বাংলাদেশের বনাঞ্চল

বৈশিষ্ট্যসূচক বাহ্যিক চেহারা ও গঠনসহ গাছপালার একককে বনের ধরন বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বনের ধরনের নিরূপকগুলো হচ্ছে জলবায়ু, মৃত্তিকা, উদ্ভিদ এবং অতীতের উন্নয়মূলক কার্যাবলী (জৈবিক হস্তক্ষেপসহ)।[১] পরিবেশগতভাবে বাংলাদেশের বনগুলোকে নানানভাবে ভাগ করা হয়েছে। এর মাঝে রয়েছে ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন, ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন, ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বন, মিঠাপানির জলাভূমি বন, প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন, ও সৃজিত বন।[২][৩]

বাংলাদেশের সুন্দরবন বনে প্রবেশ

ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বনসম্পাদনা

এসব বন সাধারণত সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় পাওয়া যায়। এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার ও উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজারেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে।

সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য নিয়ে চিরহরিৎ উদ্ভিদ এখানে কর্তৃত্ব করে। এসব বৃক্ষ ছাড়াও প্রায়-পর্ণমোচীপর্ণমোচী প্রজাতিরও দেখা মিললেও বনের চিরহরিৎ বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে।

সর্বোচ্চ চাঁদোয়ার বৃক্ষরা ৪৫ থেকে ৬২ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় বেড়ে উঠতে পারে। আর্দ্রতার কারণে ছায়াযুক্ত আর্দ্র স্থানে পরাশ্রয়ী অর্কিড, ফার্ণ ও ফার্ণসহযোগী, আরোহী লতা, স্থলজ ফার্ণ, মস, অ্যারোয়েড, এবং বেত পাওয়া যায়। গুল্ম, বিরুৎ আর ঘাসের পরিমাণ অপ্রতুল।

এধরনের বনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে সবচাইতে উপরের চাঁদোয়া প্রধানত কালিগর্জন, ঢালিগর্জন, সিভিট, ধূপ, কামদেব, রক্তন, বুদ্ধনারকেল, টালি, চুন্দুল, ঢাকিজাম দখল করে রাখে। প্রায়-পর্ণমোচী ও পর্ণমোচী বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে চম্পা, বনশিমুল, চাপালিশ, মান্দার। এছাড়া চাঁদোয়ার দ্বিতীয় স্তরে অন্যান্যের মধ্যে পাওয়া যায় পিতরাজ, চালমুগরা, ডেফল, নাগেশ্বর, কাও, জাম, গদা, ডুমুর, কড়ই, ধারমারা, তেজভাল, গামার, মদনমাস্তা, আসার, মুজ, ছাতিম, টুন, বুরা, অশোক, বরমালা, ডাকরুম। মাঝে মাঝে ব্যাক্তবীজীর মধ্যে GnetumPodocarpus উদ্ভিদ প্রজাতির দেখা মেলে। বাঁশের প্রজাতির মধ্যে রয়েছে মুলি, ডলু, যতি বা মিত্তিঙ্গা, Dendrocalamus lognispathus, Oxytenanthera nigrosiliata, Teinostachyum griffithii. বন্য কলাগাছও এখানে সাধারণ।[২][৩]

ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বনসম্পাদনা

সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় এ ধরনের বন দেখতে পাওয়া যায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিনাজপুরেও এ ধরনের কিছু বন এলাকা রয়েছে। সাধারণত চিরহরিৎ হলেও পর্ণমোচী বৃক্ষরাও এখানে রাজত্ব করে। বেশিরভাগ বনেই জুমচাষ প্রচলিত।

এখন পর্যন্ত এসব বনে প্রায় ৮০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদের উপস্থিতি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। চিরহরিৎ বনের তুলনায় এসব বনে লতাগুল্মের ঝোপঝাড়ের পরিমাণ বেশি। সবচাইতে উপরে চাঁদোয়ার উচ্চতা ২৫ থেকে ৫৭ মিটার। উপত্যকা ও আর্দ্র ঢালের সবচেয়ে উপরের স্তরের উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে চাপালিশ, তেলসুর, চুন্দুল, এবং বুদ্ধনারকেল। মধ্যম স্তরের উদ্ভদদের মধ্যে গুটগুটিয়া, গুটগুইট্টা টুন, পিতরাজ, নাগেশ্বর, উরিআম, নালিজাম, গদাজাম, পিতজাম, ঢাকিজাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সবচাইতে নিচের স্তরটিতে দেখা যায় ডেফল ও কেচুয়ান। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত গরম ও শুষ্ক ঢাল এবং শৈলশিরার উপরের স্তরের উদ্ভিদগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় গর্জন, বনশিমুল, শিমুল, শিল কড়ই, চুন্দুল, গুজা বাটনা, কামদেব, বুরা গামারি, বহেড়া, এবং মুজ। মধ্যম স্তরের রয়েছে গাব, উদাল, এবং শিভাদি আর নিম্নস্তরে দেখা যায় আদালিয়া, বরমালা, গোদা, অশোক, জলপাই এবং ডারুম। সচরাচর যেসব পর্ণমোচী উদ্ভিদ দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে আছে গর্জন, শিমুল, বনশিমুল, বাটনা, চাপালিশ, টুন, কড়ই, এবং জলপাই।[২][৩]

ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন এবং ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন একসাথে মিলে ৬,৭০,০০০ হেক্টর জমি দখল করে আছে যা দেশের মোট ভূমির ৪.৫৪ শতাংশ এবং মোট জাতীয় বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এছাড়াও, দু’ধরনের বনেই রয়েছে বিচিত্র প্রাণীপ্রজাতির আবাস। স্তন্যপায়িদের মধ্যে হাতি, বানর, বন্য শূকর, চিত্রা হরিণ , সম্বর হরিণ, এবং ইন্ডিয়ান চিতা উল্লেখযোগ্য। সরিসৃপ হিসেবে এসব বনে বিচরণ রয়েছে শঙ্খচূড়, মনিটর লিজার্ড, এবং বেঙ্গল মনিটর লিজার্ডের[৪]

ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বনসম্পাদনা

বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রংপুর এবং কুমিল্লাতে এ ধরনের বন বিস্তৃত রয়েছে। এসব বনকে শাল বন হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় যেহেতু শালবৃক্ষই এসব বনে কর্তৃত্ব করে থাকে (প্রায় ৯০ শতাংশ)। যদিও কালের পরিক্রমায় নানা কারণে এসব বন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। বনের চাঁদোয়া মোটামুটি ১০ থেকে ২০ মিটার উচ্চতার হয়ে থাকে।

শাল ছাড়াও এসব বনে অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে পলাশ, হালদু, জারুল বা সিধা, বাজনা, হারগোজা, আজুলি, ভেলা, কড়ই, মেন্দা, কুসুম, উদল, ডেফাজাম, বহেরা, কুর্চি, হরিতকি, পিতরাজ, শেওরা, সোনালু, আসার, আমলকি, এবং আদাগাছ। আরোহী লতাগাছের মধ্যে কাঞ্চনলতা, আনিগোটা, কুমারিলতা, গজপিপল, পানিলতা, Dioscorea প্রজাতি, শতমূলি, এবং গিলার অবস্থান লক্ষ্যণীয়। এছাড়াও ৫০ টি গণের প্রায় ২৫০ প্রজাতির গুল্মের ঝোপঝাড়ও এসব বনে বর্তমান। সানগ্রাস নামে এক প্রকার ঘাস এসব বনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ, লিগিউম, ইউফ্রোবিয়া এবং কনভলভুলাস উদ্ভিদও এসব স্থানে বিদ্যমান।[২][৩]

সর্বোমোট ১,২০,০০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে এসব বন বিস্তৃত যা দেশের মোট ভূমির ০.৮১ শতাংশ এবং মোট বনভূমির ৭.৮ শতাংশ। এসব বনে প্রায় ৩৭.৫ লক্ষ ঘনমিটার কাঠের মজুদ রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে খেকশিয়াল, বানর, বনবিড়াল, ইত্যাদি বিদ্যমান। এছাড়া সরীসৃপ হিসেবে মূলত বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড, এবং কমন কোবরা উল্লেখযোগ্য।[৪]

মিঠাপানির জলাভূমি বনসম্পাদনা

মূলত সিলেটের হাওর অঞ্চলের বেতভূমি ও হিজল-করচ বনে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যমূলক বন দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে এসব বন বানের জলে কানায় কানায় ভরে উঠে। এছাড়াও পাহাড়ী বনের নিচু জায়গাগুলোতেও এসব বনের দেখা মেলে।

নানা ধরনের জলসহিষ্ণু গাছ, যেমন, হিজল, করচ, পানিজাম, কদম, কাঞ্জল, ভুবি, অশোক, বরুণ, শতমূলি, ডুমুর, ঢোলকলমি, বুনো গোলাপ, নল, খাগড়া, ইকরা,কাশ, মূর্তা, এবং কচুরিপানা, এখানে সহজলভ্য। নানান পরাশ্রয়ী, ফার্ণ এবং মসও রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।[২][৩]

প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বনসম্পাদনা

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের বন পরিলক্ষিত হয়। প্রায় ৫২০,০০০ হেক্টর জুড়ে এসব বনের বিস্তৃতি। জোয়ারের পানিতে এই বন নির্দিষ্ট সময় পর পর বিধৌত হয়। এ অঞ্চলের উদ্ভিদদের মাঝে বিশেষ ধরনের অভিযোজন হিসেবে রয়েছে শ্বাসমূল, ঠেসমূল, এবং জরায়ূজ অঙ্কুরোদগম দেখা যায়। এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী। সুন্দরী ছাড়াও এখানে রয়েছে পশুর, গেওয়া, কেওরা, কাঁকড়া, বাইন, ধুন্দুল, আমুর, ডাকুর, ইত্যাদি।[২][৩]

সৃজিত বনসম্পাদনা

এগুলো সাধারণত দুই ধরনেরঃ সৃজিত রাষ্ট্রীয় বন এবং সৃজিত বেসরকারি বন।

১৮৭১ সালে মায়ানমার থেকে সেগুনের বীজ এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বন সৃজনের উদ্যোগ শুরু হয়। পরবর্তীতে সিলেট এবং চট্টগ্রাম বিভাগেও এই অনুশীলনের প্রসার ঘটে। সেগুন ছাড়াও অন্য যেসব বৃক্ষ সৃজনের উদ্যোগ নেয়া হয় সেগুলো হল গামার, চাপালিশ, গর্জন, মেহগনি, জারুল, টুন, পিংকাডো, এবং জাম। এছাড়াও পরে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ হিসেবে গামার, কদম, আকাশিয়া, ইউক্যালিপটাস এবং পাইনের চাষ শুরু হয়।[৩]

বেসরকারি বন হিসেবে গ্রামীণ বন বনজদ্রব্যের জাতীয় চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মোট আয়তন প্রায় ২,৭০,০০০ হেক্টর। বসতবাড়িতে অবস্থিত এসব বনে মোট প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লক্ষ ঘনমিটার বনজদ্রব্য মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।[৪]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. কীর্তি অমৃতকর-ওয়ানি ২০০৯, 'Natural Resources- Forest[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]'
  2. বিশ্বাস, এস.আর, চৌধুরী, জে.কে (২০০৯), '‘Forests and forest management practices in Bangladesh: the question of sustainability,’ International Forestry Review, ভলিউম ৯(২)।
  3. "বাংলাপিডিয়া"। ২৭ আগস্ট ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুলাই ২০১৩ 
  4. "বন অধিদপ্তর-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার"www.bforest.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-৩১