প্রভাতরঞ্জন সরকার

যোগী, লেখক, সামাজিক বিপ্লবী, কবি, সুরকার, এবং ভাষাতত্ত্ববিদ

প্রভাতরঞ্জন সরকার[১] (২১ মে ১৯২১;– ২১ অক্টোবর ১৯৯০), এছাড়া তিনি তার আধ্যাত্মিক নাম শ্রী শ্রী আনন্দমূর্ত্তি এবং বাবা নামে তার অনুসারীগণের কাছে পরিচিত; একজন ধর্মগুরু, ভারতীয় দার্শনিক, যোগী, গ্রন্থকার, সামাজিক বিপ্লবী, কবি, সঙ্গীতকার, ভাষাবিদ এবং বিজ্ঞানী[২] ছিলেন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে, সরকার আনন্দমার্গ নামে একটি আধ্যাত্মিক তথা সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেন; যেখানে ধ্যান এবং যোগব্যায়াম সম্পর্কিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ভারতের সপ্তম রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং, সরকার সম্পর্কে বলেন যে: "প্রভাতরঞ্জন সরকার ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক দার্শনিক ছিলেন।"[৩]

প্রভাতরঞ্জন সরকার
PRSarkar GentlemanPhoto 3.jpg
প্রভাতরঞ্জন সরকার
জন্ম(১৯২১-০৫-২১)২১ মে ১৯২১
মৃত্যু২১ অক্টোবর ১৯৯০(1990-10-21) (বয়স ৬৯)
জাতীয়তাভারতীয়
যেখানের শিক্ষার্থীবিদ্যাসাগর কলেজ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাদার্শনিক, গ্রন্থকার, সামাজিক বিপ্লবী, লেখক, কবি, রচয়িতা, বুদ্ধিজীবী, ভাষাবিদ এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষক
পরিচিতির কারণপ্রতিষ্ঠাতা: আনন্দ মার্গ, প্রগতিশীল ব্যবহারিক তত্ত্ব, আমরা বাঙালী

সরকারের আধ্যাত্মিক অনুশীলনের পদ্ধতিকে বৈদিক এবং তান্ত্রিক দর্শনশাস্ত্রের একটি বাস্তব সমন্বয় হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।[৪] তিনি বস্তুবাদ ও পুঁজিবাদের নিন্দা করেছেন, এবং মহাবিশ্বকে গুরুভৌতিক অনুরুক্তির ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন;– সমগ্র মহাবিশ্ব মহাজাগতিক-মস্তিস্কের মধ্যে বিদ্যমাম, যার থেকে চেতনার প্রথম প্রকাশ এই ঘটে যে, সকলে নিজেই নিজের প্রকৃতির দাসত্বের আওতায়।

সরকার একজন ফলপ্রসূ গ্রন্থকার ছিলেন এবং মানবিক কল্যাণ যেমন সামাজিক চক্র নিয়ম, প্রগতিশীল ব্যবহারিক তত্ত্ব, Theory of Microvitum, এবং নব্যমানবতাবাদ দর্শনের মত মানব কল্যাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তত্ত্ব সহ ব্যাপক কর্ম রচনা করেন।

          আনন্দ মার্গ দর্শন

আনন্দ মার্গ দর্শন হল সর্বানুস্যূত দর্শন অর্থাৎ এই দর্শনে মানুষের মানসিক, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক এই ত্রিবিধ ক্ষুধা নিবারণের জন্য সমগ্র বিশ্বে ১৮০-টিরও বেশি দেশে আনন্দ মার্গ প্রচারক সংঘ নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আনন্দ মার্গ দর্শনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এই সংঘটনটি এক মানবসমাজ গঠনে বদ্ধপরিকর। এটি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থাকায় সারা বিশ্বে ব্যাপক ভাবে আলোড়ন তৈরি করেছে। তাই বিভিন্ন সময় সংঘটনটিকে বহু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। তারপরেও সংঘটনটির আর্দশকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।

          প্রথম দীক্ষাদান

শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি ১৯৩৯ সালে শ্রাবণী পূর্ণিমার জ্যোৎস্নাপ্লাবিত কলকাতার গঙ্গাতীরে কাশী মিত্র ঘাটে কুখ্যাত কালী ডাকাতকে (কালীচরণ ব্যানার্জী) প্রথম দীক্ষাদান করেন। সেই কালী ডাকাতই হয়েছিলেন মহাসাধক আচার্য কালীকানন্দ অবধূত।

          প্রভাত সংগীত

শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি ১৯৮২ সাল থেকে মহাপ্রয়াণের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গান ও সুরসমেত বাংলা,সংস্কৃত,মৈথিলী,ইংরেজি,হিন্দি,উর্দু,মগাহি ও অঙ্গিকা মোট আটটি ভাষায় ৫০১৮-টি প্রভাত সংগীত রচনা করেন। তবে বেশিরভাগ গান বাংলা ভাষাতেই রচিত হয়েছে। প্রেম, ভক্তি, রহস্যবাদ, মানবধর্ম, নব্যমানবতাবাদ, অনুপ্রেরণা, উপদেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান,বিপ্লব,দেশপ্রেম ইত্যাদি বিষয়ক গানগুলো আজ বহু মানুষকে উদ্বেলিত করছে।

        নব্যমানবতাবাদ (তত্ত্ব) 

শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার প্রদত্ত নব্যমানবতাবাদ (Neohumanism)-এর ধারণা মানুষের বুদ্ধির ক্ষেত্র ও মনের মাধুর্যকে উন্মেষিত করে মানুষ, পশু,পাখি, গাছপালা, লতাগুল্ম, নদী, সাগর সমস্ত কিছুর প্রতি সেবার ভাবনাকে জাগরিত করে সমগ্র বিশ্বের কল্যাণকর পথকে প্রশস্ত করতে হবে। তিনি বলেছেন, মানুষকে যুক্তিবর্জিত ভাবাবেগের (সেন্টিমেন্ট)দ্বারা পরিচালিত হলে চলবে না।এই সমস্ত ভাবাবেগ মানব সমাজের প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। তাঁর রচিত প্রভাত সংগীতের ভাষায় "নব্যমানবতাবাদ" হল – "মানুষ যেন মানুষের তরে সব কিছু করে যায় একথাও যেন মনে রাখে পশু-পাখী তার পর নয়; তরুও বাঁচিতে চায়।।"

     প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব (প্রাউট)

মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের ২২ খন্ডের প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব (Progressive Utilization Theory) পুঁজিবাদ (Capitalism) ও সাম্যবাদ (Communism)-এর করাল গ্রাস থেকে সমগ্র বিশ্বকে মুক্ত করতে নীতিবাদের পথ ধরে আঞ্চলিক শ্রীবৃদ্ধির মাধ্যমে এক বিশ্ব মানবসমাজ গঠনের লক্ষ্যে ১৯৫৯ সাল থেকে পি.আর.সরকার প্রাউটের উপর আলোকপাত করতে থাকেন। প্রাউটিস্টরা দাবি করেন যে, প্রাউট সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিটা মানুষের ৫-টি নূন্যতম প্রয়োজন (অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা) পুর্তি পূরণ করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে প্রাউটিস্ট ইউনিভার্সালের গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে।

    কুসংস্কার বিরোধী সামাজিক বিপ্লব 

শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি শুধুমাত্র সামাজিক কুসংস্কার বিরোধী প্রবচন দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁর বিচারধারাকে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগের ব্যবস্থা করে গেছেন। তথাকথিত পুরোহিতের শোষণ ও অন্যায়মূলক বিধিনিষেধকে যুক্তির দ্বারা ব্যাখ্যা করে সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন– শিশুর নামকরণ, জন্মদিন পালন, গৃহপ্রবেশ, শিলান্যাস, পণ-বিহীন বিবাহ, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ইত্যাদি "চর্যাচর্য তৃতীয় খন্ড"-এর মন্ত্র ও বিধি অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে পালিত হচ্ছে। তবে ভারতবর্ষে কোন কোন জায়গায় আনন্দ মার্গ মতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে গিয়ে অনেক মার্গী পরিবার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছেন এবং পরে আদালতের সুবিচারে মার্গীদের জয় হয়।এজন্যই আনন্দ মার্গের বিধি অনুযায়ী সকল প্রকার কুসংস্কারমুক্ত ও শোষণহীন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো সারা বিশ্বে আজ সমাদৃত।

 তান্ডব,কৌশিকী ও ললিত মার্মিক নৃত্য 

সদাশিবের দেওয়া "তান্ডব নৃত্য"-কে আবার মানুষের কাছে যথাযথভাবে অনুশীলনযোগ্য করে নিয়ে এসেছেন শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি।এই নৃত্য শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য। এই নৃত্যের যথাযথভাবে অনুশীলন করলে পুরুষের শারীরিক দৃঢ়তা আসে, মনোবল ও সাহস বেড়ে যায় ও বিভিন্ন রোগমুক্তিও সম্ভব। আর "কৌশিকী নৃত্য" সম্পূর্ণভাবে ১৯৭৮ সালে শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি উদ্ভাবন করেন।এটি পুরুষদের অপেক্ষা মহিলাদের জন্য বেশি কার্যকরী। এই নৃত্য অনুশীলনে মহিলারা কুড়িটিরও বেশি রোগ হওয়া থেকে সহজেই মুক্তি পেতে পারে। "বাবা নাম কেবলম্" কীর্ত্তন করবার সময় আনন্দ মার্গীরা সবে মিলে "ললিত মার্মিক নৃত্য" করে থাকে। দু'হাত উপরে তুলে কীর্ত্তন করার অর্থ হল হল পরমপুরুষের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণের ভাবনা।দু'পায়ের অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে মাটিতে হাল্কা ভাবে স্পর্শ করার অর্থ হল যতটুকু আমার প্রয়োজন ততটুকুই আমি এই দুনিয়া থেকে নিচ্ছি বা নেব তার ভাবনা। এর সম্যক অর্থ হল – হে প্রভু, আমার সবকিছুই তোমার।

           রচনাবলী

শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার ধর্মশাস্ত্র,দর্শনশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র, সমাজশাস্ত্র, শিক্ষা,বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, কৃষি, পরিবেশ, সংগীত, শিশুসাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন খন্ডে প্রায় ২৫০টি মূল্যবান গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচনাবলী বিভিন্ন ভাষাতে অনূদিত হয়েছে ও হচ্ছে। যেমন– ১. আনন্দ বচনামৃতম্, ২.সুভাষিত সংগ্রহ, ৩.নমঃ শিবায় শান্তায়, ৪.নমামি কৃষ্ণসুন্দরম্, ৫.কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার, ৬.ভক্তিরস ও কীর্ত্তনমহিমা, ৭.প্রকৃত গুরু কে?, ৮.তন্ত্রই সাধনা, সাধনাই তন্ত্র, ৯.আনন্দ মার্গ (প্রারম্ভিক দর্শন), ১০. আনন্দ সূত্রম্, ১১.ভাব ও ভাবাদর্শ, ১২.যোগ মনস্তত্ত্ব, ১৩.যোগ সাধনা, ১৪.আনন্দ মার্গে চর্যাচর্য, ১৫.প্রগতিশীল ব্যবহারিক তত্ত্ব, ১৬.প্রাউটের রূপরেখা, ১৭.মানুষের সমাজ, ১৮.অভিমত, ১৯.আজকের সমস্যা, ২০.দেশপ্রেমিকদের প্রতি, ২১.পথ চলতে ইতিকথা, ২২.বাংলা ও বাঙালী, ২৩.সভ্যতার আদিবিন্দু–রাঢ়, ২৪.বাংলার মণিপ্রদীপ বরেন্দ্রভূমি, ২৫.যৌগিক চিকিৎসা ও দ্রব্যগুণ, ২৬.দ্রব্যগুণে রোগারোগ্য, ২৭.বুদ্ধির মুক্তি – নব্যমানবতাবাদ, ২৮.কৃষিকথা, ২৯.আমাদের প্রতিবেশী পশু ও পক্ষী, ৩০.মহাভারতের কথা, ৩১.নব্যমানবতাবাদ ভিত্তিক শিক্ষা, ৩২.নারীর মর্যাদা, ৩৩.বর্ণবিজ্ঞান, ৩৪.বর্ণবিচিত্রা, ৩৫.শব্দচয়নিকা ৩৬.প্রয়োজনের পরিভাষা, ৩৭.প্রভাত সঙ্গীত, ৩৮.নৃত্য-বাদ্য-গীত তিনে সংগীত, ৩৯.নীলসায়রের অতল তলে, ৪০.নীলসায়রের স্বর্ণকমল, ৪১.হট্টমালার দেশে, ৪২.হট্টমালার আরও গল্প, ৪৩.তাড়াবাঁধা ছড়া, ৪৪.নোতুন বর্ণ পরিচয়, ৪৫.প্রভাতরঞ্জনের গল্প সঞ্চয়ন, ৪৬.প্রভাতরঞ্জনের নাট্য সঞ্চয়ন, ৪৭.বিচিত্র অভিজ্ঞতা, ৪৮.প্রভাত সাহিত্যে আকল্ মন্দ্, ৪৯.কণিকায় মাইক্রোবাইটাম, ৫০. প্রমা তত্ত্ব, ইত্যাদি।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. প্রভাতরঞ্জন সরকার কর্তৃক রচিত "বাংলা ও বাঙালী" গ্রন্থে উল্লেখিত বানান: শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার; সেই অনুরূপ ব্যবহার করা হলো
  2. "A Quantum Theory of Microvita"www.microvita.info। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-১৬ 
  3. এনায়েতুল্লাহ, সোহেল। (২০০২) Understanding Sarkar: The Indian Episteme, Macrohistory and Transformative Knowledge. Leiden: Brill, আইএসবিএন ৯০০৪১২১৯৩৫, authors book page.
  4. Ishwaran 1999, পৃ. 9।

আরও পড়ুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা