যিরমিয়[ক] (আনু. ৬৫০ – আনু. ৫৭০ খ্রিস্টপূর্ব),[২] এছাড়াও "কান্নারত নবী" নামেও ডাকা হয়,[৩] ছিলো হিব্রু বাইবেলের মূখ্য নবীদের অন্যতম একজন নবী। ইহুদি ঐতিহ্য অনুযায়ী, যিরমিয় তার শিষ্য ও অনুলিপি কারক বারুক বেন জেরিয়ের সাহায্য ও সম্পাদনায় যিরমিয়ের পুস্তক, রাজাবলি এবং বিলাপ গাঁথা লিখেছেন।[৪]

যিরমিয়
Michelangelo Buonarroti 027.jpg
সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিং থেকে প্রাপ্ত মাইকেলেঞ্জেলো দ্বারা চিত্রিত যিরমিয়
জন্মআনু. ৬৫০ খ্রিস্টপূর্ব
মৃত্যুআনু. ৫৭০ খ্রিস্টপূর্ব
পেশানবী
পিতা-মাতাহিল্কিয়

ইস্রায়েলের ঈশ্বর ইয়াহওয়েহের অনেক ভবিষ্যতবাণী ঘোষণার পাশাপাশি যিরমিয়ের পুস্তক নবীর ব্যক্তিগত জীবন, তার অভিজ্ঞতা এবং তার কারাবাস তুলে ধরে।[৫]

ইহুদিবাদ যিরমিয়ের পুস্তককে বাইবেলীয় গ্রন্থাবলির অংশ বলে বিবেচনা করে, এবং যিরমিয়কে মূখ্য নবীদের দ্বিতীয় নবী বলে গণ্য করে। খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলামও যিরমিয়কে তাদের নবী হিসেবে গণ্য করে। তার বাণীগুলো নতুন নিয়মে উল্লেখ করা হয়েছে[৬] এবং তার গল্পগুলো ইসলামি ঐতিহ্যে পুনরায় তুলে ধরা হয়েছে।[৭]

বাইবেলীয় বর্ণনাসম্পাদনা

কালানুক্রমসম্পাদনা

যিরমিয় নবী হিসেবে যিহূদার রাজা যোশিয়ের শাসনকালের ত্রয়োদশতম বছর (৬২৬ খ্রিস্টপূর্ব[৮]) থেকে ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের জেরুসালেমের পতন এবং শলোমনের মন্দিরের ধ্বংসের ঘটনার পর পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।[৯] এই সময়কালে পাঁচজন রাজা যিহূদা শাসন করেছে: যোশিয়, যিহোয়াশ, যিহোয়াকিম, যিহোয়াখিন, এবং সিদিকিয়[৮] পয়গম্বরিনী হুলদা ছিলেন যিরমিয়ের আত্মীয় ও তার সমসাময়িক, অন্যদিকে নবী সফনিয় ছিলেন তার পরামর্শদাতা।[১০]

বংশ এবং প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

যিরমিয় ছিলেন অনাথোত নামক বিনইয়ামিনীয় গ্রামের কোহেন (ইহুদি যাজক) হিল্কিয়ের পুত্র।[১১] যিরমিয় এবং বিলাপ গাঁথার বর্ণনা অনুসারে তিনি যে পরিমাণ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তা তাকে পণ্ডিতদের দ্বারা "ক্রন্দনরত নবী" হিসাবে উল্লেখ করতে প্ররোচিত করে।[১২]

৬২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তরের আক্রমণকারী দ্বারা[১৩] জেরুজালেমের আসন্ন ধ্বংস ঘোষণা করতে[১৪] ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য[১৫] ঈশ্বর যিরমিয়কে দায়িত্ব প্রদান করেন। কারণ ইসরায়েল ঈশ্বরকে ত্যাগ করে বাআলের পূজা করত[১৬] এবং বাআলের উদ্দেশ্যে তাদের সন্তানদের অগ্নিবলি প্রদান করত।[১৭] জাতিটি ঈশ্বরের আইন থেকে এতদূর বিচ্যুত হয়েছিল যে তারা ঈশ্বরের সাথে তাদের চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, যার ফলে ঈশ্বর তাদের উপর নিজের আশীর্বাদ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। যিহূদা জাতির উপর দুর্ভিক্ষ, বৈদেশিক বিজয়, লুণ্ঠন এবং প্রবাসে বন্দিত্ব ভোগ করার ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা করার জন্য যিরমিয়কে ঈশ্বর পরিচালিত করে।[১৮]

দায়িত্বসম্পাদনা

 
হোরেস ভার্নেট, জেরুজালেমের ধ্বংসাবশেষে যিরমিয় (১৮৪৪)

যিরমিয় ১:২-৩ অনুযায়ী, যিহূদার রাজা যোশিয় মূর্তিপূজারী অভ্যাস থেকে অনুতাপের দিকে জাতিকে পরিণত করার প্রায় পাঁচ বছর আগে[১৯] ঈশ্বর যিরমিয়কে ৬২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভবিষ্যদ্বাণী প্রচারের দায়িত্ব দেন।[১৫] রাজাবলি এবং যিরমিয়ের পুস্তক অনুসারে, যোশিয়ের দাদা মনঃশির পাপের কারণে,[২০] এবং যোশিয়ের মৃত্যুর পর বিদেশী দেবতাদের মূর্তিপূজায় যিহূদার নির্লজ্জ ফিরে যাওয়ার[২১] কারণে যোশিয়ের সংস্কারগুলো যিহূদা এবং জেরুজালেমকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে অপর্যাপ্ত ছিল। যিরমিয়কে মানুষদের পাপ এবং তাদের আসন্ন শাস্তি প্রকাশ্যে আনার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল বলে বলা হয়েছিল।[২২][২৩]

যিরমিয় এই অভিযোগ করে তার দায়িত্ব অর্পণের প্রতিরোধ করেছিলেন যে তিনি কেবল একজন শিশু এবং কীভাবে কথা বলতে হয় তা জানেন না,[২৪] কিন্তু সদাপ্রভু যিরমিয়ের মুখে তার প্রবেশ করিয়ে দিলেন,[২৫] এবং আদেশ করলেন "নিজেকে প্রস্তুত কর!"[২৬] যিরমিয় ১ অধ্যায়ে তালিকাভুক্ত একজন নবী গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে ভয় না পাওয়া, কথা বলার জন্য মনস্থির করা, কথা বলা এবং যেখানে পাঠানো হয়েছে সেখানে যাওয়া।[২৭] যেহেতু যিরমিয়কে তার প্রথম বাণী প্রচার থেকে উদীয়মান উত্তম প্রশিক্ষিত এবং সম্পূর্ণ শিক্ষিত হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাই শাফন পরিবারের সাথে তার সম্পর্কটি ইঙ্গিত করে যে তিনি শাফন নেতৃত্বাধীন জেরুসালেমের পুঁথি লেখকদের বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।[২৮][২৯]

একজন নবী হওয়ার প্রারম্ভিক বছরগুলোয়, যিরমিয় প্রাথমিকভাবে একজন প্রচারক নবী ছিলেন,[৩০] যিনি ইসরায়েল জুড়ে প্রচার.[২৯] তিনি মূর্তিপূজা, পুরোহিতদের লোভ এবং মিথ্যা নবীদের প্রতি নিন্দা প্রকাশ করেন।[৩১] বহু বছর পরে, ঈশ্বর যিরমিয়কে এই প্রাথমিক বাণীগুলো এবং তার অন্যান্য বার্তাগুলি লিখতে নির্দেশ দেন।[৩২]

নিপীড়নসম্পাদনা

 
রেমব্রন্ট ভ্যান রিজন, জেরুজালেমের ধ্বংসে যিরমিয়ের বিলাপ, আনু. ১৬৩০

যিরমিয়ের ভবিষ্যদ্বাণী তার বিরুদ্ধে মানুষকে চক্রান্ত করতে প্ররোচিত করে।যিরমিয় ১১:২১-২৩ যিরমিয়ের বার্তায় অসন্তুষ্ট হয়ে, সম্ভবত এটি অনাথোতের ধর্মস্থান বন্ধ হয়ে যাবে এই আশঙ্কা থেকে, এর পুরোহিত, তার আত্মীয় এবং অনাথোতের লোকেরা তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। তবে, প্রভু যিরমিয়ের কাছে তাদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ করে তার জীবন রক্ষা করেছিলেন এবং অনাথোতের লোকদের জন্য বিপর্যয় ঘোষণা করেছিলেন।[২৯]যিরমিয় ১১:১৮-২:৬ যখন যিরমিয় এই নিপীড়নের ব্যাপারে ঈশ্বরের নিকট অভিযোগ করেন তখন তাকে বলা হয় যে আরো খারাপভাবে তার উপর আক্রমণ করা হবে।[৩৩]

ইম্মেরের পুত্র, জেরুজালেমের একজন মন্দিরের কর্মকর্তা পশহূর যিরমিয়কে মারধর করে এবং বিনইয়ামিনের তোরণে একদিনের জন্য শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। এরপর যিরমিয় ঈশ্বরের বাণী প্রকাশের কারণে তার প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার ফলে প্রাপ্ত কষ্ট এবং উপহাসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।যিরমিয় ২০:৭ তিনি বর্ণনা করেন যদি তিনি ঈশ্বরের বাক্যকে ভিতরে বন্ধ করার চেষ্টা করেন তবে তা কিভাবে তার হৃদয়ে জ্বলে ওঠে এবং তিনি তা ধরে রাখতে অক্ষম হন।যিরমিয় ২০:৯

ভণ্ড নবীদের সাথে দ্বন্দ্বসম্পাদনা

যখন যিরমিয় আসন্ন ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন, তখন তিনি অন্যান্য অনেক নবীদের নিন্দা করেছিলেন যারা শান্তিপূর্ণ অবস্থার ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন।যিরমিয় ৬:১৩-১৫১৪:১৪-১৬২৩:৯-৪০২৭:১-২৮:১৭২:১৪

যিরমিয়ের পুস্তক অনুসারে, রাজা সিদিকিয়ের রাজত্বকালে, প্রভু যিরমিয়কে একটি জোয়াল তৈরি করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে এই বার্তা দিয়েছিলেন যে ইস্রায়েল জাতি ব্যাবিলনের রাজার অধীন হবে। নবী হনানিয় যিরমিয়ের ঘাড় থেকে জোয়ালটি নিয়ে তা ভেঙে ফেলার পর ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে দুই বছরের মধ্যে প্রভু ব্যাবিলনের রাজার জোয়াল ভেঙে দেবেন, কিন্তু যিরমিয় এর বিনিময়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: "তুমি কাঠের জোয়াল ভেঙ্গেছো, কিন্তু পরিবর্তে লোহার জোয়াল তৈরি করলে।"যিরমিয় ২৮:১৩

শমরীয় রাজ্যের সাথে সম্পর্কসম্পাদনা

ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য হতে আগত যিরমিয় এই রাজ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তার তুলে ধরা প্রথমদিকের অনেকগুলো বাণী শমরীয়ের ইস্রায়েলীয়দের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল। তিনি তার ভাষা ব্যবহারে এবং ইস্রায়েলের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্কের উদাহরণ প্রদানে উত্তরাঞ্চলীয় নবী হোশেয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রাচীন ইস্রায়েলীয় বিবাহের উদাহরণ হিসাবে কাঙ্খিত সম্পর্ককে বর্ণনা করার জন্য হোশেয় প্রথম নবী ছিলেন বলে মনে করা হয়, যেখানে একজন পুরুষ বহুবিবাহ করতে পারে, এবং একজন মহিলাকে শুধুমাত্র একজন স্বামীর সাথে সংসার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। যিরমিয় প্রায়ই হোশেয়ের বৈবাহিক চিত্রের পুনরাবৃত্তি করেছেন।[৩৪][৩৫]

ব্যাবিলনসম্পাদনা

বাইবেলের কাহিনী যিরমিয়কে ভয়ানক নির্যাতনের শিকার হিসাবে চিত্রিত করে। জেরুজালেমকে ব্যাবিলনীয় সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করার পর, যাজক পশহূর সহ রাজার কর্মচারীরা, রাজা সিদিকিয় বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে সৈন্য ও জনগণকে হতাশ করার জন্য যিরমিয়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। সিদিকিয় তাদের এই দাবির মান্যতা দেন, ফলে তারা যিরমিয়কে একটি কূপে নিক্ষেপ করে, যেখানে যিরমিয় কাঁদায় ডুবে যান। হত্যার পাপ থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে যিরমিয়কে তারা অনাহারে হত্যা করার প্রচেষ্টায় এটি করে।[৩৬] একজন কুশীয় কূপ থেকে যিরমিয়কে উদ্ধার করে, কিন্তু ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বে জেরুসালেমের পতনের আগ পর্যন্ত যিরমিয় বন্দি ছিল।যিরমিয় ৩৮

ব্যাবিলনীয়রা যিরমিয়কে মুক্তি দিয়েছিল, এবং তার প্রতি দারুন দয়া দেখিয়েছিল, একটি ব্যাবিলনীয় আদেশ অনুসারে তাকে তার বাসস্থানের জায়গা বেছে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুয়ায়ী যিরমিয় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত যিহূদার প্রদেশপতি গদলিয়ের সাথে বিনইয়ামিনের মিসপায় গমন করেন।যিরমিয় ৪০:৫-৬

মিশরসম্পাদনা

ব্যাবিলনীয়দের জন্য কাজ করার অপরাধে ইস্রায়েলীয় রাজপুত্রদের ভাড়াটে অম্মোন আততায়ী গদলিয়কে হত্যা করার পর যোহানন তার স্থলাভিষিক্ত হয়। যিরমিয়ের পরামর্শ উপেক্ষা করে যোহানন যিরমিয়, বারুক, যিরমিয়ের বিশ্বস্ত লিপিকার ও ভৃত্য, এবং রাজন্যাদের নিয়ে মিশরে পালিয়ে যান।যিরমিয় ৪৩:১-১৩ মিশরে, নবী যিরমিয় সম্ভবত তার অবশিষ্ট জীবন কাটিয়েছেন এবং তখনও মানুষদের ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়ে আনতে বৃথা চেষ্টা করে গেছেন।যিরমিয় ৪৩:১-১৩ তার মৃত্যু সম্পর্কিত কোনো সঠিক দলিল নেই।

ঐতিহাসিকতাসম্পাদনা

এই ব্যাপারে ঐক্যমত রয়েছে যে যিরমিয় নামে একজন ঐতিহাসিক নবী ছিলেন এবং যিরমিয়ের পুস্তকের কিছু অংশ সম্ভবত যিরমিয় এবং/অথবা তার সম্পাদক বারুক লিখেছেন।[৩৭]

বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ বিদ্যমান যে যিরমিয়ে বর্ণনা ও কাব্যিক অনুচ্ছেদগুলো তার জীবনের সমসাময়িক (ডাব্লিউ. এল. হলদয়), বা এটাও মনে করা হয় যে আসল নবীর কর্মগুলো আবিষ্কার কিংবা পুনরুদ্ধার করা যায়নি (আর. পি. ক্যারল)।[৩৮][৩৯]

আলবের্টজ ২০০৩, পৃ. ৩০২–৩৪৪ এর বিস্তৃত বিশ্লেষণ দেখুন। প্রথমে অধ্যায় ২–৬, ৮–১০, ১৩, ২১–২৩ ইত্যাদি অংশগুলো পুস্তকের প্রাথমিক সংগ্রহ ছিল। তারপর তারপরে একটি প্রাথমিক দ্বিবরণীয় সম্পাদনা ছিল যা আলবার্টজ প্রায় ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্ধারণ করেছেন, সাথে তিনি বইটির মূল সমাপ্তি ২৫:১৩ এ নির্ধারণ করেন। তারপর ৫৪৫-৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় সম্পাদনা ঘটে যেখানে আরো অনেক পাতা ৪৫তম অধ্যায় পর্যন্ত সংযোজন করা হয়। তারপর ৫২৫–৫২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় সম্পাদনা ঘটে যা বইটির সমাপ্তি ৫১:৬৪ পর্যন্ত নিয়ে আসে। তারপরে অধ্যায় ৫২ যোগ করে নির্বাসন-পরবর্তী সংশোধনগুলি বইয়ে করা হয়।

যদিও ঐতিহ্যগতভাবে যিরমিয়কে বিলাপ গাঁথার লেখক হিসেবে প্রায়ই মনে করা হয়ে থাকে, হয়ত এটি সম্ভবত সমগ্র ব্যাবিলনীয় বন্দীদশা জুড়ে বিভিন্ন সময়ে রচিত ব্যক্তি ও ধর্মীয় বিলাপের একটি সংগ্রহ ছিল। আলবার্টজ অধ্যায় ২-কে প্রাচীনতম গণ্য করে এটিকে জেরুসালেম অবরোধের সময়ের কিছু পরে এবং অধ্যায় ৫-এর তারিখ গদলিয়ের মৃত্যুর পর নির্ধারণ করে, গদলিয়ের পরে অন্যান্য অধ্যায়গুলো সংযোজন করা হয় (পৃ. ১৬০)।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণসম্পাদনা

ইহুদি ধর্মসম্পাদনা

ইহুদি রাব্বানীয় সাহিত্যে, বিশেষত আজ্ঞাদাহে যিরমিয় ও মোশিকে প্রায়ই একসাথে উল্লেখ করা হয়,[৪০] তাদের জীবন ও কর্ম সমান্তরালে উপস্থাপন করা হয়। প্রাচীন মিদরাশে আরো মজাদার বিষয় রয়েছে যেখানে দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১৮ এর সাথে সম্পর্ক দেখানো হয়, এই শ্লোকে "মোশির মত একজন নবী" প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে: "মোশি চল্লিশ বছরের জন্য নবী ছিলেন, আবার যিরমিয়ও ছিলেন; মোশি যিহূদা ও বিনইয়ামিন নিয়ে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, যিরমিয় সেটা করেন; মোশির নিজের গোষ্ঠী (কোরহের নেতৃত্বাধীন লেভীয়রা) তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, যিরমিয়ের বিরুদ্ধেও তার গোষ্ঠী বিদ্রোহ করে; মোশিকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়, যিরমিয়কে গর্তে; মোশিকে একজন দাসী বাঁচায় (ফারাওয়ের কন্যার দাসী); অন্যদিকে, যিরমিয়কে একজন দাস বাঁচায় (এবদমেলক); মোশি বক্তৃতায় লোকদের তিরস্কার করেছিলেন; যিরমিয় তাই করেছেন।"[৪১] রাব্বানীয় সূত্র অনুযায়ী নবী যিহিষ্কেল ছিলেন নবী যিরমিয়ের পুত্র।[৪২] ২ মাক্কাবীয় ২:৪এফএফ অংশে যিরমিয়কে চুক্তিসিন্দুক, ধূপ বেদী ও তাম্বুকে মোশির পাহাড়ে লুকিয়ে রাখার জন্য কৃতিত্ব প্রদান করা হয়।[৪৩]

খ্রিস্টধর্মসম্পাদনা

খ্রিস্টীয় উপাসনা সমাবেশগুলোয় নিয়মিতভাবে যিরমিয়ের পুস্তক থেকে পাঠ করা হয়।[৪৪] মথির সুসমাচারের লেখক বিশেষভাবে মনে রেখেছিলেন যে কীভাবে যিশুর জীবন, মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের ঘটনাগুলি যিরমিয়ের ভবিষ্যদ্বাণীগুলিকে সম্পন্ন করেছিল।[৪৫]

নতুন নিয়মে সরাসরি ৪০টি উদ্ধৃতি দেওয়া আছে, অধিকাংশ পাওয়া যায় প্রত্যাদেশ ১৮-তে যেখানে ব্যাবিলনের ধ্বংসযজ্ঞের সাথে সম্পর্কের ফলে এগুলো এসেছে।[৪৬] ইব্রীয়দের কাছে পত্রতেও নতুন চুক্তির ভবিষ্যদ্বাণীমূলক প্রত্যাশার পরিপূর্ণতা তুলে ধরা হয়েছে।ইব্রীয় ৮:৮-১২১০:১৬-১৭

ইসলামসম্পাদনা

 
মরুভূমিতে যিরমিয় (উপরে বামে); যোনা ও মাছ; জেরুজালেম ধ্বংসের পর উজাইর জেগে ওঠে। উসমানীয় তুর্কি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, ষষ্ঠদশ শতাব্দী।[৪৭]

হিব্রু বাইবেলের অন্যান্য অনেক নবীদের ন্যায়, যিরমিয়কে ইসলামে নবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যিরমিয় সম্পর্কে কুরআনে উল্লেখ না থাকলেও, ইসলামিক ব্যাখ্যা ও সাহিত্যে যিরমিয়ের জীবনের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরা হয়, যেগুলোর সাথে হিব্রু বাইবেলে দেওয়া বিবরণের সাথে অনেকটা মিল পাওয়া যায়। আরবি ভাষায় যিরমিয়ের নাম সাধারণত উচ্চারণ করা হয় ইরমিয়া, আরমিয়া অথবা উরমিয়া হিসেবে।[৪৮] শাস্ত্রীয় ঐতিহাসিকরা যেমন ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ যিরমিয়ের বিবরণ দিয়েছেন যা "যিরমিয়ের পুরাতন নিয়মের গল্পের মূল বিষয়গুলো: নবুওয়ত প্রাপ্তি, যিহূদার রাজার নিকট তার কাজ, মানুষের নিকট তার কাজ ও বাধাপ্রাপ্তি, বিদেশি হানাদারের ঘোষণা যে যিহূদা শাসন করবে - এগুলোর উপর ভিত্তি করে লেখা।"[৭] যদিও, কিছু হাদিসতাফসির বলে যে ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকার দৃষ্টান্ত যিরমিয়ের কাহিনী নিয়ে।[৪৯] এছাড়াও, সূরা ১৭ (আল-ইসরা), আয়াত ৪–৭, বনি ইসরায়েলের দুটি পাপের কথা উল্লেখ করে, কিছু হাদিস ও তাফসিরের উদ্ধৃতি অনুসারে দুটি পাপের একটি হল যিরমিয়কে কারাবন্দী এবং নির্যাতন করা।

মুসলিম সাহিত্য জেরুসালেমের ধ্বংসযজ্ঞ বিস্তারিত বর্ণনা করে যা যিরমিয়ের পুস্তকের বর্ণনার সমান্তরালে লিখিত।[৫০]

প্রত্নতত্ত্বসম্পাদনা

নেবো-সার্সেকিম ফলকসম্পাদনা

২০০৭ এর জুলাই মাসে, অ্যাসিরীয়বিদ মাইকেল জুরসা ৫৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্ধারিত তারিখের একটি কিউনিফর্ম ফলকের অনুবাদ করে। ফলকে নবুশররুসু-উকিন নামক ব্যক্তিকে ব্যাবিলনের দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের প্রধান নপুংসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জুরসার মতামত হল এই নামটি এবং বাইবেলের যিরমিয় ৩৯:৩ অংশে বর্ণিত ব্যক্তি একই হতে পারেন।[৫১][৫২]

সিলমোহরসম্পাদনা

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেলিমিয়ের পুত্র যেহুকলের একটি এবং পশূয়ের পুত্র গদলিয়ের আরেকটি সিলমোহর (যিরমিয় ৩৮:১-তে একসাথে আলোচিত হয়েছে; যেহুকলকেও যিরমিয় ৩৭:৩-এ আলোচনা করা হয়েছে) জেরুসালেমের দায়ূদের নগরে এলিয়াত মাজার নেতৃত্বাধীন খননকাজের সময় যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৮ সালে পাওয়া গিয়েছে।[৫৩]

তেল আরাদ অস্ট্রাকাসম্পাদনা

তেল আরাদে ১৯৭০ এর দশকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রের টুকরোতে পশূরের নাম রয়েছে যার নাম বাইবেলের যিরমিয় ২০:১ অংশে পাওয়া যায়।[৫৪]

সাংস্কৃতিক প্রভাবসম্পাদনা

যিরমিয় ফরাসি jérémiade ও পরবর্তীকালে ইংরেজি jeremiad বিশেষ্যে প্রভাব রেখেছে যার অর্থ "বিলাপ; শোকের অভিযোগ",[৫৫] অথবা আরও বলতে গেলে, "একটি সতর্কতামূলক বা রাগান্বিত শব্দ।"[৫৬]

যিরমিয় (ইংরেজি: Jeremiah) নামটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পর্যায়ক্রমে একটি জনপ্রিয় প্রথম নাম যা রাখা শুরু হয়েছে প্রথমদিককার পিউরিটান বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা। তারা প্রায়ই বাইবেলের নবী ও সাধুদের নাম ব্যবহার করত।[৫৭] যিরমিয় নামটির আইরিশ প্রতিশব্দ হল দিয়ামুইদ/দিয়ারমেইদ (দেরমোট নামেও ডাকা হয়), যার অবশ্য কোন উৎপত্তিগত সম্পর্ক নেই কিন্তু গৌলীয় নাম হিসেবে সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহার হয়ে আসছিল। জেরেমি নামটিও যিরমিয় থেকে এসেছে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

টীকাসম্পাদনা

  1. /ˌɛrɪˈm.ə/;[১] হিব্রু ভাষায়: יִרְמְיָהוּ‎, আধুনিক: Yīrməyahū  [jiʁmiˈjahu], তিবেরীয়: Yīrəməyāhū; গ্রিক: Ἰερεμίας; অর্থ "ওয়াহ মহিমান্বিত করেছে"

উদ্ধৃতিসম্পাদনা

  1. Wells 1990, পৃ. 383।
  2. "Jeremiah"Encyclopedia Britannica 
  3. Hillers 1993, পৃ. 419।
  4. Hillers 1972, পৃ. xix–xxiv।
  5. যিরমিয় ৩২:৬-২৫, যিরমিয় ৩৭:১৫-১৮, যিরমিয় ৩৮:৬
  6. মথি ২:১৮, ইব্রীয় ৮:৮-১২, ইব্রীয় ১০:১৬-১৭
  7. Wensinck 1913–1936
  8. Douglas 1987, পৃ. 559–560।
  9. Sweeney 2004, পৃ. 917।
  10. Singer 1926, পৃ. 100,130।
  11. যিরমিয় ১:১
  12. Henderson 2002, পৃ. 191–206।
  13. যিরমিয় ৪
  14. যিরমিয় ১:১৪-১৬
  15. Longman 2008, পৃ. 6।
  16. যিরমিয় ২, যিরমিয় ৩, যিরমিয় ৫, যিরমিয় ৯
  17. যিরমিয় ১৯:৪–৫
  18. যিরমিয় ১০,যিরমিয় ১১
  19. ২ রাজাবলি ২২:৩-১৩
  20. ২ রাজাবলি ২৩:২৬-২৭
  21. যিরমিয় ১১:১০, ২ রাজাবলি ২৩:৩২
  22. যিরমিয় ১:১-২:৩৭
  23. Ryken 2001, পৃ. 19-36।
  24. Freedman 1992, পৃ. 686।
  25. যিরমিয় ১:৬-৯
  26. যিরমিয় ১:১৭
  27. যিরমিয় ১:৪-১০, যিরমিয় ১:১৭-১৯
  28. ২ রাজাবলি ২২:৮-১০
  29. Freedman 1992, পৃ. 687।
  30. যিরমিয় ১:৭
  31. যিরমিয় ৩:১২–২৩,যিরমিয় ৪:১-৪, যিরমিয় ৬:১৩-১৪
  32. যিরমিয় ৩৬:১-১০
  33. Sweeney 2004, পৃ. 950।
  34. যিরমিয় ২:২, যিরমিয় ২:৩, যিরমিয় ৩:১-৫,যিরমিয় ৩:১৯-২৫, যিরমিয় ৪:১–২
  35. Anon. 1971, পৃ. 126।
  36. Barker, Youngblood এবং Stek 1995, পৃ. 1544।
  37. Britannica, The Editors of Encyclopaedia. "The Book of Jeremiah". Encyclopedia Britannica
  38. Anon. 1971, পৃ. 125।
  39. Marsh 2018
  40. This article incorporates text from the 1901–1906 Jewish Encyclopedia, a publication now in the public domain.
  41. Pesiqta, ed. Buber, xiii. 112a.
  42. "EZEKIEL – JewishEncyclopedia.com"jewishencyclopedia.com 
  43. Collins 1972, পৃ. 101–।
  44. Schroeder, Joy A., "Medieval Christian Interpretation of the Book of Jeremiah", The Book of Jeremiah, Brill, 2018আইএসবিএন ৯৭৮৯০০৪৩৭৩২৭৩
  45. Dahlberg, Bruce T., "The Typological Use of Jeremiah 1:4-19 in Matthew 16:13-23", Journal of Biblical Literature, Vol. 94, No. 1 (Mar., 1975), pp. 73-80, The Society of Biblical Literature
  46. Dillard ও Longman 1994, পৃ. 339।
  47. Renda 1978
  48. see Tād̲j̲ al-ʿArūs, x. 157.
  49. Tafsir al-Qurtubi, vol. 3, p. 188; Tafsir al-Qummi, vol. 1, p. 117.
  50. Tabari, i, 646ff.
  51. Reynolds 2007
  52. Hobbins 2007
  53. Kantrowitz 2012
  54. "Arad-Canaanite city and Israelite citadel in the Negev – Site No. 6"। Israeli Foreign Ministry। ২০ নভে ২০০০। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-০৮ 
  55. Anon. 1989, পৃ. 766।
  56. "jeremiad"Merriam-Webster Online Dictionary। Merriam-Webster, Inc.। ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০৯-২৩ 
  57. Sausalito News, Volume XXX, Number 8, 21 February 1914

উদ্ধৃত কর্মসম্পাদনা

আরো পড়ুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

  • Cheyne, Thomas Kelly (১৯১১)। "Jeremiah"। ব্রিটিশ বিশ্বকোষ15 (১১তম সংস্করণ)। পৃষ্ঠা 323–325। [[বিষয়শ্রেণী:উইকিসংকলনের তথ্যসূত্রসহ ১৯১১ সালের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে উইকিপিডিয়া নিবন্ধসমূহে উদ্ধৃতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে]]
  •   Faulhaber, Michael (১৯১০)। "Jeremias (the Prophet)"। ক্যাথলিক বিশ্বকোষ8। নিউ ইয়র্ক: রবার্ট অ্যাপলটন কোম্পানি। 
  • Hirsch, Emil G.; et al., "যিরমিয়" ইহুদি বিশ্বকোষ (১৯০৬)।