশী
নাগরিকত্ববাংলাদেশী
শিক্ষাপিএইচডি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
সময়কালআধুনিক
ধরনউদারনীতিবাদ
বিষয়নারীবাদ, সাহিত্য, বিজ্ঞান
সাহিত্য আন্দোলনপ্রথাবিরোধিতা
উল্লেখযোগ্য রচনাবলিনিচে দেখুন
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারএকুশে পদক (২০১২), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৬), আরো..
সক্রিয় বছর১৯৭৩, ১৯৮০–২০০৪
দাম্পত্যসঙ্গীলতিফা কোহিনূর (বি. ১৯৭৫; মৃত্যুপূর্ব ২০০৪)
সন্তান
  • মৌলি আজাদ
  • স্মিতা আজাদ
  • অনন্য আজাদ

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ছিলেন একজন প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক মননশীল লেখক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬০টির বেশি। আজাদের ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি উপন্যাস, ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৮টি কিশোরসাহিত্য, ৭টি ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ তার জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালে নারীবাদী গবেষণামূলক গ্রন্থ নারী প্রকাশ করে গোটা দেশে সাড়া তোলেন। বইটি ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলো। এ গ্রন্থ তার বহুল আলোচিত গবেষণামূলক কাজ হিসেবেও স্বীকৃত। তাকে ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম এবং ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। তার রচিত কিশোরসাহিত্য ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত আব্বুকে মনে পড়ে জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে ২০০৩ সালে।

হুমায়ুন আজাদ অকুতোভয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক শাসনের/একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতা, নারীবাদী বক্তব্য এবং একই সঙ্গে নিঃসংকোচ যৌনবাদিতার জন্যে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অভীষ্ট তার সাহিত্যকে প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল। লেখার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তীব্র আক্রমণের কারণে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি হত্যা প্রচেষ্টার শিকার হন

প্রারম্ভিক জীবন

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

আজাদ ১৯৪৭ সালে বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে জন্ম নেন যেটি এখন মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার অন্তর্গত,[২][৩] তার জন্ম নাম ছিলো হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্যম তিনি বর্তমান নাম ধারণ করেন।[১] বাবা আবদুর রাশেদ প্রথম জীবনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পোস্টমাস্টারির চাকুরি করতেন, পরে ব্যবসায়ী হন।[৪] মা জোবেদা খাতুন একজন গৃহিণী ছিলেন। তিন ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে আজাদ ছিলেন পিতামাতার প্রথম পুত্রসন্তান।[৫] ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তার পিতৃবিয়োগ ঘটে।[৬] তিনি ছেলেবেলায় প্রায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত রাড়িখাল গ্রামে বেড়ে ওঠেন।[২]

শিক্ষা জীবন

চিত্র:বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ (১৯৬৭).jpg
১৯৬৭ সালে টাঙ্গাইলের জমিদার বাড়িতে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ (পেছনে মাঝে)

১৯৫২ সালে হুমায়ুন 'রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে' প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হন, ওখানে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন, এরপর ১৯৫৫ সালে তৃতীয় শ্রেণী বাদ দিয়ে তিনি সরাসরি চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন রাড়িখালের 'স্যার জে সি বোস ইন্সটিটিউশন'-এ, যেটাতে তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছিলো। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। এ বিদ্যালয় থেকে তৎকালীন 'ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড' এর অধীনে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (ম্যাট্রিক বা মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।[৭] এরপর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন।[৮] ২০১৬ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধু স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বলেন যে, তার এই বন্ধুটি লেখাপড়ায় খুবই মনোযোগী ছিলো এবং সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বই পড়ে অনেক সময় ব্যয় করতো।[৯]

১৯৭৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণ[১০] এই গবেষণাপত্র পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালে প্রোনমিনালাইজেশান ইন বেঙ্গলি নামে বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

কর্মজীবন

অধ্যাপনা

 
ষাটের দশকের শেষের দিকে হুমায়ুন (মাঝখানে চশমা পরিহিত)

হুমায়ুন আজাদ পেশায় শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তার কর্মজীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিশেবে।[১১] এখানে কিছুকাল কর্মরত থাকার পর ১৯৭০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।[১২] একই বছর ১৯৭২ সালের শেষ দিকে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন।[১৩] পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন এবং পরবর্তী কালে কয়েক বছর বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।[১৪] ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।[১]

ভাষাবিজ্ঞান গবেষণা

১৯৬০-এর দশকে হুমায়ুন আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র তখন পশ্চিমের ভাষাবিজ্ঞানী চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত 'সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ' (transformational-generative grammar (TGG)) তত্ত্বটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য হুমায়ুন আজাদ এই তত্ত্বের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার রূপমূলতত্ত্ব তথা বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল 'Pronominalization in Bengali' (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে এটি একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি দালীলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যাতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা সংকলিত হয়। এই তিনটি গ্রন্থ বাংলা ভাষাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হয়। তিনি পরবর্তী কালে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দু'টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত অকাল মৃত্যুর কারণে তার এই আগ্রহ বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

সাহিত্যিক জীবন

হুমায়ুন আজাদ নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ই কবিতাচর্চা শুরু করেন। তবে তার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাকের শিশুপাতা কচিকাঁচার আসরে

কবিতা

গদ্যের জন্য বেশি জনপ্রিয় হলেও হুমায়ুন আজাদ আমৃত্যু কাব্যচর্চা করে গেছেন। তিনি ষাটের দশকের কবিদের সমপর্যায়ী আধুনিক কবি। সমসাময়িক কালের পরিব্যাপ্ত হতাশা, দ্রোহ, ঘৃণা, বিবমিষা, প্রেম ইত্যাদি তার কবিসত্বার প্রধান নিয়ামক। প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম অলৌকিক ইস্টিমার যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ এর জানুয়ারিতে (পৌষ, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দ)। কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন ১৯৬৮-১৯৭২ এর রাত-দিনগুলোর উদ্দেশে। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ জ্বলো চিতাবাঘ প্রথম প্রকাশিত হয় ফাল্গুন, ১৩৮৬ বঙ্গাব্দে (মার্চ ১৯৮০)। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশের সময় বৈশাখ ১৩৯২ বঙ্গাব্দ (এপ্রিল, ১৯৮৫)।[১৫] ১৩৯৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (মার্চ ১৯৮৭) প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল। তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে প্রকাশিত হয় ১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি ১৯৯০)। এর আট বছর পর ১৪০৪ এর ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮) প্রকাশিত হয় তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু। কাব্যগ্রন্থটি কবি তার 'প্রিয় মৃতদের জন্য' উৎসর্গ করেন। সপ্তম কাব্যগ্রন্থ পেরোনোর কিছু নেই প্রকাশিত হয় ১৪১০ বঙ্গাব্দের মাঘ(ফেব্রুয়ারি, ২০০৪) মাসে। এটিই হুমায়ুন আজাদের জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ। তবে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর বঙ্গাব্দ ১৪১১ এর ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি,২০০৫) এই সাতটি কাব্যগ্রন্থ সহ আরো কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে তার কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হয়। নব্বুইয়ের দশক থেকে ঢাকার আগামী প্রকাশনী তার গ্রন্থাবলীর প্রধান প্রকাশক।

কথাসাহিত্য

মূলত গবেষক ও প্রাবন্ধিক হলেও হুমায়ূন আজাদ ১৯৯০-এর দশকে একজন প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু অবধি তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১২টি । তার ভাষা দৃঢ়, কাহিনীর গঠন সংহতিপূর্ণ এবং রাজনৈতিক দর্শন স্বতঃস্ফূর্ত।

১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন প্রথম উপন্যাস ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল-এর মধ্যে দিয়ে। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় সব কিছু ভেঙে পড়ে। আর এই বইয়ের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ১০,০০০, এবং আরো ১টি ধর্ষণ, ২০০৪ সালে পাক সার জমিন সাদ বাদ এবং একটি খুনের স্বপ্ন উপন্যাসসমূহ স্পষ্টতই বক্তব্যমুখী। রাজনৈতিক প্রণোদনাই এ সব রচনার প্রধান নিয়ামক। ভাষা-ভঙ্গী ও কাহিনী - দু'দিক দিয়েই তার মধ্যে আক্রমণাত্মকতা প্রত্যক্ষ করা যায়।

প্রবন্ধ

 
নারী (১৯৯২)

১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধের বই নারী। আর এই বইয়ের প্রকাশের পর তিনি মৌলবাদীদের তীব্র রোষানলে পড়েন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] মৌলবাদীদের চেষ্টার ফলে[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ১৯৯৫ সালে নারী বইটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ সরকার। অবশ্য ৪ বছর পর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বইটি আবার পুনর্মূদ্রিত হয়। তার আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম গ্রন্থে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের দূরবস্থার সাহসী বর্ণনা আছে।

ব্যক্তিগত জীবন

হুমায়ুন আজাদ ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠিনী লতিফা কোহিনুরকে বিয়ে করেন। তার দুই কন্যা মৌলি আজাদ, স্মিতা আজাদ এবং এক পুত্র অনন্য আজাদ।

রাজনৈতিক সমালোচনা

১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। এ সময় তিনি 'খবরের কাগজ' নামীয় সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখালিখির সূত্রপাত। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম গ্রন্থটি প্রধানত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক সমালোচনা। ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যভিচারের প্রামাণিক দলিল এই গ্রন্থটি।

বিশ্বাস ও দর্শন

হুমায়ুন আজাদ ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক[১৬] তার অন্যতম প্রণোদনা ছিল প্রথা-বিরোধিতা। কবিতা, উপন্যাস ও রচনা সর্বত্রই তিনি প্রথাবিরোধী ও সমালোচনামুখর। সর্বপ্রথম গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের আদলে ১৯৯১ প্রকাশিত প্রবচনগুচ্ছ এদেশের শিক্ষিত পাঠক সমাজকে আলোড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদের লেখালেখিতে বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ স্পষ্ট। তবে তিনি নিজেই ছিলেন তার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের প্রধান মুখপাত্র। একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তার স্বপ্ন ছিল। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকেই তিনি মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করতেন।[১৭]

হত্যা প্রচেষ্টা

বাংলাদেশে যখন মৌলবাদ বিস্তার লাভ করতে থাকে, বিশেষ করে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত, তখন ২০০৪-এ প্রকাশিত হয় হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠি তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়, এবং বিভিন্ন স্থানে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে প্রচারনা চালায়। তিনি এই বইটিতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন। আর তারই জের ধরে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন তিনি। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (বা সংক্ষেপে জেএমবি) নামক ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তিতে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে।[১৮] এই হত্যা প্রচেষ্টার মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য উচ্চ আদালত ফেব্রুয়ারি ২০১৪তে আদেশ প্রদান করে।

সমালোচনা

২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪)[১৯] বইটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন এবং এ ধরনের লেখকদের লেখা বন্ধ করতে 'ব্ল্যাসফেমি আইন' প্রণয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।[২০] এই বইটিতে হুমায়ুন আজাদ তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠী স্বরূপ চিত্রিত করেন।

গ্রন্থতালিকা

পুরস্কার এবং সম্মাননা

মৃত্যু

২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের উপর কাজ করার জন্য জার্মান সরকারের নিকট একটি বৃত্তির আবেদন করেছিলেন। ২০০৪-এর ৭ আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান।[২১]

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট রাতে একটি পার্টি থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবাসস্থলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার এপার্টমেন্টে পাওয়া সব জিনিসপত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিসপত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা তিনটি চিঠি। চিঠি তিনটি আলাদা তিনটি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে এবং একমাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষরগুলোই ছিল তার জীবনের শেষ লেখা।[২২] তার মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযার নামাজ শেষে তার মরদেহ জন্মস্থান রাড়িখালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয় এবং পরে তার কবর সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে একটি বইয়ের মত করে বানানো হয়।[২৩]

পাদটিকা

  1. মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। "আজাদ, হুমায়ুন"বাংলাপিডিয়া। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুন ২৩, ২০১৪ 
  2. মৌলি আজাদ (ফেব্রুয়ারি ২০১১)। "বাবার বেড়ে ওঠা"। আমার বাবাঢাকা: আগামী প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ১১। আইএসবিএন 978-984-04-1380-5 
  3. এই বাঙলার সক্রেটিস, জামাল উদ্দিন ও শরীফা বুলবুল সম্পাদিত, বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম, ২০০৪, পৃ. ৮ ও ৯
  4. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৩৬
  5. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৯ ও ১০
  6. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ১০
  7. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ২৩
  8. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৪২
  9. Tulu Matin (Humayun Azad's friend) (১২ আগস্ট ২০১৬)। "Humayun Azad and me in the university life."swapno71.com। ১৫ আগস্ট ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৬ নভেম্বর ২০১৭ 
  10. "হুমায়ুন আজাদ"। lekhok.net। ২৪ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৫ 
  11. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৪৪
  12. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৪৫
  13. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৪৮
  14. এই বাঙলার সক্রেটিস, পৃ. ৫০
  15. এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলাভাষার সমসাময়িক দুই জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ) এবং ইমদাদুল হক মিলনকে উৎসর্গিত। প্রত্যুত্তরে ইমদাদুল হক মিলন তার বনমানুষ নামীয় একটি উপন্যাস হুমায়ুন আজাদকে উৎসর্গ করেন।
  16. "প্রথাবিরোধী যোদ্ধা হুমায়ুন আজাদ"ntvbd.com। ২৮ এপ্রিল ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০১৭ 
  17. "হুমায়ুন আজাদ"। gunijan.org.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৭ 
  18. "জেএমবি নেতার স্বীকারোক্তি"বিবিসি। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৬ 
  19. (পাক সার জমিন সাদ বাদ পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম চরণ)
  20. "হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে সংসদে সাঈদীর বক্তব্য জানতে চেয়ে চিঠি"। icsforum.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৭ 
  21. "হুমায়ুন আজাদ"। samakal.com.bd। ৬ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৭ 
  22. "হুমায়ুন আজাদক"। thedailysangbad.com। ৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-০৭ 
  23. "বাবার স্বপ্ন ছিল সেক্যুলার বাংলাদেশ : মৌলি আজাদ"ntvbd.com। ১২ আগস্ট ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২ নভেম্বর ২০১৭ 

বহিঃসংযোগ