উসমান ইবন আফফান

ইসলামের তৃতীয় খলিফা

উসমান ইবন আফ্‌ফান (عثمان بن عفان) (c. ৫৮০ - ১৭ জুন ৬৫৬) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। খলিফা হিসেবে তিনি চারজন খুলাফায়ে রাশিদুনের একজন। উসমান আস-সাবিকুনাল আওয়ালুনের (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারা'র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর মুহাম্মদ সন্তুষ্ট ছিলেন।[৮]। তাকে সাধারণত হযরত উসমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। কুরাইশ গোত্রের বিশিষ্ট বংশ বনু উমাইয়ায় জন্মগ্রহণকারী। প্রথম দিকের ইসলামিক ইতিহাসে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালনকারী এবং তিনি কুরআনের আদর্শ সংস্করণ সংকলনের আদেশ দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন।[৯]

ʿউসমান ইবন আফ্‌ফান
عثمان بن عفان
দুই নূরের অধিকারী (জিন্নুরাইন) (ذو النورين)
“আল-গনি” (উদার)
আমির আল-মুমিনুন
Rashidun Caliph Uthman ibn Affan - عثمان بن عفان ثالث الخلفاء الراشدين.svg
খুলাফায়ে রাশেদিন এর ৩য় খলিফা
রাজত্ব৬ নভেম্বর ৬৪৪ – ১৭ জুন ৬৫৬
পূর্বসূরিউমর ইবনুল খাত্তাব
উত্তরসূরিআলী ইবনে আবু তালিব
জন্ম৫৭৬ খ্রিঃ (৪৭ হিজরি )
তায়েফ, আল আরব
মৃত্যু১৭ জুন ৬৫৬ খ্রিঃ(১৮ জিল্ -হাজ ৩৫ হিজরি)[১][২][৩][৪][৫] (৭৯ বছর)[৬][৭]
মদিনা, আল আরব, খুলাফায়ে রাশেদিন এর রাজত্বকালে
সমাধিজান্নাতুল বাকি, মদিনা
দাম্পত্য সঙ্গী
পূর্ণ নাম
উসমান ইবন আফ্‌ফান আরবি: عثمان بن عفان‎‎
বংশ!কুুরাইশ (বনু উমাইয়া)
পিতাআফ্‌ফান ইবন আবি আল-আস্
মাতাআরওয়া বিনতু কুরাইজ

উসমানের নেতৃত্বে ৬৫০ সালে ইসলামী সাম্রাজ্য ফার্স (বর্তমান ইরান) এবং ৬৫১ সালে খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্তান) এর কয়েকটি অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছিল। ৬৪০ এর দশকের মধ্যে আর্মেনিয়া বিজয় শুরু হয়েছিল।[১০]

জীবনীসম্পাদনা

জন্মসম্পাদনা

উসমানের জন্ম সন ও তারিখ নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে তার জন্ম ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ হস্তীসনের ছয় বছর পর[১১]। এ হিসেবে তিনি মুহাম্মাদ এর চেয়ে বয়সে ছয় বছরের ছোট। অধিকাংশ বর্ণনামতেই তার জন্ম সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। অবশ্য অনেকের বর্ণনামতে তার জন্ম তায়েফ নগরীতে বলা হয়েছে।[১২]ডেভিড স্যামুয়েল মার্‌গোলিউথ, ২০তম শতাব্দীর একজন অমুসলিম ইসলামী চিন্তাবিদ লিখেছেন :

নবীর থেকে ছয় বছরের ছোট উসমান একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন; এছাড়াও তিনি মহাজনের ব্যবসা করতেন, অর্থাৎ বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ করতেন যার লভ্যাংশের অর্ধেক তিনি পেতেন (ইবন সা'দ, iii, ১১১) এবং অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি ছিলেন অতি সূক্ষ্ণ (আল-ওয়াকিদি ডব্লিউ.২৩১)। [১৩]

পরিবার ও বংশসম্পাদনা

উসমানের উপাধি জুন-নুরাইন এবং জুল-হিজরাতাইন। তার পিতা আফ্‌ফান এবং মাতা আরওয়া বিনতু কুরাইজ। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান ছিলেন।[১৪] তার ঊর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে মুহাম্মদের বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তার নানী বায়দা বিনতু আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু।[১৫] সেই হিসাবে তিনি মুহাম্মদ এর ভাগ্নে।

ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ তার কন্যা রুকাইয়্যার সাথে তার বিয়ে দেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধের পরপর মদিনায় রুকাইয়্যা মারা যায়। এরপর নবী তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের সাথে তার বিয়ে দেন। এ কারণেই তিনি মুসলিমদের কাছে জুন-নুরাইন বা দুই জ্যোতির অধিকারী হিসেবে খ্যাত। তবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে।[১৬] যেমন ইমাম সুয়ুতি মনে করেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ওসমানের সাথে রুকাইয়্যার বিয়ে হয়েছিল[৮]। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই ধারণা পরিত্যাগ করেছেন। উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিজরতকারী মুসলিম পরিবার। তারা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। এরপর উসমানের কুনিয়া হয় ইবী আবদিল্লাহ। হিজরি ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যায়। বদেরের যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা মারা যান। এরপর উসমানের সাথে উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাদের ঘরে কোনো সন্তান আসে নি। হিজরি নবম সনে উম্মু কুলসুমও মারা যান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

প্রাথমিক জীবনসম্পাদনা

অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতোই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় নি। উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কোষ্ঠীবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোনো অভ্যাস ছিল না যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত। যৌবনকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মতো ব্যবসায় শুরু করেন। ব্যবসায়ে তার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তার উপাধি হয়েছিল গণি যার অর্ধ ধনী।

ই.এ. বেলায়েভ, ২০তম শতাব্দীর একজন সুন্নী ইসলামী চিন্তাবিদ লিখেছেন :

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে অর্থাৎ যৌবনকালে উসমান মুনাফাভিত্তিক এবং লাভজনক লেনদেনের মাধ্যমে অনেক টাকার মালিক হন।[১৭]

মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায়সম্পাদনা

ইসলাম গ্রহণসম্পাদনা

৬১১ সালে তিনি সিরিয়া থেকে বাণিজ্য করে ফিরে মুহাম্মদ ইসলাম প্রচার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং আবু বকরের মাধ্যমে মুহাম্মদ এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।[১৮]

হিজরতের পর মদীনায় থাকাকালীন অবস্থায়সম্পাদনা

হজরত উসমান খুব লাজুক সভাবের ছিলেন নবী সঃ ভবিষ্যত বানি করেছিল যে উসমান আল্লাহ্ তোমাকে পোশাক পরাবে কিন্তু লোকেরা সেটা খোলার চেষ্টাকরবে। তুমি খুলবেনা। সেই পোশাকটির উদ্দেশ্য ছিলো খিলাফতের দায়িত্ব পাওয়া।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশাসনসম্পাদনা

 
বিসমিল্লাহ লিখিত পারস্য মুদ্রা।

তিনি বায়তুল মাল থেকে জনগণকে দেওয়া ভাতা ২৫% বাড়িয়ে দেন যা উমারের সময় সবার জন্য নিদির্ষ্ট ছিল। বিজিত অঞ্চলের কৃষি[১৯] জমি বিক্রির উপর উমারের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তিনি এর অনুমোদন প্রদান করেন। তার করা অর্থনৈতিক পুনঃগঠনের কারণে খিলাফাতের মুসলিম অমুসলিম সবাই অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করতে পারতো।[২০]

মৃত্যুসম্পাদনা

ওসমান(রঃ)যেদিন খলিফা নির্বাচিত হন, সেদিন তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। আর যখন তাকে হত্যা করা হয়, সেদিনও তিনি উত্তম ছিলেন। মুহাম্মদ(সাঃ)বলেছেন, "আল্লাহর হিকমত অনুসারে জিননুরাইনের ওপর মতানৈক্য দেখা দেবে এবং লোকেরা তাকে শহীদ করবে। অথচ তিনি তখন হকের ওপরই থাকবেন এবং তার বিরোধীরা থাকবে বাতিলের ওপর।" শেষ পর্যন্ত মিসর, বসরা ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠী একাট্টা হয়ে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় সমবেত হয়ে খলিফার পদত্যাগ দাবি করে। হজ উপলক্ষে অধিকাংশ মদিনাবাসী মক্কা গমন করায় তারা এ সময়কেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। খলিফা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তারা হত্যার হুমকি দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। হযরত ওসমান (রঃ) রক্তপাতের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। বিশাল মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে মুষ্টিমেয় বিদ্রোহীর কঠোর শাস্তিদানের পরিবর্তে তিনি তাদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকলেন। হযরত আলী(রঃ) তালহা ও জুবাইরের ছেলেদের দ্বারা গঠিত ১৮ নিরাপত্তারক্ষী বিপথগামী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। অবশেষে তারা ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন[২১] হিজরি ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ শুক্রবার আসরের নামাজের পর ৮২ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ খলিফাকে অত্যন্ত বর্বরভাবে পবিত্র কোরআন পাঠরত অবস্থায় হত্যা করা হয়

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Ibn Hajar al-AsqalaniLisan Al-Mizan: *Uthman bin al-Affan 
  2. University of Zurich Institute of Oriental Studies ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৪ জুলাই ২০১৪ তারিখে
  3. "Islamic Calendar"। ১ আগস্ট ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  4. Musannaf Ibn Abi Shaybah vol. 13, pg 388, no. 38727, status of naration: Sahih.
  5. Muhammad, Muhammad Hamid (৭ মে ২০১৮)। سيرة ومناقب عثمان بن عفان। Dar al-Taqwa। আইএসবিএন 9789776603585استشهد في أوسط أيام التشريق (12 ذي الحجة) لصحة نقله عن أبي عثمان النهدي، المعاصر للحادثة. وما سواه من أقوال لم يصح إسناد شيء منها، وكل ما جاء به من أسانيد فهي ضعيفة، وبعض منها صدر ممن لم يعاصر الحادثة.] 
  6. [R. Stephen Humphreys (transl.), The History of al-Tabari: Volume XV. The Crisis of the Early Caliphate, (New York: State University of New York Press, 1990), pp. 250-251.]
  7. Wilferd Madelung, The Succession to Muhammad: A Study of the Early Caliphate (Cambridge: Cambridge University Press, 1997), p. 135.
  8. আসহাবে রাসূলের জীবনকথা - মুহাম্মদ আবদুল মা'বুদ
  9. Tabatabai, Sayyid M. H. (১৯৮৭)। The Qurơan in Islam : its impact and influence on the life of Muslims। Internet Archive। London : Zahra। আইএসবিএন 978-0-7103-0265-6 
  10. Fisher, Sydney Nettleton, 1906-1987. (২০০৪)। The Middle East : a history। Ochsenwald, William. (৬ষ্ঠ সংস্করণ)। Boston, Mass.: McGraw-Hill। আইএসবিএন 0-07-244233-6ওসিএলসি 51336562 
  11. আল-ইসতিয়াব
  12. ফিতনাতুল কুবরা - ড. তোহা হুসাইন
  13. আ রিস্টেইটমেন্ট অফ দ্য হিস্টরি অফ ইসলাম অ্যান্ড মুসলিম্‌স - Al-Islam.org [১] যা মোহাম্মেড অ্যান্ড দ্য রাইস অফ ইসলাম-কে নির্দেশ করে, লন্ডন, ১৯৩১)
  14. Landau-Tasseron, Ella, সম্পাদক (১৯৯৮)। The History of al-Ṭabarī, Volume XXXIX: Biographies of the Prophet's Companions and their Successors: al-Ṭabarī's Supplement to his History। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন 978-0-7914-2819-1 
  15. মাবুদ, মুহাম্মদ আব্দুল। "উসমান ইবনে আফফান (রা.)"। আসহাফে রসূলের জীবন কথা। কাটাবন: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার। পৃষ্ঠা ৩৯। 
  16. Saʻd, Muḥammad Ibn (২০১৩)। Kitab at-Tabaqat Al-Kabir: The Companions of Badr (ইংরেজি ভাষায়)। Aisha Abdurrahman Bewley কর্তৃক অনূদিত। Ta-Ha Publishers Limited। পৃষ্ঠা 55। আইএসবিএন 978-1-84200-133-2 
  17. আ রিস্টেইটমেন্ট অফ দ্য হিস্টরি অফ ইসলাম অ্যান্ড মুসলিম্‌স - Al-Islam.org [২] যা অ্যারাব্‌স, ইসলাম অ্যান্ড দ্য অ্যারাব ক্যালিফেট ইন দ্য আর্লি মিড্‌ল এজেস-কে নির্দেশ করে, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬৯)
  18. Ahmad; Basit, Abdul (২০০০), Uthman bin Affan, the Third Caliph of Islam, Riyadh: Dar-us-Salam Publications .
  19. A Restatement of the History of Islam and Muslims on Al-Islam.org ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে referencing Al-Fitna Al-Kubra (The Great Upheaval), published by Dar-ul-Ma'arif, Cairo, 1959, p. 47
  20. "The Gold Coins of Muslim Rulers"। ২২ জুলাই ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  21. Humphreys, R. Stephen, সম্পাদক (১৯৯০)। The History of al-Ṭabarī, Volume XV: The Crisis of the Early Caliphate: The Reign of ʿUthmān, A.D. 644–656/A.H. 24–35। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন 978-0-7914-0154-5 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

মুসলিম ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গী :

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গী :

পূর্বসূরী:
উমর ইবনুল খাত্তাব
খলিফা
৬৪৪৬৫৬
উত্তরসূরী:
আলি ইবন আবি তালিব