ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

বাংলাদেশের একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (পূর্বনাম ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন) বাংলাদেশের একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। দলটির বর্তমান আমির সৈয়দ রেজাউল করিম, নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করিম এবং মহাসচিব ইউনুস আহমাদ। ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ বিভিন্ন ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের যৌথ প্রয়াসের ফলে ইসলামি শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যপ্রয়াসী একটি ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে আন্দোলনে অনৈক্য ও ভাঙ্গনের ফলে এটি চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে একটি একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। মূলত ১৯৯১ সাল থেকে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০০৮ সালে নিবন্ধন জটিলতায় এটি নাম পরিবর্তন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয় এবং হাতপাখা প্রতীক লাভ করে। বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এটি এককভাবে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় স্থান লাভ করে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
ইংরেজি নামIslami Andolan Bangladesh
উর্দু নামاسلامی تحریک بنگلہ دیش
সংক্ষেপেআইএবি
আমিরসৈয়দ রেজাউল করিম
নায়েবে আমিরসৈয়দ ফয়জুল করিম
মহাসচিবইউনুস আহমাদ
প্রতিষ্ঠাতাসৈয়দ ফজলুল করিম
প্রতিষ্ঠা১৩ মার্চ ১৯৮৭; ৩৫ বছর আগে (1987-03-13)
নিবন্ধিত২০০৮
সদর দপ্তরপুরানা পল্টন, ঢাকা
ছাত্র শাখাইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ
যুব শাখাইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ
মতাদর্শ
রাজনৈতিক অবস্থানডানপন্থী
স্লোগানশুধু নেতা নয়, নীতির পরিবর্তন চাই
জাতীয় সংসদের আসন
০ / ৩৫০
ওয়েবসাইট
www.islamiandolanbd.org

২০০৮ সালে নিবন্ধন জটিলতায় এটি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নামটি গ্রহণ করে।

চরমোনাই পীর ঐতিহ্যগতভাবে দলের আমির বা প্রধান নেতা হন। দলের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের শিকড় দারুল উলুম দেওবন্দে বিশেষত দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি। দেওবন্দমুখী কওমি মাদ্রাসা ও উলামাদের পাশাপাশি সারাদেশে বিপুল সংখ্যক মুরিদ ও পীরের অনুসারী দলটির সমর্থন-ভিত্তি গঠন করে। দলের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দাওয়াহ, সংগঠন, জ্ঞান আহরণ এবং প্রশিক্ষণ, জনগণের ঐক্য, মানবতার সেবা, সামাজিক ও শিক্ষার সংস্কার ও অর্থনৈতিক মুক্তি, ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণআন্দোলন পরিচালনা। "শুধু নেতা নয়, নীতির পরিবর্তন চাই", দলটির মূল স্লোগান।[১]

ইতিহাসসম্পাদনা

প্রতিষ্ঠাসম্পাদনা

 
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা সমাবেশের পোস্টার

১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির আমীর সৈয়দ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে বিভিন্ন ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের যৌথ প্রয়াসের ফলে ইসলামি শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যপ্রয়াসী একটি ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটে যা পরবর্তীতে সংগঠনে রূপ নেয়।[২] দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এই আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বাঁধার কারণে তিনি এই আন্দোলন থেকে সরে আসেন। শুরুতে যেসব সংগঠন এই আন্দোলনের সাথে ছিল: আবদুর রহিমের নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, আজিজুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের একাংশ, আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে ইসলামী যুব শিবির, আবদুল জাব্বারের নেতৃত্বে আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ, সৈয়দ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি। ইত্তেহাদুল উম্মাহর নেতা হিসেবে আবদুল আহাদ মাদানী ও নোয়াপাড়ার পীর খাজা সাঈদ শাহ তার ভক্তদের নিয়ে শুরু থেকেই এই আন্দোলনের সাথে ছিলেন।[২]

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সৈয়দ ফজলুল করিম বলেন,

খিলাফতে রাশিদার আদলে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করাকে এটি নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা গ্রহণ এবং নিজেদের সমস্ত কর্মকান্ড শরিয়তসম্মত শূরার নিয়মে পরিচালনার মৌলনীতির ভিত্তিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।[৩] দলটির নীতিমালায় দাওয়াত, সংগঠন, প্রশিক্ষণ, সমাজ সংস্কার, গণআন্দোলনসহ ১০টি কর্মসূচি রয়েছে।[৪] এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো একজন আমীর, মজলিসে সাদারাত (প্রেসিডিয়াম), মজলিসে শূরা (পরামর্শ পরিষদ) ও মজলিসে আমেলা (নির্বাহী পরিষদ) নিয়ে গঠিত।[৫] এটি ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রথম নির্বাচন করে। ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে নিবন্ধিত হয়।[৬] সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষক নজরুল ইসলাম এটিকে সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম সুসংগঠিত পীর-ভিত্তিক ইসলামি রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করেছে।[৭]

প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মাথায় আন্দোলনে অনৈক্য ও ভাঙ্গন দেখা দেয়। ১৯৮৭ সনের ১ অক্টোবর আব্দুর রহিম মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্যারিস্টার কোরবান আলীর নেতৃত্বে একটি অংশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনে থেকে যায়। আর হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ এ ঐক্য থেকে বের হয়ে যায়। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন এবং যুব শিবির এক যৌথ বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন একটি একক দলে পরিণত হয়।[৮]

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসম্পাদনা

আত্মপ্রকাশের পর পরই এটি ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার শাপলা চত্বরে একটি সমাবেশ আহ্বান করে, যা পুলিশের বাঁধায় পন্ড হয়ে যায়।[৫] আজিজুল হক সহ ৪০-এর অধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার এবং বহু কর্মী আহত হন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এটি ইস্যু ভিত্তিক মিছিল-মিটিং সমাবেশের আয়োজন করে। এ সময়কালে ১৯৮৮ সালের মার্চে দেশব্যাপী শাসনতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ঢাকায় সমাবেশ বিশাল মিছিল, যাত্রীবাহী ইরানী বিমানে মার্কিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২৯০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ, সৌদি হজ্ব নীতি ও কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন ও বিক্ষোভ, ১৯৮৮-র বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, মার্কিন হামলায় ২টি লিবিয়ান বিমান ধ্বংসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ, স্যাটানিক ভার্সেস রচয়িতা সালমান রুশদির ফাঁসির দাবিতে প্রচন্ড বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।[৫] রুশদি বিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের একশনে ঢাকায় এর অর্ধশতাধিক কর্মী আহত হয়। ১৯৯০ সালে কাশ্মীরে নির্যাতন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে এটি ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে। মিছিল সভা সমাবেশের মাধ্যমে এটি এরশাদ সরকার পতনের আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করে।[৫] এরশাদ সরকারের পতনের পর দলের মুখপাত্র চরমোনাইর পীর সৈয়দ ফজলুল করিম এক বিবৃতিতে মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে অনৈসলামিক জালেম ও মুনাফিক সরকারের পতনে সন্তোষ প্রকাশ করে।[৯]

ইসলামী ঐক্যজোটসম্পাদনা

মূলত ১৯৯১ সাল থেকে এটি একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।[৫] ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সহ ৭টি দলের সমন্বয়ে ইসলামী ঐক্যজোট গঠিত হয়। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি ১টি আসনে বিজয়ী হয়।[১০] এটি ইসলামী ঐক্যজোটভুক্ত দলের আহ্বানে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে আয়োজিত লংমার্চে অংশগ্রহণ করে। বিতর্কিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি প্রদান, ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন, এনজিওদের ইসলাম বিরোধী তৎপরতা বন্ধ, কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা এবং দৈনিক জনকণ্ঠ, আজকের কাগজসহ ইসলাম বিদ্বেষী পত্রিকাসমূহ নিষিদ্ধ করার দাবিতে ইসলামী ঐক্যজোটভূক্ত দলসমূহ এবং অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থনে ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন হরতাল পালিত হয়।[১১]

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠাসম্পাদনা

খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর পুনরায় তা ফিরিয়ে আনতে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। সৈয়দ ফজলুল করিমের আহ্বানে ১৯৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য গণঅবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। এতে ফজলুল করিম উদ্বোধনী ভাষণে ১১ নভেম্বরের পূর্বে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে দেশ ও জাতিকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বিপর্যয় হতে রক্ষার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আহ্বান জানান। গণঅবস্থানের ১ম দিনে বিভিন্ন দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনুরোধে গণঅবস্থান কর্মসূচির দ্বিতীয় দিবস শেষে প্রত্যাহার করা হয়। গণ অবস্থান শেষে প্রধানমন্ত্রির সচিবালয় অভিমুখে এক মিছিল যাত্রা করে। মিছিল শেষে ৮ নভেম্বর মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৮ নভেম্বর দুপুর ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ইত্তেফাকের মোড় হতে ফার্মগেট পর্যন্ত মানব বন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। সমাবেশে তিনি ১৮ নভেম্বর বাদ ফজর দেশ ব্যাপী দোয়া দিবস এবং ২৩ নভেম্বর শান্তি মিছিলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে দলটি আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। সৈয়দ ফজলুল করিমের সভাপতিত্বে ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় দ্বীনদার নির্দলীয় সরকার গঠন করে নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুল হক আমিনী, ফ্রীডম পার্টির আবদুর রশীদ, এনডিএর মহাসচিব আনোয়ার জাহিদ, মুসলিম লীগের মহাসচিব অ্যাডভোকেট আয়েন উদ্দিন, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, যুবকমান্ডের রহমতুল্লাহ, এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, নেজাম ইসলাম পার্টির এম.এ. লতিফ প্রমুখ। নেতৃবৃন্দ ২২ নভেম্বরের মধ্যে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের পদ্ধতি সাব্যস্ত করার ওপর জোর দেন।

শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম মেয়াদসম্পাদনা

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদে সরকার গঠনের পর সরকারের বিভিন্ন নীতিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রদান করে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার নামে করিডর প্রদান, পানি ও বিদ্যুৎ সংকট, ‘শিখা চিরন্তন’ নামক অগ্নি শিখা স্থাপন, আইন শৃংঙ্খলার চরম অবনতি ও সন্ত্রাস দমনে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার প্রতিবাদে এটি ১৯৯৭ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলে দেশে গৃহযুদ্ধের হুঁশিয়ারি দেন দলের আমির ফজলুল করিম। সমাবেশে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল: ২৮ মার্চ – ২৫ মে: বিভিন্ন পর্যায়ে জনসভা; ২৫ এপ্রিল: থানায় বিক্ষোভ মিছিল; ২ মে: জেলা শহরসমূহে জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল; ২৫ মে: ঢাকায় জনসভা। এটি শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনকে সুসংহত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে ঢাকায় আয়োজিত তিন দিন ব্যাপী জাতীয় সংহতি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। ১৯৯৯ সালের শুরুতে সরকার পৌর নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে তার বিরোধিতা করে তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে। আওয়ামী সরকারের জননিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালের ৩১ মার্চ পল্টন ময়দানে মহাসমাবেশের আয়োজন করে। ৭ ও ৮ নভেম্বর শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে আহুত বিরোধী দলের হরতালের সমর্থনে এটি ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে এটি বঙ্গভবন অভিমুখে গণমিছিলের ঘোষণা দেয়। মিছিলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে ২৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়।

নির্বাচনী তৎপরতাসম্পাদনা

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছে। ১৯৯১ সালে এটি ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। ১৯৯৬ সালে এটি এককভাবে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২০০১ সালে এটি জাতীয় পার্টির সাথে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রেন্টের ব্যানারে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৩টি আসনে নির্বাচন করার সুযোগ পায়। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করে ১৬৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭,৩৩,৯৬৯টি ভোট পায়। অন্যান্য দলের ন্যায় এটি ২০১৪ সালের একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি দেশের সর্বোচ্চ মনোনয়ন দেওয়া দল হিসেবে বিবেচিত হয়। দলটি ৩০০ টি আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে। একটি মাত্র আসনে আইনি জটিলতার কারণে তাদের একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়।[১২][১৩]

২০১৫ সালে ঢাকার দুইটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটের হিসাবে তারা তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জখুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তারা তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তৃতীয় এবং রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা চতুর্থ হয়। এছাড়া একই বছর রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিলেও অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ দিয়ে তিন সিটিতে নির্বাচন বর্জন করেছিল তারা।[১৪][১৫]

সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডসম্পাদনা

হজ ও মুহাম্মদ সা.-কে নিয়ে কটূক্তি করায় আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর শাস্তি দাবি করে তারা।[১৬] সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য অপসারণ বিষয়ে ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল পল্টনে দলের কার্যালয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক মতবিনিময় সভায় গ্রীক মূর্তির সাথে সাথে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহারও অপসারণের দাবি জানানো হয়।[১৭] রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বপ্রথম বৃহৎ আকারে, মিয়ানমার সীমানা অভিমুখে লং মার্চের ডাক দিয়ে ছিল ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তে।[১৮] ভারতে এনআরসি এবং সিএএ আইনের বিরোধীতায় তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ভারত সরকারের সমালোচনা করেন।[১৯] ২০২০ সালের করোনা মহামারীতে এটি চিকিৎসা সেবায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

অঙ্গসংগঠনসম্পাদনা

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ নামে পরিচিত। সংগঠনটির পূর্বনাম ছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন।[২০] ১৯৯১ সালের ২৩ আগস্ট এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ৫ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠনটি পরিচালিত হয়।[২১] সংগঠনটির ২০২১–২০২২ সেশনের সভাপতি নূরুল করীম আকরাম এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মাদ আল আমিন।[২২]

ইসলামী যুব আন্দোলনসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুব সংগঠন ইসলামী যুব আন্দোলন নামে পরিচিত। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই এটি আত্মপ্রকাশ করে। সাত দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠনটি পরিচালিত হয়।[২৩] সংগঠনের ২০২১–২০২২ সেশনের সভাপতি মুহাম্মাদ নেছার উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মুজাহিদ। ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়া আলেম যোদ্ধাদের সংবর্ধনা দিয়েছে।[২৪]

ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠন ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ নামে পরিচিত। ২০২২ সালে এই সংগঠনের সভাপতি মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান।[২৫]

ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরিষদসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সমর্থিত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়ে ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরিষদ গঠিত। ২০১৯ সালের নভেম্বরে সংগঠনটির সভাপতি মনোনীত হন শহিদুল ইসলাম কবির এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম।[২৬]

ইসলামী আইনজীবী পরিষদসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সমর্থিত আইনজীবীদের নিয়ে ইসলামী আইনজীবী পরিষদ গঠিত। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এই পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ আতিয়ার রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন হাওলাদার।[২৭]

জাতীয় শিক্ষক ফোরামসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয় শিক্ষক ফোরাম। ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে।[২৮] ২০২১-২২ সেশনের সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন মাহবুবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান।[২৯]

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদসম্পাদনা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক আলেমদের একটি সংগঠন জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ। ২০১৮ সালের জুনে সংগঠনটির ৮৫ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন নূরুল হুদা ফয়েজী এবং সাধারণ সম্পাদক গাজী আতাউর রহমান।[৩০]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "হঠাৎ আলোচনায় ইসলামী আন্দোলন"প্রথম আলো। ২৮ নভেম্বর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জানুয়ারি ২০২১ 
  2. পাটওয়ারী, মো. এনায়েত উল্যা (২০১৪)। বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির তিন দশক (PDF)। ৪২/২ ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা-১০০০: অসডার পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা ২৮০। আইএসবিএন 978-984-90583-0-4। ৩ জুন ২০২১ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০২২ 
  3. পাটওয়ারী ২০১৪, পৃ. ২৮০।
  4. পাটওয়ারী ২০১৪, পৃ. ২৮১।
  5. পাটওয়ারী ২০১৪, পৃ. ২৮২।
  6. হক, এহসানুল (২০১৯)। বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন ও রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা (এমফিল)। বাংলাদেশ: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃষ্ঠা ১১৩। ১৫ আগস্ট ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুলাই ২০২২ 
  7. ইসলাম, মু. নজরুল (২০১৭)। গড ইন পলিটিক্স : ইসলামিজম এন্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ (পিএইচডি) (ইংরেজি ভাষায়)। নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি। পৃষ্ঠা ২৭৬। ২ জুন ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৩০ মে ২০২১ 
  8. এহসানুল ২০১৯, পৃ. ২৭৭–২৭৮।
  9. পাটওয়ারী, মোঃ এনায়েত উল্যা (২০০২)। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ইসলাম পন্থীদের ভূমিকা। বড় মগবাজার, ঢাকা: প্রীতি প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৯৭–৯৮। আইএসবিএন 9845811949 
  10. পাটওয়ারী ২০১৪, পৃ. ২৭৪।
  11. পাটওয়ারী ২০১৪, পৃ. ২৬৬।
  12. "আমরা বর্তমানে দেশের ৩ নম্বর দল: চরমোনাই পীর"যুগান্তর। ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  13. "সংসদ নির্বাচন ২০১৮: ইসলামপন্থী দলগুলো কে কোথায় নির্বাচন করছে"বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮ 
  14. "একা হাঁটছে ইসলামী আন্দোলন"পরিবর্তন.কম। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  15. "Islami Andolon Bangladesh: Who are they and what do they stand for?"dhakatribune.com। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮ 
  16. "Islamist party demands punishment for Latif Siddique"bdnews24। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮ 
  17. "প্রধান বিচারপতিরও অপসারণ হবে: চরমোনাই পীর"বাংলা ট্রিবিউন। ১৬ এপ্রিল ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  18. "ইসলামী আন্দোলনের মিয়ানমার লংমার্চ ঢাকাতেই শেষ"বিডিনিউজ ২৪। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জানুয়ারি ২০২১ 
  19. "Islami Andolon demonstrates in Dhaka against India's CAA, NRC"ঢাকা ট্রিবিউন। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জানুয়ারি ২০২১ 
  20. "ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের নাম পরিবর্তন"দৈনিক যুগান্তর। ২৫ ডিসেম্বর ২০২১। 
  21. "পরিচিতি"ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ। ১২ জুন ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জুন ২০২২ 
  22. "কেন্দ্রীয় কমিটি - ২০২১"ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ। ১২ জুন ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জুন ২০২২ 
  23. "পরিচিতি"ইসলামী যুব আন্দোলন 
  24. "আলেম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা"দৈনিক যুগান্তর। ২২ ডিসেম্বর ২০২১। 
  25. "শ্রমিকদের বঞ্চিত রেখে দেশের কল্যাণ সম্ভব নয়: চরমোনাই পীর"বার্তা২৪.কম। ১২ জুন ২০২২। 
  26. "ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের নতুন কমিটি, সভাপতি শহিদুল ইসলাম কবির"দৈনিক যুগান্তর। ১৬ নভেম্বর ২০১৯। 
  27. ইউছুফ, কে এম (১৭ জানুয়ারী ২০২১)। "ইসলামী আইনজীবী পরিষদ গঠিত"শ্যামল বাংলা 
  28. "পরিচিতি"জাতীয় শিক্ষক ফোরাম 
  29. "২০২১-২২ সেশনের জন্য জাতীয় শিক্ষক ফোরামের নতুন কমিটি ঘোষণা"জাতীয় শিক্ষক ফোরাম। ২১ জানুয়ারি ২০২১। 
  30. "জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা"দৈনিক ইনকিলাব। ৮ জুন ২০১৮।