বিশ্বকর্মা (সংস্কৃত: विश्वकर्मान्, Viśvakarmān; আক্ষরিক অর্থে: "সর্বস্রষ্টা") হলেন একজন হিন্দু দেবতাঋগ্বেদ অনুযায়ী, তিনি পরম সত্যের প্রতিরূপ এবং সৃষ্টিশক্তির দেবতা। উক্ত গ্রন্থে[১] তাকে সময়ের সূত্রপাতের প্রাক্‌-অবস্থা থেকে অস্তিত্বমান স্থপতি তথা ব্রহ্মাণ্ডের দিব্য স্রষ্টা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[২][৩][৪]

বিশ্বকর্মা
দেবশিল্পী
Vishwakarmaji.png
অন্তর্ভুক্তিদেব
বাহনকালো হস্তী

রামায়ণসম্পাদনা

 
রাম কর্তৃক বিশ্বকর্মা নির্মিত হরধনু ভঙ্গ, রাজা রবি বর্মা অঙ্কিত

রামায়ণে একাধিক স্থলে বিশ্বকর্মার উল্লেখ পাওয়া যায়। আদিকাণ্ডে উল্লিখিত হয়েছে, বিশ্বকর্মা দুটি ধনুক নির্মাণ করেছিলেন। তিনি তার মধ্যে একটি ত্রিপুরাসুর বধের জন্য শিবকে এবং অপরটি বিষ্ণুকে প্রদান করেন। বিষ্ণু তার ধনুকটি প্রদান করেন পরশুরামকেরাম শিবের ধনুকটি ভঙ্গ করে সীতাকে বিবাহ করেন এবং অপর ধনুটিতে জ্যা আরোপ করে পরশুরামের দর্প চূর্ণ করেন।[৫]

বিশ্বকর্মার পুত্র বিশ্বরূপকে ইন্দ্র বধ করেছিলেন।রামায়ণ, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড।

 
বিশ্বকর্মা নির্মিত স্বর্ণলঙ্কা, কাংড়া চিত্রকলা, আনু. ১৭৭৫-৮০

রামায়ণে উল্লিখিত বিশ্বকর্মার স্থাপত্যকীর্তিগুলি হল: কুঞ্জর পর্বতের ঋষি অগস্ত্যের ভবন,রামায়ণ, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড। কৈলাস পর্বতে অবস্থিত কুবেরের অলকাপুরী, রামায়ণ কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড। রাবণের লঙ্কা নগরী রামায়ণ, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড। এছাড়া বিশ্বকর্মা ব্রহ্মার জন্য নানা অলংকারে সজ্জিত পুষ্পক বিমান/রথ নির্মাণ করেছিলেন। এই বিমান/রথ ব্রহ্মা কুবেরকে দান করেন এবং লঙ্কেশ্বর দশানন রাবণ কুবেরের থেকে সেটি অধিকার করেন।

মাহাত্ম্যসম্পাদনা

বিশ্বকর্মা বৈদিক দেবতা, ঋগবেদের ১০ম মণ্ডলে ৮১ এবং ৮২ সূক্তদ্বয়ে বিশ্বকর্মার উল্লেখ আছে। [৬] ঋগবেদ অনুসারে তিনি সর্বদর্শী এবং সর্বজ্ঞ। তার চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পদ সবদিকে পরিব্যাপ্ত। তিনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা ও বিধাতা অভিধায় ভূষিত। তিনি ধাতা, বিশ্বদ্রষ্টা ও প্রজাপতি। [৭]

ধ্যানমন্ত্রসম্পাদনা

  • দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।
  • বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।।
  • ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।

কীর্তি ও স্থাপত্যসম্পাদনা

বিশ্বকর্মা লঙ্কা নগরীর নির্মাতা। তিনি বিশ্বভুবন নির্মাণ করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর অস্ত্র, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকেয়র শক্তি প্রভৃতি তিনি তৈরি করেছেন। শ্রীক্ষেত্রর প্রসিদ্ধ জগন্নাথ মূর্তিও তিনি নির্মাণ করেছেন।

বিশ্বকর্মা পূজাসম্পাদনা

ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণকার,কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন।[৮]

প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে বিশ্বকর্মার পূজা হয়ে থাকে। প্রতিবছর একইদিনে এই পূজা হয়, এর কোনো পরিবর্তন হয় না বিশেষ।[৯]

বিশ্বকর্মা পূজা হয় ভাদ্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিনে। আর এই দিনেই হয় রান্নাপুজো বা অরন্ধন যা কিনা মনসাপূজার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভাদ্রের আগে বাংলায় শ্রাবণ মাস চলে - এই মাস শিবের মাস, এই মাস মনসার মাস। পুরো শ্রাবণ মাস জুড়ে বর্ষা-প্লাবিত বাংলায় প্রাচীন কাল থেকেই সাপের প্রকোপ দেখা দেয় আর সেই সাপের দংশন থেকে রক্ষা পেতে সহায় হন দেবী মনসা। তাই বর্ষার শেষে ভাদ্র সংক্রান্তিতে তাঁরই উদ্দেশে করা হয় মনসা পূজা। তাহলে দেখা গেল, ভাদ্র সংক্রান্তির এই একটি মাত্র দিনেই একইসঙ্গে অরন্ধন, মনসাপূজা এবং বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।[৯]

বিশ্বকর্মার হাতে দাঁড়িপাল্লা থাকে। দাঁড়িপাল্লার দুটি পাল্লা জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক হিসাবে ধরা হয়। উভয়ের সমতা বজায় রেখেছেন তিনি। এছাড়া তিনি হাতুরী ধারন করেন, যা শিল্পের সাথে জড়িত। তিনি যে শিল্পের দেবতা এই হাতুরী তারই প্রতীক। [১০]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Vishvakarman – Oxford Reference" (ইংরেজি ভাষায়)। 
  2. Melton, J. Gordon (২০১১)। Religious Celebrations: L-Z (ইংরেজি ভাষায়)। ABC-CLIO। আইএসবিএন 9781598842050 
  3. "Rig Veda: Rig-Veda, Book 10: HYMN LXXXI. Visvakarman."www.sacred-texts.com 
  4. "Rig Veda: Rig-Veda, Book 10: HYMN LXXXII. Visvakarman."www.sacred-texts.com 
  5. রামায়ণ, আদিকাণ্ড, ৭৫
  6. দেবদেবীর পরিচয় ও বাহন রহস্য, শ্রীশিব শঙ্কর চক্রবর্ত্তী
  7. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  8. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=বিশ্বকর্মা_পূজা
  9. "প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পূজা একই তারিখে হয় কেন"সববাংলায়। ২০২১-০৮-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০৭ 
  10. https://www.sangbadekalavya.in/2020/09/viswakarma-puja-2020-india.html