প্রধান মেনু খুলুন

উইকিপিডিয়া β

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিল।[১] ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবর রহমান গং মামলা। তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই বেশি পরিচিত, কারণ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল। মামলা নিষ্পত্তির চার যুগ পর মামলার আসামী ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি স্বরচিত গ্রন্থে এ মামলাকে সত্য মামলা' বলে দাবী করেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রেক্ষাপটসম্পাদনা

৬ জানুয়ারি, ১৯৬৮ সালে ২ জন সি. এস. পি অফিসারসহ ২৮জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের গ্রেফতার সম্পর্কে সরকারী প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয় যে,

গত মাসে (অর্থাৎ ডিসেম্বর, ১৯৬৭) পূর্ব-পাকিস্তানে উদ্‌ঘাঁটিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই ষড়যন্ত্রকে "আগরতলা ষড়যন্ত্র" নামে অভিহিত করে। এই একই অভিযোগে ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৮ সালে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানকেও গ্রেফতার করা হয়। ৩৫জনকে আসামী করে সরকার পক্ষ মামলা দায়ের করে।[১]

নামকরণসম্পাদনা

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটিকে সরকারিভাবে নামকরণ করেছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার। এই মামলায় ৩৫জনকে আসামী করা হয়।[১]

আসামীরা সকলেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁরা হলেন -শেখ মুজিবুর রহমান; আহমেদ ফজলুর রহমান, সিএসপি; কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন; স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান; সাবেক এলএস সুলতানউদ্দীন আহমদ; এলএসসিডিআই নূর মোহাম্মদ; ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজ উল্লাহ; কর্পোরাল আবদুস সামাদ; সাবেক হাবিল দলিল উদ্দিন; রুহুল কুদ্দুস, সিএসপি; ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ ফজলুল হক; বিভূতি ভূষণ চৌধুরী (ওরফে মানিক চৌধুরী); বিধান কৃষ্ণ সেন; সুবেদার আবদুর রাজ্জাক; সাবেক কেরানি মুজিবুর রহমান; সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ আব্দুর রাজ্জাক; সার্জেন্ট জহুরুল হক; এ. বি. খুরশীদ; খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান, সিএসপি; একেএম শামসুল হক; হাবিলদার আজিজুল হক; মাহফুজুল বারী; সার্জেন্ট শামসুল হক; শামসুল আলম; ক্যাপ্টেন মোঃ আব্দুল মোতালেব; ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী; ক্যাপ্টেন খোন্দকার নাজমুল হুদা; ক্যাপ্টেন এ. এন. এম নূরুজ্জামান; সার্জেন্ট আবদুল জলিল; মাহবুবু উদ্দীন চৌধুরী; লেঃ এম রহমান; সাবেক সুবেদার তাজুল ইসলাম; আলী রেজা; ক্যাপ্টেন খুরশীদ উদ্দীন এবং ল্যাঃ আবদুর রউফ।

বিচার প্রক্রিয়াসম্পাদনা

প্রথমে আসামীদেরকে 'দেশরক্ষা আইন' থেকে মুক্তি দেয়া হয়। পরবর্তীতে 'আর্মি, নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স অ্যাক্টে' শেখ মুজিবুর রহমান, সার্জেন্ট জহুরুল হক-সহ অন্যান্য আসামীকে পুণরায় গ্রেফতার করে সেন্ট্রাল জেল থেকে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। ১৯ জুন, ১৯৬৮ সালে মামলাটির শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়।[১]

অভিযোগনামাসম্পাদনা

'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার' শিরোনামের মামলার অভিযোগনামায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে,

অভিযুক্তরা ভারতীয় অর্থ ও অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটিয়ে কেন্দ্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল।

মামলার স্থান হিসেবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে অবস্থিত 'সিগন্যার অফিসার মেসে' নির্ধারণ করা হয়। মামলাটির শেষ তারিখ ছিল ৬ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালে।[১]

ফলাফলসম্পাদনা

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে সাধারণ জনতা। প্রবল গণ-আন্দোলন তথা উত্তাল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সরকার পিছু হটতে শুরু করে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে একান্ত বাধ্য হয়। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমান-সহ অন্যান্যদের মুক্তির দাবী করেছিল। ফলশ্রুতিতে, সরকার প্রধান হিসেবে আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।[১] ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। সাথে সাথে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল কারাবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়। পরেরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্তদের এক গণসম্বর্ধনা দেয়া হয়। একই দিনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ উপাধিতে ভূষিত করেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ

'ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান' নামক এই গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ঐতিহাসিকগণ এই মামলা এবং মামলা থেকে সৃষ্ট গণ-আন্দোলনকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পেছনে প্রেরণাদানকারী অন্যতম প্রধান ঘটনা বলে গণ্য করে থাকেন।

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, সম্পাদক: সেলিনা হোসেন ও নূরুল ইসলাম, ২য় সংস্করণ, ২০০৩, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ. ১৭২