বিরিয়ানি

এক বিশেষ প্রকারের খাবার যা সুগন্ধি চাল, ঘি, গরম মশলা এবং মাংস মিশিয়ে রান্না করা হয়

বিরিয়ানি বা বিরানি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে প্রচলিত এক বিশেষ প্রকারের খাবার যা সুগন্ধি চাল, ঘি, গরম মশলা এবং মাংস মিশিয়ে রান্না করা হয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করে।[১][২][৩] এটি সাধারনত বিশেষ অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশিত হয়।

বিরিয়ানি
Biriyani1.jpg
বিরিয়ানি
প্রকারমূল খাবার
উৎপত্তিস্থলদক্ষিণ এশিয়া
অঞ্চল বা রাজ্যআফগানিস্তান, বাহরাইন, বাংলাদেশ, ব্রুনেই, মায়ানমার, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুর্দিস্তান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুরশ্রীলংকা
প্রধান উপকরণচাল, মসলা, সবজি (মুলত আলু), মাংস অথবা ডিম), দই, সাথে আরও ঐচ্ছিক উপাদান (যেমনঃ শুকনো ফল)
ভিন্নতাঅনেক
রন্ধনপ্রণালী: বিরিয়ানি  মিডিয়া: বিরিয়ানি
বার্মিজ বিরিয়ানি
Biryani of Lahore

নামকরণসম্পাদনা

বিরিয়ানি (بریانی) একটি উর্দু শব্দ, যা ফারসি ভাষা থেকে এসেছে।[৪][৫] ফারসি ভাষায় বিরিঞ্জ (ফার্সি: برنج‎‎) অর্থ চাল বা ভাত।[৬][৭] অন্যমতে, ফারসি শব্দ বিরিয়ান (ফার্সি: بریان‎‎) থেকে এসেছে যারঅর্থ রোস্ট বা ভেজে নেওয়া।[৮][৯] অর্থাৎ মূলত রোস্ট করা মাংস ও ভাতের সহযোগে তৈরি বিশেষ সুুস্বাদু খাবারই বিরিয়ানি। এটি বিরানি, বেরিয়ানি, বিরিয়ান্নি ইত্যাদি নামেও পরিচিত। বিরিয়ানি রান্নার আগে সুগন্ধি চাল ঘি দিয়ে ভেজে নেওয়া হয়। তাই এই নামকরণ। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে “বিরন করা” শব্দটি ব্যবহৃত হয় সেটা এই ফারসি শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ।

উৎপত্তিসম্পাদনা

উত্তর ভারতে, দিল্লির (মুঘলাই রন্ধনপ্রণালী) মুসলিম বসতিপূর্ণ স্থানগুলিতে বিরিয়ানি বিভিন্ন বৈচিত্র্যের উৎপত্তি লক্ষ করা যায়।[৪]

বিরিয়ানি ও পোলাও-এর মধ্যে পার্থক্যসম্পাদনা

পোলাও ও বিরিয়ানি দুটো খাবারই সুগন্ধি চাল ও গোশত দিয়ে রান্না করা হয়। তারপরও এদের মাঝে বেশ কিছুটা পার্থক্য আছে।[১০] পোলাওতে গোশত দেওয়া বা না দেওয়া ঐচ্ছিক। তবে পোলাও এর উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায়। সেখানে পোলাও গোস্তের সাথেই রান্না করা হয়। এমনকি বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে অনেকটা এভাবেই পোলাও রান্না করা হয়। মুঘলরা মধ্য এশিয়া থেকে আসার সময়ে পোলাও এর সংস্কৃতি মাতৃভূমি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। পোলাও বিরিয়ানির মূল পার্থক্য যতটা না রান্নার প্রণালীতে তার চেয়েও অনেক বেশি মশলার ব্যবহারে। বিরিয়ানির মশলায় উপাদানের বৈচিত্র্য অনেক বেশি, মশলাও ব্যবহার করা হয় তুলনামূলক বেশি পরিমাণে। ফলে বিরিয়ানির মশলার ঝাঁঝ পোলাও এর চেয়ে অনেক বেশি কড়া হয়।[১১]

মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান বা তুর্কমেনিস্তান এ হালের পোলাও এবং বিরিয়ানির আদিরূপের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে এত বেশি মশলার ব্যবহার হয় তাতে সমরখন্দ বা বুখারার সেই আদি পোলাও বেশ পানসে ও জৌলুসহীন মনে হয়। পোলাও এবং বিরিয়ানির আরেকটি বড় পার্থক্য আছে তাদের মৌলিক রন্ধন প্রণালীতে। পোলাও রান্নার আগে চাল ধুয়ে কিছুক্ষণ রেখে দেয়া হয় ও পরে পানিতে ফুটিয়ে সেদ্ধ করা হয়। কিন্তু বিরিয়ানিতে চালের সুঘ্রাণ অবিকৃত রাখতে চাল বেশি ধোয়া কিংবা ফোটানো হয়না। বরঞ্চ আগে থেকে ফুটিয়ে গরম পানি যোগ করা হয়।

তেহারী ও বিরিয়ানির মধ্যে পার্থক্যসম্পাদনা

তেহারীকে বিরিয়ানির একটি বিশেষ পরিমার্জিত ধরন বলা চলে। তেহারীতে গোশতের পরিমাণ থাকে কম। আলু ও হাড় থাকে বেশি। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চড়া দামের কারণে খরচ বাঁচাতে এই বৈচিত্র্য আনা হয়েছিল। তবে প্রেক্ষাপট বদলে গেলেও এখনও আবেদন বদলে যায়নি তেহারীর।

প্রকারভেদসম্পাদনা

প্রথাগতভ‍াবে বিরিয়ানিকে দুই শ্রেণীতে ভ‍াগ করা যায়।

  • পাক্কি- রান্না করা মাংস অর্ধেক রান্না করা চালের সঙ্গে মিশিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা।
  • কাচ্চি- এ পদ্ধতিতে খাসির/গরুর(রেড মিট) মাংস টকদই ও মসলা দিয়ে মেরিনেট করে কাচা মাংস হাফ বয়েল চালের সঙ্গে দমে একইসাথে রান্না করা হয়।

তবে কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করতে অনেক বেশি সময় নেয়। মাংস নরম করতে মেরিনেট করার সময় কাঁচা পেঁপে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রস্তুতপ্রণালীসম্পাদনা

বিরিয়ানির চাল কখনও কখনও সেদ্ধ করা হয় না। বিরিয়ানির চাল সবসময়েই লম্বা বা চিকন প্রকারের যেমনঃ তুলশীমালা, বাসমতী বা কালিজিরা চাল বা চিনিগুড়া ব্যবহার করা হয়। বিরিয়ানির চাল প্রথমে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া হয়। তারপর তা বেশ কয়েকঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর গরম পানি তে শহী জিরা, গরমমশলা মেশানো হয়, এরপর এতে ভেজানো চাল দিয়ে সিদ্ধ / আধা সিদ্ধ করা হয়। ম্যারিনেট করা মাংসের বড় টুকরো তা সে মুরগি হোক বা খাসি বা গরু‌‌, চালে মেশানো হয়। হাঁড়িতে চাল ও মাংস স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়, দুটি স্তরের মধ্যে ঘি দেওয়া হয়। এছাড়াও নানারকম মশলা মেশানো হয়। শেষে হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিরিয়ানিতে আলু ও আলুবোখরা, দই ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্নতাসম্পাদনা

  • কাচ্চি বিরিয়ানি (ঢাকা)
  • মোরগ পোলাও (ঢাকা)
  • ঢাকাইয়া হাজী বিরিয়ানি
  • চাঁটগাইয়া ওরশ বিরিয়ানি
  • সিলেটি আখনী বিরিয়ানি
  • পাঞ্জাবি মুর্গ বিরিয়ানি
  • কলকাতা বিরিয়ানি
  • বিফ বিরিয়ানি
  • হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি
  • ভাটকালী বিরিয়ানী
  • লক্ষনৌ বিরিয়ানী
  • মোরাদাবাদী বিরিয়ানী
  • সিন্ধী বিরিয়ানী
  • মেমোনী বিরিয়ানী
  • তেহারী
  • থাই বিরিয়ানী
  • শ্রিলঙ্কান বিরিয়ানী
  • ইরাকী বিরিয়ানী
  • নাসি বিরিয়ানী
  • চিংড়ী বিরিয়ানী
  • মাছ বিরিয়ানী
  • মোরগ বিরিয়ানী
  • সব্জী বিরিয়ানী

পরিবেশনাসম্পাদনা

বিরিয়ানি বিভিন্ন ভাবে পরিবেশন করা হয়। পরিবেশনা নির্ভর বিরিয়ানির প্রকারের উপর। প্রকারভেদে বিরিয়ানির সাথে রায়তা (টকদই + গোলমরিচের সাহায্যে বানানো উপদেয় খাবার), চাটনি (আলু বোখারার চাটনি / জলপাই চাটনি), সালাদ, সিদ্ধ ডিম, কাবাব প্রভৃতি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Karan, Pratibha (২০১২-০৬-০১)। Biryani (ইংরেজি ভাষায়)। Random House India। আইএসবিএন 9788184002546 
  2. "Food racism: Biryani to target Muslims?"www.dailyo.in। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১২-১৬ 
  3. "Everything you want to know about biryani"Hindustan Times (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১০-০২-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১২-১৬ 
  4. Naqvī, Ṣādiq; Rao, V. Kishan; Satyanarayana, A. (২০০৫)। A thousand laurels--Dr. Sadiq Naqvi: studies on medieval India with special reference to Deccan (ইংরেজি ভাষায়)। 1। Felicitation Committee, Dept. of History & Dept. of Ancient Indian History, Culture & Archaeology, Osmania University। পৃষ্ঠা 97। 
  5. Laet, Sigfried J. de (১৯৯৪)। History of Humanity: From the seventh to the sixteenth century (ইংরেজি ভাষায়)। UNESCO। আইএসবিএন 978-92-3-102813-7 
  6. "Biryani | Definition of Biryani by Lexico"Lexico Dictionaries | English (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১২-১৬ 
  7. Karan, Pratibha (২০১৭-০৭-২৪)। Biryani (ইংরেজি ভাষায়)। Random House India। পৃষ্ঠা ১–১২,৪৫। আইএসবিএন 978-81-8400-254-6 
  8. Cannon, Garland Hampton; Kaye, Alan S. (২০০১)। The Persian Contributions to the English Language: An Historical Dictionary (ইংরেজি ভাষায়)। Otto Harrassowitz Verlag। পৃষ্ঠা ৭১। আইএসবিএন 978-3-447-04503-2 
  9. Vishal, Anoothi (২০১১-০৫-১৪)। "When rice met meat"Business Standard India। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১২-১৬ 
  10. Ray, Krishnendu; Srinivas, Tulasi (২০১২)। Curried Cultures: Globalization, Food, and South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। University of California Press। আইএসবিএন 978-0-520-27011-4 
  11. ʻAbdulḥalīm Sharar (১৯৮৯) [1913]। Lucknow: The Last Phase of an Oriental Culture (Hindustan Men Mashriqi Tamaddun ka Akhri Namuna)। ES Harcourt; Fakhir Hussain কর্তৃক অনূদিত। Oxford University Press। আইএসবিএন 978-0-19-562364-2