আবদুল জলিল (সার্জেন্ট)

ফ্লাইট সার্জেন্ট (অবঃ) আবদুল জলিল (এই শব্দ সম্পর্কেউচ্চারণ ; জন্ম: ২০ মার্চ, ১৯৩৫) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নারায়ণগঞ্জ মহকুমার অধীনস্থ নরসিংদীর রায়পুরা থানার (বর্তমানে: বেলাবো উপজেলা) সল্লাবাদ ইউনিয়নের সররাবাদ (দক্ষিণ পাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহণকারী আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।

আবদুল জলিল
Abdul Jalil (2019) by ROY.jpg
আগস্ট, ২০১৯ সালে নিজগৃহে সংগৃহীত স্থিরচিত্রে সার্জেন্ট আবদুল জলিল
জন্ম (1935-03-20) মার্চ ২০, ১৯৩৫ (বয়স ৮৫)
সররাবাদ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ মহকুমা, ব্রিটিশ ভারত
জাতীয়তাভারতীয় (১৯৩৫-১৯৪৭)
পাকিস্তানী (১৯৪৭-৭১)
বাংলাদেশী (১৯৭১-বর্তমান)
নাগরিকত্বব্রিটিশ ভারত (১৯৩৫-১৯৪৭)
পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৭১)
 বাংলাদেশ (১৯৭১-বর্তমান)
পরিচিতির কারণআগরতলা মামলার ২৯নং অভিযুক্ত ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

খুব ছোটবেলা থেকেই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সংগঠক, সমাজকর্মী ও সমাজ সংস্কারক আবদুল হামিদের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের প্রচারণায় আবদুল হামিদের পক্ষে জনমত তৈরীতে প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন।

শৈশবকালসম্পাদনা

মো. আবদুল কাদির ও রহিমা খাতুন দম্পতির সন্তান তিনি। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তার অবস্থান ছিল জ্যেষ্ঠ। নারায়ণপুর সরাফত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ করলেও ১৯৫১ সালে ঢাকাভিত্তিক পূর্ব বাংলা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাগেরহাট মুসলিম হাইস্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। তার চাচা আবদুর রাজ্জাক বাগেরহাট পিসি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালীন একই কলেজে তাকে ভর্তি করান। পড়াশোনার পাশাপাশি নাট্যাভিনয় ও বিতর্কচর্চায় সিদ্ধহস্তের অধিকারী ছিলেন।

১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন কর্মসূচীতে নেতৃত্ব দিতেন। করাচী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রাইভেটে আইএ আর্টসে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ইসলামিয়া কলেজে স্নাতক (পাস) শ্রেণীতে ভর্তি হলেও চাকুরীর কারণে পড়াশুনো শেষ করতে পারেননি।

কর্মজীবনসম্পাদনা

ভাষা আন্দোলনের পর ১১ মার্চ, ১৯৫২ তারিখে অধ্যয়নকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগদান করেন ও পরবর্তীতে কোহাট শহরে সাধারণ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে অবস্থানকালেই বেতারে বাংলা ভাষায় গান শোনা নিয়ে বৈষম্য দেখতে পান। ট্রেড ট্রেনিং শেষ করে লাহোরে বদলী হন। ১৯৬০ সালে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। ৪জন বাঙ্গালী ও ৬জন পাকিস্তানীর মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। গান্টার এয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট অব অ্যাডভান্স ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন।

১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে বাদিন ক্যান্টে বদলী হন। করাচীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে বৈষম্যের শিকার হন। সংক্ষুদ্ধ হয়ে বাঙ্গালী জওয়ান ও অফিসারদেরকে গোপনে সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। স্বাধীনতা অর্জনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গোপন বিপ্লবী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ফলে, বিভিন্নভাবে তিনি বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে গোপনে মতবিনিময় করতেন।

১৯৬৪ সালে করাচীতে অবস্থানকালে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার লক্ষ্যে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে নিজের বাসায় প্রথম অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ একটি হ্যান্ডগ্রেনেড পাকিস্তান বিমানবাহিনীর করঙ্গী ক্রিক বিমানঘাঁটির অস্ত্রাগার হতে কর্পোরাল এ. কে. এম আব্দুল হাইয়ের মারফত কৌশলে লুকিয়ে এনে সার্জেন্ট আবদুল জলিলের জি-১৪/৪, ক্লেটন কোয়ার্টার্স, করাচীতে অবস্থিত বাসায় আনেন। সার্জেন্ট জহুরুল হক ১৯৬৪ সাল থেকে ছুটির দিনগুলোয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সদস্যদের হাল্কা অস্ত্র ও হ্যান্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ সমন্ধে প্রশিক্ষণ দিতেন। পরিবারের সদস্যদেরকে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে বাসাটি খালি করতেন। পুলিশ তাকে বন্দী করার সময় হ্যান্ডগ্রেনেডটি আলামত হিসেবে জব্দ করে ও আদালতে দাখিল করে। বর্তমানে হ্যান্ডগ্রেনেডটি ঢাকা সেনানিবাসের বিজয় কেতন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

আগরতলা মামলাসম্পাদনা

স্ব-কণ্ঠে ধারণকৃত শব্দচিত্রে সার্জেন্ট আবদুল জলিলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার ২৯নং অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার হন ও চরম কারানির্যাতন ভোগ করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রেফতার হন তিনি ও করাচীর বিমানবাহিনীর পুলিশ সেলে সপ্তাহখানেক আটক থাকেন। ১৯ জুন, ১৯৬৮ তারিখ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে বন্দী ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আনীত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ সত্য ছিল। তবে, মামলার আত্মপক্ষ রক্ষার্থে অভিযোগগুলো তখন অস্বীকার করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এবং পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীতে লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর বাঙ্গালীরা প্রাক্তন বাঙ্গালী সৈনিক এবং স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার সহযোগিতায় সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল।

ঐ পরিকল্পনায় ‘একটি নির্দিষ্ট রাত্রে নির্দিষ্ট সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো ক্যান্টনম্যান্টে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দখল করে পাকিস্তানীদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দী করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা’ ছিল। তবে, বিশ্বাসঘাতকের মাধ্যমে পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাবার কারণে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার সূত্রপাত ঘটে।

মামলা চলাকালীন মুজিব তনয়া শেখ হাসিনার বিয়ের দিন শুনানী কার্যক্রম ছিল। বিয়ের পর ফজিলাতুননেসা মুজিব দুই হাড়িভর্তি মিষ্টি নিয়ে কোর্টে উপস্থিত হন ও বঙ্গবন্ধু তাকে দরাজ গলায় বলেছিলেন, ‘জলিল, ইউ ডিস্ট্রিবিউট দ্য সুইটস’। এরপর তিনি অভিযুক্তদেরসহ নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝে ঐ মিষ্টিগুলো বিতরণের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখে গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব সরকার সকলের সাথে তাকেও মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখে নারায়ণপুর সরাফত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় আবদুল জলিলকে গণসংবর্ধনা দেয়া হয়।[১] পরবর্তীতে সার্জেন্ট পদ থেকে ফ্লাইট সার্জেন্ট হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

 
মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নের সাথে দণ্ডায়মান সার্জেন্ট আবদুল জলিল

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণসম্পাদনা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। উইং কমান্ডার এম. কে. বাশারের অধীনে ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের ইচ্ছে অনুযায়ী সেক্টর কমান্ডার বিমানবাহিনীর হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে তিনি ৬নং সেক্টরের অধীনে রংপুর অঞ্চলে যুদ্ধ করেছিলেন।

১৫ মে, ১৯৭১ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ থেকে বদলী হয়ে ঢাকার বিমানবাহিনীতে যোগদানের জন্য রেকর্ড অফিসের এডজুটেন্ট নূরুল ইসলামের কাছে যান। কিন্তু, পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর প্রদান করায় তিনি যোগদান গ্রহণ করেননি। তবে তিনি মুভমেন্ট অর্ডারে লিখে দিয়েছিলেন যে, ‘রিপোর্টেড টু বিএএফ এইচকিউ ফর জয়েনিং বাট একর্ডিং টু এক্সিসটিং পলিসি হি ইজ নট এলিজেবল ফর রি-এনরোলম্যান্ট’।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধুর পরামর্শক্রমে তিনি তেজগাঁওয়ের সরকারী মটর ভেহিক্যাল ওয়ার্কশপে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ঐ পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি বেশ কয়েকটি বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানের চাকুরী করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনসম্পাদনা

 
অক্টোবর, ২০১৮ সালের সংগৃহীত স্থিরচিত্রে সার্জেন্ট আবদুল জলিল

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত তিনি ও দুইবার পাণিগ্রহণ করেন। বর্তমানে ঢাকার খিলগাঁওয়ে বসবাস করছেন। কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী জাহানারা জলিলের সাথে ১৯৫৬ সালে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। এ সংসারে পাঁচ কন্যা - নাসরিন সুলতানা, নুসরাত সুলতানা, নাজলী মোস্তফা, ফৌজিয়া জলিল ও সূবর্ণা জলিল এবং এক পুত্র - মুক্তি মাহমুদের জন্ম হয়। তন্মধ্যে, নাসরিন ও নুসরাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

১৯৮৪ সালে জাহানারা জলিলের দেহাবসান ঘটলে রেনুয়ারা জলিল নাম্নী ভৈরবের এক বিধবা রমণীকে বিয়ে করেন ও এলি নাম্নী এক কন্যা পূর্বেই ছিল। দ্বিতীয় বিয়েতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার প্রদান করেন। এ সংসারে আবদুল জলিলের কোন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেনি।

মূল্যায়ণসম্পাদনা

দেশের স্বাধীনতা-পূর্ব ভূমিকা গ্রহণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২ আগস্ট, ২০১৯ তারিখে স্থানীয় লাল সবুজ চেতনা সংসদের উদ্যোগে ও সল্লাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ‘সররাবাদ ব্রিজের উত্তর প্রান্ত থেকে কান্তু বাড়ির মোড় হয়ে সল্লাবাদ বোর্ড অফিস’ পর্যন্ত প্রধান রাস্তাটি ‘সার্জেন্ট জলিল সড়ক’ নামে নামকরণ করা হয়।[২][৩]

বর্তমানে তিনি আগরতলা মামলার অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে সেতুবন্ধনের কাজ করে যাচ্ছেন এবং ‘ঐতিহাসিক আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত পরিষদ’ নামীয় ঢাকাভিত্তিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচালনা করছেন। এছাড়াও, লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন সার্জেন্ট আবদুল জলিল।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ এম.এসসি এর জীবনী সংক্ষেপ [১৯১১-১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ], লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মো. খায়রুল বাকের, এপ্রিল ২০১৮, প্রথম সংস্করণ।
  2. দৈনিক গ্রামীণ দর্পণ, মুদ্রিত সংস্করণ, প্রধান পাতা, ৩ আগস্ট, ২০১৯, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীর নামে সড়কের নামকরণ
  3. দৈনিক ভোরের পাতা, মুদ্রিত সংস্করণ, প্রধান পাতা, ৩ আগস্ট, ২০১৯, বেলাবোতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অবঃ) আবদুল জলিলের নামে সড়কের নামকরণ ও উদ্বোধন

আরও দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা