শিশুসাহিত্য শিশুদের উপযোগী সাহিত্য। সাধারণত ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখে এ সাহিত্য রচনা করা হয়। এই বয়সসীমার ছেলেমেয়েদের শিক্ষামূলক অথচ মনোরঞ্জক গল্প, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদিকেই সাধারণভাবে শিশুসাহিত্য বলে।

একজন মা তার বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন, জেসি উইলকক্স স্মিথের দ্বারা চিত্রিত হয়েছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে মধ্যভাগে রচিত কল্পিত রূপকথার একটি চিত্রের অনুকরণে।
দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ পিনোকিও (১৮৮৩) শিশুদের সাহিত্যের একটি সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম এবং এটি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে একটি।[১]

শিশুসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিশেষ বক্তব্য, ভাষাগত সারল্য, চিত্র ও বর্ণের সমাবেশ, হরফের হেরফের প্রভৃতি কলাকৌশলগত আঙ্গিক। শিশুসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্য অফুরন্ত। এতে থাকে কল্পনা ও রোম্যান্স, জ্ঞান-বুদ্ধির উপস্থাপনা, রূপকথা, এ্যাডভেঞ্চার আর ভূত-প্রেতের গল্প। বিশ্ববিখ্যাত রচনাদি, যেমন: হ্যান্স এন্ডারসনের ফেয়ারি টেলস, এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড; ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রসো (১৭১৯); জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস (১৭২৬); সারভাস্টিজের ডন কুইকসোট (১৬০৫), ট্রেজার আইলা্যান্ড (১৮৩৩), ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড প্রভৃতি যুগযুগ ধরে সব দেশের শিশুদের আনন্দ দিয়ে আসছে।

ইতিহাসসম্পাদনা

প্রথমদিকে শিশুসাহিত্য বলতে কথ্য গল্প, গান এবং কবিতাকে বুঝাতো, যা শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং বিনোদন দিত।[২] শৈশব সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তনের সাথে অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিশু-সাহিত্যের একটি পৃথক ধারা প্রকাশিত হতে শুরু করে আলাদা বৈশিষ্ট্য, প্রত্যাশা ও ধারা নিয়ে।[৩]:x-xi

বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্যের গোড়াপত্তন হয় ১৮১৮ সালে কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত নীতিকথা নামক গ্রন্থের মাধ্যমে।[৪] উপদেশমূলক ১৮টি গল্পের সমন্বয়ে প্রণীত এ গ্রন্থটি স্কুলপাঠ্যরূপে ব্যবহৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটিই প্রথম শিশুপাঠ্য গ্রন্থ।[৪]

শিশুসাহিত্যের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখের রচনার মাধ্যমে।[৪]

প্রকারভেদসম্পাদনা

শিশুসাহিত্যের বিষয়গুলোকে পাঠকের বয়স বা ধরন অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

 
অবনীন্দ্রনাথের আঁকা হিন্দু পুরাণের একটি চিত্র

গণ অনুসারেসম্পাদনা

একটি সাহিত্যগণ হলো সাহিত্যের রচনাগুলির একটি ধরন বা বিভাগ। গণগুলো কৌশল, স্বন, সামগ্রী বা দৈর্ঘ্যের দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। অ্যান্ডারসনের মতে, শিশু সাহিত্যের ছয়টি গণ রয়েছে (কিছু উল্লেখযোগ্য উপ-গণ সহ)[৫]:

  • পিকচার বুক, বর্ণমালা বা গণনার উদাহরণ শেখায়, প্যাটার্ন বই এবং শব্দহীন বইও পিকচার বুক।
  • প্রথাগত সাহিত্য, লোককথা যা পূর্ববর্তী সভ্যতার কিংবদন্তি, রীতিনীতি, কুসংস্কার এবং মানুষের বিশ্বাস প্রকাশ করে। এই ঘরানাটি আরও উপ-ঘরানায় বিভক্ত হতে পারে: পৌরাণিক কাহিনী, কল্পকাহিনী, কিংবদন্তি এবং রূপকথার গল্প
  • কাহিনি; কল্পনা, বাস্তববাদী কল্পকাহিনী এবং ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী সহ
  • নন-ফিকশন
  • জীবনচরিতঅটোবায়োগ্রাফি
  • কবিতা ও পদ্য

পাঠকের বয়স অনুসারেসম্পাদনা

এই বিভাগুলোর মানদণ্ড অস্পষ্ট। ছোট বাচ্চাদের জন্য বইগুলি সহজ ভাষায় লেখা হয়, বড় মুদ্রণ ব্যবহার করে এবং অনেক চিত্র থাকে। বড় বাচ্চাদের বইগুলি ক্রমবর্ধমান জটিল ভাষা, সাধারণ মুদ্রণ এবং কম (যদি থাকে) চিত্র ব্যবহার করে। বয়সসীমা সহ বিভাগগুলি হলো:

  • পিকচার বুক, সদ্য-পাঠক বা ০-৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত
  • খুদে পাঠক, ৫-৭ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত। এগুলোকে এমনভাবে নকশা করা হয় যাতে বাচ্চাদের পড়ার দক্ষতা তৈরিতে সহায়তা করে।
  • চ্যাপ্টার বই, ৭-১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত।
    • সংক্ষিপ্ত চ্যাপ্টার বই, ৭-৯ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত
    • দীর্ঘ চ্যাপ্টার বই, ৯-১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত।
  • ইয়ং অ্যাডাল্ট ফিকশন, ১২-১৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্য উপযুক্ত।

উল্লেখযোগ্য শিশুসাহিত্যসম্পাদনা

  • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের
    • বোধোদয় (১৮৫১)
    • কথামালা (১৮৫৬)
    • চরিতাবলী (১৮৫৬)
    • আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩)
    • বর্ণপরিচয় (১৮৮৫)[৩]
  • অক্ষয়কুমারের চারুপাঠ (৩ খন্ড, ১৮৫৫-৫৯)
  • মদনমোহনের শিশুশিক্ষা (৩ ভাগ, ১৮৫০-৫৫)
  • স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত বালক পত্রিকা
  • হেমেন্দ্রপ্রসাদের আষাঢ়ে গল্প (১৯০১)
  • যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হাসিরাশি (১৯০২)
  • দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৮)
  • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভূত পেতনী (১৩০৯)
  • উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির বই (১৯১০)
  • সুখলতা রাও-এর গল্পের বই (১৯১৩)
  • সুকুমার রায়ের
    • আবোল তাবোল (১৯২৩)
    • পাগলা দাশু
    • অবাক জলপান
  • নজরুল ইসলামের ঝিঙে ফুল (১৯২৬)
  • জসীমউদ্দীনের চলে মুসাফির
  • আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের
    • এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে (১৯৫৫)
    • অবাক পৃথিবী (১৯৫৫)
    • খেলতে খেলতে বিজ্ঞান

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ...remains the most translated Italian book and, after the Bible, the most widely read... by Francelia Butler, Children's Literature, Yale University Press, 1972.
  2. "To Instruct and Delight A History of Children's Literature"। Randon History। জুলাই ১৫, ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১৬, ২০১২ 
  3. Nikolajeva, María, সম্পাদক (১৯৯৫)। Aspects and Issues in the History of Children's Literature। Greenwood। আইএসবিএন 978-0-313-29614-7 
  4. "শিশুসাহিত্য - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০১-২৭ 
  5. Anderson 2006