খ্রিস্ট ধর্ম

একেশ্বরবাদী আব্রাহামীয় ধর্ম।
(Christianity থেকে পুনর্নির্দেশিত)

খ্রিস্টধর্ম একটি অব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম, যা মধ্যপ্রাচ্যের নাসরৎ থেকে আগত ধর্মপ্রচারক যীশুর জীবন ও শিক্ষার ওপর ভিত্তিতে প্রচলিত হয়। খ্রিস্টধর্মের অনুসারীগণ খ্রিস্টান হিসেবে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করেন যে যীশু হলেন খ্রীষ্ট (অর্থাৎ "ইশ্বরের নির্বাচিত") যাঁর মশীহ (অর্থাৎ "মানবজাতির ত্রাতা") হিসেবে আগমন সম্পর্কে হিব্রু বাইবেল তথা পুরাতন নিয়মে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে এবং নূতন নিয়মে তা বিবৃত হয়েছে।[১] অনুসারীর সংখ্যা অনুযায়ী খ্রিস্টধর্ম বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম; বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৩০ কোটি খ্রিস্টান বাস করে।[২]

খ্রিস্টধর্ম সাংস্কৃতিকভাবে এর পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য শাখাগুলোর মধ্যে এবং পরিত্রাণের প্রকৃতি ও প্রতিপাদন, যাজকাভিষেক, মণ্ডলীতত্ত্ব ও খ্রিস্টতত্ত্ব বিষয়ক মতাদর্শে বৈচিত্র্যময়। খ্রিস্টানদের সাধারণ ধর্মমত অনুসারে যীশু হলেন ঈশ্বরের পুত্র—মাংসে মূর্তিমান বাক্য—যিনি পরিচর্যা করেছিলেন, যন্ত্রণাভোগ করেছিলেন এবং ক্রুশারোহণ করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, কিন্তু এর পরে তিনি মানবজাতির পরিত্রাণের জন্য পুনরুত্থিত হয়েছিলেন, যাকে বাইবেলে সুসমাচার বলে অবিহিত করা হয়েছে। মথি, মার্ক, লূকযোহন লিখিত চারটি সুসমাচারের পাশাপাশি এর পটভূমি হিসেবে ইহুদি পুরাতন নিয়ম হল যীশুর জীবন ও শিক্ষার বিবরণী।

খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের যিহূদিয়া প্রদেশে একটি দ্বিতীয় মন্দির ইহুদি উপদল হিসেবে খ্রিস্টধর্ম যাত্রা শুরু করে। প্রারম্ভিক নিপীড়ন সত্ত্বেও যীশুর প্রেরিতগণ ও তাঁদের অনুসারীরা লেভান্ত, ইউরোপ, আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া, ট্রান্সজর্ডান, মিশরইথিওপিয়ায় ছড়িয়ে পড়েন। এটি দ্রুত পরজাতীয় ঈশ্বরভীরুদের আকৃষ্ট করে যা একে যিহূদী রীতিনীতি থেকে ভিন্নপথে চালিত করে। ৭০ খ্রীষ্টাব্দে যিরূশালেমের পতনের পর দ্বিতীয় মন্দিরভিত্তিক ইহুদিধর্মের অবসান ঘটে এবং খ্রিস্টধর্ম ধীরেধীরে ইহুদিধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সম্রাট মহান কনস্টান্টিন মিলান ফরমান (৩১৩) জারি করার মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি নিকিয়ার প্রথম পরিষদের (৩২৫) আহ্বান করেন যেখানে প্রারম্ভিক খ্রিস্টধর্মকে সংহত করা হয় যা রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় মণ্ডলীতে (৩৮০) পরিণত হয়। প্রধান বিচ্ছেদগুলোর পূর্বে খ্রিস্টধর্মের সংযুক্ত মণ্ডলীর ইতিহাসকে প্রায়শই “মহামণ্ডলী” বলে অবিহিত করা হয় (যদিও তৎকালে প্রচলিত মতের বিরোধী রহস্যবাদী খ্রিস্টান ও ইহুদি খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব ছিল)। খ্রিস্টতত্ত্বকে কেন্দ্র করে এফেসুসের পরিষদের (৪৩১) পর পূর্ব মণ্ডলী এবং চ্যালসিডনের পরিষদের (৪৫১) প্রাচ্য অর্থডক্সি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।[৩] অন্যদিকে রোমের বিশপের কর্তৃত্বকে কেন্দ্র করে পূর্ব অর্থডক্স মণ্ডলীক্যাথলিক মণ্ডলীর মধ্যে মহাবিচ্ছেদ (১০৫৪) ঘটে। ধর্মতাত্ত্বিক ও মণ্ডলীতাত্ত্বিক বিতর্ককে—প্রধানত আত্মপক্ষসমর্থন ও পোপীয় আধিপত্য—কেন্দ্র করে সংস্কার যুগে (১৬শ শতাব্দী) প্রোটেস্ট্যান্টবাদ পূর্ব ক্যাথলিক মণ্ডলীসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসংখ্য উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশে, বিশেষত ইউরোপে প্রাচীনযুগের শেষভাগ থেকে মধ্যযুগে, খ্রিস্টধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[৪][৫][৬][৭][৮] আবিষ্কারের যুগের (১৫শ–১৭শ শতাব্দী) পর মিশনারি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম আমেরিকা, ওশেনিয়া, সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।[৯][১০][১১]

খ্রিস্টধর্মের চারটি বৃহত্তম শাখা হল ক্যাথলিক মণ্ডলী (১.৩ বিলিয়ন/৫০.১%), প্রোটেস্ট্যান্টবাদ (৯২০ মিলিয়ন/৩৬.৭%), পূর্ব অর্থডক্স মণ্ডলী (২৩০ মিলিয়ন) ও প্রাচ্য অর্থডক্সি (৬২ মিলিয়ন/১১.৯%),[১২][১৩] যাদের মধ্যে ঐক্যের (বিশ্বব্যাপ্তিবাদ) বিভিন্ন প্রচেষ্টা জারি রয়েছে।[১৪] পাশ্চাত্যে আনুগত্যের দিক দিয়ে পতন হওয়া সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্ম অঞ্চলটির প্রভাবশালী ধর্ম যেখানে প্রায় ৭০% জনগণ নিজেদের খ্রিস্টান হিসেবে চিহ্নিত করে।[১৫] বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ আফ্রিকাএশিয়ায় খ্রিস্টানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।[১৬] পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায়, খ্রিস্টানেরা নিপীড়নের শিকার হয়।[১৭][১৮]

অনুসারীর সংখ্যা ও মণ্ডলীসমূহ

অনুসারীর সংখ্যা অনুযায়ী খ্রিস্টধর্ম বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম।[১৯][২০] সারা বিশ্বে প্রায় ২৪০ কোটি খ্রিস্টধর্মের অনুসারী আছে,[২১][২২][১৫] যা বিশ্ব জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রে খ্রিস্টধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম।[১৫] বর্তমান যুগে খ্রিস্টধর্ম বেশ কিছু শাখা বা মণ্ডলীতে বিভক্ত। এদের মধ্যে ৫টি প্রধান শাখা হল রোমান ক্যাথলিক মণ্ডলী (১৩০ কোটি অনুসারী), প্রতিবাদী মণ্ডলী (৯২ কোটি অনুসারী), পূর্বী প্রথানুবর্তী মণ্ডলী (২৭ কোটি অনুসারী[১৪]), প্রাচ্যদেশীয় প্রথানুবর্তী মণ্ডলী (৮ কোটি অনুসারী) এবং ইঙ্গ (অ্যাংলিকান) মণ্ডলী (৮৫ লক্ষ)। এদের বাইরেও বিশ্বের সর্বত্র ভিন্ন ভিন্ন মতের অনেক মণ্ডলী রয়েছে।

উদ্ভব (যিশুখ্রিস্টের জীবন)

মধ্যপ্রাচ্যের (বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের উত্তরভাগে অবস্থিত) ঐতিহাসিক গালীল অঞ্চলের নাসরত শহর থেকে আগত ইহুদি বংশোদ্ভূত ধর্মীয় নেতা যিশুখ্রিস্টের জীবন ও শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে খ্রিস্টীয় ১ম শতকে ধর্মটির উৎপত্তি হয়। ঐতিহাসিকভাবে নাসরতের যিশু খ্রিস্টীয় ১ম শতকের প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের প্রদেশ যিহূদিয়াতে (ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলের পার্বত্য দক্ষিণাংশ) বসবাসকারী একজন ধর্মপ্রচারক ও নৈতিক শিক্ষক ছিলেন। যিশুর পালক বাবা যোসেফ ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী। কিন্তু যিশুর অনুসারীরা অর্থাৎ খ্রিস্টানেরা বিশ্বাস করেন যে যিশু স্বয়ং ঈশ্বরের একমাত্র সন্তান। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থগুলিতে বর্ণিত কাহিনী অনুযায়ী তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি সারাতে পারতেন, এমনকি মৃত মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারতেন। এসব অলৌকিক ঘটনা সম্পাদনের প্রেক্ষিতে যিশুকে ইহুদিদের রাজা হিসেবে দাবী করা হয়। এই উপাধি ব্যবহার ও নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে দাবী করার দোষে জেরুসালেমের ইহুদি নেতাদের নির্দেশে যিশুকে জেরুসালেমে গ্রেপ্তার করা হয়। ইহুদিদের সর্বোচ্চ আদালতে তার বিচার হয় ও ইহুদিরা যিহূদিয়ার স্থানীয় রোমান প্রশাসক পোন্তিউস পীলাতকে অনুরোধ করে যেন যিশুকে মৃত্যদণ্ড দান করা হয়। পীলাত প্রথমে যিশুকে নিরপরাধ গণ্য করলেও পরবর্তীতে যাজকদের প্ররোচণায় উন্মত্ত ইহুদি জনতার ইচ্ছাপূরণ করতে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করান।[২৩]

ধর্মগ্রন্থ

খ্রিস্টধর্মের অনুসারীরা একটি ধর্মীয় পুস্তকসমগ্র অনুসরণ করে, যার সামগ্রিক নাম বাইবেল। বাইবেলের পুস্তকগুলিকে দুইটি বড় অংশে ভাগ করা হয়েছে: পুরাতন নিয়মনতুন নিয়ম। খ্রিস্টানেরা বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের সমস্ত পুস্তককে ঈশ্বরের পবিত্র বাণী হিসেবে গণ্য করেন। পুরাতন নিয়ম অংশটি হিব্রু বাইবেল (বা তানাখ) এবং অব্রাহামের পৌত্র যাকব তথা ইসরায়েলের বংশধরদের লেখা অনেকগুলি ধর্মীয় পুস্তক নিয়ে গঠিত। খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা ক্যাথলিক মণ্ডলীতে অনুমোদিত পুস্তকতালিকা অনুযায়ী বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অংশে ৪৬টি পুস্তক আছে। এই পুস্তকগুলি বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক পর্যন্ত মূলত হিব্রু ভাষাতে রচিত হয়।

বাইবেলের দ্বিতীয় অংশটির নাম নতুন নিয়ম, যা ২৭টি পুস্তক নিয়ে গঠিত। এই পুস্তকমালাতে যিশুর জীবন, শিক্ষা ও খ্রিস্টীয় ১ম শতকে তার অনুসারীদের কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে।[২৪] নতুন নিয়মের বিভিন্ন পুস্তক খ্রিস্টীয় ১ম শতকেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সেসময়ে অতি প্রচলিত গ্রিক ভাষাতে রচিত হয়, পরে খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতকে এসে ৩৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাথলিক মণ্ডলীর ধর্মীয় নেতারা উত্তর আফ্রিকার কার্থেজ শহরে আয়োজিত একটি সম্মেলনে নতুন নিয়মের পুস্তকগুলির একটি সঠিক তালিকা অনুমোদন ও প্রণয়ন করেন। নতুন নিয়মের প্রথম চারটি পুস্তককে একত্রে সুসমাচার নামে ডাকা হয়; এগুলিতে যিশুর জীবন, তার মৃত্যু এবং মৃত অবস্থা থেকে তার পুনরুত্থানের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

খ্রিস্টানদের বিশ্বাস

খ্রিস্টানেরা বিশ্বাস করে একজন মাত্র ঈশ্বর স্বর্গমর্ত্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ ঈশ্বর জগতের পিতা। পিতারূপী ঈশ্বর প্রতিটি মানুষকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন এবং তার সাথে সম্পর্ক রাখতে চান। কিন্তু প্রতিটি মানুষ পাপ করার প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে (যার উৎস প্রথম মানব আদমের আদিপাপ)। এই সব ছোট-বড় পাপের কারণে মানুষ ও জগতের পিতা ঈশ্বরের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। খ্রিস্টানেরা বিশ্বাস করে যে যিশুখ্রিস্ট ঈশ্বরেরই দ্বিতীয় একটি রূপ; তিনি ঈশ্বরের একমাত্র প্রকৃত পুত্র। ঈশ্বরের তৃতীয় আরেকটি রূপ হল পবিত্র আত্মা। পবিত্র আত্মা বিভিন্ন নবী বা ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে মানবজাতির সাথে যোগাযোগ করেছে। পবিত্র আত্মারূপী ঈশ্বর মানব কুমারী মেরির গর্ভে পুত্ররূপী ঈশ্বর তথা যিশুখ্রিস্টের জন্ম দেন, যার সুবাদে যিশুখ্রিস্ট রক্তমাংসের মানুষের রূপ ধারণ করে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসেন। পবিত্র আত্মারূপী ঈশ্বরের সুবাদে পুত্ররূপী ঈশ্বর যিশুখ্রিস্ট পৃথিবীতে বহু অলৌকিক কাজ সম্পাদন করেন। শেষ পর্যন্ত যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণাভোগ করে মৃত্যুবরণ করে সমগ্র মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেন।[২৫] কিন্তু তিন দিন পরে তিনি মৃত্যুকে পরাজিত করে পুনরুজ্জীবিত হন এবং স্বর্গে আরোহণ করেন যেখানে তিনি পিতারূপী ঈশ্বরের ডান পাশের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ঈশ্বর উপহার হিসেবে সবাইকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। সময়ের যখন সমাপ্তি হবে, তখন যিশু আবার পৃথিবীতে ফেরত আসবেন এবং শেষ বিচারে সমস্ত মানবজাতির (মৃত বা জীবিত) বিচার করবেন। যারা যিশুখ্রিস্টে বিশ্বাস আনবে এবং ঈশ্বরের ক্ষমা গ্রহণ করবে, তারাই ভবিষ্যতে শেষ বিচারের দিনে পরিত্রাণ পাবে ও স্বর্গে চিরজীবন লাভ করবে। পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিতে যে মসিহ বা ত্রাণকর্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে যিশুই সেই ত্রাণকর্তা। তারা যিশুকে একজন নৈতিক শিক্ষক, অনুকরণীয় আদর্শ এবং প্রকৃত ঈশ্বরকে উদ্ঘাটনকারী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে।

বিকাশ ও বিস্তার

খ্রিস্টধর্ম প্রথমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলিতে ইহুদিধর্মের একটি উপ-সম্প্রদায় হিসেবে যাত্রা শুরু করে।[২৬][২৭] খ্রিস্টের মৃত্যুর পরে তার আদি বারো শিষ্য জেরুসালেম থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়েন। কয়েক দশকের মধ্যে খ্রিস্টে বিশ্বাসী অনুসারীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বারো শিষ্যের বাইরে খ্রিস্টধর্মের বাণীর আদি প্রচারকদের মধ্যে সন্ত পৌল (৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ- আনু. ৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; বাইবেলের নতুন নিয়মের ২৭টি পুস্তকের মধ্যে ১৩টিই তিনি রচনা করেন। খ্রিস্টীয় ১ম শতকেই বারো শিষ্যদের সবার মৃত্যু হয়। এরপর ২য় ও ৩য় শতকে খ্রিস্টের বারো শিষ্যের উত্তরসূরী ধর্মবিদেরা খ্রিস্ট ধর্মের তত্ত্ব নির্মাণ ও প্রচার অব্যাহত রাখেন; তাদের রচনার অংশবিশেষ নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসময় খ্রিস্টধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ অ-ইহুদি ধর্ম হিসেবে রোমান সাম্রাজ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। একই সাথে ধর্মটি মধ্যপ্রাচ্য, ইথিওপিয়া (আকসুম সাম্রাজ্য) ও আন্তঃককেশিয়ার বিশাল অংশে এবং এশিয়ার কিয়দংশে ছড়িয়ে পড়ে। আকসুম সাম্রাজ্য প্রথম সাম্রাজ্য হিসেবে খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে। ৪র্থ শতকে রোমান সম্রাট কোনস্তানতিন খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং তিনি ৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে মিলানের রাজকীয় অধ্যাদেশবলে খ্রিস্টধর্মকে আইনবিরুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করেন। এর প্রেক্ষিতে এটি সমগ্র রোমান সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কোনস্তানতিনের আহুত নিকায়েয়া-র (বর্তমান তুরস্কের ইজনিক শহর) ধর্মীয় সম্মেলনে খ্রিস্টধর্মের ধর্মীয় বিশ্বাসের সারসংক্ষেপ প্রথমবারের মত রচিত হয়। এতে বাইবেলে বর্ণিত পিতারূপী ঈশ্বর, পুত্ররূপী ঈশ্বর (যিশু) ও পবিত্র আত্মারূপী ঈশ্বর - এই তিন সত্তাই যে একই ঈশ্বরের তিন রূপ, এই ত্রিত্ববাদ ধারণাটি গৃহীত হয়। বর্তমানে খ্রিস্টান মণ্ডলীগুলির সিংহভাগ ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী; তবে মূলধারার বাইরে অনেক ছোট ছোট মণ্ডলী এতে বিশ্বাস করে না। ৫ম শতকে খ্রিস্টধর্মের নেতৃস্থানীয় ধর্মযাজকেরা ধর্মগ্রন্থসমগ্র বাইবেলের সংকলন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন। মধ্যযুগে এসে ইউরোপের বাকি অংশগুলিরও খ্রিস্টধর্মায়ন ঘটে। সে সময় খ্রিস্টানরা মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং ভারতের অংশবিশেষেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বাস করত।[২৮] আবিষ্কারের যুগের পরে উপনিবেশ স্থাপন ও জোরালো ধর্মপ্রচারণার সুবাদে খ্রিস্টধর্ম সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের অন্যত্র (যেমন পূর্ব এশিয়া বিশেষত ফিলিপাইন) ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী বিরাজমান প্রধান ধর্ম।

টীকা

তথ্যসূত্র

  1. Woodhead 2004, পৃ. n.p
  2. "World's largest religion by population is still Christianity"Pew Research Center (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  3. S. T. Kimbrough, সম্পাদক (২০০৫)। Orthodox and Wesleyan Scriptural understanding and practice। St Vladimir's Seminary Press। আইএসবিএন 978-0-88141-301-4 
  4. Religions in Global Society. p. 146, Peter Beyer, 2006
  5. Cambridge University Historical Series, An Essay on Western Civilization in Its Economic Aspects, p. 40: Hebraism, like Hellenism, has been an all-important factor in the development of Western Civilization; Judaism, as the precursor of Christianity, has indirectly had had much to do with shaping the ideals and morality of western nations since the christian era.
  6. Caltron J.H Hayas, Christianity and Western Civilization (1953), Stanford University Press, p. 2: "That certain distinctive features of our Western civilization—the civilization of western Europe and of America—have been shaped chiefly by Judaeo – Graeco – Christianity, Catholic and Protestant."
  7. Horst Hutter, University of New York, Shaping the Future: Nietzsche's New Regime of the Soul And Its Ascetic Practices (2004), p. 111: three mighty founders of Western culture, namely Socrates, Jesus, and Plato.
  8. Fred Reinhard Dallmayr, Dialogue Among Civilizations: Some Exemplary Voices (2004), p. 22: Western civilization is also sometimes described as "Christian" or "Judaeo- Christian" civilization.
  9. Muslim-Christian Relations। Amsterdam University Press। ২০০৬। আইএসবিএন 978-90-5356-938-2। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০০৭The enthusiasm for evangelization among the Christians was also accompanied by the awareness that the most immediate problem to solve was how to serve the huge number of new converts. Simatupang said, if the number of the Christians were double or triple, then the number of the ministers should also be doubled or tripled and the tole of the laity should be maximized and Christian service to society through schools, universities, hospitals and orphanages, should be increased. In addition, for him the Christian mission should be involved in the struggle for justice amid the process of modernization. 
  10. Fred Kammer (১ মে ২০০৪)। Doing Faith JusticePaulist Press। পৃষ্ঠা 77। আইএসবিএন 978-0-8091-4227-9। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০০৭Theologians, bishops, and preachers urged the Christian community to be as compassionate as their God was, reiterating that creation was for all of humanity. They also accepted and developed the identification of Christ with the poor and the requisite Christian duty to the poor. Religious congregations and individual charismatic leaders promoted the development of a number of helping institutions-hospitals, hospices for pilgrims, orphanages, shelters for unwed mothers-that laid the foundation for the modern "large network of hospitals, orphanages and schools, to serve the poor and society at large." 
  11. Christian Church Women: Shapers of a Movement। Chalice Press। মার্চ ১৯৯৪। আইএসবিএন 978-0-8272-0463-8। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০০৭In the central provinces of India they established schools, orphanages, hospitals, and churches, and spread the gospel message in zenanas. 
  12. "Christian Traditions"Pew Research Center's Religion & Public Life Project। ১৯ ডিসেম্বর ২০১১। About half of all Christians worldwide are Catholic (50%), while more than a third are Protestant (37%). Orthodox communions comprise 12% of the world’s Christians. 
  13. "Status of Global Christianity, 2019, in the Context of 1900–2050" (PDF)। Center for the Study of Global Christianity। 
  14. Peter, Laurence (১৭ অক্টোবর ২০১৮)। "Orthodox Church split: Five reasons why it matters"। BBC। সংগ্রহের তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০১৮  উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ অবৈধ; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "BBC" নাম একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  15. Analysis (১৯ ডিসেম্বর ২০১১)। "Global Christianity"। Pew Research Center। সংগ্রহের তারিখ ১৭ আগস্ট ২০১২  উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ অবৈধ; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "Global Christianity" নাম একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  16. Pew Research Center
  17. "Christian persecution 'at near genocide levels'". BBC News. 3 May 2019. Retrieved 7 October 2019.
  18. Wintour, Patrick. "Persecution of Christians coming close to genocide' in Middle East - report". The Guardian. 2 May 2019. Retrieved 7 October 2019.
  19. Zoll, Rachel (১৯ ডিসেম্বর ২০১১)। "Study: Christian population shifts from Europe"Associated Press। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ 
  20. "The Global Religious Landscape"। Pew Research Center। ডিসেম্বর ২০১২। ১৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০১৮ 
  21. 33.39% of ~7.2 billion world population (under the section 'People') "World"The World Factbook। CIA। ৫ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৪ 
  22. "Christianity 2015: Religious Diversity and Personal Contact" (PDF)। gordonconwell.edu। জানুয়ারি ২০১৫। ২৫ মে ২০১৭ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মে ২০১৫ 
  23. Tacitus tells about this in his Annales: Perseus-Project: Annales 15,44 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৭ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে In the passage, Tacitus talks about the burning of Rome, which Nero attributed to the Christians: Christus, from whom the name had its origin, suffered the extreme penalty during the reign of Tiberius at the hands of one of our procurators, Pontius Pilatus, and a most mischievous superstition, thus checked for the moment, again broke out not only in Judaea, the first source of the evil, but even in Rome, where all things hideous and shameful from every part of the world find their centre and become popular.
  24. "BBC - Religion & Ethics - 566, Christianity"BBC। ২০১৭-০৮-০২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-১০-০১ 
  25. McGrath, Christianity: An Introduction, p. 4-6.
  26. Robinson, Essential Judaism: A Complete Guide to Beliefs, Customs and Rituals, p. 229.
  27. Esler. The Early Christian World. p. 157f.
  28. McManners, Oxford Illustrated History of Christianity, p. 301-303.