ললিতা রায়

ভারতীয় নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকারী এবং সমাজ সংস্কারক

ললিতা রায় (জন্ম: ১৮৬৫ – ?), যিনি মিসেস পি. এল. রয় নামেও পরিচিত, একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক এবং মহিলা ভোটাধিকারী ছিলেন। তিনি লন্ডনে ভারতীয়দের সামাজিক জীবনের প্রগতির জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সেইসাথে মহিলাদের ভোটাধিকারের জন্য ব্রিটেন এবং ভারতে আন্দোলন ও প্রচারাভিযান করেন।[১] ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের দ্য ভোট নামক ব্রিটিশ নাটকে তাকে সেইসময়কার সবচেয়ে মুক্তচেতা ভারতীয় নারী হিসেবে ব্যক্ত করা হয়।[২]

ললিতা রায়
Indian Suffragettes on the Women's Coronation Procession.jpg
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে উইমেন'স কোরনেশন প্রসেশনে ভারতীয় নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকারীরা; বামদিকে ললিতা রায়
জন্ম১৮৬৫
মৃত্যুঅজ্ঞাত
জাতীয়তাভারতীয়
পেশানারীবাদী, নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকারী, সমাজ সংস্কারক
দাম্পত্য সঙ্গীপিয়ারীলাল রায়
সন্তান
পরেশলাল রায়
ইন্দ্রলাল রায়

জীবনীসম্পাদনা

ললিতা রায় ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।[১] তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ব্যারিস্টার এবং পাবলিক প্রসিকিউশনের পরিচালক[৩] পিয়ারীলাল রায়কে বিয়ে করেন। তাদের ছয় সন্তান: লীলাবতী, মীরাবতী, পরেশলাল, হীরাবতী, ইন্দ্রলাল এবং ললিত কুমার। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে রায় ও তার সন্তানেরা পশ্চিম লন্ডনে বসবাস শুরু করে।[১]

লন্ডনে থাকাকালীন ললিতা রায় ভারতীয়দের জন্য একাধিক সামাজিক এবং কর্মী সমিতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি লন্ডন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন সোসাইটির সভাপতি এবং ন্যাশনাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মেরি কার্পেন্টার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত) কমিটির একজন সদস্য ছিলেন।[১][৪] লন্ডন ইউনিয়ন সোসাইটি লন্ডনে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাহায্য করতো। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্ডিয়ান উইমেনস এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য করেছিলেন, যা ভারতীয় মহিলাদের ব্রিটেনে শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল।[১]

১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন উইমেনস সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন[৫] রাজা পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেকের সময় মহিলা ভোটাধিকারের জন্য একটি পদযাত্রার আয়োজন করে।[৬] জেন কোবডেন এবং ললিতা রায় পদযাত্রার শুরুতে 'ইম্পেরিয়াল কন্টিনজেন্ট'-এর অংশ হিসেবে একটি ছোট ভারতীয় দল গঠন করেছিলেন।[৪][৫] এই দল সমাজে মহিলাদের ভোটাধিকারের সমর্থনের শক্তি প্রদর্শন করেছিল। শোভাযাত্রার একটি ছবিতে রয়েছে ললিতা রায়, মিসেস ভগবতী ভোলা নাথ এবং মিসেস লীলাবতী মুখার্জী (ললিতা রায়ের মেয়ে)।[৩] বহু বছর পরে পদযাত্রায় তাদের উপস্থিতির কথা লিখে ভারতীয় রাজনীতিবিদ সুশমা সেন স্মরণ করেন:

সেই সময়ে মহিলাদের ভোটাধিকার আন্দোলনের জন্য যারা লড়াই করছিল, তারা এই আন্দোলনকে একটি অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। সেই সময়ে লন্ডনে অল্প সংখ্যক ভারতীয় মহিলা ছিলেন। আমার কথা শুনে তারা আমাকে পিকাডিলি সার্কাসে তাদের বিক্ষোভে যোগ দিতে এবং মিসেস পঙ্কহার্স্টের নেতৃত্বে তাদের সাথে মিছিল করে সংসদ ভবনে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাঠায়। এটি আমার জন্য একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা ছিল, একই সাথে মিছিলের মধ্যে একক ভারতীয় মহিলার জন্য এটি একটি অভিনব দৃশ্য ছিল। আমি ছিলাম জনসাধারণের কেন্দ্রদৃষ্টিতে।[৬]

সমাজতান্ত্রিক, নারী অধিকার আন্দোলনকারী এবং থিওসফিস্ট অ্যানি বেসান্তও ভারতীয় আন্দোলনকারী সঙ্গে মিছিলে যোগদান করেছিলেন।[৫]

১৯১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে ললিতা রায় লন্ডন এবং কেমব্রিজে বেশ কয়েকটি ভারতীয় নাটকের প্রযোজনায় সহায়তা করেছিলেন, পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং নাট্যাভিনেতাদের পাগড়ি এবং শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী পোশাক দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।[১]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ললিতা রায়ের দুই পুত্র সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেন। তার বড় ছেলে পরেশলাল রায় যুদ্ধের সময় অনারেবল আর্টিলারি কোম্পানিতে চাকরি করেছিলেন। ১৯২০-এর দশকে ভারতে ফিরে আসার পর তিনি বক্সিং খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[১] তার মেঝ ছেলে, ইন্দ্রলাল রায় (১৮৯৮-১৯১৮) রয়েল ফ্লাইং কর্পসে যোগদান করেন।[৭] তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একমাত্র ভারতীয় বৈমানিক।[৮][৯] ললিতা রায় ইস্টার্ন লিগের অনারারি সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ভারতীয় সৈন্যদের তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ, ভারতীয় সৈন্যদের পোশাক, খাদ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে অন্যান্য নারীবাদীদের সঙ্গে ললিত রায় একটি 'মহিলা দিবস' আয়োজন করতে সাহায্য করেছিলেন, যেখানে অর্থ সংগ্রহের জন্য লন্ডনের হেইমার্কেটে জিনিসপত্র বিক্রি করা হয়েছিল।[১]

ব্রিটেনে ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি ভারতে মহিলাদের ভোটাধিকার প্রদানের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন। তার কর্মসূচির মধ্যে ছিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করা, ভারতের জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট অব ডেপুটেশনে অংশ নেওয়া, হাউস অব কমন্সে একটি সভায় যোগ দেওয়া এবং ভারতীয় মহিলাদের ভোটাধিকার সমর্থনে জনসাধারণের মতামত নেওয়া। ১৯২০-এর দশকে তিনি ভারতে সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলনে যোগদান করেন এবং মহিলাদের ভোটাধিকারের জন্য কাজ করতে থাকেন।[১]

ললিতা রায়ের মৃত্যুর তারিখ অজানা।[১]

প্রভাব ও উত্তরাধিকারসম্পাদনা

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং কর্মীরা ললিতা রায় সহ ব্রিটিশ মহিলাদের ভোটাধিকার আন্দোলনকে বৃহত্তর স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।[১০] ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক[১১] ডাঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করেন এবং ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইনের মাধ্যমে সেইসময় কিছু মহিলাকে যুক্তরাজ্যে যে ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘটনার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় মহিলাদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, পশ্চিমের জনপ্রিয় বিশ্বাস ভারতীয় মহিলাদের অবদানকে উপেক্ষা করেছে।[১০] ডাঃ মুখোপাধ্যায় প্রধানত ভারতীয় ভোটাধিকার প্রচারক ও আন্দোলনকারীদের ভূমিকার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন- ভারতীয় উপমহাদেশে একটি উচ্চ পর্যায়ের নারী ভোটাধিকার আন্দোলন ছিল এবং এই মহিলারা আন্তর্জাতিকভাবে অন্যান্য ভোটাধিকার প্রচারকদের সাথে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পেরেছিল।[১০]

২০১৮-এর এপ্রিল মাসে লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে মিলিসেন্ট ফসেট মূর্তির নিচে একটি চূড়া তৈরি করা হয়। সেখানে রাণী ভিক্টোরিয়া[৪] সহ ভারতীয় বংশদ্ভুত সোফিয়া দুলীপ সিং এবং ললিতা রায়ের চিত্রাঙ্কন করা হয়।[১০] একই বছরে, হ্যামারস্মিথ টাউন হলে একটি প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হয়েছিল যাতে ভোটাধিকার আন্দোলনে ললিতা রায়ের অবদানকে একটি শিল্পকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।[১২][১৩]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Roy, Lolita [known as Mrs P. L. Roy] (b. 1865), social reformer and suffragist"Oxford Dictionary of National Biography (ইংরেজি ভাষায়)। ডিওআই:10.1093/odnb/9780198614128.013.369120। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  2. Hoque, Nikhat (২০১৯-০২-০৩)। "Meet 7 Indian Suffragettes Of The British Suffrage Movement"Feminism In India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  3. "Bloomsbury Collections - Suffrage and the Arts - Visual Culture, Politics and Enterprise"www.bloomsburycollections.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  4. "Suffrage Stories: Black And Minority Ethnic Women: Is There A 'Hidden History'?"Woman and her Sphere (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৭-০৭-২৪। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  5. "Lolita Roy and Indian Suffragettes, Coronation Procession - Museum of London"Google Arts & Culture (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  6. "Black History Month: Diversity and the British female Suffrage movement"Fawcett Society (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  7. Oct 8, Manimugdha S. Sharma / TNN / Updated:; 2014; Ist, 23:34। "Indians who lorded over European skies in WWI | India News - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০৭ 
  8. "Remembering Indra Lal Roy, India's 'Ace' Over Flanders"The Wire। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০৭ 
  9. DelhiDecember 2, india today digital New; December 2, 2015UPDATED:; Ist, 2015 10:18। "Indra Lal Roy's 177th birth anniversary: Some unknown facts you must know about the flying ace"India Today (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০৭ 
  10. "Indian Suffragettes: Changing Public Understanding of Suffrage Histories"University of Bristol। ১৭ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  11. Science, London School of Economics and Political। "Unearthed photograph highlights important role of Indian suffragettes"London School of Economics and Political Science (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  12. "New town hall exhibition celebrates a pioneering Indian suffragette from Hammersmith"LBHF (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮-১০-১৭। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 
  13. "Visit LDN WMN: a series of free public artworks"London City Hall (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮-১০-০৩। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১২ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা