প্রধান মেনু খুলুন

মোহাম্মদ লুৎফর রহমান

বাঙালি লেখক

মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬) ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মী।[১] তিনি 'ডাক্তার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান' হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

মোহাম্মদ লুৎফর রহমান
চিত্র:ডাক্তার লুৎফর রহমান.jpg
জন্ম
মোহাম্মদ লুৎফর রহমান

১৮৮৯
মাগুরা মহাকুমা (বর্তমান মাগুরা জেলা), যশোর, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু১৯৩৬
মাগুরা মহাকুমা (বর্তমান মাগুরা জেলা), যশোর, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যুর কারণযক্ষায় আক্রান্ত হয়ে
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারত
জাতিসত্তাবাঙালি
নাগরিকত্বব্রিটিশ ভারত
যেখানের শিক্ষার্থীকৃষ্ণনগর হোমিওপ্যাথিক কলেজ
পেশা
কার্যকাল১৯১৬–১৯৩৬
পিতা-মাতা
  • সরদার মইনউদ্দিন আহমদ (পিতা)
  • শামসুন নাহার (মাতা)

নারী সমাজের উন্নতির জন্য নারীতীর্থ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান গঠন এবং নারীশক্তি নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন তিনি এবং একজন চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তার প্রবন্ধ সহজবোধ্য এবং ভাবগম্ভীর। মহান জীবনের লক্ষ্য সাহিত্যের মাধ্যমে মহান চিন্তাচেতনার প্রতি আকৃষ্ট হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। গভীর জীবনবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, উচ্চ জীবন, সত্য জীবন, মানব জীবন, সূহ্ম বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি তার রচনার প্রসাদগুণ। প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি কবিতা, উপন্যাস ও শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করেছেন।[২][৩]

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রাথমিক জীবনসম্পাদনা

মোহাম্মদ লুৎফর রহমান তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত যশোর জেলার মাগুরা মহাকুমার (বর্তমান মাগুরা জেলা) পরনান্দুয়ালী গ্রামে ১৮৮৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা শামসুন নাহার এবং পিতা সরদার মইনউদ্দিন আহমদ,[২] যিনি একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন। এই দম্পতীর চার পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে মোহাম্মদ লুৎফর রহমান একজন। তার পৈত্রিক নিবাস ছিল তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহাকুমার হাজীপুর গ্রামে।[২][৪] লুত্ফর রহমানের পিতা ছিলেন এফ.এ পাস। ইংরেজি ভাষাইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার পিতার অনুরাগ ছিল। সম্ভবত একারণেই পিতার অনুরাগ লুৎফর রহমানের মাঝে প্রতিভাস হয়েছিল।[৫]

শিক্ষাসম্পাদনা

লুৎফর রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রাম হাজিপুরের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি মাগুরা শহরের মাগুরা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে (বর্তমান মাগুরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন এবং ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা পাস করেন।[২] এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান, হুগলী মহসিন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হন। কলকাতায় টেলর হোস্টেলে থাকাকালীন তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কমতে থাকে এবং এফএ পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে কৃষ্ণনগর হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে এইচএম-বি ডিগ্রি লাভ করেন।[২][৪][৫]

কর্মজীবনসম্পাদনা

লুৎফর রহমান প্রথমে শিক্ষক এবং পরবর্তীকালে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। এফএ অধ্যয়নকালে, ১৯১৬ সালে সিরাজগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে অ্যাংলো-পারসিয়ান শিক্ষক পদে যোগ দেন তিনি। তবে সেখানে অন্যান্য বিষয়েও তিনি পাঠদান করতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক মতান্তরের কারণে এ চাকরি ছেড়ে ১৯১৮ সালে তিনি চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ হাই স্কুলে একই বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২০ সালে তিনি কলকাতায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করেন।[২][৪] ১৯২৫ থেকে ১৯২৬ সালের দিকে সম্ভবত অত্যধিক শারিরীক ও মানসিক পরিশ্রমে এবং অভাব-অনটনের কারণে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ে, এক সময় যক্ষায় আক্রান্ত হন তিনি। তাকে নিজ গ্রাম হাজিপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জনৈকা সন্নাসিনীর প্রদত্ত ওষুধে অনেকটা রোগমুক্ত হওয়ায় কবিরাজী ওষুধের গুণে মুগ্ধ হয়ে তিনি এর নামকরণ করেন যোগিনী পাচন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর গ্রামে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা আরম্ভ করেন।[৫] এসময় তিনি কয়েকটি পেটেন্ট ওষুধ বিক্রয়ের বন্দবস্ত করেন, এগুলোর মধ্যে যোগিনী পাচন, আনন্দ বটিকা, জ্বরবিজয়ী বটিকা, নয়ন শান্তি, মুখারি, ক্ষত-শান্তি উল্লেখযোগ্য। সে সময়ে তিনি চিকিৎসক হিসেবে সুনাম অর্জন করতে শুরু করেলেও স্থানীয় অন্য চিকিৎসকের ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি মির্জাপুর চেড়ে চলে যান। পরবর্তীকালে মাগুরার স্টিমারঘাট সংলগ্ন পান্নান্দুয়ালি গ্রামের একটি বাড়িতে ডাক্তারখানা খুলেছিলেন। ১৯৩১ সালে তিনি আবার নিজ গ্রাম হাজিপুরে ফিরে আসেন এবং সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।[৫]

ব্যক্তিগত জীবনসম্পাদনা

এফ.এ অধ্যয়নকালীন সময়ে লুৎফর রহমান তার নিজ গ্রাম হাজীপুরের 'আয়েশা খাতুন' নামে এক মহিলা সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আয়শা খাতুনের পিতা মোহাম্মদ বদরউদ্দীন এ সময়ে মুন্সীগঞ্জ রেলওয়ের বুকিং ক্লার্ক ছিলেন। অন্যদিকে লুৎফর রহমানের পিতা এই বিবাহে অমত থাকায় তাকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।[৪]

সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

লুৎফর রহমানের সাহিত্য সাধনা শুরু হয়েছিল মূলত কবিতা রচনার মাধ্যমে। ১৯১৫ সালে চল্লিশটি কবিতা নিয়ে তার প্রথম এবং একমাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ প্রকাশিত হয়।[৪] পরে তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প, কথিকা, শিশুতোষ সাহিত্য ইত্যাদি রচনা করেছেন। তার কিছু অনুবাদ কর্মও পাওয়া যায়।

১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস সরলা, যেখানে তিনি একটি পথভ্রান্ত নারীর জীবনের সমস্যা এবং প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে তার সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরেছেন। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয় পথহারা এবং রায়হান নামে দুইটি উপন্যাস। আদর্শ নারী-সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভিন্নধর্মী উপন্যাস ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রীতি উপহার[৪]

লুৎফর রহমান মুক্তবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন যার প্রভাব সাহিত্যচর্চায় তার ফুটে উঠেছে। ১৯২০ সালে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার ব্রত নিয়ে কলকাতা যান। এ সময় অসহযোগ আন্দোলনের প্রাক্কালে তিনি বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। নভেম্বর মাসের তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা থেকে তিনি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (পরে ডক্টরেট প্রাপ্ত) ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা[৬] প্রভৃতির প্রকাশ ভার গ্রহণ করেছিলেন।

তৎকালীন বাংলা ভাষার বিখ্যাত পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোতে তার রচনা সমূহ প্রকাশ হত যা পরে একত্রে সঙ্কলিত হয়েছে। বিশেষত সওগাত, প্রবাসী, হিতবাদী, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মোসলেম ভারত, সাধনা, সোলতান, সহচর, সাম্যবাদী, সাহিত্যিক, মোয়াজ্জিন, মাসিক মোহাম্মদী প্রভৃতি বিভিন্ন পত্রিকায় তার রচনা প্রকাশ হত।

চিন্তাধারা ও আদর্শসম্পাদনা

লুৎফর রহমান বিশ্বাস করতেন, মানুষের শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে জ্ঞান এবং জীবনের সুন্দর বিশুদ্ধতম অনুভূতির নাম হচ্ছে প্রেম। উন্নত জীবন দর্শন মেনে চলতেন। লোকদেখানো এবং বংশগত সম্মানকে তিনি গ্রহণ করেননি। নামের সাথে তিনি কখনো নিজ কৌলিক উপাধি জরদার ব্যবহার করতেন না। এ সম্বন্ধে উচ্চজীবন গ্রন্থের পিতৃমাতৃভক্তি প্রবন্ধে লিখেছিলেন,

সমাজসেবার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন লুৎফর রহমান। পথভ্রষ্ট ও সমাজ পরিত্যক্ত নারীদের সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে নিজ আবাসস্থলেই গড়ে তোলেন নারীতীর্থ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের সভানেত্রী ছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এবং সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজেই। এছাড়াও কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দীন ও মোহাম্মদ জোবেদ আলী কার্যনির্বাহী পরিষদের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

গ্রন্থতালিকাসম্পাদনা

মৃত্যুসম্পাদনা

চরম দারিদ্রের মুখোমুখি যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মানবতাবাদী সাহিত্যিক ডাক্তার লুৎফর রহমান ১৯৩৬ সালের ৩১ মার্চ ৪৭ বৎসর বয়সে বিনা চিকিৎসায় নিজ গ্রাম মাগুরার হাজিপুর গ্রামে মৃত্যুবরন করেন।[৪]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. মমতাজ আরা খুশী (মার্চ ৩১, ২০১১)। "মোহাম্মদ লুৎফর রহমান স্মরণে"দৈনিক সমকাল। সংগ্রহের তারিখ মে ১৩, ২০১৬ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. খোন্দকার সিরাজুল হক (২০১২)। "রহমান, মোহাম্মদ লুৎফর"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীরবাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি 
  3. কাজী শওকত শাহী। "যশোরের যশস্বী, শিল্পী ও সাহিত্যিক"। 
  4. "লুৎফর রহমান"jessore.info। jessore.info। সংগ্রহের তারিখ মে ১৩, ২০১৬ 
  5. "স্মরণীয় বরণীয়: মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬)"যায়যায়দিন। সংগ্রহের তারিখ মে ১৫, ২০১৬ 
  6. মুহম্মদ মতিউর রহমান (অক্টোবর ৭, ২০১১)। "বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি'র শতবর্ষপূর্তি"দৈনিক সংগ্রাম। ১৭ অক্টোবর ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ মে ১৫, ২০১৬ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা