টুঙ্গিপাড়া উপজেলা

গোপালগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা

টুংগীপাড়া উপজেলা বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা যা ১টি পৌরসভা এবং ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এটি ঢাকা বিভাগের অধীন গোপালগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে একটি এবং গোপালগঞ্জ জেলার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। এর পূর্বে কোটালীপাড়া উপজেলা, পশ্চিম ও উত্তরে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা এবং দক্ষিণে চিতলমারীবাগেরহাট উপজেলা অবস্থিত। এই উপজেলার উপর দিয়ে মধুমতি নদী ও বাঘিয়ার নদী প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সংসদীয় আসন গোপালগঞ্জ-৩। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা ও কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-৩ আসনটি জাতীয় সংসদে ২১৭ নং আসন হিসেবে চিহ্নিত।[১]

টুংগীপাড়া
উপজেলা
টুংগীপাড়া বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
টুংগীপাড়া
টুংগীপাড়া
বাংলাদেশে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২২°৫৩′৪৯″ উত্তর ৮৯°৫২′৫৪″ পূর্ব / ২২.৮৯৬৯৪° উত্তর ৮৯.৮৮১৬৭° পূর্ব / 22.89694; 89.88167স্থানাঙ্ক: ২২°৫৩′৪৯″ উত্তর ৮৯°৫২′৫৪″ পূর্ব / ২২.৮৯৬৯৪° উত্তর ৮৯.৮৮১৬৭° পূর্ব / 22.89694; 89.88167 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগঢাকা বিভাগ
জেলাগোপালগঞ্জ জেলা
আয়তন
 • মোট১২৭.২৫ বর্গকিমি (৪৯.১৩ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)
 • মোট৯৯,৭০৫ জন
সাক্ষরতার হার
 • মোট৫৩%
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড৮১০০ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৩০ ৩৫ ৯১
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

এ উপজেলার পাটগাতি ইউনিয়নের টুংগীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান[২]

পটভূমিসম্পাদনা

নামকরণসম্পাদনা

কথিত আছে পারস্য এলাকা থেকে আগত কতিপয় মুসলিম সাধক অত্র এলাকার প্লাবিত অঞ্চলে টং বেঁধে বসবাস করতে থাকেন এবং কালক্রমে ঐ টং থেকেই এই এলাকার নামকরন করা হয় টুংগীপাড়া। বর্তমানে কালের বিবর্তনে বড়-বড় দালান-কোঠার মাঝে হারিয়ে যেতে বসেছে এ ঐতিহ্য। তবে উপজেলার বিলাঞ্চল ও নীচু এলাকা সাধারণ মানুষ এখনো এ ধরনের টং বেঁধে ঘর বানিয়ে বসবাস করে থাকে।[৩]

মুক্তিযুদ্ধে টুংগীপাড়াসম্পাদনা

১৭ মার্চে পাটগাতি বাজারে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ধানমন্ডি ৩২ থেকে শেখ জামাল পালিয়ে গেলে তাকে খোঁজ করতে হানাদার বাহিনী ১৯ মে ১৯৭১ তারিখে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে চলে আসে। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ঐ দিন হানাদার বাহিনী নির্মম ভাবে এই গ্রামের ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে। ভারতের বাগুন্ডিয়া ক্যাম্প থেকে মূলত টুংগীপাড়ার অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষন ও অস্ত্র নিয়েছিলেন। টুংগীপাড়ায় বড় ধরনের কোন যুদ্ধ হয়নি। কারণ সে সময় এ অঞ্চল ছিল দুর্গম। এ কারণে হানাদার বাহিনী নদী দিয়ে গানবোট নিয়ে টহল দিত। তাই এ অঞ্চলের যোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেছে।[৪]

ভৌগোলিক সীমানাসম্পাদনা

টুংগীপাড়া উপজেলার ভৌগলিক অবস্থান ২২°৫৪′০০″ উত্তর ৮৯°৫৩′০০″ পূর্ব / ২২.৯০০০° উত্তর ৮৯.৮৮৩৩° পূর্ব / 22.9000; 89.8833। এই উপজেলাটির আয়তন ১২৭.২৫ বর্গকিলোমিটার। টুংগীপাড়া উপজেলার কেন্দ্র থেকে পূর্বে কোটালীপাড়া উপজেলা, পশ্চিম ও উত্তরে গোপালগঞ্জ সদর এবং দক্ষিণে চিতলমারী ও বাগেরহাট উপজেলা অবস্থিত। এই উপজেলার উপর দিয়ে মধুমতি নদী, বাঘিয়ার নদী, শৈলদাহ নদী সহ বেশ কয়েকটি নদী প্রবাহিত হয়েছে।[৫]

প্রশাসনসম্পাদনা

১৯৭৪ সালে গোপালগঞ্জ সদর থানাকে ভেঙ্গে টুংগীপাড়া থানা গঠন করা হয়। পরবর্তীতে, ১৯৯৫ সালে এটি থানা থেকে উপজেলায় রুপান্তরিত হয়। টুংগীপাড়া উপজেলায় ১টি পৌরসভা, ৯টি ওয়ার্ড, ৫টি ইউনিয়ন, ৩৩টি মৌজা ও ৬৯টি গ্রাম রয়েছে।[৬]

ইউনিয়নগুলো হলো

১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারী টুংগীপাড়াকে পৌরসভায় রূপান্তর করা হয় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে পৌরসভাটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক দ্বিতীয় শ্রেণীর (খ-শ্রেণী) পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃত। পৌরসভার আয়তন ২.৫৭ বর্গ কি:মি:। পৌরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ৯টি। ১৯৯৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি প্রথম পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে শেখ আহমেদ হোসেন মির্জা পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থনীতিসম্পাদনা

টুংগীপাড়ার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি যা মোট আয়ের ৭০.০৮%। এছাড়া অকৃষি শ্রমিক ২.১৯%, ব্যবসা ১১.৩৬%, পরিবহন ও যোগাযোগ ০.৯৯%, চাকরি ৮.৮২%, নির্মাণ ০.৫৮%, ধর্মীয় সেবা ০.৪১%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৩৫% এবং অন্যান্য ৫.২২%।[৭] এখানকার প্রধান ফসল ধান, পাট, সরিষা, ডাল, মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী, আখ, গম, পান, শাকসবজি ইত্যাদি। উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, নারিকেল, তাল, পেয়ারা, লেবু, লিচু অন্যতম। এছাড়াও এই উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চাষ করা হয়।

শিক্ষাসম্পাদনা

২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী টুংগীপাড়ার গড় সাক্ষরতার হার শতকরা ৫৬.৬%; (পুরুষ ৫৭.২%, নারী ৫৬.০%)। এ উপজেলায় ৪২ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৩টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল, ৪১টি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৬টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি সরকারি ও ১ টি বেসরকারি কলেজ, ১৪টি মাদ্রাসা এবং ০৩টি এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে।[৫][৬]

এই উপজেলার উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ যেটি ১৯৮৬ সালের ১৩ই সেপ্টম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা যেটি ১৯৩৭ সালে শামসুল হক ফরিদপুরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে এটি একটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয় যেখানে ভর্তির মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাজীবন শুরু করেন।[৮]

স্বাস্থ্যসম্পাদনা

সামগ্রিকভাবে এই উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতই। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ অপুষ্টি, পরিবেশগত স্যানিটেশন সমস্যা, ডায়াবেটিস, সংক্রামক রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। উপজেলায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি সরকারি হাসপাতালের সাথে সাথে ২টি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। ৫টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ১টি পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক এবং ৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এছাড়াও এখানে শেখ রাসেল দুঃস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পূর্ণবাসন কেন্দ্র নামে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।[৯]

যোগাযোগ ব্যবস্থাসম্পাদনা

টুংগীপাড়া উপজেলায় কোনো জাতীয় বা আঞ্চলিক মহাসড়ক নেই। টুংগীপাড়াকে জেলা সড়ক জেড৮৪৩০ (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া সড়ক) কোটালীপাড়া উপজেলার সাথে এবং জেলা সড়ক জেড৭০৫৪ (চিতলমারী-টুংগীপাড়া-পাটগাতি সড়ক) চিতলমারী হয়ে বাগেরহাট জেলার সাথে স্থলপথে সংযুক্ত করেছে। টুংগীপাড়া থেকে ঢাকাগামী অধিকাংশ বাস গোপালগঞ্জ হয়ে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, গুলিস্থান ও গাবতলী বাস টার্মিনালে এসে থামে। টুংগীপাড়া জিরো পয়েন্ট থেকে গোপালগঞ্জ জেলা সদরের দূরুত্ব ২২ কিলোমিটার, রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার।[৬]

এ উপজেলায় কোন রেললাইন বা ট্রেন যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। এখানে এক ইউনিয়ন হতে অন্য ইউনিয়নে চলাচল বা অভ্যন্তরীন নৌযাতায়াতের এর জন্য স্থানীয় নৌযান রয়েছে। এছাড়া এই উপজেলার পাটগাতী, বাঁশবাড়ীয়া এবং তারাইল নৌ-বন্দর সমূহ থেকে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুর, নাজিরপুর, বাগেরহাট, বানারীপাড়া, কোটালীপাড়াসহ অন্যান্য স্থানে নৌ-যান চলাচল করে থাকে।[১০]

নদনদীসম্পাদনা

টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় তিনটি নদী আছে। সেগুলো হচ্ছে ঘাঘর নদী, মধুমতি নদী, দাড়ির গাঙ নদী, কাটাখাল নদী এবং শালদহ নদী[১১][১২]

উল্লেখযোগ্য স্থানসম্পাদনা

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "জাতীয় সংসদীয় আসনবিন্যাস (২০১৩) গেজেট" (PDF)বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ১৬ জুন ২০১৫ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৬ আগস্ট ২০১৫ 
  2. Rashid, Harun-or। "Mujib, (Bangabandhu) Sheikh Mujibur"Banglapedia (ইংরেজি ভাষায়)। Asiatic Society of Bangladesh। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৭-০৬ 
  3. "উপজেলার ঐতিহ্য-টুঙ্গিপাড়া উপজেলা"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৫ 
  4. [১] ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৬ আগস্ট ২০১৩ তারিখে, additional text
  5. COMMUNITY REPORT: GOPALGANJ (PDF) (ইংরেজি ভাষায়)। ঢাকা: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। জুলাই ২০১৩। আইএসবিএন 978-984-90056-7-4। ২০১৭-০৯-২৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৫ 
  6. জেলা পরিসংখান ২০১১ (PDF) (ইংরেজি ভাষায়)। ঢাকা: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ডিসেম্বর ২০১৩। ৩ মে ২০২০ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুন ২০২০ 
  7. "টুঙ্গিপাড়া উপজেলা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৫ 
  8. Kadir, Muhammad Nurul (২০০৪)। Independence of Bangladesh in 266 days: history and documentary evidence (ইংরেজি ভাষায়)। Mukto Publishers। আইএসবিএন 978-984-32-0858-3 
  9. "এক নজরে টুংগীপাড়া"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (ইংরেজি ভাষায়)। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৫ 
  10. "টুঙ্গিপাড়া উপজেলা"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৫ 
  11. ড. অশোক বিশ্বাস, বাংলাদেশের নদীকোষ, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৯৮, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৮৯৪৫-১৭-৯
  12. মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক (ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি। ঢাকা: কথাপ্রকাশ। পৃষ্ঠা ৬০৬। আইএসবিএন 984-70120-0436-4 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা