আইয়ুবীয় রাজবংশ

আইয়ুবীয় রাজবংশ (আরবি: الأيوبيون‎‎ al-Ayyūbīyūn; কুর্দি: ئەیووبیەکان ,Eyûbiyan) সালাহউদ্দিন মিশরে ১১৭১ খ্রিস্টাব্দে মিসরের ফাতিমীয় খিলাফতকে বিলুপ্ত করে মধ্যযুগীয় মিসরের সালতানাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেটি মূলতঃ কুর্দি জাতির[৮][8][৯][১০][১১] একটি সুন্নি মুসলিম জনগোষ্ঠী। সালাহউদ্দিন মূলতঃ সিরিয়ার নুরুদ্দীনের অধীনে চাকুরী করতেন। নুরুদ্দীনের সৈন্যদলকে ফাতিমীয় মিসরে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তিনি উজির হিসেবে পদোন্নতি পান। নুরুদ্দীনের মৃত্যুর পর সালাহউদ্দিন নিজেকে প্রথম মিসরের সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। নিজেকে সুলতান ঘোষণা করে তিনি দ্রুতগতিতে নিজের সালতানাতের সীমানা বৃদ্ধি করতে থাকেন। মিসরের সীমান্ত পেরিয়ে পূর্বসুরী নুরুদ্দীনের ভূমিসহ লেভান্ত, হিজায, ইয়েমেন, উত্তর নুবিয়া, তারাবুলুস, বারকাহ, দক্ষিণ আনাতোলিয়া, কুর্দীদের জাতীয় ভূমি উত্তর ইরাক পর্যন্ত প্রসারিত করেন। নিজের সালতানাতকে হিজাযের অন্তর্ভুক্ত করায় তিনিই সর্বপ্রথম খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধিটি ধারণ করেন।[১২][১৩] (মক্কা ও মদিনার উভয় মসজিদ হিজাযের অন্তভুক্ত।) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে আরব মুসলিম ভূমিগুলো একত্রিত করার জন্য সালাহউদ্দীনের নিজ শাসনের প্রথম দশ বছরে পরিচালনা করা সামরিক অভিযানগুলো তার সালতানাতের সাড়ে তিন শতাব্দীর জন্য সাধারণ সীমানা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তৈরী করে দেয়। জেরুজালেম রাজ্যসহ অধিকাংশ ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ সালাহউদ্দিনের হাতেই ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে হিত্তিনের যুদ্ধে পরাস্ত হয়েছিল। যদিও ক্রুসেডাররা ১১৯০ এর দশকে ফিলিস্তিনের উপকূল পুনরায় দখল করে নিয়েছিল।


الأيوبيون
ئەیووبی
Eyûbî
১১৭১–১২৬০/১৩৪১
আইয়ুবীয়ের জাতীয় পতাকা
Saladin's Standard.svg
বামে: আইয়ুবীয় রাজবংশের পতাকা
ডানে: সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত নিশানার সম্পাদিত চিত্র
সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর সময়ে ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুবীয় মিশরের সালতানাত (গোলাপী রঙ)
সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর সময়ে ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুবীয় মিশরের সালতানাত (গোলাপী রঙ)
অবস্থাসার্বভৌম রাষ্ট্র
(১১৭১–১২৬০)
রাজধানী
প্রচলিত ভাষা
ধর্ম
[৪]
সরকারআব্বাসীয় খিলাফতের অধীনে সালতানাত (রাজকীয় মৈত্রী)[৫]
সুলতান 
• ১১৭৪–১১৯৩
সালাহউদ্দিন (প্রথম)
• ১১৯৩–১১৯৮
আজিজ
• ১১৯৮–১২০০
মানসুর
• ১২০০–১২১৮
প্রথম আদিল
• ১২১৮–১২৩৮
কামিল
• ১২৩৮–১২৪০
দ্বিতীয় আদিল
• ১২৪০–১২৪৯
সালিহ আইয়ুব
• ১২৫০–১২৫০
শাজারাতুদ দুর
• ১২৫০–১২৫৪
আশরাফ
ইতিহাস 
• প্রতিষ্ঠা
১১৭১
• বিলুপ্ত
১২৬০/১৩৪১
আয়তন
১১৯০ প্রায়.[৬]২০,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার (৭,৭০,০০০ বর্গমাইল)
১২০০ প্রায়[৭]১৭,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার (৬,৬০,০০০ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা
• ১২শ শতক
৭,২০০,০০০ (প্রায়)
মুদ্রাদিনার
পূর্বসূরী
উত্তরসূরী
ফাতিমীয় খিলাফত
জেনগি রাজবংশ
জেরুজালেম রাজ্য
জুরাইদ
জর্জিয়া রাজ্য
আর্মেনীয় শাহ
আরতুকিদ
মামলুক সালতানাত
রাসূলীয় রাজবংশ
হাসানকাইফ আমিরাত
দনবলি রাজত্ব
সিরওয়ান আমিরাত
কিলিস আমরিাত
বিঙ্গুল আমিরাত
বর্তমানে যার অংশ
আইয়ুবীয় রাজবংশের একটি শাখা হিসন কাইফাতে ১৬শ শতক পর্যন্ত শাসন করেছে।

আইয়ুবি শাসকদের ভাষাসমূহের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে নিচে ধর্ম, ভাষা এবং জাতিতত্ত্ব অনুচ্ছেদ দেখুন।
আইয়ুবি সাম্রাজ্যের পূর্ণ অঞ্চলের জনসংখ্যা অজ্ঞাত। এই জনসংখ্যার হিসাবে শুধুমাত্র মিশর, সিরিয়া, উত্তর ইরাক, ফিলিস্তিন আর পূর্ব জর্ডান অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য আইয়ুবি সাম্রাজ্যের অঞ্চল ইয়েমেন, হিজায, নুবিয়া এবং পূর্ব লিবিয়া অন্তর্ভুক্ত নয়।

১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার সন্তানের সালতানাতের ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কিন্তু সালাহউদ্দিনের ভাই প্রথম আদিল ১২০০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান হন। পরবর্তী সকল আইয়ুবীয় সুলতানরা তারই বংশধর ছিলেন। ১২৩০ এর দশকে সিরিয়ার আমিররা মিসর এবং আইয়ুবীয় রাজত্ব থেকে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ১২৪৭ খ্রিস্টাব্দে সালিহ আইয়ুব আলেপ্পো ব্যতীত সিরিয়ার অধিকাংশ এলাকা দখল করে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে ততদিনে ইয়েমেন, হিজায আর মেসোপটেমিয়ার কিছু অংশের স্থানীয় রাজবংশের লোকেরা সেসব অঞ্চল থেকে আইয়ুবীয়দের ক্ষমতা লুপ্ত করেছিল। ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে সালিহ আইয়ুবের মৃত্যুর পর তার সন্তান মুয়াজ্জম তুরানশাহ তার উত্তরসূরী নির্বাচিত হন। কিন্তু সামান্য কিছুদিন পরেই তাকে তার মামলুক জেনারেলরা উৎখাত করেন। তারা তখন নীল বদ্বীপে ক্রুসেডারদের আক্রমণকে প্রতিহত করেছিল। এই ঘটনা মিশরের কার্যকরী আইয়ুবীয় ক্ষমতা শেষ করে দেয়। আলেপ্পোর আমির নাসির ইউসুফের নেতৃত্বে সিরিয়ার আমিরদের একটি দল মিশরকে আইয়ুবীয়দের অধীনে রাখার চেষ্টা করলেও সেটা ব্যর্থ হয়। ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলরা আলেপ্পো দখল করে নেয় এবং খুব দ্রুতই আইয়ুবীয়দের বাকি থাকা অঞ্চলগুলোও দখলে নিয়ে নেয়। কিন্তু খুব দ্রুতই মামলুকরা সেসব অঞ্চল মঙ্গোলদের হাত থেকে ফিরিয়ে নেয়। শুধুমাত্র হামায় ১৩৪১ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুবীয়দের পদত্যাগের আগপর্যন্ত সেখানে মামলুক কর্তৃক আইয়ুবীয়দের ক্ষমতা বজায় থাকে।

খুব কম সময় রাজত্ব করলেও আইয়ুবীয়রা এই অঞ্চলে খুব পরিবর্তনমূলক প্রভাব ফেলেছিল। তাদের রাজত্বের পূর্বে মিশর ফাতেমীয়দের অধীনে শিয়াদের খিলাফত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কর্তৃত্বে ছিল। কিন্তু আইয়ুবীয়দের ক্ষমতাগ্রহণের পরে মিশর প্রভাবশালী সুন্নী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠে। এছাড়া পুরো আরবের, বরং মুসলিম সাম্রাজ্যসমূহে এটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে যায়। আইয়ুবীয় শাসন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির যুগের সূচনা করে। তাদের প্রদত্ত সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সুন্নী মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপের পুনরায় উত্থানের সূচনা হয়। এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাদের প্রধান শহরগুলোতে অসংখ্য মাদরাসা নির্মাণের মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলে সু্ন্নী মুসলিমদের আধিপত্যকে জোরালোভাবে শক্তিশালী করে। তারা এমন সম্মানের একটি জায়গা হিসেবে মিশরকে প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, মামলুকদের হাতে তাদের পতনের পরও তাদের সীমানা করে দেয়া সালতানাত আরো ২৬৭ বছর মিশর, লেভান্ত, হিজায এবং ইয়েমেনে মিশর সালতানাতের ক্ষমতা বজায় থাকে। শেষপর্যন্ত ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয়দের হাতে মামলুকদের পতন ঘটলে মিশর তার প্রাধান্য হারায়।

সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনরুদ্ধারে প্রধান কৃতিত্ব রাখেন। ক্রুসেডাররা এই বিজয়ের ৯৯ বছর পূর্বে খোদ মিশর শহর পর্যন্ত দখল করে ফেলেছিল। এত শক্তিশালী রাজ্যকে বিজয় করার জন্য সালাহউদ্দীনকে তার সালতানাতের অধীন ছিল এমন বর্তমান দেশগুলোতে বর্তমান সময়েও জাতীয় বীর হিসেবেই পরিচিত। বিশেষতঃ মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন আর তার জন্মভূমি ইরাকে। সিরিয়া বাদে উল্লেখিত প্রতিটি দেশই তার আভিজাতিক ঈগলকে তাদের জাতীয় কোট অব আর্মস হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

ইতিহাসসম্পাদনা

উদ্ভবসম্পাদনা

 
সালাহউদ্দিনের আসল ঈগলের পরিলেখ। কায়রো দূর্গে, মিশর

আইয়ুবীয় রাজবংশের পূর্বপুরুষ নাজমুদ্দিন আইয়ুবের পিতা শাযী কুর্দী রাওয়াদিয়া গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাওয়াদিয়া গোত্র হাযাবানি গোত্রের অন্তর্গত ছিল।[১৪] আইয়ুবের পূর্বপুরষরা উত্তর আর্মেনিয়ার দাবিল বা দিভিন শহরে বসতি স্থাপন করেছিলেন।[৯]রাওয়াদিয়ারা দিভিন শহরে প্রভাবশালী কুর্দী গোষ্ঠী হিসেবেই প্রসিদ্ধ ছিল। তারা রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের অংশ ছিল। তুর্কী জেনারেলরা দিভিন শহর কুর্দী রাজা থেকে দখলে নিয়ে নিলে শহরের পরিস্থিতি প্রতিকূলে চলে যায়। শাযী তার পুত্র আইয়ুব ও আসাদুদ্দীন শিরকুহকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন।[১৫] সেলজুকদের পক্ষ থেকে উত্তর মেসোপটেমিয়ার সামরিক শাসক মুজাহিদুদ্দীন বেহরোজ তার বন্ধু ছিলেন। তিনি শাযীকে আমন্ত্রণ করেন এবং তিকরিতের শাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। শাযীর মৃত্যুর পর তার সন্তান আইয়ুব শহরের শাসনে তার উত্তরাধিকার হিসেবে নিযুক্ত হন, আর তার ভাই শিরকুহ তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। তারা দুই ভাই মিলে শহরের বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে সমাধান করেন। এরফলে তারা খুব দ্রুতই শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।[১৬] এরমধ্যে একটি যুদ্ধে মসুলের শাসক ইমাদউদ্দিন জেনগি আব্বাসীয় খলীফা মুসতারশিদ ও বেহরুজের কাছে পরাজিত হন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণের সময়ে জেনগি তিকরিত হয়ে মসুল পৌঁছার চিন্তা করেন। তিনি আইয়ুবের কাছে এইকাজে সহায়তা ও নিরাপত্তা চান। আইয়ুব তাকে সহায়তা করেন এবং দজলা নদীতে নৌকায় করে তাকে নিরাপদে মসুল পৌঁছে দেন।[১৭]

জেনগিকে সহায়তা করার অভিযোগে আব্বাসীয় কর্তৃপক্ষ আইয়ুবের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা করে। এদিকে আরেকটি ভিন্ন ঘটনায় বেহরুজের সাথেও তার ভাইয়ের শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি এমন, বেহরুজের একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি একজন মহিলাকে যৌন নির্যাতন করেছিল। যার ফলে শিরকুহ তাকে হত্যা করেন। এই উভয় ঘটনার প্রভাবে আব্বাসীয় দরবার থেকে আইয়ুব এবং শিরকুহ উভয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু তারা গ্রেফতার হবার আগেই তিকরিত থেকে পলায়ন করে মসুল চলে যান। এই ঘটনা ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দের।[১৮] তারা মসুল পৌঁছলে জেনগি তাদের সকল বন্দোবস্ত করে দেন। তাদেরকে নিজের কাজে নিযুক্ত করে দেন। আইয়ুব বালবেকের সেনাপতি নিযুক্ত হন আর শিরকুহকে জেনগির পুত্র নুরউদ্দিনের বাহিনীতে যুক্ত করা হয়। ইতিহাসবিদ আবদুল আলীর মতে, জেনগি পরিবারের তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই আইয়ুবীয় পরিবার প্রসিদ্ধি লাভ করে।[১৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Magill 1998, পৃ. 809
  2. France 1998, পৃ. 84
  3. Ahmed, Rumee (২৫ অক্টোবর ২০১৮)। The Oxford Handbook of Islamic Law। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 311। আইএসবিএন 9780191668265 
  4. Eliade, Mircea (১৯৮৭)। "Kalam"The Encyclopedia of Religion8: 238। আইএসবিএন 9780029097908 
  5. Jackson 1996, p. 36
  6. Turchin, Adams এবং Hall 2006, পৃ. 223
  7. Taagepera 1997, পৃ. 495।
  8. Jackson 1996, পৃ. 36।
  9. Humphreys 1987
  10. Özoğlu 2004, পৃ. 46
  11. Bosworth 1996, পৃ. 73
  12. Fakkar, Galal (২৭ জানুয়ারি ২০১৫)। "Story behind the king's title"Arab NewsJeddah। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জুন ২০১৬ 
  13. Eiselen 1907, পৃ. 89
  14. The biographer Ibn Khallikan wrote, "Historians agree in stating that [Saladin's] father and family belonged to Duwin. ... They were Kurds and belonged to the Rawādiya [sic], which is a branch of the great tribe al-Hadāniya": Minorsky (1953), p. 124.
  15. Humphreys 1987
  16. Ali 1996, পৃ. 27
  17. Ali 1996, পৃ. 28
  18. Ali 1996, পৃ. 28