হোমিওপ্যাথি

জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান উদ্ভাবিত (১৭৯৬) এক চিকিৎসা পদ্ধতি

হোমিওপ্যাথি জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান উদ্ভাবিত (১৭৯৬) এক চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসা পদ্ধতির অন্তর্নিহিত মূলনীতি হচ্ছে- কোনো একজন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে যে ওষুধ প্রয়োগ করলে তার মধ্যে যে লক্ষণ দেখা দেয়, ওই একই ওষুধ সেই লক্ষণের ন্যায় অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তির উপরে প্রয়োগ করলে তা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অসুখের লক্ষণ নিরাময়ের কাজ করে।[১] হ্যানিম্যানের প্রস্তাবিত এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এখনো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পুরোপুরি পোস্টমর্টাম করতে পারে নি। হোমিওপ্যাথিক রেমেডি কিভাবে দেহে শোষিত হয়, কাজ করে রোগ থেকে আরোগ্য করে তা বের করতে পারেনি। অর্থাৎ বিজ্ঞান এখনও সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি বরং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে উল্টো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে Placebo effects বলে চালিয়ে দেয়।

Homeopathic remedies
1857 painting by Alexander Beydeman showing historical figures and personifications of homeopathy observing the perceived brutality of medicine of the 19th century

হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন সকল অসুখের মূলে রয়েছে "মিয়াসম" নামক একধরনের প্রতিক্রিয়া এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এই মিয়াসম দূর করার জন্য কার্যকর। সাধারণত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যকে ক্রমাগত লঘুকরণ করা হয় অ্যালকোহল অথবা পতিত জলে দ্রবীভূত করে। এই লঘুকরণ এতবার করা হয়ে থাকে যে শেষপর্যন্ত এই মিশ্রণে প্রাথমিক দ্রব্যের অণু পরিমাণও অবশিষ্ট থাকে না।[২]

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জৈবরসায়ন এবং জীববিজ্ঞান সম্পর্কে যে সকল প্রাসঙ্গিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা হোমিওপ্যাথির বিপরীত।

ইতিহাসসম্পাদনা

 
হোমিওপ্যাথি অ্যালোপ্যাথির ভয়াবহতা দেখেছে,অ্যালেক্সান্ডার বেইডেমনের একটি ১৮৫৭ সালের চিত্রকর্ম, যাতে ১৯ শতকের চিকিৎসার নৃশংসতা পর্যবেক্ষণ করে হোমিওপ্যাথির ঐতিহাসিক চিত্র এবং ব্যক্তিত্ব দেখা যায়।

ঐতিহাসিক প্রসঙ্গসম্পাদনা

হ্যানিম্যান আঠারো শতকের শেষের দিকে মূলধারার ঔষধগুলো অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন [৩] কারণ এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অকার্যকর এবং প্রায়শই ক্ষতিকারক ছিল। [৪] তিনি কম মাত্রায় একক ওষুধের ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন এবং জীবিত প্রাণীরা কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ, প্রাণবন্ত দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করেছিলেন। [৫] চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ফলাফলটি মূলধারার ঔষধের চেয়ে সাধারণত হোমিওপ্যাথির শুরু হওয়ার সময় প্রচলিত ছিল।

হ্যানিম্যানের ধারনাসম্পাদনা

 
স্যামুয়েল হ্যানিম্যান স্মৃতিস্তম্ভ, ওয়াশিংটন ডিসি, "সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার" সদৃশ্য সদৃশ্যকে আরোগ্য করবে।

"হোমিওপ্যাথি" শব্দটি হ্যানিম্যান তৈরি করেছিলেন এবং ১৮০৭ সালে প্রথম মুদ্রণে প্রকাশিত হয়েছিল।[৬]

স্কটিশ চিকিৎসক এবং রসায়নবিদ উইলিয়াম কুলেনের জার্মান ভাষায় একটি মেডিকেল গ্রন্থ অনুবাদ করার সময় হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে ধারণা করেছিলেন। ম্যালেরিয়া নিরাময়ের জন্য সিনচোনার ব্যবহার সম্পর্কিত কুলেনের তত্ত্ব সম্পর্কে সন্দেহাতীত হলেন, হ্যানিম্যান কী ঘটবে তা খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষভাবে কিছু ছাল খেয়েছিলেন। তিনি জ্বর, কাঁপুনি এবং জয়েন্টে ব্যথা অনুভব করেছেন: ম্যালেরিয়ার মতোই লক্ষণগুলি। এ থেকে হ্যানিম্যান বিশ্বাস করেছিলেন, যে সমস্ত কার্যকর ওষুধগুলি থেকে চিকিৎসা করা হয়, সেগুলোই রোগগুলির মতো সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষণ তৈরি করে, প্রাচীন চিকিৎসকদের প্রস্তাবিত "সাদৃশ্য বিধান" অনুসারে। [৭] অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস দ্বারা চিহ্নিত এবং ১৮৬১ সালে প্রকাশিত সিনচোনার ছাল খাওয়ার প্রভাবগুলির একটি বিবরণ লক্ষণগুলি পুনরুৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়েছিল।[৮] হ্যানিম্যানের সাদৃশ্য বিধান একটি আইপ্স ডিক্সিট যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত হয় না।[৯] এটিকে হোমিওপ্যাথি নাম দিয়েছ যা আসে, গ্রিকঃ ὅμοιος hómoios, "-সাদৃশ্য" and πάθος páthos, "পদ্ধতি" থেকে।

পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে সিনচোনা ম্যালেরিয়া নিরাময় করে, কারণ এটিতে কুইনাইন রয়েছে যা প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম পরজীবীকে মেরে ফেলে যা এই রোগের কারণ হয়; এটি একটি রাসায়নিক ক্রিয়াযা হ্যানম্যানের ধারণার সাথে সম্পর্কিত নয়। [১০]

১৯ শতক: জনপ্রিয়তা এবং প্রথম দিকে সমালোচনা বৃদ্ধিসম্পাদনা

বিশ শতকে পুনর্জাগরণসম্পাদনা

একবিংশ শতাব্দিসম্পাদনা

ভারতীয় উপমহাদেশেসম্পাদনা

ভারত ও বাংলাদেশে বহুকাল থেকেই এই চিকিৎসা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিজ্জ বা সাধারণ রাসায়নিক পদার্থ থেকে কনসেনট্রেট হিসেবে এই ওষুধ তৈরি করা হয় এবং চিকিৎসকরা গাইড বুকের নির্দেশ অনুযায়ী সেগুলি প্রয়োজন মতো লঘুকৃত করেন। বাংলা ভাষায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচুর বইপত্র আছে এবং এগুলির ভিত্তিতে দেশে এই চিকিৎসা চলছে। ইদানীং দেশের নগর ও শহরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের জন্য কয়েকটি হোমিওপ্যাথি কলেজ[১১] প্রতিষ্ঠিত হয়েছে [১২]

প্রমাণ এবং ফলপ্রসূতাসম্পাদনা

Like Cures like নীতি অনুসারে রোগের কারন রোগ সারানোর ক্ষমতা রাখে। আধুনিক বিজ্ঞান এটাকে স্বীকার না করলেও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রধান একটা হাতিয়ার Vaccine এই একই নীতি মেনে কাজ করে। তাই বুঝাই যায় সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই হোমিওপ্যাথির প্রতি বিরূপ আচরণ করা হয়। Vaccine হল একটি জৈবিক প্রস্তুতি; Biological preparation যা নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সক্রিয় অর্জিত অনাক্রম্যতা (Acquired active immunity) সরবরাহ করে। ভ্যাকসিনে রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী জীবাণু বা তার টক্সিন অংশ বা তার পৃষ্ঠতলের দুর্বল প্রোটিন বা মৃত ফর্ম খুবই অল্প পরিমানে থাকে যা দেহে রোগ সৃষ্টি করতে না পারলেও দেহের Immunity কে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভবিষ্যতে সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। এখন যদি করোনা রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে আক্রান্তের দেহে প্রয়োগ করা হয় তাহলে আক্রান্তের দেহে করোনা ভাইরাসই পুস করা হবে, যা দেহের Immunity কে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধি করে তুলবে। তাহলে যে জীবানু যে রোগ সৃষ্টিকরে সেই জীবানুই অতি-স্বল্প পরিমান দেহে পুশ করলে তা সেই রোগ প্রতিরোধ করে। যা Like Cures like নীতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Hahnemann, Samuel (১৮৩৩)। The Homœopathic Medical Doctrine, or "Organon of the Healing Art"। Dublin: W.F. Wakeman। পৃষ্ঠা iii, 48–49Observation, reflection, and experience have unfolded to me that the best and true method of cure is founded on the principle, similia similibus curentur. To cure in a mild, prompt, safe, and durable manner, it is necessary to choose in each case a medicine that will excite an affection similar (ὅμοιος πάθος) to that against which it is employed.  Translator: Charles H. Devrient, Esq.
  2. "Dynamization and Dilution", Complementary and Alternative Medicine, Creighton University Department of Pharmacology, সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৩-২৪ 
  3. Lasagna L (1970) [1962]. The doctors' dilemmas. New York: Collier Books. p. 33. ISBN 978-0-8369-1669-0.
  4. Edzard Ernst; Singh, Simon (2008). Trick or Treatment: The Undeniable Facts about Alternative Medicine. New York: W. W. Norton. ISBN 978-0-393-06661-6.
  5. W. Steven Pray (August 1, 2003). a History of Nonprescription Product Regulation https://books.google.com.bd/books?id=uadgq04eLr0C&pg=PA192&redir_esc=y. Psychology Press. p. 192. ISBN 978-0-7890-1538-9. Retrieved January 21, 2013.
  6. Dean ME (2001). "Homeopathy and "the progress of science""https://web.archive.org/web/20060101084902/http://www.shpltd.co.uk/dean-homeopathy.pdf(PDF). Hist Sci. 39 (125 Pt 3): 255–83. Bibcode:2001HisSc..39..255E. doi:10.1177/007327530103900301. PMID 11712570. Archived from the original http://www.shpltd.co.uk/dean-homeopathy.pdf(PDF) on January 1, 2006. Retrieved March 31, 2009.
  7. Robert W. Ullman; Judyth Reichenberg-Ullman (October 1, 1994). The patient's guide to homeopathic medicine. Picnic Point Press. pp. 1 https://archive.org/details/patientsguidetoh00robe/page/1–2. ISBN 978-0-9640654-2-0. Retrieved January 24, 2013.
  8. Oliver Wendell Holmes, Sr. (1842). Homoeopathy and its kindred delusions: Two lectures delivered before the Boston Society for the Diffusion of Useful Knowledge. Boston. as reprinted in Oliver Wendell Holmes, Sr. (1861). Currents and counter-currents in medical science. Ticknor and Fields. pp. 72–188. OCLC 1544161. OL 14731800M.
  9. J. D. White; John Hugh McQuillen; George Jacob Ziegler; James William White; Edward Cameron Kirk; Lovick Pierce Anthony, eds. (December 1894). "A wail from the waste-basket" https://quod.lib.umich.edu/d/dencos/acf8385.0036.001/1050:349?didno=ACF8385.0036.001;rgn=full+text;view=image. The Dental Cosmos (editorial). 36 (12): 1030–32.
  10. Atwood, Kimball (January 4, 2008). "Homeopathy and evidence-based medicine: back to the future" https://sciencebasedmedicine.org/homeopathy-and-evidence-based-medicine-back-to-the-future-part-i/. Science Based Medicine. Retrieved September 9, 2013.
  11. http://www.homeopathybd.com/list-of-homeopathic-medical-colleges-in-bangladesh/
  12. দৈনিক সংগ্রাম (শনিবার ২৫ ডিসেম্বর ২০১০)। "সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ পরিচিতি ও ভর্তিতথ্য, লেখক: মুহম্মদ হামিম উদ্দিন"। ১০ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০১৪  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)