প্রধান মেনু খুলুন

অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি

বাঙালি লেখক

অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি (ইংরেজি: Achyut Charan Choudhury; ১৮৬৫ – ১৯৫৩) ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের একজন ইতিহাসবিদ ও বৈষ্ণব সাহিত্যের সুখ্যাত পন্ডিত, যিনি বিশেষ করে সিলেটের বিস্তৃত ইতিহাস রচনার মাধ্যমে সমাদৃত হোন। ১৯২০ দশকে প্রকাশিত তার ১,৬৬৩ পৃষ্ঠার "শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত" নামক বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থটি শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ)শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ) নামে দুইটি আলাদা আলাদা খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল, যা আজও সিলেট ও প্রাচীন সিলেট অঞ্চলের (ভারতের করিমগঞ্জ অবধি বিস্তৃত) ইতিহাসের আলোচনায় অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন [ক]। এছাড়াও তিনি ফোকলোরসহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের জীবনী রচনা করে গেছেন। তিনি ১৩৬০ বঙ্গাব্দের (১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) ১০ আশ্বিন ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।[১]

অচ্যুতচরণ চৌধুরী
পেশাপণ্ডিত
পরিচিতির কারণঐতিহাসিক
তত্ত্ববিদ

ব্যক্তিগত জীবনসম্পাদনা

অচ্যুতচরণ চৌধুরী ১২৭২ বঙ্গাব্দের (১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) ২৩ মাঘ বিভাগপূর্ব তৎকালীন সিলেট জেলার জাফরগড় পরগনার মৈনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম অদ্বৈতচরণ চৌধুরী।[১]

সৃষ্টিকর্মসম্পাদনা

শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তসম্পাদনা

১,৬৬৩ পৃষ্ঠার এই ইতিহাস গ্রন্থটি দুইটি আলাদা আলাদা খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) (৭৭৯ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয় ১৩১৭ বঙ্গাব্দে (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ) (৮৮৪) প্রকাশিত হয় ১৩২৪ বঙ্গাব্দে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ)। গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য কামরূপ শাসনাবলীর গ্রন্থকার পণ্ডিত পদ্মনাথ ভট্টাচার্য তৎকালীন মূল্যমানের সাড়ে চার হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। প্রকাশিত গ্রন্থটি সম্পর্কে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আবদুল হক চৌধুরীর অভিমত: সংগৃহীত উপাদানের সাহায্যে তাঁর আগে এতবড় ইতিহাস গ্রন্থ এদেশে (বাংলাদেশে) কেউ লিখেননি। এই বৃহৎ বইটিতে তিনি সিলেটের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বিবরণ ছাড়াও প্রতিটি গ্রামের প্রাচীন হিন্দু-মুসলমান পরিবারগুলোর ইতিহাস, কবি, রাজনীতিবিদ, ফকির-দরবেশ, সাধু, আওলিয়াদের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখে গেছেন। এছাড়া দিয়েছেন বহু ঐতিহাসিক সনদ, প্রাচীন মুদ্রা ও ফরমানের আলোকচিত্র, বংশলতিকার অনুলিপি ও প্রাচীন মুদ্রার ছবি। এই ইতিহাস গ্রন্থ রচনার জন্য অচ্যুতচরণ চৌধুরী ঘুরে বেড়িয়েছেন সিলেটের প্রতিটি গ্রামে, সেই যুগে, যে যুগে পর্যাপ্ত যানবাহন ছিল না, ছিল না পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট। এমনকি বইয়ের "উত্তরাংশ" মুদ্রণ উপলক্ষে তিনি রুগ্ন স্ত্রী ও আট মাসের শিশু সন্তানকে ফেলে কলকাতা চলে যান, আর তার অবর্তমানে সেই রুগ্ন স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে মারা যান, পরে আট মাসের শিশুটিও মারা যায়। তার বিপুল ত্যাগের এই কীর্তি সিলেটের ইতিহাসের আকরগ্রন্থ হিসেবে আজও সমাদৃত।[১] যদিও ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী গ্রন্থটির সমালোচনায় বলেন, ...[এই] গ্রন্থে সিলেটের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য অনেক বিষয়ের উল্লেখ আছে। দুঃখের বিষয় মুসলমান সমাজ সম্বন্ধে এই পুস্তকে সম্যক আলোচনা করা হয়নি। দীর্ঘকালের ব্যবধানে ঐ পুস্তকের নানা বিবরণ বর্তমানে সংশোধনের অপেক্ষা রাখে।[২]

মূল গ্রন্থ দুটির প্রকাশক ছিলেন কলকাতার শ্রী উপেন্দ্র নাথ পাল চৌধুরী, আর মূল্য ছিল যথাক্রমে তৎকালীন মূল্যে মাত্র চার টাকা ও পাঁচ টাকা।[১] বইটি দীর্ঘদিন আর পুণর্মুদ্রিত না হলেও পরবর্তিতে বাংলাদেশের উৎস প্রকাশন তা পুণর্মুদ্রণের উদ্যোগ নেয়, যদিও তাতে কোনো সংশোধন না এনে মূলের অণুবর্তী রাখার চেষ্টা লক্ষ করা যায়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এছাড়াও কলকাতা থেকেও বইটির দুটি খণ্ড পুণর্মুদ্রিত হয়েছে।[৩]

অন্যান্যসম্পাদনা

শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ছাড়াও তার ছিল কমপক্ষে আরো ২০টি প্রকাশনা:[১]

  • চৈতন্য চরিত (১৩১১ বঙ্গাব্দ)
  • রঘূনাথ দাস গোস্বামীর জীবনী (১৩০০ বঙ্গাব্দ)
  • গোপাল ভট্ট গোস্বামীর জীবনী (১৩০২ বঙ্গাব্দ)
  • নিতাই লীলা লহরী (১৩২০ বঙ্গাব্দ)
  • হরিদাস ঠাকুরের জীবনী (১৩০৩ বঙ্গাব্দ)
  • সীতা চরিত
  • ভক্ত নির্য্যাস (১২৯৯ বঙ্গাব্দ)
  • সাধু চরিত (১৩১৯ বঙ্গাব্দ)
  • চারু চরিত
  • শ্যামানন্দ চরিত
  • শ্রী গৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল ভ্রমণ (১৩০৯ বঙ্গাব্দ)
  • চাঁদ সওদাগর
  • বিষ্ণুপ্রিয়ার বিবাহ
  • লাউড়িয়া কৃষদাস রচিত বাল্যলীলা সূত্রম বঙ্গানুবাদ
  • সাবাস ছবি (১৩১০ বঙ্গাব্দ)
  • অশ্রু কণা
  • শান্তি লতা
  • বিষাদিতা
  • রাজভক্তি ও মহাযুদ্ধ
  • শ্রী পাদ ঈশ্বরপুরী

তিনি সিলেট থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মাসিক শ্রীহট্ট দর্পন সম্পাদনা করতেন; আরো সম্পাদনা করতেন ‘কমলা’ নামের একটি সাহিত্যপত্রও[৪]। তাছাড়াও বিশিষ্ট গবেষণাধর্মী পত্রিকা সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় গবেষণাধর্মী লেখালেখী করতেন।[৫]

পাদটীকাসম্পাদনা

  1. ^ অনেক ইতিহাসবিদ ও লেখক শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উভয় খণ্ড) সিলেটের ইতিহাস পর্যালোচনায় ব্যবহার করেছেন, তন্মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো: চট্টগ্রামের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরী তাঁর সিলেট বিষয়ক ইতিহাস গ্রন্থ সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ[১] বইতে সিলেটি সংস্কৃতি, প্রথা ও লোক-উৎসব এবং আঞ্চলিক ব্যক্তিত্বের জীবনী আলোচনায়, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত মোহাম্মদ সাদিক-এর সিলেটি নাগরী: ফকিরি ধারার ফসল[৬] বইতে নাগরি ভাষা ও সাহিত্য আলোচনায়, বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা সম্পাদিত ছিলটে প্রচলিত পই-প্রবাদ ডাক-ডিঠান[৭] বইয়ের প্রারম্ভে সিলেটের ইতিহাস আলোচনায় শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ব্যবহৃত হয়েছে। অবশ্য সিলেটের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর বই হজরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস[২] বইতে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ব্যবহার করার সময় এবিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, বইটিতে সময়ের ব্যবধানে সংশোধন করা জরুরি এবং বইতে সিলেটের মুসলমান সমাজ সম্পর্কে সম্যক আলোচনা অনুপস্থিত। এছাড়াও সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান[৮] প্রণয়নে চট্টগ্রামের সংকলক ও সম্পাদক আহমেদ আমিন চৌধুরী শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত থেকে অনেক শব্দ ধার করেছেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ, আবদুল হক চৌধুরী; কথামালা প্রকাশনা, চট্টগ্রাম থেকে মুদ্রিত: জুলাই ১৯৯৩; পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১২, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  2. হজরত শাহ্‌ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস, সৈয়দ মুর্তাজা আলী; উৎস প্রকাশন, ঢাকা থেকে পুণর্মুদ্রিত: জুলাই ২০০৩। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১২, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  3. পুস্তক পরিচয় ২... ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে, আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১২, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  4. বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৩ জুন ২০১১ তারিখে, সিলেট জেলা তথ্য বাতায়ন। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১২, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  5. সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৩ আগস্ট ২০১১ তারিখে, ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী; বাংলাপিডিয়া (সিডি ভার্ষণ: 2.0.0), ঢাকা থেকে পুণর্মুদ্রিত: ২০০৬। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১২, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  6. সিলেটি নাগরী:ফকিরি ধারার ফসল, মোহাম্মদ সাদিক; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা; ডিসেম্বর ২০০৮; ISBN 984-300-003029-0। পরিদর্শনের তারিখ: ১৩ জুন ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  7. নামোৎপত্তি প্রসঙ্গ: ছিলটে প্রচলিত পই-প্রবাদ ডাক-ডিঠান, সংগ্রহ ও সংকলন: আম্বিয়া খাতুন, সম্পাদনা: দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা; বাংলা একাডেমী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত: জুন ১৯৯৮; আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৩৮১১-৯; পৃ. ২৮। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১৩, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  8. পরিশিষ্ট ৯: সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, সংকলন, গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: আহমেদ আমীন চৌধুরী; উৎস প্রকাশন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; নভেম্বর ২০০৯; পৃ. ১১৮; পরিদর্শনের তারিখ: ১৩ জুন ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।

বহিঃসংযোগসম্পাদনা