রক্ত হল উচ্চশ্রেণীর প্রাণিদেহের এক প্রকার কোষবহুল, বহু জৈব ও অজৈব পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত সামান্য লবণাক্ত, আঠালো, ক্ষারধর্মী ও লালবর্ণের ঘন তরল পদার্থ যা হৃৎপিণ্ড, ধমনী, শিরাকৈশিক জালিকার মধ্য দিয়ে নিয়মিত প্রবাহিত হয়। রক্ত একধরনের তরল যোজক কলা। রক্ত প্রধানত দেহে অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ পরিবাহিত করে। রক্ত হল আমাদেরে দেহের জ্বালানি স্বরূপ।[১] মানবদেহে মোট ওজনের শতকরা ৭ ভাগ রক্ত থাকে (গড়ে মানবদেহে ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে)। [২] রক্তের পিএইচ সামান্য ক্ষারীয় অর্থাৎ ৭.৩৫-৭.৪৫ (গড়ে ৭.৪০)। মানুষের রক্তের তাপমাত্রা ৩৬ - ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (গড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)।[৩][৪] রক্তের আপেক্ষিক ঘনত্ব পানির চেয়ে বেশি, প্রায় ১.০৬৫ । অজৈব লবণের উপস্থিতির জন্য রক্তের স্বাদ নোনতা। সুনির্দিষ্ট বাহিকার মাধ্যমে রক্ত দেহের সবখানে সঞ্চালিত হয়।

রক্ত
Venous and arterial blood.jpg
শিরাস্থ (গাঢ়) এবং ধামনিক (উজ্জ্বল) রক্ত
বিস্তারিত
শনাক্তকারী
লাতিনhaema
মে-এসএইচD001769
টিএ৯৮A12.0.00.009
টিএ২3892
এফএমএFMA:9670
শারীরস্থান পরিভাষা

রক্তের অংশসম্পাদনা

রক্তের মূল অংশ দুইটি। যথা:

রক্তরসসম্পাদনা

রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশকে রক্তরস (plasma) বলে। রক্তকণিকা ব্যতীত রক্তের বাকি অংশই রক্ত রস। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্তের প্রায় ৫৫% রক্তরস।

রক্তের প্রধান উপাদান দুইটি। যথা: (ক) অজৈব পদার্থ (খ) জৈব পদার্থ

(ক) অজৈব পদার্থ: রক্তরসে ৪ ধরনের অজৈব পদার্থ দেখা যায়।এগুলো হল: জল ৯১%-৯২%, কঠিন পদার্থ ৭%-৮% যার মধ্যে আছে ক্যাটায়ন ( Na+, K+, Ca++, Mg++, P+++, Fe++, Cu+, Mn++, Zn++, Pb++ ইত্যাদি ) ও অ্যনায়ন (Cl-, HCO-, PO43-, SO42-, ইত্যাদি) এবং ০.৯% গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে আছে কার্বন ডাই অক্সাইড, অক্সিজেন, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

(খ) জৈব পদার্থ: রক্ত রসে মাত্র ৭.১%-৮.১% জৈব পদার্থ থাকে। এর মধ্যে অধিক পরিমাণে থাকে প্লাজমা প্রোটিন- গড়ে ৬-৮ গ্রাম/ডেসি লি.। প্লাজমা প্রোটিনগুলো হচ্ছে - অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন, ফিব্রিনোজেন। এছাড়াও অন্যান্য জৈব পদার্থগুলো হল: স্নেহ দ্রব্য (নিউট্রাল ফ্যাট, কোলেস্টেরল, ফসফোলিপিড, লেসিথিন ইত্যাদি), কার্বোহাইড্রেট (গ্লুকোজ), অপ্রোটিন নাইট্রোজেন দ্রব্য (অ্যামাইনো এসিড, ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, ক্রিয়েটিন, ক্রিয়েটিনিন, জ্যানথিন ইত্যাদি), রঞ্জক দ্রব্য (বিলিরুবিন, বিলিভার্ডিন), বিভিন্ন ধরনের এসিড (যেমন:- সাইট্রিক এসিড, ল্যাকটিক এসিড), হরমোন, ভিটামিন, এনজাইম, মিউসিন ও অ্যান্টিবডি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

কাজসম্পাদনা

  1. মানবদেহে রক্তরসের মাধ্যমে পাচিত খাদ্যবস্তু, হরমোন, উৎসেচক ইত্যাদি দেহের বিভিন্ন অংশে পরিবাহিত হয়।
  2. রক্তরসের প্রোটিনের পরিমাণ রক্তের সান্দ্রতা (ঘনত্ব), তারল্য (fluidity), প্রবাহধর্ম (rheology) বজায় রাখে এবং পানির অভিস্রবণিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  3. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  4. অ্যান্টিবডি, কম্প্লিমেন্টস ইত্যাদি প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ উপকরণ রক্ত ধারণ করে।
  5. রক্তের তরল ভাবের প্রধান কারণ রক্ত রস।
  6. বাফার হিসেবে কাজ করে এতে বিদ্যমান প্রোটিন।
  7. দেহের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে।
  8. দেহে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহন করে।

মানব রক্তরসের কিছু প্রোটিন এবং অন্যান্য উপাদানসমূহসম্পাদনা

  1. রক্তের অ্যালবুমিন
  2. গ্লোবিউলিন (অ্যান্টিবডি গামা/ইম্যুনো গ্লোব্যুলিন)
  3. প্রতঞ্চকপ্রতিতঞ্চক উপাদান সমূহ
  4. ফাইব্রিনোজেনভিট্রোনেক্টিন
  5. কম্প্লিমেন্টস (২০টির বেশি)
  6. সি আর পি
  7. ট্রান্সফেরিন
  8. ট্রান্সথাইরেটিন
  9. সেরুলোপ্লাজমিন
  10. হ্যাপ্টোগ্লোবিন
  11. হিমোপেক্সিন
  12. সাইটোকাইনস
  13. লাইপোপ্রোটিনকাইলোমাইক্রন
  14. এল বি পি
  15. গ্লুকোজ
  16. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চর্বিকণা
  17. খনিজ লবন
  18. ভিটামিন
  19. হরমোন
  20. এন্টিবডি
  21. বর্জ্যপদার্থ যেমন :- কার্বন ডাই অক্সাইড , ইউরিয়া , ইউরিক এসিড
  22. সোডিয়াম ক্লোরাইড খুবই অল্প ৷

রক্তকণিকাসম্পাদনা

 
বিভিন্ন রক্তকণিকা (রক্তকোষ)

রক্তের প্লাজমার মধ্যে নির্দিষ্ট আকার ও গঠন বিশিষ্ট উপাদান বা রক্ত কোষসমূহকে রক্ত কণিকা বলে। রক্তে প্রায় তিন ধরনের কণিকা পাওয়া যায়। যথা:

  1. লোহিত রক্তকণিকা (Erythorcytes),
  2. শ্বেত রক্তকণিকা (Leucocytes)
  3. নিউট্রোফিল
  4. ইওসিনোফিল
  5. বেসোফিল
  6. লিম্ফোসাইট (বৃহৎ ও ক্ষুদ্র)
  7. মনোসাইট
  8. অণুচক্রিকা (Thrombocytes)।

রক্ত কনিকার বিভিন্ন রোগসম্পাদনা

  1. পলিসাইথিমিয়া :— লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে ৷ লোহিত রক্তকণিকার পরিমান প্রতি ঘন মিলিলিটারে ৬৫ লাখের বেশি হয়ে যায় এই রোগে।
  2. এনিমিয়া :— লোহিত রক্তকণিকা কমে গেলে ৷ সাধারনত স্বাভাবিকের তুলনায় ২৫% লোহিত রক্তকণিকা কমে গেলে এই রোগ হয় ।
  3. লিউকোমিয়া :— শ্বেত রক্তকণিকা অত্যধিক বেড়ে গেলে যদি ৫০০০০ -১০০০০০০ হয় ৷
  4. লিউকোসাইটোসিস :— শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যদি ২০০০০-৩০০০০ হয় ৷
  5. থ্রম্বোসাইটোসিস :— অণুচক্রিকার সংখা বেড়ে গেলে ৷
    1. করোনারী থম্বোসিস :— হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বাধায় ৷
    2. সেরিব্রাল থম্বোসিস :— মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাধায় ৷
  6. পারপুরা / থ্রোম্বোসাইটোপিনিয়া :— অণুচক্রিকা কমে গেলে ৷
  7. থ্যালাসেমিয়া :— বংশগত রোগ। হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। বিভিন্ন ধরনের অণুচক্রিকার সংখ্যা বেড়ে গেলে ৷

রক্তের ধরনসম্পাদনা

রক্তের ধরন (রক্তের গ্রুপ হিসাবেও পরিচিত) যা অ্যান্টিবডিগুলির উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির ভিত্তিতে এবং রক্তের লোহিত রক্তকণিকার (Red Blood Corpuscles) পৃষ্ঠে প্রাপ্ত অ্যান্টিজেনিক পদার্থগুলির উপর ভিত্তি করে। এই অ্যান্টিজেনগুলি রক্তের গ্রুপ সিস্টেমের উপর নির্ভর করে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, গ্লাইকোপ্রোটিন বা গ্লাইকোলিপিড হতে পারে। এর মধ্যে কিছু অ্যান্টিজেন অন্যান্য টিস্যুগুলির অন্যান্য ধরনের কোষের পৃষ্ঠেও উপস্থিত রয়েছে। এই লাল রক্ত ​​কোষের পৃষ্ঠের বেশিরভাগ অ্যান্টিজেনগুলি একটি অ্যালিল (জিনের বিকল্প সংস্করণ) থেকে উদ্ভূত হতে পারে এবং সম্মিলিতভাবে রক্তের গ্রুপ সিস্টেম গঠন করতে পারে।রক্তের ধরন (বা রক্তের গ্রুপ) নির্ধারিত হয় লাল রক্ত ​​কোষে উপস্থিত ABO রক্ত ​​গ্রুপ অ্যান্টিজেন দ্বারা। রক্তের ধরনগুলি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং পিতামাতার উভয়ের অবদানের প্রতিনিধিত্ব করে। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ ব্লাড ট্রান্সফিউশন (আইএসবিটি) দ্বারা মোট ৩৬ টি মানব রক্তের গ্রুপ সিস্টেম এবং ৩৪৬ অ্যান্টিজেনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্তের গ্রুপ সিস্টেমগুলি হল ABO এবং Rh।লােহিত রত্ত কণিকায় A এবং B নামক দুই ধরনের অ্যান্টিজেন (antigens) থাকে এবং রস্তুরসে a ও b দুই ধরনের অ্যান্টিবডি (antibody) থাকে। কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ১৯০১ সালে মানুষের রক্তের শ্রেণিবিন্যাস করেন এবং A, B, AB এবং O এ চারটি গ্রুপের নামকরণ করেন। আর রেসাস (Rh) ফ্যাক্টর আন্টিজেন রক্তে উপস্থিত থাকলে রক্ত পজিটিভ না থাকলে রক্ত নেগেটিভ। তাই ABO গ্রুপের পাশাপাশি রেসাস ফ্যাক্টরও পরীক্ষা করে মিলিয়ে দেখাতে হবে। অর্থাৎ রেসাস ফ্যাক্টর বিবেচনায নেওয়া হলে রক্ত গ্রুপ গুলা হবে A+, A-, B+ B-, AB+, AB-,O+ এবং O-। সাধারণত একজন মানুষের রক্তের গ্রুপ আজীবন একই রকম থাকে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

রক্তচাপসম্পাদনা

হৃৎপিণ্ডের সংকোচন-প্রসারণের কারণে মানুষের ধমনীশিরায় রক্তের চাপ সৃষ্টি হয়। হৃৎপিণ্ডের সংকোচন এর ফলে যে চাপ অনুভূত হয় তাকে সিস্টোলিক চাপ বলে।হৃৎপিণ্ডের প্রসারণের ফলে যে চাপ অনুভূত হয় তাকে ডায়াস্টোলিক চাপ বলে। মানুষের শরীরে ৮০/১২০ হলো আদর্শ রক্তচাপ, ৮০/১৩০ হলো সবচেয়ে অনুকূল রক্তচাপ এবং ৮৫/১৪০ হলো সর্বোচ্চ রক্তচাপ।আর রক্তচাপ নির্ণয়ের যন্ত্রের নাম হলো-স্ফিগমোম্যানোমিটার (Sphygmomanometer)

রক্তচাপের গুরুত্বসম্পাদনা

রক্তচাপ রক্তসংবহনে এবং জালকতন্ত্রে পরিস্রাবণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এই পরিস্রাবণ প্রক্রিয়া রক্ত থেকে কোষে পুষ্টি সরবরাহ করা, মূত্র উৎপাদন করা প্রভৃতি শারীরবৃত্তীয় কাজের সঙ্গে জড়িত।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী কারণসমূহসম্পাদনা

  1. হৃৎপিণ্ডের সংকোচন করার ক্ষমতা।
  2. রক্তবাহের স্থিতিস্থাপকতা।
  3. হরমোন।
  4. খাদ্য গ্রহণ।
  5. ঘুমানো।
  6. দৈহিক পরিশ্রম।

রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মানসম্পাদনা

  1. লোহিত রক্তকণিকা:
  • পুরুষ :প্রতি  ঘনমিলিমিটারে ৫০ লক্ষ
  • মহিলা : প্রতি ঘনমিলিমিটারে ৪৫ লক্ষ

২. শ্বেতরক্তকণিকা: ৪-১১ /৫-৮ হাজার / ঘন মিলিলিটার

৩. অনুচক্রিকা - ২.৫ - ৫ লক্ষ / ঘন মিলিলিটার

অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এবং এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যে কোনো ব্যক্তি মারা যেতে পারে ।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Definition of BLOOD"। ২৩ মার্চ ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৪ মার্চ ২০১৭ 
  2. Alberts, Bruce (২০১২)। "Table 22-1 Blood Cells"Molecular Biology of the Cell। NCBI Bookshelf। ২৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০১২  অজানা প্যারামিটার |name-list-style= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  3. https://www.webmd.com/heart/anatomy-picture-of-blood
  4. https://medlineplus.gov/ency/article/001982.htm