পাণ্ডব

মহারাজ পাণ্ডুর পুত্রগণ (মহাভারত)

১। মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডব:

পাণ্ডবগণ মহর্ষি বেদব্যাসের সাথে সাক্ষাৎ করছেন

মহাভারত মহাকাব্যে বর্ণিত পান্ডুর পাঁচ পুত্র। যথাঃ যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব। যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন কুন্তীর সন্তান এবং নকুল ও সহদেব মাদ্রীর সন্তান। এদেরকে যথাক্রমে ধর্ম, পবন, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সন্তান বলা হয়ে থাকে। এই পাঁচ পুত্রই বিশেষ শৌর্যশালী এবং দেববলে উৎপন্ন, কেউই পান্ডুর ঔরসজাত নয়।

★পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদীকে পঞ্চপান্ডব বিবাহ করেন।

মহাপ্রস্থানের পথে সবার আগে হরি পর্বতে দ্রৌপদীর মৃত্যু হয়। কারণ পতিপ্রাণা হলেও তিনি অর্জুনকে বেশি ভালবাসতেন ।

যুধিষ্ঠির হলেন প্রথম পান্ডব বা জ্যেষ্ঠ পান্ডব।

দ্রোণকে যুদ্ধে নিরস্ত করার জন্য কৃষ্ণ এবং ভীমের প্ররোচনায় যুধিষ্ঠির 'অশ্বত্থামা হতঃ-ইতি গজঃ' এই মিথ্যা উচ্চারণ করেন। যুধিষ্ঠিরের এই বাক্যে দ্রোণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা'র মৃত্যু হয়েছে মনে করে অস্ত্রত্যাগ করেন। উল্লেখ্য অশ্বত্থামা নামক হাতির মৃত্যু হয়েছে এই সংবাদটাই যুধিষ্ঠির মিথ্যার আশ্রয়ে উচ্চারণ করেন। এই মিথ্যাচারের জন্য তাঁর রথ কিছুটা ভূমির দিকে নেমে যায়। যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে যুধিষ্ঠির কর্ণের কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়ে শিবিরে পলায়ন করেন। এই সময় অর্জুন উপস্থিত হয়ে কর্ণকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলে যুধিষ্ঠির তাঁকে তিরস্কার করে গাণ্ডিব ত্যাগ করতে বলেন। এতে অর্জুন ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করতে উদ্যত হলে কৃষ্ণ তাঁকে নিবারণ করেন। পরে অবশ্য কর্ণকে অর্জুনই হত্যা করেছিলেন। যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে যুধিষ্ঠির শল্যকে হত্যা করেন। যুদ্ধের শেষে দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে আত্মগোপন করলে, যুধিষ্ঠির তাঁকে তীক্ষ্ণবাক্যে উত্তেজিত করেন। পরে ভীমের সাথে দুর্যোধনের গদা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের উরু ভেঙে দেন। যুদ্ধের শেষে ক্রুদ্ধ গান্ধারী যুদ্ধক্ষেত্রে এলে ইনি তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য গান্ধারীর পায়ে ধরেন। এ সময় গান্ধারী বস্ত্রাবরণের আড়াল থেকে শুধুমাত্র যুধিষ্ঠিরের নখগুলি দেখতে পান। ফলে যুধিষ্ঠিরের নখগুলো বিকৃত হয়ে যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা সবার মৃতদেহ সৎকারের সময় কুন্তী তাঁদের কাছে কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করে তাঁর উদ্দেশ্যেও তর্পণ করতে অনুরোধ করেন। এতে যুধিষ্ঠির ক্ষিপ্ত হয়ে অভিশাপ দেন যে, স্ত্রী জাতি কোন বিষয়ই গোপন রাখতে পারবে না। যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক হয়। এই সময় যুধিষ্ঠির আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত হয়ে রাজপদ ত্যাগ করতে উদ্যত হন। কিন্তু কৃষ্ণ, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, অনুনয় করে তাঁকে রাজ্য গ্রহণে সম্মত করান। রাজ্যগ্রহণের পর ইনি শরশয্যাশায়ী ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হন। ভীষ্ম তাঁকে বহু পরামর্শ দিয়ে দেহত্যাগ করেন। এরপর ইনি আত্মীয়-স্বজন হত্যাজনীত অপরাধ থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যাসদেবের পরামর্শে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। এরপর যুধিষ্ঠির ৩৬ বৎসর রাজত্ব করেন। এই সময় ইনি ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সেবা করার ব্যবস্থা করেন।

ভীম হলেন দ্বিতীয় পান্ডব বলা হয়।

পাণ্ডব ভাইদের বনবাসের সময়ে ভীম হিড়িম্বা নামের রাক্ষসীকে বিয়ে করেন, এবং তাদের ঘটোৎকচ নামের একটি পুত্র সন্তান হয়। দ্রৌপদী ও ভীমের সন্তান সুতসোম৷ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীম একা শতকৌরবকে বধ করেন৷ অপরিসীম বলশালী ভীম মল্লযুদ্ধে মগধরাজ চক্রবর্তী সম্রাট জরাসন্ধ ও অজ্ঞাতবাস কালে বিরাটের সেনাপতি কীচককে বধ করেন৷ গদা চালনায় ভীম ও দুর্যোধন সমান পারদর্শী ছিলেন৷ এ'বিষয়ে তাদের শিক্ষাগুরু ছিলেন কৃষ্ণের অগ্রজ হলধারী বলরাম৷ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষপর্বে ভীম ও দুর্যোধন গদাযুদ্ধের দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ভীম জয়ী হন৷ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময় ভীম পূর্ব ভারত অভিযানে নেতৃত্ব দেন৷ পাশাখেলায় পরাজিত হয়ে যুধিষ্ঠির সহ পাণ্ডবদের তেরো বছরের জন্য নির্বাসনে যেতে হয়। নির্বাসনকালে জটাসুর এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেবকে অপহরণ করে। ভীম তাদের উদ্ধার করেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৩৬ বছর পর মহাপ্রস্থানের পথে ভীমের মৃত্যু হয়। তিনি অর্জুন এর পর হিমালয় পর্বতমালা থেকে পড়ে যান এবং মৃত্যু বরণ করেন।

অর্জুনকে তৃতীয় পান্ডব বলা হয়। অর্জুন চারজন নারীকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁরা হলেন-পাঞ্চাল রাজের কন্যা দ্রৌপদী, নাগকন্যা উলূপী (ইনি পূর্ব-বিবাহিতা ছিলেন), মণিপুররাজ চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা এবং শ্রীকৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রা। তার চার পুত্রের নাম হল শ্রুতকীর্তি (দ্রৌপদীর পুত্র), ইরাবান্ (উলুপীর পুত্র), বভ্রুবাহন (চিত্রাঙ্গদার পুত্র) ও অভিমন্যু (সুভদ্রার পুত্র)।

নকুলকে চতুর্থ পান্ডব বলা হয়। তিনি দ্রৌপদী এবং কারেনুমতীকে বিয়ে করেছিলেন।

সহদেব ছিলেন পঞ্চপান্ডবদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

১৩ বছর পর বিরাট রাজ্যে অজ্ঞাতবাসকালে সহদেব তান্তিপথ নাম নিয়ে এক বৈশ্যের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। পাণ্ডবদের মধ্যে তিনি জয়দবল নামে পরিচিত হন। তিনি বিরাট রাজার গোশালার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির সহদেব ও নকুলকে তাদের মায়ের রাজ্য মদ্রের রাজা নিযুক্ত করেন। সহদেব তার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন। যুধিষ্ঠির তাকে দেবগুরু বৃহস্পতির থেকেও অধিক বুদ্ধিমান বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সহদেব ছিলেন ভাল জ্যোতিষী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘটনার কথা কাউকে বললে তার মাথা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। সহদেব যুদ্ধ পরিকল্পনাতেও বেশ দক্ষ ছিলেন।

কলিযুগের আগমন হলে এবং শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ঘটলে পাণ্ডবরা তাদের একমাত্র জীবিত বংশধর পরীক্ষিতের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে হিমালয়ের দিকে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন। যাত্রাকালে যুধিষ্ঠির ছাড়া অন্যান্যরা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং দ্রৌপদীর পরেই সহদেবের মৃত্যু হয়। ভীম যুধিষ্ঠিরকে সহদেবের মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন সহদেবের জ্ঞানের অহংকারই তার মৃত্যুর কারণ।


২। বাংলা সাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডব ত্রিশের দশকের বিশিষ্ট ৫ জন কবি রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে গিয়ে বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের ৫ জনকে বাংলা সাহিত্যে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়।

১.অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৭)।

২.বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪)।

৩.জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)।

৪.বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২)।

৫.সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০)।

নামব্যুৎপত্তিসম্পাদনা

পাণ্ডব শব্দ ( সংস্কৃত: पाण्डवा, আইএএসটি: Pāṇḍavā) তাঁদের পিতার নাম পান্ডু ( সংস্কৃত: पाण्डु) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আইএএসটি: Pāṇḍu) এবং এর অর্থ "পান্ডুর পুত্র"। পাণ্ডবদের অন্যান্য উপাধি বা নামগুলো হল: [১]

  • পাণ্ডুপুত্র (সংস্কৃত: पाण्डुपुत्र) - পাণ্ডুর পুত্র
  • পাণ্ডবকুমার (সংস্কৃত: पाण्डवकुमार) - তরুণ পাণ্ডবগণ
  • কৌন্তেয় (সংস্কৃত: कौन्तेय) - কুন্তীর পুত্র ( যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন )।
  • মাদ্রেয় (সংস্কৃত: माद्रेय) - মাদ্রীর পুত্র ( নকুলসহদেব)
  1. Bonnefoy, Yves. Asian Mythologies. translated under the direction of Wendy Doniger. Chicago and London: The University of Chicago Press. 1993. pp. 180-183. আইএসবিএন ০-২২৬-০৬৪৫৬-৫