চৈতন্য মহাপ্রভু

ভারতীয় মহাপুরুষ

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ খ্রিঃ – ১৫৩৩ খ্রিঃ) ছিলেন পূর্ব এবং উত্তরভারতের এক বহু লোকপ্রিয় বৈষ্ণব সন্ন্যাসী ও ধর্মগুরু এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। তিনি গৌড়বঙ্গের নদিয়া অন্তর্গত নবদ্বীপে (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা) হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত শ্রীজগন্নাথমিশ্র ও শ্রীমতী শচীদেবীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[২] বৈষ্ণব সমাজে তাঁকে শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুুুগল প্রেমাবতার বলে মনে করা হয়।[৩] শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণশ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে ভক্তিযোগ ভাগবত দর্শনের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা ও প্রচারক।[৪] তিনি বিশেষত রাধাকৃষ্ণের রূপে পরম সত্ত্বার উপাসনা প্রচার করেন এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পর্যন্ত শ্রীহরি নাম ও ভক্তি এবং হরেকৃষ্ণ হরেরাম মহামন্ত্র যাহা শ্রীকলিসন্তরন উপনিষদের ও শ্রীপদ্মপুরাণের হরপার্বতী সংবাদে উল্লেখিত মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন।

শ্রীমন্মহাপ্রভু চৈতন্যদেব
হিন্দু ধর্মগুরু
Chaitanya-Mahabrabhu-at-Jagannath.jpg
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু
জন্ম ফাল্গুনী পূর্ণিমা (দোল যাত্রা), ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ
জন্মস্থান নবদ্বীপ[১], নদিয়া, গৌড়বঙ্গ (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ)
পূর্বাশ্রমের নাম বিশ্বম্ভর মিশ্র, নিমাই পণ্ডিত, গৌরাঙ্গ চন্দ্র
মৃত্যু ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যুস্থান শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথপুরী উৎকল (অধুনাওড়িশা)
গুরু স্বামী ঈশ্বরপুরী (মন্ত্র প্রদাতা গুরু)
স্বামী কেশব ভারতী (সন্ন্যাস দীক্ষা গুরু)
দর্শন অচিন্ত্য অদ্বৈতাদ্বৈত (ভেদাভেদ) বেদান্ত দর্শন, শ্রীব্রহ্মসূত্র-গোবিন্দভাষ্যম্, ভক্তিযোগ

গৌড়ীয় ভাগবত(বৈষ্ণব) মত

সম্মান "বিদ্যাসাগর বাদীসিংহ", রাধাকৃষ্ণের যুগল প্রেমাবতার]], একই দেহে রাধা ও কৃষ্ণের ভাব ও কান্তির সমন্বয়
উক্তি

"চণ্ডালোঽপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তিপরায়ণঃ"
বঙ্গানুবাদ:- যে চণ্ডাল হরিভক্তি পরায়ণ, সে দ্বিজজাতি (ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য) থেকেও শ্রেষ্ঠ হয়।

"মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে।
কোটী নমস্কার করি তাহার চরণে।।" ('গোবিন্দদাসের কড়চা'য় উল্লিখিত)

"তৃণাদপি সুনিচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীর্ত্তনীয়া সদা হরিঃ।।"

পাদটীকা

বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো (৬০ ফুট) চৈতন্য মহাপ্রভু মূর্তি নবদ্বীপে

মহামন্ত্র
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।[৫][৬]

সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তারই রচনা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারাণীর ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্যরূপে প্রেমাবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে। শ্রীভবিষ্যপুরাণেও শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যেরদেবের বিশেষ উল্লেখ আছে [৭] তাহার জন্মতিথি প্রতিবছর দোলযাত্রা দিনে বাঙ্গালী দের বহু ঘরে এবং ভারতের সম্পূর্ণ গৌড়ীয় ভাগবত মত অনুসরণকারী দের বাড়ি ও মন্দিরেগৌরপূর্ণিমা রূপে উদ্যাপন করা হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমে নামকরণ 'শ্রীশ্রী বিশ্বম্ভর মিশ্র'করা হয়েছিল। তার গাত্রবর্ণ গৌর ও স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাকে 'গৌরাঙ্গ' বা 'গৌরচন্দ্র' নামে অভিহিত করা হত;[৮] অন্যদিকে, নিম্ব বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাহার মাতা তারে 'নিমাই' বলে ডাকতেন তাই নবদ্বীপ বাসিও নিমাই পণ্ডিত বলে তাহারে অভিহিত করতেন।[৯] ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বঙ্গীয় সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সে যুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর:- শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত(সবথেকে পুরনো বা অতি প্রমাণিত শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনচরিত্রাবলী), শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরের:- শ্রীমদ্ চৈতন্য ভাগবত,[১০] এবং শ্রীলোচন দাস ঠাকুরের:- শ্রীশ্রীচৈতন্যমঙ্গল[১১]

জীবনীসম্পাদনা

 
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু চৈতন্যদেব

চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা ও বঙ্গীয় সনাতন ধর্মালম্বীদের অনুযায়ী, ১৪০৭ শকাব্দের বা ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্য মহাপ্রভু ফাল্গুনী পূর্ণিমার (দোল যাত্রা উৎসব) সন্ধ্যাকালে সিংহলগ্নে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[১২] তাঁর পিতামাতা ছিলেন প্রাচীন গৌড়বঙ্গে নদিয়া অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী।[১৩] চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের (অধুনা সিলেট, বাংলাদেশ) আদি নিবাসী। তার পিতা জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপে বেদাধ্যয়ন ও সংস্কৃত শাস্ত্রচর্চার জন্য এসে বসতি স্থাপন করেন।[৫][১৪][১৫]

গঙ্গাতীরে নবদ্বীপ তখন ছিল বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ স্থান। সেনরাজাদের সময় নবদ্বীপ ছিল বাংলার অন্যতম রাজধানী।[১৬]:৩১–৩২ ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমে বক্তিয়ার খিলজি এই নবদ্বীপ জয় করেই বাংলা জয়ের সূচনা করেন। নবদ্বীপের সমৃদ্ধি বহুকালের। বাণিজ্য ও বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র হিসাবে খ্যাতিলাভ করায় বাংলাদেশের নানা অঞ্চল থেকে গুণীজ্ঞানী ব্রাহ্মণপণ্ডিত ও জীবিকাপ্রার্থীদের আগমনে নবদ্বীপ খুবই বড় হয়ে উঠতে থাকে। বৃন্দাবন দাস লিখেছেন:

নবদ্বীপ সম্পত্তি কে বর্ণিবারে পারে।
একো গঙ্গা ঘাটে লক্ষ স্নান করে॥
ত্রিবিধ বৈসে এক জাতি লক্ষ লক্ষ।
সরস্বতী দৃষ্টিপাতে সভে মহাদক্ষ॥
সভে মহা অধ্যাপক কবি গর্ব ধরে।
বালককেও ভট্টাচার্য সনে কক্ষা করে॥
নানা দেশ হৈতে লোক নবদ্বীপ যায়।
নবদ্বীপে পড়ি লোক বৃদ্যারস পায়॥

[১৬]:৩২

অতিরঞ্জন থাকলেও এই বর্ণনার মধ্যে সত্য আছে।

শ্রীচৈতন্যের জন্মের সমকালে দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অশান্তি তেমন ছিল না। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসন অধিকার করে হুসেন শাহ দেশের শান্তি অক্ষুন্ন রাখেন।[১৬]

হিন্দুদের মধ্যে উচ্চবর্ণের শিক্ষিতরা সরকারি চাকরি ইত্যাদি করে অভিজাত শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু অন্য-দিকে আবার দেখা যায় অনুন্নত সমাজের মানুষেরা অবহেলিত হচ্ছিল। ঐশ্বর্যের সঙ্গে দারিদ্র সহাবস্থান করছিল। উচ্চশ্রেণীর জীবনযাপনে “ম্লেচ্ছাচার” প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল। বৃন্দাবন দাসের বর্ণনা অনুসারে জানতে পারি, তখন মানুষ অত্যন্ত ধর্মবিমুখ হয়ে পড়েছিল। ধর্মকর্মের মধ্যে ছিল সারারাত জেগে “মঙ্গলচণ্ডীর গীত” শোনা, মদমাংস দিয়ে “যক্ষপূজা”, ধূমধাম করে বিষহরির পূজা আর পুত্রকন্যার বিয়েতে অর্থের অপচয় করা। এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে সে সময়ে সমাজের মধ্যে মূঢ়তা ও উদ্দেশ্যহীনতার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছিল, যা একদল চিন্তাশীল ও ভাবুককে বিচলিত করে তুলেছিল। রামানন্দ বসু, রূপ-সনাতনের মত প্রতিষ্ঠিত, ধনী ও অভিজাত উচ্চ বংশের শিক্ষিত হিন্দুরা উদ্দেশ্যহীন ঐশ্বর্য প্রতিষ্ঠার অসারতা অনুভব করছিলেন।

[১৬]

চৈতন্যদেবের মাতামহ ও পিতৃ প্রদত্ত নাম ছিল শ্রীবিশ্বম্ভর মিশ্র। কিশোরাবস্থায় তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। ব্যাকরণশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি ছাত্রদের অধ্যয়নের জন্য একটি টোল স্থাপন করেন।[৫] তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। দ্বিগ্বিজয়-কেশবকাশ্মীর নামক এক দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতকে তরুণ নিমাই তর্ক-যুদ্ধে পরাস্ত করেন। জপ ও শ্রী হরির নাম কীর্তনের প্রতি তার আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তার জীবনের নানা কাহিনি থেকে।[১৭] তার প্রথম ধর্মপত্নী লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবী কে বিয়ের পর একবার আদিনিবাস শ্রীহট্ট গিয়েছিলেন তিনি। পূর্ববঙ্গে পর্যটনকালে লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবীর সর্পদংশনে মৃত্যু ঘটলে তিনি মায়ের অনুরোধে বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর সাথে পাণিগ্রহণ করেন। [৫]

এরপর গয়ায় পিতার পিণ্ডদান করতে গিয়ে পিতা ও প্রথম স্ত্রীর বিয়োগ কাতর নিমাই তার মন্ত্রদাতাগুরু স্বামী ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনিশ্রীশ্রীগোপাল অষ্টাদশাক্ষর মহামন্ত্রেরাজে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।[১৮] বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত থেকে কৃষ্ণভাবময় ভক্ত রূপে তার অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন। হিন্দুধর্মের জাতিভেদ উপেক্ষা করে তিনি সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে “হরি বল” ধ্বনি বিতরণ করতেন এবং হরিনাম প্রচারে মৃদঙ্গ (শ্রীখোল)-করতাল সহযোগে অনুগামীদের নিয়ে নবদ্বীপের রাজপথে ‘নগর সংকীর্তন’-এ বের হতেন। অত্যাচারী জগাই ও মাধাইকে তিনি ভক্তেরূপে পরিণত করেন। তার প্রভাবে মুসলমান ‘যবন’ (হরিদাস ঠাকুর) সনাতন ধর্ম ও বৈষ্ণব মত গ্রহণ করেন এবং নবদ্বীপের শাসক চাঁদকাজী তার আনুগত্য স্বীকার করেন। চৈতন্যভাগবত-এ আছে, জাতিভেদের অসারতা দেখানোর জন্য তিনি শূদ্র রামরায়কে দিয়ে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিয়েছিলেন। [৫]

মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে কাঞ্চন নগরে স্বামী কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসাশ্রমে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই পণ্ডিত শ্রীমন্ কৃষ্ণচৈতন্যদেব ভারতী নাম গ্রহণ করেন।[১৯] সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি গৌড়বঙ্গ ও নদিয়া ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান যথা: নীলাচল, দাক্ষিণাত্য, পণ্ডরপুর, বৃন্দাবন আদিতে তীর্থাটন করেন। পথে সত্যবাই, লক্ষ্মীবাই নামে বারাঙ্গনাদ্বয় এবং ভীলপন্থ, নারেজী প্রভৃতি দস্যুগণ তার শরণ গ্রহণ করে। এইসব স্থানে ভ্রমণের সময় তিনি এতদাঞ্চলের ভাষা (যথা: ওড়িয়া, তেলুগু, মালয়ালম প্রভৃতি) বিশেষভাবে শিক্ষা করেন। এই সময় তিনি অশ্রুসজল নয়নে অবিরত কৃষ্ণনাম জপ ও কঠোর বৈরাগ্য সাধন (আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে কৌপীনসার হয়ে) করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছরের অধিকাংশ সময় তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে[২০] ওড়িশার সূর্যবংশীয় সনাতনধর্মীয় সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপ রুদ্রদেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তার সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন।[২১] ভক্তদের মতে, জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন।[২২] ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে আষাঢ় মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে রবিবারে পুরীধামে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার লীলাবসান ঘটে।[৫]

পাদুকাসম্পাদনা

নবদ্বীপ শহরের মহাপ্রভু ধাম মন্দিরে শ্রী শ্রী বিষ্ণুপ্রিয়া সমিতির তত্ত্বাবধানে রয়েছে শ্রীচৈতন্যর পাদুকা যুগল। কাঠের এই পাদুকা দু’টি ৫০০বছর আগে বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে দিয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং মহাপ্রভু। কথিত রয়েছে, শ্রীচৈতন্যদেব সন্ন্যাস নেওয়ার এক বছরের মাথায় শান্তিপুরে এসেছিলেন শচীমাতাকে দর্শনের জন্য। শচীমাতাকে দর্শনের পরেই পুরীধামে চলে যাওয়ার কথা ছিল তার। অচমকা পুরীর যাত্রা বাতিল করে তিনি নবদ্বীপে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শ্রীবাস, গদাধরকে সঙ্গে নিয়ে কীর্তন করতে তিনি নবদ্বীপে চলে আসেন। বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী সেই সময় বাড়িতে পুজো করছিলেন। সন্ন্যাসীদের স্ত্রীর মুখ দর্শনের নিয়ম নেই। তাই উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মহাপ্রভু। বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী ঘর থেকে বের হয়ে স্বামীকে প্রণাম করতে যান। প্রণাম শেষ হতেই বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী দেখেন, এক জোড়া পাদুকা রেখে গিয়েছেন মহাপ্রভু। সামনে মহাপ্রভু নেই। ওই দিন রাতে বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী মায়ের স্বপ্নাদেশ পান, জন্মভিটের নিম গাছ থেকে কাঠের বিগ্রহ তৈরি করে পুজো করতে এবং তার সঙ্গে পাদুকাও পুজো হবে। সেই থেকে মহাপ্রভুর পাদুকা পুজো হয়ে আসছে। বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীর ভাইয়ের বংশধররা ওই পাদুকা যুগল সুরক্ষিত রেখেছেন। ১৯৬০সালের পর ওই পাদুকা দু’টিকে একটি রুপোর খাপের মধ্যে রাখা হয়।[২৩]

অবতারত্বসম্পাদনা

 
চৈতন্য মহাপ্রভু (ডানে) ও নিত্যানন্দের (বামে) মূর্তি, ইসকন মন্দির, দিল্লি

গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক পৃথক রূপের আধার: প্রথমত, তিনি কৃষ্ণের ভক্ত; দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা; এবং তৃতীয়ত, তিনি রাধিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ।[২৪][২৫][২৬][২৭] ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত চৈতন্য জীবনীগ্রন্থগুলির বর্ণনা অনুসারে, তিনি একাধিকবার অদ্বৈত আচার্যনিত্যানন্দ প্রভুকে কৃষ্ণের মতো বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন।[২৮][২৯][৩০]

চৈতন্যদবের দেহকান্তি ও স্বভাব সম্পর্কিত একটি পদ নিম্নরূপ:

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতার গ্রহণের বিষয়ে তিনটি মত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হল:

  1. নিয়মে অবতার গ্রহণ
  2. যুগধর্ম প্রবর্তন
  3. অতৃপ্ত প্রেমরস আস্বাদন।

জীবনী কাব্যগুলোতে মূলত এই তিনটি কারণের কথাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (তন্ময় মণ্ডল) [৩১]

চৈতন্য সম্প্রদায়সম্পাদনা

 
বৈষ্ণব পঞ্চতত্ত্বের দেবগণ: চৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত আচার্য, গদাধর পণ্ডিত ও শ্রীবাস ঠাকুর

সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারসম্পাদনা

আরও দেখুনসম্পাদনা

পাদটীকাসম্পাদনা

  1. কবিরাজ, কৃষ্ণদাস। "সচিত্র শ্রী শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত(আদি লীলা)"Internet Archive। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২৯ 
  2. "Britannica: Caitanya Movement"। ২৭ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ 
  3. "Ravi Shankar discusses Sri Chaitanya Mahaprabhu"। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ 
  4. Srimad Bhagavatam (Introduction) ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৫ মে ২০১৩ তারিখে "Lord Caitanya not only preached the Srimad-Bhagavatam but propagated the teachings of the Bhagavad-gita as well in the most practical way"
  5. দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা-১৩, প্রকাশ: ১৯৮৬
  6. Sri Chaitanya Mahaprabhu "He spread the Yuga-dharma, or the practice most recommended for the attainment of pure love for Sri Sri Radha-Krishna. That process is Harinam Sankirtan, or the congregational chanting of the Holy Names of the Lord: Hare Krishna Hare Krishna Krishna Krishna Hare Hare, Hare Rama Hare Rama Rama Rama Hare Hare"
  7. Bhag-P 11.5.32 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ তারিখে "In the age of Kali, intelligent persons perform congregational chanting to worship the incarnation of Godhead who constantly sings the names of Krishna. Although His complexion is not blackish, He is Krishna Himself. He is accompanied by His associates, servants, weapons and confidential companions. "
  8. In the Name of the Lord (Deccan Herald) "He was also given the name of ‘Gaura’ (meaning golden) because of his extremely fair complexion."
  9. KCM Archive "they named Him, Nimai, as he was born under a neem tree"
  10. Gaudiya Literature
  11. Biography of Sri Locana Dasa Thakura ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৩ জুন ২০১৩ তারিখে (salagram.net)
  12. Sri Caitanya Mahaprabhu: His Life and Precepts, by Bhaktivinoda Thakura ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৭ মে ২০১৪ তারিখে “Caitanya Mahäprabhu appeared in Mäyäpur in the town of Nadia just after sunset on the evening of the 23rd Phälguna 1407 Shakabda, answering to 18 February, 1486, of the Christian Era. The moon was eclipsed at the time of His ‘birth’”
  13. "Sri Caitanya Mahaprabhu: His Life and Precepts, by Bhaktivinoda Thakura"। ১৭ মে ২০১৪ তারিখে সংগ্রহের-তারিখ=২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ মূল |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) থেকে আর্কাইভ করা। 
  14. "Sri Chaitanya Mahaprabhu: His Life and Precepts, by Bhaktivinoda Thakura"। ১৭ মে ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ 
  15. Nair, পৃঃ ৮৭
  16. অবন্তীকুমার সান্যাল (আগষ্ট ১৯৭৯)। "শ্রীচৈতন্যের জীবনী"। বাংলা সাহিত্যের সরল বৃত্তান্ত: পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দী (প্রথম সংস্করণ)। ১৫ বঙ্কিম চ্যাটার্জী ষ্ট্রীট: দেবেন্দ্র গ্রন্থালয়। পৃষ্ঠা ৩১–৩৫। 
  17. "CC Adi lila 14.22"। ৬ মার্চ ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ 
  18. CC Adi lila 17.9 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে “In Gayla, Sri Chaitanya Mähaprabhu was initiated by Isvara Puri, and immediately afterwards He exhibited signs of love of Godhead. He again displayed such symptoms after returning home.”
  19. Teachings of Lord Chaitanya ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৫ মে ২০১৫ তারিখে “They were surprised to see Lord Caitanya after He accepted his sannyasa order from Kesava Bharati”
  20. History of Gaudiya Vaishnavism “Chaitanya spent the remainder of His life, another 24 years, in Jagannäth Puri in the company of some of His intimate associates, such as Svarüpa Dämodara and Rämänanda Räya”
  21. Gaudiya Vaishnavas ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২ মার্চ ২০০৯ তারিখে “His magnetism attracted men of great learning such as Särvabhauma Bhattächärya, the greatest authority on logic, and Shree Advaita Ächärya, leader of the Vaishnavas in Bengal, and men of power and wealth like the King of Orissa, Pratapa Rudra and his brähman minister, Rämänanda Räya...”
  22. Srimad Bhagavatam, Introduction ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৫ মে ২০১৩ তারিখে “At Puri, when he [Caitanya] entered the temple of Jagannätha, he became at once saturated with transcendental ecstasy”
  23. "পাদুকা" 
  24. Daniel Coit Gilman, Harry Thurston Peck, Frank Moore Colby, The New International Encyclopædia - Encyclopedias and dictionaries (1904) p. 198, “was regarded as also divine and as a reincarnation of Krishna Himself”.
  25. Margaret H. Case, Seeing Krishna: The Religious World of a Brahman Family in Vrindaban (2000) p. 63
  26. C. J. Fuller, The Camphor Flame: Popular Hinduism and Society in India (2004) p. 176
  27. David G. Bromley, Larry D. Shinn, Krishna Consciousness in the West(1989) p. 69
  28. "CC Adi-lila 17.10"। ৩ মার্চ ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ 
  29. Chaitanya Bhagavata Ādi-khaṇḍa 1.122
  30. Chaitanya Bhagavata, Madhya-khaṇḍa 24
  31. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা