আশুরা

ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী মুহররম মাসের দশম দিন

আশুরা (আরবি: عَاشُورَاء‎, প্রতিবর্ণী. ʿĀshūrāʾ[ʕaːʃuːˈraːʔ]) একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি দিবস যা ইসলামি চন্দ্র বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহররমের দশম দিনে অনুষ্ঠিত হয়।[১] আশুরা কারবালার যুদ্ধে হোসাইন ইবনে আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতকে চিহ্নিত করে। শিয়া মুসলিমরা এই দিনে নবি মুহাম্মাদের নাতি এবং তার পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া বিয়োগান্তক ঘটনাকে স্মরণ করে।[২] আশুরা সেই তারিখের সাথে মিলে যায় যে তারিখে কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে ইসলামি নবি মুহাম্মাদের নাতি ও মুহাম্মাদের পরিবারের (আহল আল-বাইত) সদস্য হোসাইন ইবনে আলীর শাহাদাত হয়। শিয়া মুসলিমদের জন্য এইভাবে এটি প্রধানত শোকের একটি উপলক্ষ যা প্রায়ই স্মারক মিছিল দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। সুন্নি মুসলিমদের জন্য, তাই, এটি প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে এবং এর বাইরে রোজা রাখার একটি উপলক্ষ।

আশুরা
Ashura 2016 mourning in Imam Hossein Square, Tehran 02.jpg
নবীর নাতির শাহাদাতের স্মরণে আশুরা, তেহরান, ২০১৬
আনুষ্ঠানিক নামআরবি: عَاشُورَاء‎‎ ʿĀshūrāʾ
অন্য নামহোসাই, তাবুইক, তাবোত, মুহররমের শোক, প্রায়শ্চিত্তের দিবস
পালনকারীমুসলিম
ধরনইসলামি ও জাতীয় (কিছু দেশে যেমন আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাহরাইন, ইরান, লেবানন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ , ভারতইরাক)
তাৎপর্যকারবালার যুদ্ধ স্মরণে, যেখানে মুহাম্মাদের নাতি হোসাইন ইবনে আলীকে হত্যা করা হয়
পালনউপবাস (রোজা), শোক
তারিখ১০ মুহররম
সংঘটনপ্রত্যেক ইসলামি বছরে একদিন

ব্যুৎপত্তিসম্পাদনা

সেমেটীয় ভাষায় আশুরা শব্দের মূল অর্থ দশম ; তাই স্মরণীয় দিবসের নামটি আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করা হয়েছে, যার অর্থ "দশম দিন"। প্রাচ্যবিদ এ. জে. ওয়েনসিঙ্কের মতে, নামটি এসেছে আরামীয় নির্ধারক সমাপ্তি সহ হিব্রু ʿāsōr থেকে।[৩] দিনটি প্রকৃতপক্ষে মাসের দশম দিন, যদিও কিছু ইসলামি পণ্ডিত ভিন্ন ভিন্ন ব্যুৎপত্তি প্রদান করেন।

হোসাইনের শাহাদাতসম্পাদনা

সংকটময় পরিবেশের মধ্যে ইয়াজিদের উত্তরাধিকার সূত্রে কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[৪][৫] উত্তরাধিকারের পরপরই ইয়াজিদ মদিনার গভর্নরকে হোসাইন ও আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তাদের আনুগত্যের (বাইয়াত) অঙ্গীকার করতে বাধ্য করার নির্দেশ দেন।[৬] হোসাইন অবশ্য এ ধরনের অঙ্গীকার করা থেকে বিরত ছিলেন যিনি বিশ্বাস করতেন যে ইয়াজিদ প্রকাশ্যে ইসলামের শিক্ষার বিরুদ্ধে যাচ্ছে এবং মুহাম্মদের সুন্নাহ পরিবর্তন করছে। তাই তিনি তার পরিবার, পুত্র, ভাই এবং হাসানের পুত্রদের নিয়ে মক্কায় আশ্রয় প্রার্থনা করার জন্য মদিনা ত্যাগ করেন।[৬]

মক্কায় হুসাইন জানতে পারে যে হজের মাঝখানে পবিত্র নগরীতে তাকে হত্যা করার জন্য ইয়াজিদ কর্তৃক ঘাতকদের পাঠানো হয়েছে। হুসাইন পরিস্থিতি বিরূপ মোড় নিয়েছে এটা না জেনে শহরের পবিত্রতা এবং বিশেষ করে কাবার পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য, নিজ হজ পরিত্যাগ করে এবং তার আশেপাশের অন্যদেরকে নিয়ে কুফায় যাওয়ার জন্য তাকে অনুপ্রাণিত করে।[৬]

পথিমধ্যে হোসাইন দেখতে পান যে তার দূত মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় নিহত হয়েছেন। হুসাইন কুফার দিকে যাওয়ার পথে উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদদের সেনাবাহিনীর অগ্রগামীর মুখোমুখি হন। হোসাইন কুফীয় সেনাবাহিনীকে সম্বোধন করে তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তারা তাকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো কারণ তারা ইমাম ছাড়া ছিল। তিনি তাদের বলেছিলেন যে তিনি তাদের সমর্থন নিয়ে কুফায় যেতে চান, কিন্তু তারা যদি এখন তার আসার বিরোধিতা করে তবে তিনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানেই ফিরে যাবেন। জবাবে সেনাবাহিনী তাকে অন্য পথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। এইভাবে, তিনি বাম দিকে ঘুরে কারবালায় পৌঁছেন, যেখানে সেনাবাহিনী তাকে আরও সামনে না যেতে বাধ্য করে এবং এমন একটি স্থানে থামতে বাধ্য করে যেখানে পানির সীমিত প্রবেশাধিকার ছিলো।[৬]

গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফীয় সেনাবাহিনীর প্রধান উমর ইবনে সা'দকে হুসাইন এবং তার সমর্থকদের ইয়াজিদের আনুগত্যের শপথ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। তিনি উমর ইবনে সা'দকে হুসাইন ও তার অনুসারীদের ফোরাতের পানিতে প্রবেশ করা থেকে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন।[৬] পরের দিন সকালে উমর ইবনে সা'দ কুফীয় সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধের ব্যবস্থা করেন।[৬]

কারবালার যুদ্ধ ১০ অক্টোবর ৬৮০ (১০ মুহররম, ৬১ হিজরি সন) সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়। হোসেনের ছোট দল এবং পরিবারের সদস্যরা (মোট প্রায় ৭২ জন পুরুষ এবং মহিলা এবং শিশু)[টীকা ১][৮][৯] উমর ইবনে সা'আদের নেতৃত্বে একটি বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এবং নদীর কাছে নিহত হয় (ফোরাত), যেখান থেকে তাদের পানি পেতে দেওয়া হয়নি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবু রায়হান আল-বিরুনি বলেন:

… তারপর তাদের শিবিরে আগুন লাগানো হয়েছিলো এবং ঘোড়ার খুর দ্বারা মৃতদেহগুলোকে পদদলিত করা হয়; মানব জাতির ইতিহাসে এমন নৃশংসতা কেউ দেখেনি।[১০]

উমাইয়া সৈন্যরা হোসাইন এবং তার পুরুষ অনুসারীদের হত্যা করার পর, তারা তাদের তাঁবু লুট করে, মহিলাদের গয়না খুলে নেয় এবং আলী ইবনে হোসাইন জয়নুল আবিদীন যে চামড়ার উপর সেজদা করেছিল তা নেয়। হুসাইনের বোন জয়নবকে ক্রীতদাস মহিলাদের সাথে দামেস্কে শাসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যখন তাকে বন্দী করা হয় এবং এক বছর পর অবশেষে মদিনায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।[১১][১২]

ইসলামি নিস্তারপর্ব দিবসসম্পাদনা

মুহাম্মাদ বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামের সুন্নি সম্প্রদায়ে আশুরার দিনে (মুহররমের ১০ তারিখ) যেদিন লোহিত সাগরে পথ তৈরি করে মূসা ও তার অনুসারীরা ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন সেই দিনটিকে স্মরণ করার জন্য রোজা রাখার সুপারিশ করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী মদিনার ইহুদিরা নিস্তারপর্ব পালনে মহররমের দশ তারিখে রোজা রাখত। সহীহ আল-বুখারির হাদিস (ইসলামী নবি মুহাম্মাদের বাণী) বর্ণনায়, মুসলিমদের এই দিনে রোজা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটাও নির্ধারিত করা হয়েছে যে এর পালন ইহুদিদের দ্বারা উদযাপন করা নিস্তারপর্বের উৎসব থেকে আলাদা হওয়া উচিত এবং তিনি বলেছিলেন যে মুসলিমদের একটির পরিবর্তে দুই দিন রোজা রাখা উচিত, হয় মুহররমের ৯ ও ১০ তম দিনে বা ১০ ও ১১ তম দিনে।[১৩]

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিতেসম্পাদনা

যদিও আশুরা সর্বদা ইসলামি বর্ষপঞ্জির একই দিনে হয়, গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি তারিখ দুটি বর্ষপঞ্জির মধ্যকার পার্থক্যের কারণে বছরব্যাপী পরিবর্তিত হয়, যেহেতু ইসলামি বর্ষপঞ্জি একটি চন্দ্র পঞ্জিকা এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি একটি সৌর পঞ্জিকা। তদুপরি, বিভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানের কারণে প্রতিটি ইসলামি মাস কখন শুরু হয় তা নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত অর্ধচন্দ্রের চেহারা দেশ থেকে দেশে পরিবর্তিত হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

হিজরি সন গ্রেগরীয় তারিখ
১৪৩৮ ১২ অক্টোবর, ২০১৬ (মধ্যপ্রাচ্য: লেবানন, ইরাক, ইরান)
১৪৩৯ ১ অক্টোবর, ২০১৭ (মধ্যপ্রাচ্য: লেবানন, ইরাক, ইরান)[১৪]
১৪৪০ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
১৪৪১ ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
১৪৪২ ৩০ আগস্ট, ২০২০[১৫]
১৪৪৩ ১৮ আগস্ট, ২০২১[১৫]
১৪৪৪ ৭ আগস্ট, ২০২২[১৫]

চিত্রশালাসম্পাদনা

পাদটীকাসম্পাদনা

  1. তার যুবক পুত্র আলী ছাড়া, যে যুদ্ধের সময় গুরুতর অসুস্থ ছিল।[৭]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

উদ্ধৃতিসম্পাদনা

  1. "Shiite History Beliefs and Differences Between Sunnis and Shiites: Muslim Sects and Sunnis"। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০১৫ 
  2. Morrow, John Andrew. Islamic Images and Ideas: Essays on Sacred Symbolism. McFarland & Co, 2013. pp. 234–36. আইএসবিএন ৯৭৮-০৭৮৬৪৫৮৪৮৬
  3. A. J. Wensinck, "Āshūrā", Encyclopaedia of Islam 2. Retrieved 8 June 2011.
  4. Encyclopaedia of Islam 
  5. Hitti, Philip K. (১৯৬১)। The Near East in History A 5000 Year Story (ইংরেজি ভাষায়)। Literary Licensing, LLC। আইএসবিএন 978-1258452452। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 
  6. Encyclopædia Iranica Online 
  7. Hoseini-e Jalali, Mohammad-Reza (১৩৮২)। Jehad al-Imam al-Sajjad (ফার্সি ভাষায়)। Musa Danesh কর্তৃক অনূদিত। Iran, Mashhad: Razavi, Printing & Publishing Institute। পৃষ্ঠা 214–17। 
  8. "در روز عاشورا چند نفر شهید شدند؟"। ২৬ মার্চ ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  9. "فهرست اسامي شهداي كربلا"Velaiat.com। ২৯ জুন ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুন ২০১২ 
  10. Chelkowski, Peter J. (১৯৭৯)। Ta'ziyeh: Ritual and Drama in Iran। New York। পৃষ্ঠা 2। 
  11. Madelung, Wilferd"ʿAlī B. Ḥosayn B. ʿAlī B. Abī Tāleb"Encyclopædia Iranica। সংগ্রহের তারিখ ১ আগস্ট ২০১১ 
  12. Donaldson, Dwight M. (১৯৩৩)। The Shi'ite Religion: A History of Islam in Persia and Irak। Burleigh Press। পৃষ্ঠা 101–11। 
  13. BukhariSahih Bukhari। Vol. 3, Book 31, Number 222। 
  14. "Holidays in Iran in 2017" 
  15. "Ashura – Calendar Date"www.calendardate.com। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

উৎসসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা