কলি যুগ

বর্তমান সময়

কলি যুগ (দেবনাগরী লিপি: “कलि युग”) হল হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী চার যুগের শেষ যুগ। অন্য তিনিযুগ হলো সত্য যুগ, ত্রেতা যুগ, ও দ্বাপর যুগ।

কল্কি

এ যুগে পৃথিবীতে ধর্ম সংকোচিত হয়ে অধর্মের আধিক্য ঘটবে । পুণ্য হবে এক ভাগ এবং পাপ হবে তিন ভাগ । মানুষ সল্প আয়ু নিয়ে জন্মাবে । তাদের আয়ু হবে মাত্র একশত বছর ।[১] নিজের হাতে সাড়ে তিন হাত হবে শরীরের আয়তন । মানুষের প্রাণ থাকবে অন্নে । গঙ্গা হচ্ছে এযুগের তীর্থ । সব পাত্র ব্যবহার করা হয়। মানুষ তপস্যাহীন, সত্য থেকে দূরে অবস্থানরত।রাজনীতি কুটিল । শাসক ধনলোভী । ব্রাহ্মণ শাস্ত্রহীন । পুরুষ স্ত্রীর অনুগত । পাপে অনুরক্ত । সৎ মানুষের কষ্ট বৃদ্ধি। দুষ্টের প্রভাব বৃদ্ধি । কলি যুগের শেষ অবতার হলেন বিষ্ণু অবতার কল্কি

বর্তমান কলিযুগের সূচনাসম্পাদনা

বর্তমান সময়টিকে কলি যুগের একটি সময় বলা হয়। মাঘী পূর্ণিমায়ং শুক্রবারে কলিযুগোৎপত্তিঃ[২]। বলা হয়ে থাকে ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দের চৈত্রমাসের শুক্লা প্রতিপাদ তিথিতে(১৭ ও ১৮ই ফেব্রুয়ারীর মধ্যরাতে) বর্তমান কলিযুগের সূচনা হয়েছে। এ যুগের পরিমাণ হবে ৪,৩২,০০০ বছর।[৩] কলিযুগের সূচনা হতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ বৎসর অতিক্রম করেছে ।[৩] এভাবে বহু চতুর্যুগ অতিক্রান্তের পর সৃষ্টির শুরু হতে এখন পর্যন্ত অতিক্রান্ত সময় , ১৯৭ কোটি ২৯ লক্ষ ৪৯ হাজার বছর ।[৩] কলিযুগের সূচনার সময় সৌরজগতের সকল গ্রহ একই সুত্রে অবস্থান করছিল । বেদব্যাস রচিত বিষ্ণু পুরাণ বলা হয়েছে যে শ্রী কৃষ্ণের পৃথিবী ত্যাগ করে স্বর্গারোহণের সময় থেকে পৃথিবীতে কলি যুগের সূচনা হয়েছে । মনুসংহিতা কলিকালের সময় নির্ণয় করা হয়েছে । মানুষের এক বছরে দেবতাদের এক দিবারাত্র হয় । সূর্যের উত্তরাযণ হয় দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ন হয় তাদের রাত। ৪,০০০ চার সহস্র দৈবপরিমাণ বছরে সত্য যুগ সত্য বা কৃত যুগ হয় এবং ওই যুগের আগে ৪০০(চার শত) দৈববছর সন্ধ্যা ও পরে ৪০০ দৈববছর সন্ধ্যাংশ হয়।[৪] পরবর্তী যুগগুলিতে (ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি) যুগের পরিমাণ ১,০০০(এক হাজার) দৈববছর করে এবং সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ ১০০(এক শত) দৈববছর করে কমে যায়।[৫][৬] এই হিসাবে ১০০০ দৈব বছরে কলিযুগ হয় এবং এর সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ ১০০ বছর হয়;[৫][৬] অর্থাৎ সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ সহ ১২০০ দৈব বছরে কলি যুগ সম্পূর্ণ হয় । ১ দৈব বছর ৩৬০ দৈব দিনে ধরে কলিযুগ শেষ হতে সময় লাগবে ১২০০x৩৬০ = ৪,৩২,০০০ মনুষ্য বা সৌর বছর।

মানুষের আয়ুস্কালসম্পাদনা

মানুষের আয়ুস্কাল সম্বন্ধে মনুসংহিতাতে বলা হয়েছে, সত্যযুগে মানুষের আয়ু ছিল ৪০০(চার শত) বছর। পরবর্তী ৩ যুগে ১০০ বছর করে পরমায়ু কমে যায়।[৭] এবং সব শেষে কলি যুগে মানুষের পরমায়ু প্রায় ১০০ বছর হয় ।[১]

লক্ষণসম্পাদনা

বিষ্ণু পুরাণ অনুযায়ী[৮] কলিযুগে,

  • বেদবিহিত ক্রিয়াসমূহ হ্রাস পাবে ।
  • বর্ণ ও আশ্রমের আচারানুরূপ প্রবৃত্তি সকল বিলুপ্ত হবে ।
  • ধর্মানুরূপ বিবাহ হবে না ।
  • কম ধনের অধিকারী হয়ে মানুষ এ যুগে বেশি গর্ব করবে।
  • ধর্মগ্রন্থের প্রতি মানুষের আর্কষন থাকবে না।
  • মাতাপিতাকে মানবে না।
  • পুত্র পিতৃহত্যা বা পিতা পুত্র হত্যা করতে কুন্ঠিত হবে না।
  • ধনহীন পতিকে স্ত্রীরা ত্যাগ করবে। আর ধনবান পুরুষরা সেই স্ত্রীগণের স্বামী হবে।
  • কলিযুগে ধর্মের জন্য ব্যয় না করে কেবল গৃহাদি নির্মাণে অর্থ ব্যয় করবে।
  • মানুষ পরকালের চিন্তা না করে কেবল অর্থ উর্পাজনের চিন্তাতেই নিরন্তর নিমগ্ন থাকবে।
  • কলিযুগে নারীরা সাধারনতঃ স্বেচ্ছাচারিণী ও বিলাস উপকরণে অতিশয় অনুরাগিণী হবে এবং পুরুষরা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করতে অভিলাষী হবে।
  • সুহ্বদদের প্রার্থনাতে মানুষ নিজের অনুমাত্র স্বার্থ পরিত্যাগ করবেনা। অসমর্থ মানুষরা ধনহীন হয়ে নিরন্তর দুর্ভিক্ষ ও ক্লেশ ভোগ করবে।
  • কলিকালে মানুষ স্নান না করে ভোজন করবে।
  • কলিকালে স্ত্রীলোকরা নিতান্তই লোভী হবে, বহু ভোজনশীল হবে।
  • স্ত্রীরা দুহাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে অনায়াসে পতি আজ্ঞা অবহেলা করবে। নিজের দেহ পোষণে ব্যস্ত থাকবে, নিরন্তন কঠোর ও মিথ্যা বাক্য বলবে।
  • আচারহীন ব্রাহ্মণপুত্ররা ব্রহ্মচারীর বেশ ধারণ বেদ অধ্যয়ন করবে। গৃহস্থরা হোমাদি করবেন না এবং উচিত দানসমূহও প্রদান করবেন না। মানুষ অশাস্ত্রীয় তপস্যা করবে।
  • কলিকালে ৮ থেকে ১০বছরের বালকেরা সহবাসে ৫ থেকে ৭বছর বয়সের বালিকারা সন্তান প্রসব করবে।
  • মানুষের বুদ্ধি অতি অল্প ,তাঁদের ইন্দ্রিয় প্রবৃত্তি অতিশয় কুৎসিত, তাদের অন্তঃকরণ অতিশয় অপবিত্র হবে। আর অল্প কালেই বিনাশ লাভ করবে। যখন পাষন্ড লোকের প্রভাব অত্যন্ত বাড়বে, তখন সমাজের ভালো লোক কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকবে না। সজ্জনের হানি লক্ষিত হবে।
  • অল্প বৃষ্টি হবে, কলিকালে ফসল কম হবে।
  • মানুষ শ্বশুরের অনুগত হয়ে, কার মাতা কার পিতা এরকম কথা বলবে।
  • সুন্দরী স্ত্রী যার তার সাথে বন্ধুত্ব হবে, নিজ ভাইয়ের সাথে শত্রুভাব পোষন করবে।

ভাগবতে বলা আছে ছলনা মিথ্যা আলস্য নিদ্রা হিংসা দুঃখ শোক ভয় দীনতা প্রভৃতি হবে এযুগের বৈশিষ্ট্য। এই কলিযুগে কৃষ্ণনাম জপ ও কালীনাম ভজনাই সকলকে উদ্ধার করতে পারে। মনু সংহিতায় বলা হয়েছে যে সত্যযুগে তপস্যা, ত্রেতাযুগে জ্ঞান, দ্বাপরযুগে যজ্ঞ এবং কলিতে দানই প্রধান ধর্ম হয়।[৯]

কলিযুগের অবতারসম্পাদনা

কলি যুগে অবতার হিসাবে গৌতম বুদ্ধ আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন । এবং কলিযুগের একদম শেষের দিকে কল্কি অবতারের আর্বিভাব ঘটবে । শম্ভল গ্রামে বিষ্ণুযশ নামে এক ব্রাহ্মণের সন্তান হয়ে সুমতি নামে ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে বিষ্ণুর দশম অবতার কল্কিদেব জন্ম নিবেন । কল্কি হবে বিষ্ণুযশ-সুমতির চতুর্থ সন্তান । বিষ্ণুযশ-সুমতির প্রথম তিন সন্তানের নাম হবে যথাক্রমে কবি, প্রাজ্ঞ, ও সুমন্তক । তিনি কলিযুগের সকল অন্যায় ও অধর্মের অবসান করে সত্যযুগের সূচনা করবেন ।[১০]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. মনুসংহিতা ১ম অধ্যায় ৮২-৮৪
  2. বিশুদ্ধ সনাতন পঞ্জিকা /, লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা। (প্রকাশ কাল ৫ বছর বিশুদ্ধ পঞ্জিকা,৭০ বছর লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা।)। কলিযুগৎপত্তি। ৩৩/১ বাংলা বাজার,ঢাকা।: লোকনাথ বুক এজেন্সি। পৃষ্ঠা পৃ. নঃ ৩৫।  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  3. ডঃ রাধেশ্যাম ব্রহ্মচারী। হিন্দুু কালগণনা পদ্ধতি। তুহিনা প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ১৭,১৮। 
  4. মনুসংহিতা ১ম অধ্যায়, ৬৯শ্লোক
  5. সূর্যসিদ্ধান্ত ১ম অধ্যায় ১৫-১৭
  6. মনুসংহিতা ১ম অধ্যায়, ৭০শ্লোক
  7. মনু সংহিতা, অধ্যায় প্রথম, শ্লোক ৮৩
  8. বিষ্ণু পুরাণ ৬ষ্টাংশ, ১ম অধ্যায়
  9. মনু সংহিতা, অধ্যায় প্রথম, শ্লোক ৮৬
  10. কল্কিপুরাণ

আরও দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা