ব্যাকটেরিয়া

জীবসত্তা
(ব্যাক্টেরিয়া থেকে পুনর্নির্দেশিত)

ব্যাক্টেরিয়া (ইংরেজি: Bacteria; /bækˈtɪəriə/ (এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন); একবচন: bacterium) হলো এক প্রকারের আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত,অসবুজ, এককোষী অণুজীব। এরা এবং (আরকিয়া) হলো প্রোক্যারিয়ট (প্রাক-কেন্দ্রিক)।ব্যাকটেরিয়া আণুবীক্ষণিক জীববিজ্ঞানী অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েন হুক সর্বপ্রথম ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে বৃষ্টির পানির মধ্যে নিজের তৈরি সরল অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচে ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ করেন । আদিকোষী অণুজীবদের একটি বিরাট অধিজগৎ ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গঠিত। সাধারণত দৈর্ঘ্যে কয়েক মাইক্রোমিটার ব্যাকটেরিয়ার বিভিন্ন ধরনের আকৃতি রয়েছে, গোলকাকৃতি থেকে দণ্ডাকৃতি ও সর্পিলাকার পর্যন্ত ব্যাপ্ত। গোড়ার দিকে পৃথিবীতে যেসব রূপে প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছিল, ব্যাকটেরিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর অধিকাংশ আবাসস্থলেই ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া মাটি,পানি,আম্লিক উষ্ণ ঝরনা,তেজস্ক্রিয় বর্জ্য[২] এবং ভূত্বকের গভীর জীবমণ্ডলে বাস করে। ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাথে মিথোজীবীপরজীবী সংসর্গেও বাস করে। বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত হয়নি এবং মাত্র প্রায় ২৭ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া পর্বের প্রজাতিগুলোকে গবেষণাগারে আবাদ(Culture) করা যায়।[৩] মাইক্রোবায়োলজির যে শাখায় ব্যাকটেরিয়া নিয়ে অধ্যয়ন করা হয় তাকে ব্যাকটেরিওলজি বলে।

ব্যাকটেরিয়া
সময়গত পরিসীমা: আর্কিয়ান বা তারও পূর্বে - বর্তমান সময়কাল
EscherichiaColi NIAID.jpg
ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে দণ্ডাকারের এশেরিকিয়া কোলাই
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
পর্ব
  • Acidobacteria
  • Actinobacteria
  • Aquificae
  • Armatimonadetes
  • Bacteroidetes
  • Caldiserica
  • Chlamydiae
  • Chlorobi
  • Chloroflexi
  • Chrysiogenetes
  • Coprothermobacterota[১]
  • Cyanobacteria
  • Deferribacteres
  • Deinococcus-Thermus
  • Dictyoglomi
  • Elusimicrobia
  • Fibrobacteres
  • Firmicutes
  • Fusobacteria
  • Gemmatimonadetes
  • Lentisphaerae
  • Nitrospirae
  • Planctomycetes
  • Proteobacteria
  • Spirochaetes
  • Synergistetes
  • Tenericutes
  • Thermodesulfobacteria
  • Thermotogae
  • Verrucomicrobia

প্রায় সকল প্রাণী টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল কারণ কেবল ব্যাকটেরিয়া ও কিছু আর্কিয়া ভিটামিন বি১২ (যা কোবালামিন নামেও পরিচিত) সংশ্লেষ করার প্রয়োজনীয় জিনউৎসেচক ধারণ করে। ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন বি১২ খাদ্য শৃঙখলের মাধ্যমে যোগান দেয়। ভিটামিন বি১২ জলে দ্রবণীয় একটি ভিটামিন যা মানবদেহের প্রতিটি কোষের বিপাকে জড়িত। এটি ডিএনএ সংশ্লেষণে এবং ফ্যাটি অ্যসিডঅ্যামিনো এসিড উভয়ের বিপাকে একটি সহউৎপাদক (Cofactor) হিসেবে ভূমিকা রাখে। মায়েলিন সংশ্লেষণে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় ভিটামিন বি১২ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।[৪][৫][৬][৭]


সচরাচর এক গ্রাম মাটিতে প্রায় ৪ কোটি (বা ৪০ মিলিয়ন) ব্যাকটেরিয়া এবং ১ মিলিলিটার মিঠা পানিতে দশ লাখ (বা এক মিলিয়ন) ব্যাকটেরিয়া থাকে। পৃথিবীতে আনুমানিক প্রায় ৫×১০৩০ টি ব্যাকটেরিয়া আছে।[৮] যেগুলো একটি জৈববস্তুপুঞ্জ (Biomass) নির্মাণ করে যা সমুদয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর জৈববস্তুপুঞ্জকেও অতিক্রম করে।[৯] ব্যাকটেরিয়াপরিপোষকের (Nutrient) পুনর্ব্যবহার যেমন, বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণের মাধ্যমে পুষ্টিচক্রের (Nutrient cycle) অনেক পর্যায়ে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। মৃতদেহের শটন (decomposition) পুষ্টিচক্রের অন্তর্ভুক্ত; ব্যাকটেরিয়া এই প্রক্রিয়ার পচন (Putrefaction) ধাপের জন্য দায়ী।[১০] এক্সট্রিমোফিল (Extremophile) ব্যাকটেরিয়া দ্রবীভূত যৌগ যেমন- হাইড্রোজেন সালফাইডমিথেনকে শক্তিতে রুপান্তরিত করে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট ও কোল্ড সিপসমূহের আশেপাশে বসবাসরত জীবসম্প্রদায়গুলোকে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিপোষক পদার্থের যোগান দেয়।

মানুষ ও অধিকাংশ প্রাণীতে সর্বাধিক সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া থাকে অন্ত্রে ও একটি বিরাট অংশ থাকে ত্বকে।[১১] ইমিউনতন্ত্রের কার্যকারিতার ফলে মানব দেহে অবস্থিত বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়াই কোন ক্ষতি করতে পারে না। যদিও অনেক ব্যাকটেরিয়া বিশেষ করে অন্ত্রের গুলো মানুষের জন্যে উপকারী , তথাপি কিছু ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি রোগজনক এবং সংক্রামক ব্যাধির কারণ। যেমনঃ কলেরা, সিফিলিস, অ্যানথ্রাক্স , কুষ্ঠব্যাধি, বিউবনিক প্লেগ ইত্যাদি। শ্বাস নালীর সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট রোগসমূহ হলো ব্যাকটেরিয়াজনিত সর্বাপেক্ষা মারত্মক ব্যাধি। শুধু যক্ষ্মারোগেই ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে আক্রান্ত হয় এক কোটি মানুষ এবং মারা যায় ১৫ লাখ মানুষ।[১২] ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণেরচিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, আবার কৃষিক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ্যতা একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এবং পতিত তেলের (Oil spill) ভাঙনে, গাঁজন প্রক্রিয়ায় পনিরদই উৎপাদনে এবং খননকার্যে[১৩] সোনা, প্যালেডিয়াম, তামা ও অন্যান্য ধাতু পুনরুদ্ধারে ব্যাকটেরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জৈবপ্রযুক্তিতে, অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য যৌগ তৈরিতেও ব্যাকটেরিয়া প্রয়োজনীয়।[১৪]

ব্যাকটেরিয়াকে একদা Schizomycetes ("fission fungi") শ্রেণী গঠনকারী উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এখন আদিকোষী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। প্রাণিকোষে ও অন্যান্য সুকেন্দ্রিক কোষের মতো ব্যাকটেরিয়ায় নিউক্লিয়াস এবং ঝিল্লিবদ্ধ অঙ্গাণু নেই।

একটা সময় ব্যাকটেরিয়া (bacteria) পরিভাষাটি ঐতিহ্যগতভাবে সকল আদিকোষী জীবকে অন্তর্ভুক্ত করত। পরবর্তীতে ১৯৯০ এর দশকে আবিষ্কৃত হয় যে প্রোক্যারিওটরা "সর্বশেষ সর্বজনীন সাধারণ পূর্বপুরুষ" (Last universal common ancestor) থেকে উদ্ভূত দুইটি পৃথক জীবগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। ফলশ্রুতিতে বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস পাল্টে যায়। বর্তমানে বিবর্তনীয় অধিজগৎ দুটিকে ব্যাকটেরিয়াআর্কিয়া বলা হয়। [১৫]

 ব্যুৎপত্তিসম্পাদনা

গ্রিক শব্দ Bacterion = little rod থেকে শব্দটির উৎপত্তি ।

ব্যাকটেরিয়া শব্দটি নব্য লাতিন ভাষার ব্যাকটেরিয়াম ('bacterium') এর বহুবচন, যেটি গ্রিক βακτήριον (bakterion বা ব্যাকটেরিয়ন) এর ল্যাটিন রূপ[১৬] এবং βακτηρία (bakteria বা ব্যাকটেরিয়া)-র সংকোচন , যার মানে "লাঠি,দন্ড,বেত"।[১৭] এহেন নামকরণের হেতু প্রথম আবিষ্কৃত ব্যাকটেরিয়া দন্ডাকৃতির ছিল ।[১৮][১৯]

ব্যাকটেরিয়া সাধারণ বৈশিষ্টসমূহসম্পাদনা

  • ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত ছোট আকারের জীব, সাধারণত ০.২ - ৫ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে, অর্থাৎ এরা আণুবীক্ষণিক (microscopic) ।
  • এরা এককোষী জীব, তবে একসাথে অনেকগুলো কলোনি করে বা দল বেঁধে থাকতে পারে ।
  • ব্যাকটেরিয়া আদিকেন্দ্রিক (প্রাককেন্দ্রিক = Prokarytic) । কোষে 70s রাইবোজোম থাকে; কোনো ঝিল্লিবদ্ধ অঙ্গাণু থাকে না ।
  • ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের প্রধান উপাদান পেপটিডোগ্লাইক্যান বা মিউকোপেপটাইড, সাথে পলিস্যাকারাইড, মুরামিক অ্যাসিড (Muramic acid) এবং টিকোয়িক অ্যাসিড (Teichoic acid) থাকে ।
  • এদের বংশগতীয় উপাদান (genetic material) হলো একটি দ্বিসূত্রক, কার্যত বৃত্তাকার ডিএনএ অণু, যা ব্যাকটেরিয়াল ক্রোমোজোম হিসেবে পরিচিত । এটি সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত, এতে ক্রোমোজোমাল হিস্টোন-প্রোটিন থাকে না । ব্যাকটেরিয়ার কোষে ডিএনএ অবস্থানের অঞ্চলকে নিউক্লিয়য়েড বলা হয় ।
  • এদের বংশবৃদ্ধির প্রধান প্রক্রিয়া দ্বি-ভাজন (binary fission) ।
  • এদের কতক পরজীবী ও রোগ উৎপাদনকারী, অধিকাংশই মৃতজীবী এবং কিছু স্বনির্ভর (autophytic) ।
  • এরা সাধারণত বেসিক রং ধারণ করতে পারে (গ্রাম পজিটিভ বা গ্রাম নেগেটিভ) ।
  • ফায ভাইরাসের প্রতি এরা খুবই সংবেদনশীল ।
  • এদের অধিকাংশই অজৈব লবণ জারিত করে শক্তি সংগ্রহ করে ।
  • ব্যাক্টেরিয়া প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এন্ডোস্পোর বা অন্তরেণু গঠন করে । এ অবস্থায় এরা ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে ।
  • এদের কতক বাধ্যতামূলক অবায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেন থাকলে বাঁচতে পারে না। কতক সুবিধাবাদী অবায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেনের উপস্থিতিতেও বাঁচতে পারে । কতক বাধ্যতামূলক বায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না ।[২০]
  • আছে ঝিল্লিহীন নিউক্লিয়য়েড
  • যার মধ্যে রৈখিক ক্রোমোজোম নেই
  • আছে বৃত্তাকার ডিএনএ বা প্লাজমিড
  • ঝিল্লিযুক্ত (মেমব্রেন) কোনো অঙ্গাণু নেই এবং
  • নেই কোনো সাইটোকঙ্কাল

মানুষের দেহে কয়েক ট্রিলিয়ন কোষ আছে, তবে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা এর থেকে ১০-১০০ গুণ বেশি। গ্রাম স্টেইন দ্বারা দুরকম ব্যাকটেরিয়া সাধারণত আলাদা করা যায়।
সচরাচর এক গ্রাম মাটিতে ৪০ মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া এবং ১ মিলিলিটার মিঠা পানিতে এক মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া থাকে। পৃথিবীতে প্রায় আনুমানিক ৫×১০৩০টি ব্যাক্টেরিয়া আছে।[২১]

উৎপত্তি ও আদি বিবর্তনসম্পাদনা

আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার পূর্বপুরুষেরা এককোষী অণুজীব ছিল এবং প্রায় চার বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীতে আবির্ভূত প্রথম জীবনের রূপ ছিল। প্রায় তিন বিলিয়ন সময় ধরে অধিকাংশ জীবই আণুবীক্ষণিক ছিল এবং ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তারকারী প্রাণের রুপ ছিল।

যদিও ব্যাকটেরিয়ার জীবাশ্ম বিদ্যমান আছে, যেমন স্ট্রোমালোইটস, তবু তাদের বৈশিষ্ট্যসূচক অঙ্গসংস্থানের ঘাটতি ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনের ইতিহাস পরীক্ষায় তাদেরকে ব্যবহৃত হওয়া রোধ করে বা একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির উদ্ভবের সময় নিরুপণে বাধা সৃষ্টি করে । তাসত্ত্বেও ব্যাকটেরিয়ার জাতিজনি পুনর্গঠনে জিন অনুক্রম ব্যবহৃত হতে পারে  আর এই গবেষণাগুলো নির্দেশ করে যে, ব্যাকটেরিয়া প্রথম অপসৃত হয় আর্কিয়া/প্রকৃতকেন্দ্রিক বংশধারা থেকে । ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ার সবচেয়ে সাম্প্রতিক সাধারণ পূর্বপুরুষ সম্ভবত একটি হাইপারথার্মোফাইল(অত্যুষ্ণপ্রেমী) ছিল যেটি প্রায় ২.৫-৩.৫  বিলিয়ন বছর আগে বাস করত।  ব্যাকটেরিয়াও আর্কিয়া ও প্রকৃতকোষীর দ্বিতীয় বৃহৎ বিবর্তমূলক অপসারণে জড়িত ছিল।

অত্র, প্রকৃতকোষীরা প্রসূত হয় আদি ব্যাকটেরিয়ার প্রকৃতকেন্দ্রিক কোষের পূর্বপুরুষদের সাথে অন্তঃমিথোজীবী সম্পর্কে প্রবেশ করার পর, যেগুলো নিজেরা সম্ভবত আর্কিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল ।  এই সম্পর্ক আলফা-প্রোটিওব্যাকটেরিয়াল মিথোজীবীদের প্রারম্ভিক প্রকৃতকোষীদের দ্বারা গ্রাসকরণ বিজড়িত করে হয় মাইটোকন্ড্রিয়া অথবা হাইড্রোজিনোসাম গঠন করে, যেগুলো এখনো সব জ্ঞাত প্রকৃতকোষী জীবে পাওয়া যায় ( কখনো অত্যন্ত হ্রাসপ্রাপ্ত রূপে, যেমনঃ প্রাচীন অ্যামিটোকন্ড্রিয়াল প্রোটোজোয়াতে) ।

পরবর্তীতে, কিয়ৎ প্রকৃতকোষী যেগুলো ইতোমধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়াধারী ছিল, সেগুলোও সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মতো জীবদের গ্রাস করে (Engulfing) এবং শৈবাল ও উদ্ভিদে ক্লোরোপ্লাস্ট গঠন পরিচালনা করে। এটি প্রাথমিক এন্ডোসিমবায়োসিস হিসাবে বিদিত।

অঙ্গসংস্থানসম্পাদনা

 
Bacterial morphology diagram

ব্যাকটেরিয়া আকার ও আকৃতির একটি বিস্তীর্ণ বৈচিত্র্য প্রদর্শন করে, যাকে অঙ্গসংস্থানবিদ্যা বলে। ব্যাকটেরিয়ার কোষ সুকেন্দ্রিক কোষের এক-দশমাংশ এবং দৈর্ঘ্যে সাধারণত ০.৫-৫.০ মাইক্রোমিটার। তবে কিছু ব্যাকটেরিয়া (যেমন- Thiomargarita namibiensis এবং Epulopiscium fishelsoni) অর্ধেক মিলিমিটারের বেশি দৈর্ঘ্য এবং খালি চোখে দৃশ্যমান।[২২] Epulopiscium fishelsoni দৈর্ঘ্যে ০.৭ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।[২৩] সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম ব্যাকটেরিয়া Mycoplasma গণের সদস্য, এরা দৈর্ঘ্যে মাত্র ০.৩ মাইক্রোমিটার হয় যা বৃহত্তম ভাইরাসগুলোর আকারের সমান।[২৪] কিছু ব্যাকটেরিয়া আরও ক্ষুদ্র হয়। এই অতিকায় ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায়নি।[২৫]
গোলাকার ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় কক্কাই (একবচনে কক্কাস। গ্রীক- kókkos ,দানা, বীজ)। দণ্ডাকৃতির ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় ব্যাসিলাই (একবচনে ব্যাসিলাস, লাতিন- baculus, লাঠি)।



ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া সামান্য বাঁকানো দন্ড বা কমাকৃতির মতো; অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া সর্পিলাকৃতি বা আঁটসাঁটভাবে কুন্ডলিত হতে পারে। একটি ক্ষুদ্রসংখ্যক অসচরাচর আকৃতি বর্ণিত আছে,  যেমনঃ তারকাকৃতি ব্যাকটেরিয়া ।

আকৃতির এই ব্যাপক বৈচিত্র্য ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর ও কোষীয় কঙ্কাল দ্বারা নির্ধারিত হয় । ব্যাকটেরিয়ার আকৃতি-বৈচিত্র গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি ব্যাকটেরিয়ার পরিতোষক পদার্থ আয়ত্ত করতে, তলসমূহে সংযুক্ত হতে, তরলের মধ্যে সাঁতরাতে, শিকারী হতে পালানো ইত্যাদির সক্ষমতাকে প্রভাবান্বিত করতে পারে।

অধিক ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি কেবল একক কোষ হিসাবেই বিরাজ করে, অন্যান্যরা বিশেষভাবে সজ্জিত থাকে।

Neisseria জোড়া গঠন করে, স্ট্রেপটোকক্কাস (Streptococcus) শিকল গঠন করে এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস (Staphylococcus) একত্রে আঙ্গুরের গুচ্ছের মত পুঞ্জ গঠন করে। ব্যাকটেরিয়া বৃহত্তর বহুকোষীয় কাঠামো গঠন করতে পুঞ্জীভূত হতে পারে। যেমনঃ অ্যাকটিনোব্যাকটেরিয়ার (Actinobacteria) দীর্ঘায়ত তন্তু, মিক্সোব্যাকটেরিয়ার (Myxobacteria) সমষ্টি, স্ট্রেপটোমাইসিসের (Streptomyces) জটিল হাইফি ইত্যাদি। শুধু নির্দিষ্ট কিছু শর্তাধীনে এমন বহুকোষীয় কাঠামোগুলো দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যখন অ্যামিনো অ্যাসিডের সংকট থাকে, মিক্সোব্যাকটেরিয়া পারিপার্শ্বিক ব্যাকটেরিয়া কোষগুলোকে 'কোরাম সেনসিং'(Quorum sensing) প্রক্রিয়ায়  শনাক্ত করতে পারে এবং প্রত্যেকে একে অপরের দিকে স্থানান্তরিত হয়ে ৫০০ মাইক্রোমিটার দীর্ঘ পর্যন্ত "ফ্রুটিং বডি" (Fruiting body) গঠন করতে পারে। ফ্রুটিং বডিতে আনুমানিক ১০০,০০০ ব্যাকটেরিয়া কোষ থাকে।[২৬]

এই ফ্রুটিং বডিগুলোর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া পৃথক পৃথক কাজ সম্পাদন করে; উদাহরণস্বরূপ, দশটি কোষের মধ্যে একটি কোষ ফ্রুটিং বডির শীর্ষে পরিযাণ করে এবং একটি বিশেষায়িত সুপ্তাবস্থায় প্রভেদিত হয়, যে দশাকে মিক্সোস্পোর বলে । এটি শুষ্ক ও প্রতিকূল পরিবেশগত অবস্থায় অধিকতর প্রতিরোধক।

ব্যাকটেরিয়া প্রায়ই বিভিন্ন তলে সংযুক্ত হয় এবং ঘন জমায়েত গঠন করে যাকে বায়োফিল্ম বলে । আরো বৃহত্তর গঠনকে মাইক্রোবিয়াল ম্যাটস (অণুজীবদের মাদুর) বলে । বায়োফিল্ম ও ম্যাটের পুরুত্ব কয়েক মাইক্রোমিটার থেকে অর্ধ মিটার পর্যন্ত গভীর হতে পারে এবং ব্যাকটেরিয়া, প্রোটিস্ট ও আর্কিয়ার বহু প্রজাতি ধারণ করতে পারে । বায়োফিল্মে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়া কোষ ও বহিঃকোষীয় উপাদানের একটি জটিল সজ্জা প্রদর্শন করে । যেমন, মাইক্রোকলোনির মতো গৌণ কাঠামো গঠন করে যার মধ্যে পরিপোষকের উত্তম ব্যাপন সমর্থ করার জন্য বহু নালী জালিকা থাকে । প্রাকৃতিক পরিবেশে, যেমন মাটি বা উদ্ভিদ পৃষ্ঠতলে, বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া বায়োফিল্ম গঠন করে তলসমূহে আবদ্ধ থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বায়োফিল্ম তাৎপর্যময়, যেহেতু এসব ব্যাকটেরিয়া কাঠামো প্রায়শ দীর্ঘকালস্থায়ী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে উপস্থিত থাকে। বায়োফিল্মে সুরক্ষিত ব্যাকটেরিয়া নাশ করা স্ববশ ও পৃথক ব্যাকটেরিয়া নাশ করার চেয়ে দুরূহ।

গ্রাম পজিটিভ ব্যাক্টেরিয়াসম্পাদনা

এরা আদিমতর। এদের ঝিল্লির আবরণ একটি। পুরু পেপটিডোগ্লাইক্যান আস্তরণ তার বাইরে থাকে, যার সঙ্গে টিকোয়িক অ্যাসিড যুক্ত।

ব্যবহারসম্পাদনা

গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াসম্পাদনা

বিস্তারিত জানতে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিবন্ধটি দেখুন

শ্রেণিবিভাগসম্পাদনা

(ক) আকৃতি অনুসারে ব্যাকটেরিয়া চার প্রকার ৷ যথা:

১। কক্কাস (এসমস্ত ব্যাকটেরিয়া গোলাকার আকৃতির। এরা এককভাবে বা দলবেঁধে থাকতে পারে। এরা নিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টি কারী ব্যাকটেরিয়া।)

২৷ ব্যাসিলাস (দণ্ডাকার ব্যাকটেরিয়া)

৩৷ স্পাইরিলাম(সর্পিল আকৃতির ব্যাকটেরিয়া)

৪৷ কমা(এরা দেখতে কমার মত, উদাহরণ কলেরার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া)

(খ) রঞ্জনের ভিত্তিতে ২ প্রকার ৷

১৷ গ্রাম পজিটিভ (যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ক্রিস্টাল ভায়োলেট রং ধরে রাখে সে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া )

২। গ্রাম নেগেটিভ (এরা ক্রিস্টাল ভায়োলেট রং ধরে রাখতে পারেনা)

সৃষ্টরোগসম্পাদনা

  • গরু-মহিষের যক্ষ্মা
  • ভেড়ার এনথ্র্যাক্স
  • হাঁস-মুরগির কলেরা ও গলাফোলা রোগ
  • গমের টুন্ডুরোগ
  • আখের আঠাঝরা রোগ
  • লেবুর ক্যাংকার
  • আলুর স্ক্যাব

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Pavan ME, ও অন্যান্য (মে ২০১৮)। "Proposal for a new classification of a deep branching bacterial phylogenetic lineage: transfer of Coprothermobacter proteolyticus and Coprothermobacter platensis to Coprothermobacteraceae fam. nov., within Coprothermobacterales ord. nov., Coprothermobacteria classis nov. and Coprothermobacterota phyl. nov. and emended description of the family Thermodesulfobiaceae."। Int. J. Syst. Evol. Microbiol.68 (5): 1627–32। doi:10.1099/ijsem.0.002720 PMID 29595416  অজানা প্যারামিটার |s2cid= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  2. Fredrickson, James K.; Zachara, John M.; Balkwill, David L.; Kennedy, David; Li, Shu-mei W.; Kostandarithes, Heather M.; Daly, Michael J.; Romine, Margaret F.; Brockman, Fred J. (জুলাই ২০০৭)। "Geomicrobiology of High-Level Nuclear Waste-Contaminated Vadose Sediments at the Hanford Site, Washington State"Applied and Environmental Microbiology৭০ (৭): ৪২৩০–৪২৪১। doi:10.1128/AEM.70.7.4230-4241.2004PMID 15240306আইএসএসএন 0099-2240। সংগ্রহের তারিখ ৩ আগস্ট ২০২০ 
  3. Dudek, Natasha K.; Sun, Christine L.; Burstein, David; Kantor, Rose S.; Aliaga Goltsman, Daniela S.; Bik, Elisabeth M.; Thomas, Brian C.; Banfield, Jillian F.; Relman, David A. (২০১৭-১২-১৮)। "Novel Microbial Diversity and Functional Potential in the Marine Mammal Oral Microbiome"Current biology: CB27 (24): 3752–3762.e6। doi:10.1016/j.cub.2017.10.040PMID 29153320আইএসএসএন 1879-0445 
  4. Fang, Huan; Kang, Jie; Zhang, Dawei (২০১৭-০১-৩০)। "Microbial production of vitamin B12: a review and future perspectives"Microbial Cell Factories16doi:10.1186/s12934-017-0631-yPMID 28137297আইএসএসএন 1475-2859পিএমসি 5282855  
  5. Moore, Simon J.; Warren, Martin J. (২০১২-০৬-০১)। "The anaerobic biosynthesis of vitamin B12"Biochemical Society Transactions (ইংরেজি ভাষায়)। 40 (3): 581–586। doi:10.1042/BST20120066আইএসএসএন 0300-5127 
  6. Graham, Ross M.; Deery, Evelyne; Warren, Martin J. (২০০৯)। Warren, Martin J.; Smith, Alison G., সম্পাদকগণ। Tetrapyrroles: Birth, Life and Death। Molecular Biology Intelligence Unit (ইংরেজি ভাষায়)। New York, NY: Springer। পৃষ্ঠা 286–299। doi:10.1007/978-0-387-78518-9_18আইএসবিএন 978-0-387-78518-9 
  7. Miller, Ariel; Korem, Maya; Almog, Ronit; Galboiz, Yanina (২০০৫-০৬-১৫)। "Vitamin B12, demyelination, remyelination and repair in multiple sclerosis"Journal of the Neurological Sciences233 (1-2): 93–97। doi:10.1016/j.jns.2005.03.009PMID 15896807আইএসএসএন 0022-510X 
  8. Whitman, William B.; Coleman, David C.; Wiebe, William J. (১৯৯৮-০৬-০৯)। "Prokaryotes: The unseen majority"Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America95 (12): 6578–6583। PMID 9618454আইএসএসএন 0027-8424 
  9. C.Michael Hogan. 2010. Bacteria. Encyclopedia of Earth. eds. Sidney Draggan and C.J.Cleveland, National Council for Science and the Environment, Washington, DC ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১১ মে ২০১১ তারিখে
  10. Forbes SL (২০০৮)। "Decomposition Chemistry in a Burial Environment"। Tibbett M, Carter DO। Soil Analysis in Forensic Taphonomy। CRC Press। পৃষ্ঠা ২০৩–২২৩। আইএসবিএন 978-1-4200-6991-4।
  11. Sears, Cynthia L. (অক্টোবর ২০১১)। "A dynamic partnership: celebrating our gut flora"Anaerobe১১ (৫): ২৪৭–২৫১। doi:10.1016/j.anaerobe.2005.05.001PMID 16701579আইএসএসএন 1075-9964। সংগ্রহের তারিখ ৩ আগস্ট ২০২০ 
  12. "World TB Day 2020"www.who.int (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-০২ 
  13. "Metal-mining bacteria are green chemists"ScienceDaily (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-০২ 
  14. Ishige, Takeru; Honda, Kohsuke; Shimizu, Sakayu (২০০৫-০৪-০১)। "Whole organism biocatalysis"Current Opinion in Chemical Biology। Bioiorganic chemistry / Biocatalysis and biotransformation (ইংরেজি ভাষায়)। 9 (2): 174–180। doi:10.1016/j.cbpa.2005.02.001আইএসএসএন 1367-5931 
  15. Woese, C R; Kandler, O; Wheelis, M L (জুন ১৯৯০)। "Towards a natural system of organisms: proposal for the domains Archaea, Bacteria, and Eucarya."Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America৮৭ (১২): ১৫৭৬–৪৫৭৯। PMID 2112744আইএসএসএন 0027-8424। সংগ্রহের তারিখ ২ আগস্ট ২০২০ 
  16. "Henry George Liddell, Robert Scott, A Greek-English Lexicon, βακτήρ-ιον"www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-০২ 
  17. "Henry George Liddell, Robert Scott, A Greek-English Lexicon, βακτηρ-ία"www.perseus.tufts.edu। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-০২ 
  18. "bacterium"on Oxford Dictionaries 
  19. "bacteria"Online Etymology Dictionary 
  20. জীববিজ্ঞান প্রথম পত্র। হাসান বুক হাউস। ২০১৯। পৃষ্ঠা ১২৯–১৩০। 
  21. Whitman WB, Coleman DC, Wiebe WJ (১৯৯৮)। "Prokaryotes: the unseen majority"Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America95 (12): 6578–83। doi:10.1073/pnas.95.12.6578PMID 9618454পিএমসি 33863 বিবকোড:1998PNAS...95.6578W 
  22. Schulz HN, Jorgensen BB (২০০১)। "Big bacteria"। Annu Rev Microbiol55: 105–37। doi:10.1146/annurev.micro.55.1.105PMID 11544351 
  23. Williams, Caroline (২০১১)। "Who are you calling simple?"। New Scientist211 (2821): 38–41। doi:10.1016/S0262-4079(11)61709-0 
  24. Robertson J, Gomersall M, Gill P (১৯৭৫)। "Mycoplasma hominis: growth, reproduction, and isolation of small viable cells"J Bacteriol.124 (2): 1007–18। PMID 1102522পিএমসি 235991  
  25. Velimirov, B. (২০০১)। "Nanobacteria, Ultramicrobacteria and Starvation Forms: A Search for the Smallest Metabolizing Bacterium"। Microbes and Environments16 (2): 67–77। doi:10.1264/jsme2.2001.67 
  26. Shimkets, L. J. (১৯৯৯)। "Intercellular signaling during fruiting-body development of Myxococcus xanthus"Annual Review of Microbiology53: 525–549। doi:10.1146/annurev.micro.53.1.525PMID 10547700আইএসএসএন 0066-4227 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা