পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীত

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীত-এর মধ্যে রয়েছে একাধিক আদি গানের ধরন রয়েছে, যেমন বাউল, বিষ্ণুপুর ঘরানা, কিশান, শ্যামা সঙ্গীত, অষ্টক গান, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, অতুলপ্রসাদী, দ্বিজেন্দ্রগীতি, কীর্তন কান্তজেতী, গণসভয়েট, আধিকিক গান, বাঙালি রক ইত্যাদি।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীত
Baul Song Performance - Saturday Haat - Sonajhuri - Birbhum 2014-06-28 5286.JPG
বীরভূমে বাউল গানের একটি অনুষ্ঠান
ধারা
নির্দিষ্ট ফর্ম
ধর্মীয় সঙ্গীত
জাতিগত সঙ্গীত
ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত
গণমাধ্যম ও অনুষ্ঠান
সঙ্গীত মাধ্যমবেতার

টেলিভিশন

ইন্টারনেট

অঞ্চলিক সঙ্গীত
সম্পর্কিত এলাকা
অন্যান্য অঞ্চল

বিষ্ণুপুর ঘরানাসম্পাদনা

বিষ্ণুপুর ঘরানা বাংলার একমাত্র শাস্ত্রীয় (ধ্রুপদ) ঘরানা। এটি মল্ল রাজাদের রাজত্বকালে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহরে উৎপত্তিলাভ করে।[১] দিল্লির বাহাদুর খান, তানসেনের বংশধর, বিষ্ণুপুর ঘরানার উদ্ভাবক ছিলেন। বাহাদুর খানকে মল্লরাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের আমলে বিষ্ণুপুরে আনা হয়েছিল।

লোকসঙ্গীতসম্পাদনা

বাউলসম্পাদনা

বাউল গায়করা বাউল গান এবং বাদ্যযন্ত্রের এক রহস্যময় দল, গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তারা একটি খমক, একতারা এবং দোতারা ব্যবহার করে বাউল গান সঞ্চালন করে থাকে।

পটুয়া সঙ্গীতসম্পাদনা

 
কলকাতায় পটচিত্র দেখিয়ে পটুয়া সঙ্গীত পরিবেশন করছেন স্বর্ণা চিত্রকর

পটুয়া সঙ্গীত পশ্চিমবঙ্গের এক প্রাচীন লোকসঙ্গীতের ধারা। পটচিত্রকর তথা পটুয়ারা লৌকিক ও পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বন করে বিভিন্ন ধরনের পটচিত্র অঙ্কন করেন এবং পটের কাহিনিকে ঘিরে সঙ্গীত রচনা করেন। এই সকল গান তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পট প্রদর্শনের সঙ্গে পরিবেশন করেন। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও অন্যান্য পল্লী অঞ্চলগুলিতে পটুয়া সঙ্গীতের প্রচলন দেখা যায়।[২]

যদিও পৌরাণিক দেব-দেবীই পটের বিষয়বস্তু তবুও গান সহযোগে বর্ণনার সময় দেব-দেবীর লোকিক রূপই প্রাধান্য পেয়ে থাকে৷ দীঘল পটের প্রথম ছবির বর্ণনা সম্পন্ন হলে প্রথম ছবি জড়িয়ে নিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় ছবির বর্ণনা, তারপর দ্বিতীয় ছবিটিও জড়িয়ে নিয়ে শুরু হয় তৃতীয় ছবির বর্ণনা; এভাবেই এগিয়ে চলতে থাকে পটুয়া সঙ্গীত৷[৩]

একটি পটুয়া সঙ্গীতের নমুনা-

(ছবিতে দেখা যাচ্ছে জটায়ু পাখির গলায় রাজা দশরথ তাঁর নিজের গলার মালা পরিয়ে দিচ্ছেন৷ এক্ষেত্রে নীচের পটুয়া গানটি গীত হতে পারে৷)

লেটো গানসম্পাদনা

লেটো হল পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের, বিশেষ করে উত্তর রাঢ় অঞ্চলের এক ধরনের খুব জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত৷ অনেকের মতে, "লেটো" শব্দটি এসেছে রাঢ় অঞ্চলে "নাট্য" শব্দের প্রচলিত অপভ্রংশ "লাট্য" থেকে৷ সাধারণতঃ রাঢ় অঞ্চলের মুসলমান সমাজের মানুষজনই লেটো গানের দল গঠন করে৷ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই রাঢ়বাংলারই মানুষ ছিলেন এবং তিনি নিজেও একসময় রাঢ়ের লেটো দলের সাথে যুক্ত ছিলেন৷

লেটো দলের অভিনেতারা সাজসজ্জা পরে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন৷ এতে পালাগান ও তর্জাগানের প্রভাব দেখা যায়৷ কখনও যাত্রাদলের মতো পুরো একটি পালাগান গীত হয়, কখনও গান বন্ধ হয়ে গিয়ে দুই পক্ষের মাঝে ছড়া কাটাকাটি বা সংলাপ চলতে থাকে৷ সাথে চলে নাচ৷ গান শুরু হওয়ার আগে এককন্ঠে বা যৌথকন্ঠে আসর বন্দনা হয়-

লেটো গানের মধ্যে কখনও কখনও দেহতত্ত্ব, আবার কখনও বা মায়াবাদ শোনা যায়-

যখন দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় তখন আত্মপ্রশস্তি ও প্রতিপক্ষকে নিন্দাবাদের মাধ্যমে আসর জমে ওঠে৷ মাঝে মাঝে অশ্লীল প্রসঙ্গও চলে আসে৷ কিশোর অভিনেতা কিশোরীবেশে চটুল নৃত্য পরিবেশন করে৷ দুইপক্ষ কখনও মা-বাবা, কখনও সোনা-লোহা, কখনও বা নামাজ-ইমান ইত্যাদি ভূমিকাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামে৷ দ্বন্দ্বযুদ্ধের চরম পর্যায়ে ব্যক্তিগত আক্রমণও চলে৷[৪]

রবীন্দ্র সঙ্গীতসম্পাদনা

রবীন্দ্র সঙ্গীতের (বাংলা: [ɾobind̪ɾo ʃoŋɡit̪]), এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা ও রচনা।[৫] রবীন্দ্র সঙ্গীত, ভারতে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের মধ্যে জনপ্রিয়তাগুলির মধ্যে বিশেষ একটি।[৬][৭]

রবীন্দ্র সংগীত শতকেরও বেশি সময় ধরে বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।[৭][৮] ভারতীয় সমাজ সংস্কারক স্বামী বিবেকানন্দ রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ছিলেন তার যুবক কালে। তিনি রবীন্দ্র সংগীত শৈলীতে সংগীত রচনা করেন, উদাহরণস্বরূপ রাগজাজিভান্তিতে গগনের থালে।[৭]

শ্যামা সঙ্গীতসম্পাদনা

শ্যামাসংগীত কালী-বিষয়ক বাংলা ভক্তিগীতির একটি জনপ্রিয় ধারা। এই শ্রেণির সঙ্গীত শাক্তপদাবলির একটি বিশিষ্ট পর্যায়। শাক্তকবিরা প্রধানত তন্ত্রাশ্রয়ী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন বলে শ্যামাসংগীতে তন্ত্রদর্শন নানাভাবে দ্যোতিত। শ্যামাসঙ্গীতের পদগুলিতে কালী বা শ্যামা মাতৃরূপে ও ভক্ত সাধক সন্তানরূপে কল্পিত। ভক্তের প্রাণের আবেগ, আকুতি, আবদার, অনুযোগ, অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার নিবেদন ছন্দোবদ্ধ হয়ে গীতধারায় প্রকাশিত হয়েছে এই পর্যায়ে।

শ্যামাসঙ্গীতের ধারাটি বিকাশলাভ করে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এই সময় বঙ্গদেশে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকালে বৈষ্ণব ধর্মানুশীলনের পরিবর্তে শাক্তদর্শন ও শক্তিপূজা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। শ্যামাসঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন এবং শাক্তপদাবলির জগতে তার পরেই স্থান কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের। এই দুই দিকপাল শ্যামাসংগীতকার ছাড়াও অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট পদকর্তা এই ধারায় সংগীতরচনা করে শাক্তসাহিত্য ও সর্বোপরি শাক্তসাধনাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – কৃষ্ণচন্দ্র রায়, শম্ভুচন্দ্র রায়, নরচন্দ্র রায়, রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুবাবু, দশরথি রায় ওরফে দাশুরায় প্রমুখ।

নজরুল গীতিসম্পাদনা

অতুলপ্রসাদীসম্পাদনা

অতুলপ্রসাদী বা অতুলপ্রসাদ সেনের গান (১৮৭১-১৯৩৪), আধুনিক যুগে প্রধান লিখিত গীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে একজন ছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয়।[৯] বাংলা সঙ্গীতে থুমরী শৈলী প্রবর্তনের জন্য আতুল প্রসাদকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়।[৯] তার গানগুলি তিনটি বিস্তৃত বিষয়-দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও প্রেমের উপর নিবদ্ধ ছিল।[৯]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Culture of Bishnupur"। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ 
  2. শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য। বঙ্গীয় লোক-সঙ্গীত রত্নাকর। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ লোক সংস্কৃতি গবেষণা পরিষদ। পৃষ্ঠা ১০৪১। 
  3. মুখোপাধ্যায়, দিলীপ (১৯৫৯)। উত্তর-রাঢ়ের লোকসঙ্গীত। কলকাতা: কল্যাণী প্রকাশন। পৃষ্ঠা ২৫। 
  4. মুখোপাধ্যায়, দিলীপ (১৯৫৯)। উত্তর-রাঢ়ের লোকসঙ্গীত। কলকাতা: কল্যাণী প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৯৩–৯৭। 
  5. Sigi 2006, পৃ. 90
  6. Tagore 2007, পৃ. xii
  7. "Magic of Rabindra Sangeet"Deccan Herald। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০১৩ 
  8. Dasgupta ও Guha 2013, পৃ. 252
  9. Arnold, Alison (২০০০)। The Garland Encyclopedia of World MusicTaylor & Francis। পৃষ্ঠা 851। আইএসবিএন 0-8240-4946-2