কোচ জাতি

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে বসবাসকারী অন্যতম প্রাচীন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
(কোচ থেকে পুনর্নির্দেশিত)

কোচ তিব্বতী-বর্মী পরিবারের অন্তর্গত মূল ভারতের আসাম, মেঘালয় ও বাংলাদেশে বসবাসকারী একটি ভাষিক জাতি ও অন্যতম প্রাচীন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।[৫] কোচরা গারো ও খাসিয়াদের মতোঈ অতি-সীমান্ত জনগোষ্ঠী৷ তাদের পূর্বপুরুষের জমি বর্তমানে একাধিক দেশ, একাধিক রাজ্যে খণ্ডিত।[৬] ভারতীয় উপমহাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে কোচরা অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত। কোচরা দ্রাবিড় এবং মঙ্গোলিয় উভয় গোষ্ঠীর সংমিশ্রণে উদ্ভুত জনগোষ্ঠী। তারা নিজেদেরকে সূর্যবংশীয় বলে দাবী করে থাকে। [৭] মেঘালয়ে এই জনগোষ্ঠী তফসিলি উপজাতি তকমাপ্রাপ্ত।[৮] জনজাতির লোকেরা সরকারী সহায়তা ও নিজেদের প্রচেষ্টায় তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ব্রতী।[৯] ভারতের বাইরে বাংলাদেশের শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী , নালিতাবাড়ী এবং শ্রীবর্দী উপজেলায় তাদের বসবাস। কোচ ও রাজবংশীদের প্রায়সময় একই জাতি মনে করা হয়। কিছু সংখ্যক কোচ এবং রাজবংশী গাজীপুর ময়মনসিংহ ও টাংগাইলের বরেন্দ্র পাহাড়ী এলাকায় বসবাস করেন ।

কোচ জাতি
কোচ
Koch male and female 1972.jpg
কোচ মহিলা ও পুরুষ ১৮৭২
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল
 ভারত (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়)
 বাংলাদেশ (ময়মনসিংহ বিভাগ)
              ভারত৩৬,৪৩৪ [১]
আসাম১২,৫৫০[২]
              মেঘালয়২৩,১৯৯[৩]
              পশ্চিমবঙ্গ৪২৭
বাংলাদেশ১৬,৯০৩[৪]
ভাষা
কোচ
ধর্ম
Om.svg হিন্দু ধর্ম
সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী
গারো, খাসিয়া , রাজবংশী
ময়মনসিংহে কোচ সম্প্রদায়

(বি: দ্র: পরের এ তথ্য টি লোকচুতি) সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে "কোচ" নামক আদিবাসী বসবাস করে আসছে ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে পাঁচ হাজার বছর অব্দে বর্তমান কোচবিহার হতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস শুরু করে বর্তমানে এদের বসবাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল জেলার বেশ কিছু জায়গায় । এদের নিজস্ব ভাষা ঐতিহ্য সংস্কৃতি রয়েছে । এ অধিবাসী ভাষাকে বলা হয় থার ভাষা । কোচ আদিবাসীদের নিয়ে একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে , সেটি হল তথাকথিত গল্প গুঞ্জন শোনা যায় যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গ্রন্থে তাদের দশ অবতার এক অবতার ভগবান শ্রী পরশুরাম ক্ষত্রিয় নিধনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে ক্ষত্রিয়রা প্রাণের ভয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড়-পর্বতে গিয়ে লুকিয়ে ছদ্মবেশে জীবনযাপন করতে থাকেন। কোচবিহারের নামকরণ এ আদিবাসী থেকেই হয়েছে বলে ধারণা করা হয় ।অর্থাৎ এ তথ্য হতে এটি সুস্পষ্ট ভাবে বলা যায় যে এরা হচ্ছে আর্য ক্ষত্রিয় । জীবিকা নির্বাহের জন্য এদের সৃষ্ট ভাষার সম্পর্কে বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:- (নোট : এদের সৃষ্ট ভাষা থাকলেও এদের নির্দিষ্ট কোন বর্ণমালা নেই , যার জন্য ভাষাগুলো আজ বিলুপ্তির পথে)

বাংলাভাষা= থারভাষা

ভাত= মেরং

তরকারি =জাবা

পিরি (বসার উপকরণ )= খাম্বাই

বিড়াল = নেখেম

কোচ নামকরণসম্পাদনা

যোগিনী তন্ত্র অনুসারে কোচরা কুবচ নামে পরিচিত ছিল।[১০] তবকত-ই-নাসিরী গ্রন্থ অনুসারে কামরূপ ছিল কোচ , মেচথারু জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত।[১১] ফাতিয়া-ই-ইব্রিয়া অনুসারে কোচবিহার রাজ্য ছিল কোচেদের বসতক্ষেত্র,[১২] যদিও কোচবিহারের কিছু কোচ ও মেচ নিজেদের কোচ রাজবংশী বলে পরিচয় দিতেন। [১৩]

আবাসস্থলসম্পাদনা

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার সালোরা, হাতিল, জয়রামপুর, কিসমতপুর, ঘাটুরী, তারাটি, রওয়ারচর, গৌরীপাড়া, কাঁঠালিয়া, কমলাপুর, চন্দনিআটা, কান্দিগাঁও অঞ্চলে ৩ সহস্রাধিক কোচ পরিবার বসবাস করে। আধুনিক যুগেও এরা প্রায় সকলেই ভূমিহীন, অশিক্ষিত ও দরিদ্র। [৭]

শাখাসম্পাদনা

কোচ সম্প্রদায় ৮টি দলে বিভক্ত। এগুলি হল,

  • ওয়ানাং
  • হরিগাইয়া
  • দশগাইয়া
  • সাতপাড়ি
  • তিনথেকিয়া
  • চাপরা
  • শঙ্কর
  • মারগান

প্রত্যেক দলে রয়েছে একাধিক গোত্র বা নিকিনি। কোচ সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও পরিবারের সন্তানসন্তুতি মায়ের গোত্রনাম গ্রহণ করে থাকে। পুত্র সন্তানেরাই পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। স্বগোত্র বা একই নিকিনির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। যৌথ ও একক উভয় প্রকার পরিবারপ্রথা চালু থাকলেও বর্তমানে একক পরিবারের সংখ্যাই বেশি। কোচ মেয়েরা বিয়ের পর স্থায়ীভাবে স্বামীগৃহে যান ও সিঁথিতে সিঁদুর এবং হাতে চুড়ির সঙ্গে শাঁখা ব্যবহার করেন। কোচ সমাজে একবিবাহ প্রথা প্রচলিত হলেও ব্যতিক্রমী একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতেও দেখা যায়।

ইতিহাসসম্পাদনা

কোচ জাতির ইতিহাসের একটি বড় অংশ দখল করেছে কোচ রাজবংশ। কোচ হাজো ছিলেন একজন ভূঁইয়া, তার হীরা ও জিরা নামে দুই কন্যা সন্তান ছিল।[১৪] ঐতিহাসিক চরিত্র এই হাজো বড়ো জানুয়ারিতেই লোকজন দ্বারা এখনো পূজিত হন।[১৫][১৬] হীরা ও জিরা দুই বোন হরিয়া মন্ডলকে বিবাহ করেন। জিরা দুই পুত্র সন্তান চন্দন এবং মদনকে জন্ম দেয়। হীরা জন্ম দেয় বিশু (বিশ্ব সিংহ) এবং শিশু (শিষ্য সিংহ)-কে। তাদের মধ্যে বিশু ছিলেন সাহসী ও বিচক্ষণ। তিনিই কোচবিহারের কোচ বা নারায়ণ রাজবংশের আদিপুরুষ।[১৬]

খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই কোচ নাম যথেষ্ট পরিচিতি পায় ও বিভিন্ন বর্বোরোচিত আচরণে জড়িয়ে পড়ে। এই জনগোষ্ঠী একটি বড় অংশ নিজেদেরকে রাজবংশী বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন, বিংশ শতাব্দীতে তাই কোচ রাজবংশীতে পরিণত হয়।[১৭]

খাদ্যাভ্যাসসম্পাদনা

কোচদের প্রধান খাদ্য ভাত, অধিকাংশই আমিষভোজী। তারা শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও মাংস আহার করে। শূকরের মাংস তাদের অতি প্রিয় এছাড়া খরগোশ, সজারু প্রভৃতির মাংস তারা পছন্দ করে। মাছ ছাড়াও কচ্ছপ, কুচিয়া প্রভৃতি তাদের নিকট প্রিয়। বিভিন্ন পার্বনে তারা চালের পিঠা তৈরি করে। কোচরা মদপান করলেও গুরুর নিকট দীক্ষিত হলে মদ, মাংস পরিহার করেন। কোচ পুরুষেরা ধুতি, লুঙ্গি, জামা, গেঞ্জি প্রভৃতি ব্যবহার করেন ও কোচ মহিলাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক লেফেন ও আছাম ব্যবহার করেন।[১৮]

জীবিকাসম্পাদনা

কোচ পরিবারের অধিকাংশই বাঁশের সামগ্রী তৈরি কিংবা দিনমজুরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বাঁশ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ায় এ শিল্পেও চলছে সংকট। [৭]

ধর্মাচারসম্পাদনা

কোচরা একদিকে যেমন দুর্গাপূজা , কালীপূজা , সরস্বতীপূজা , লক্ষ্মীপূজা সম্পন্ন করে তেমনি তাদের নিজস্ব পুরোহিত তথা দেউসি ও আজেং দ্বারা আদি ধর্মের দেব-দেবী ঋষি এবং তার পত্মী যোগমায়ার পূজা করে থাকেন। কোচেরা এই দুজনকেই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা হিসাবে বিশ্বাস করেন। দেবী কামাখ্যাও কোচ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান দেবী।

উত্তরাধিকারসম্পাদনা

হিন্দু ধর্মের প্রভাবে প্রভাবান্বিত কোচরা ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং পুত্র সন্তানরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। [৭]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Census of India Website : Office of the Registrar General & Census Commissioner, India" (PDF) 
  2. "C-16 Population By Mother Tongue - Assam"censusindia.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২০ 
  3. "Census of India Website : Office of the Registrar General & Census Commissioner, India"। সংগ্রহের তারিখ ১১ আগস্ট ২০২০ 
  4. "৪৭ জেলায় আদিবাসীর সংখ্যা কমেছে!"www.prothom-alo.com। ২০১২-০৮-১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১০-০৯ 
  5. "Glottolog 4.0 - Kochic"glottolog.org। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯ 
  6. "Interview | 'There Are Few Documents on the Diverse History of Koch Rajbanshis'"The Wire। ১১ মে ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ মে ২০২০ 
  7. মনোনেশ দাস (২০১৪-১০-২৬)। "ময়মনসিংহে অবহেলিত কোচ সম্প্রদায়"bdnews24.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-১৯ 
  8. মেঘালয়ে, কোচেস সরকারী বিজ্ঞাপিত তফসিলি উপজাতি।(ভারতের আদমশুমারি)
  9. "Koch union seeks to preserve culture"www.telegraphindia.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০১৯ 
  10. প্রায় ষোড়শ শতাব্দীতে আসামে রচিত যোগিনী তন্ত্র কোচকে কুভচ হিসাবে উল্লেখ করে(Nath:৩)
  11. (Salam , 1902:৬৫)
  12. কুচবিহারে মাখ (মেচ) এবং কুজরা (কোচ) বাস করত। রাজা, প্রথম উপজাতির অন্তর্ভুক্ত থাকত।(Salam , 1902:১১)
  13. কোচ এবং রাজবংশী উভয় শব্দই কিছু মানুষের গোষ্ঠীকে বোঝায় কিন্তু দুটি শব্দের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে- পূর্ববর্তীটি আদিবাসী বুঝায়; যদিও পরেরটি আর্য বা দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত। কামরুপা-কামাতা রাজ্যের একটি সাধারণ জাতিগোষ্ঠীকে সনাক্ত করার জন্য কোচ বা মেচ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল (বড়ুয়া ২০০৮ ১৮৯) [১]। অন্যদিকে 'রাজবংশী' শব্দটি সংস্কৃত বা দ্রাবিড় শব্দ 'রাজভামসি' থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়, যার অর্থ খসারতিয়া বা রাজকীয় জাতির ব্যক্তি বা রাজার বংশধর (চৌধুরী ২০১১ ০৯) [৪], তথায় 'রাজভামসি' শব্দটি দ্রাবিড়দের এক স্বতন্ত্র সম্প্রদায়কেও বোঝায় (বড়ুয়া ২০০৭ ২০৩) [২]। (Halder , 2017)
  14. "History Book of Cooch Behar"coochbehar.nic.in। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯ 
  15. বড়োরা (মেচ) হাজো রাজার উপাসনা করত (Hodgson , 1847:১৬৭)
  16. চৌধুরী, হরেন্দ্র নারায়ণ (১৯০৩)। The Cooch Behar state and its land revenue settlements। কোচবিহার। পৃষ্ঠা ২২৫, ২২৬। 
  17. (Jacquesson 2008:27)
  18. "নালিতাবাড়ীতে কালচারাল একাডেমি স্থাপনের দাবি"alokitobangladesh.com। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মে ২০২১