প্রধান মেনু খুলুন

ফ্রাঙ্ক ওরেল

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার

স্যার ফ্রাঙ্ক মর্টিমার ম্যাগলিন ওরেল (ইংরেজি: Frank Worrell; জন্ম: ১ আগস্ট, ১৯২৪ - মৃত্যু: ১৩ মার্চ, ১৯৬৭) বার্বাডোসের ব্রিজটাউনের সেন্ট মাইকেল এলাকায় অবস্থিত ব্যাংক হলে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা ও জামাইকান সিনেটর ছিলেন। মাঝেমাঝে তাকে টাই ডাকনামে নামাঙ্কিত করা হতো। দর্শনীয় ব্যাটিং ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনকারী ফ্রাঙ্ক ওরেল কার্যকরী বামহাতি সিম বোলার হিসেবেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলে অবদান রেখেছেন। ১৯৫০-এর দশকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়করূপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব প্রদান করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে দুইবার ৫০০ রানের জুটি গড়েছিলেন।[১]

স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল
Frank Worrell.jpg
ব্যক্তিগত তথ্য
পূর্ণ নামফ্রাঙ্ক মর্টিমার ম্যাগলিন ওরেল
জন্ম(১৯২৪-০৮-০১)১ আগস্ট ১৯২৪
সেন্ট মাইকেল, বার্বাডোস
মৃত্যু১৩ মার্চ ১৯৬৭(1967-03-13) (বয়স ৪২)
কিংস্টন, জামাইকা
ব্যাটিংয়ের ধরনডানহাতি
বোলিংয়ের ধরনস্লো লেফট আর্ম অর্থোডক্স
বামহাতি মিডিয়াম
সম্পর্কল্যারি ওরেল (কাকাতো ভাই)
আন্তর্জাতিক তথ্য
জাতীয় পার্শ্ব
টেস্ট অভিষেক
(ক্যাপ ৬১)
১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ বনাম ইংল্যান্ড
শেষ টেস্ট২৬ আগস্ট ১৯৬৩ বনাম ইংল্যান্ড
ঘরোয়া দলের তথ্য
বছরদল
১৯৪১–১৯৪৭বার্বাডোস
১৯৪৭–১৯৬৪জ্যামাইকা
খেলোয়াড়ী জীবনের পরিসংখ্যান
প্রতিযোগিতা টেস্ট এফসি
ম্যাচ সংখ্যা ৫১ ২০৮
রানের সংখ্যা ৩,৮৬০ ১৫,০২৫
ব্যাটিং গড় ৪৯.৪৮ ৫৪.২৪
১০০/৫০ ৯/২২ ৩৯/৮০
সর্বোচ্চ রান ২৬১ ৩০৮*
বল করেছে ৭,১৪১ ২৬,৯৭৯
উইকেট ৬৯ ৩৪৯
বোলিং গড় ৩৮.৭২ ২৮.৯৮
ইনিংসে ৫ উইকেট ১৩
ম্যাচে ১০ উইকেট
সেরা বোলিং ৭/৭০ ৭/৭০
ক্যাচ/স্ট্যাম্পিং ৪৩/– ১৩৯/–
উৎস: ইএসপিএনক্রিকইনফো.কম, ১১ জুলাই ২০১৪

খেলোয়াড়ী জীবনসম্পাদনা

১৯৪৭ সালে তার মা নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হন ও বাবা অধিকাংশ সময়ই সমুদ্রে অতিবাহিত করেন। ফলে ওরেল জামাইকায় চলে যান। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বার্বাডোসের পক্ষে খেলেন। ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে ত্রিনিদাদের বিপক্ষে খেলায় জন গডার্ডের সাথে চতুর্থ উইকেটে জুটি গড়ে ৪০৪ মিনিটে তারা অপরাজিত ৫০২ রান তুলেন।[২] এরপর ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত জ্যামাইকার সদস্য হন।

১৯৪৭-৪৮ মৌসুমে গাবি অ্যালেনের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে তিনি তার প্রথম টেস্টে অভিষিক্ত হন। এ সিরিজ শেষে তিনি ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারে আবাস গড়েন ও ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন ফ্রাঙ্ক ওরেল। পাশাপাশি সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার লীগে র‌্যাডক্লিফের হয়ে খেলেন। ১৯৫০ সালে ট্রেন্ট ব্রিজে অনুষ্ঠিত টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি তার সর্বোচ্চ ২৬১ রান সংগ্রহ করেন।

অধিনায়কত্বসম্পাদনা

তিনি সমগ্র খেলোয়াড়ী জীবনে ১৯৬০-৬৩ মেয়াদকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। ওরেল, এভারটন ডি. উইকসক্লাইড ডি. ওয়ালকটকে একত্রে থ্রি ডব্লিউ নামে অভিহিত করা হতো। ক্রিকেটে ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে সেরা জুটি হিসেবে তারা বিবেচিত হতেন।

ত্রিনিদাদের দ্য নেশন পত্রিকার সম্পাদক সি. এল. আর. জেমসের ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট অধিনায়কত্বের উন্নয়ন শীর্ষক সফল প্রচারণার মাধ্যমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে শ্বেতাঙ্গদের টেস্টে অধিনায়কত্ব প্রাপ্তির বিষয়টি শেষ হয়ে যায়। এরফলে ব্যতিক্রমধর্মী অল-রাউন্ডার ওরেল প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটাররূপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে পুরো সিরিজে নেতৃত্ব দেবার মর্যাদা লাভ করেন। তার অধিনায়কত্বের পাশাপাশি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট থেকে কৃষ্ণবর্ণের অধিনায়কত্ব হবার নিষিদ্ধতা বিষয়টি দূরীভূত হয়।[৩] ১৯৬০-৬১ মৌসুমে তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। ওরেল ও তার প্রতিপক্ষীয় অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক রিচি বেনো উভয় দলকে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। প্রথম টেস্টটি নাটকীয়ভাবে টাই হয়। কিন্তু ঐ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২-১ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল।

৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২ তারিখে সফরকারী ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নরি কন্ট্রাক্টর আহত হন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলার চার্লি গ্রিফিথের বাউন্সারে তিনি গুরুতর আঘাত পান। এরফলে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত নরি কন্ট্রাক্টরের খেলোয়াড়ী জীবনের সমাপ্তি ঘটে।[৪] উভয় দলের মধ্য থেকে প্রথম খেলোয়াড়রূপে ফ্রাঙ্ক ওরেল আহত কন্ট্রাক্টরের জীবন বাঁচাতে রক্ত দান করেন।[৫] জুন-আগস্ট, ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ৫ টেস্টের সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ইংল্যান্ড অংশগ্রহণ করে। সেখানেও দলটি জনপ্রিয়তা পায়। দলটি ৩-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সিরিজ জয়লাভ করেছিল।[৬][৭] এ সিরিজ শেষেই পেশাদারী পর্যায়ের ক্রিকেট খেলা থেকে অবসর নেন ফাঙ্ক ওরেল।

সম্মাননাসম্পাদনা

১৯৫১ সালের শুরুতে ওরেলকে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটার মনোনীত করা হয়। ১৯৫০ সালের সাফল্যের প্রেক্ষিতে তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে অন্য চারজন হচ্ছেন - ওয়েস্ট ইন্ডিজের সনি রামাদিন, আল্ফ ভ্যালেন্টাইন, এভারটন উইকস এবং ইংল্যান্ডের গডফ্রে ইভান্স[৮]

১৯৬০-৬১ মৌসুম থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার টেস্ট সিরিজের বিজয়ী দলকে ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফি পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয় যা তার নাম অনুসারে রাখা হয়েছে।[৯] স্যার আলেকজান্ডার বাস্তামান্তে কর্তৃক ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ মেয়াদে জামাইকার সিনেট সদস্য হন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের (ত্রিনিদাদ বিভাগ) ডিনেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সেন্ট অগাস্টিনে অবস্থিত ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বর্তমান নামকরণ হয় স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল মেমোরিয়াল গ্রাউন্ড[১০] বার্বাডোসের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেভ হিল ক্যাম্পাসে অবস্থিত একটি আবাসিক ছাত্রাবাস তার সম্মানে রাখা হয়েছে। ১৯৬৩ সালে ক্যারিবীয় সাংবাদিক আর্নেস্ট আইটল ফ্রাঙ্ক ওরেলের জীবনী লেখেন।

'থ্রি ডব্লিউজ' নামে খ্যাত এভারটন উইকস, ফ্রাঙ্ক ওরেল ও ক্লাইড ওয়ালকটের সম্মানার্থে বার্বাডোস ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ কেনসিংটন ওভালের একটি স্ট্যান্ডের নামকরণ করে।[১১]

 
ব্যাটিংকালে ফ্রাঙ্ক ওরেল

১৯৬৪ সালে ক্রিকেটে মূল্যবান অবদান রাখার দরুন ওরেলকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২০০৭ সালে ওরেলের মৃত্যুর ৪০তম বার্ষিকীতে স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল মেমোরিয়াল কমিটি গঠন করা হয়। ঐদিনই ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান অংশগ্রহণ করেছিল। ২০০৯ সালে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোয় স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল মেমোরিয়াল ব্লাড ড্রাইভ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ৭৪ বছর বয়সী নরি কন্ট্রাক্টর এর উদ্বোধন করেছিলেন।[১২] ১৯৬২ সালে কন্ট্রাক্টরকে বাঁচাতে তার অবদানের কথা স্বীকার করে বাংলা ক্রিকেট সংস্থা সাংবার্ষিকভাবে ঐ দিনে রক্ত সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।[১৩] এছাড়াও ঐদিনকে ভারতের পশ্চিমবাংলায় ‘স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল দিবস’ হিসেবে রাজ্যে পালন করা হয়।

২০০৯ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমের উদ্বোধনী তালিকায় তাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।[১৪]

দেহাবসানসম্পাদনা

১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে পরিচালনা করেন তিনি ও ১৯৬৬-৬৭ মৌসুমে শীতকালে দলের সাথে ভারত সফরে যান। ভারতে অবস্থানকালেই তার শরীরে লিউকিমিয়ার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। জামাইকায় ফিরে আসার এক মাস পর ১৩ মার্চ, ১৯৬৭ তারিখে কিংস্টনে দেহাবসান ঘটে ফ্রাঙ্ক ওরেলের। তার সম্মানে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। কোন ক্রীড়াবিদের সম্মানে এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। মৃত্যু পরবর্তীকালে জুন, ১৯৮৮ সালে ২ ডলার মূল্যমানের বার্বাডিয়ান স্ট্যাম্প অবমুক্ত করা হয়।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. 500-run partnerships.
  2. Barbados v Trinidad 1943-44
  3. Potted biography of James, including his part in getting Worrell made captain
  4. Contractor has said: "It was as Griffith was to deliver the fourth ball of his second over that somebody opened a window in the pavilion. There were no sight screen at that time and my 100 per cent concentration wasn’t on that delivery. I saw it just inches away before it hit me. But it isn’t true that I ducked.” Quoted in Arzan Sam Wadia, "Nari Contractor: ‘I don’t mind living it all over again’", Parsi Khabar, 7 March 2009.
  5. A. C. de Silva, "Frank Worrell donated blood to save Indian Nari Contractor's life", ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে Sunday Observer (Sri Lanka), 3 January 2010.
  6. Wisden Cricketers' Almanack, 1962 edition, "West Indies in Australia, 1960–61"
  7. Wisden Cricketers' Almanack, 1964 edition, "West Indies in England, 1963"
  8. "Wisden Cricketers of the Year" (ইংরেজি ভাষায়)। CricketArchive। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০২-২১ 
  9. Report announcing the Frank Worrell Trophy, Glasgow Herald, 10 February 1961.
  10. "West Indies / Grounds: Sir Frank Worrell Memorial Ground" (ইংরেজি ভাষায়)। ESPNcricinfo। সংগ্রহের তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০১২ 
  11. "Kensington Oval"। West Indies Cricket Board। ২০০৮-০৫-৩১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৬-২৯ 
  12. Clayton Murzello, "50 years on, Nari recalls near fatal blow", Mid-Day, 20 March 2012.
  13. "Ali Bacher signatory for CAB blood donation camp", The Indian Express, 30 January 2010.
  14. Cricinfo (২ জানুয়ারি ২০০৯)। "ICC and FICA launch Cricket Hall of Fame"। ESPNcricinfo। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জুলাই ২০১৯ 

আরও দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

পূর্বসূরী
জেরি আলেকজান্ডার
ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ক্রিকেট অধিনায়ক
১৯৬০/৬১-১৯৬৩
উত্তরসূরী
গারফিল্ড সোবার্স