প্রধান মেনু খুলুন

লুই পাস্তুর

ফরাসি রসায়নবিদ এবং অণুজীববিজ্ঞানী

লুই পাস্তুর (ফরাসি: Louis Pasteur লুই পাস্ত্যোর্‌) (ডিসেম্বর ২৭, ১৮২২সেপ্টেম্বর ২৮, ১৮৯৫) একজন ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ।[২] তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে অণুজীব অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়ের পচনের জন্য দায়ী। জীবাণুতত্ত্ব ও বিভিন্ন রোগ নির্মূলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

লুই পাস্তুর
Louis Pasteur, foto av Paul Nadar, Crisco edit.jpg
Photograph by Nadar
জন্ম(১৮২২-১২-২৭)২৭ ডিসেম্বর ১৮২২
Dole, ফ্রান্স
মৃত্যুসেপ্টেম্বর ২৮, ১৮৯৫(1895-09-28) (বয়স ৭২)
Marnes-la-Coquette, ফ্রান্স
জাতীয়তাফরাসি
কর্মক্ষেত্ররসায়ন
অণুজীববিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠানস্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়
Lille University of Science and Technology
একোল নর্মাল সুপেরিয়র
Pasteur Institute
প্রাক্তন ছাত্রএকোল নর্মাল সুপেরিয়র
উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দচার্লস ফ্রিডেল[১]
উল্লেখযোগ্য
পুরস্কার
রামফোর্ড মেডেল (১৮৫৬, ১৮৯২)
কপলি মেডেল (১৮৭৪)
Albert Medal (১৮৮২)
Leeuwenhoek Medal (১৮৯৫)
স্বাক্ষর

প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

লুই পাস্তুর ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ফ্রান্সের জুরা প্রদেশের দোল শহরে জন্মগ্রহণ করেন ও আরবোয়া শহরে বেড়ে উঠেন।[৩] দরিদ্র পিতা সেখানকার একটি ট্যানারিতে চাকুরি করতেন। ১৮৪৭ সালে পাস্তুর ফ্রান্সের একোল থেকে পদার্থবিদ্যারসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি জৈব যৌগের আলোক সমাণুতা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে, আলো যখন জৈব যৌগের দ্রবনের ভেতর দিয়ে যায় তখন এর দিক পরিবর্তন ঘটে। তিনি প্রস্তাব করেন যে, একই জৈব যৌগ যাদের গঠন এক, তারা সমাণু হতে পারে যদি তারা একে-অপরের আলো প্রতিবিম্ব হয়।

১৮৪৮ সালে দিজোঁ লিসিতে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে চাকুরী করেন। সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরের কন্যা মারি লরেন্তের সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হন। ২৯ মে, ১৮৪৯ সালে তারা বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। পাঁচ সন্তানের তিনটিই প্রাপ্তবয়স্ক হবার পূর্বেই টাইফয়েড রোগে মারা যায়। ব্যক্তিগতভাবে নির্মম এ ঘটনায় তিনি মুষড়ে না পড়ে এর প্রতিকারে মনোনিবেশ ঘটিয়েছিলেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

তিনি গবেষণা কর্ম চালিয়ে যান এবং সেই সাথে দিজোঁস্ত্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে পাস্তুর স্থানীয় এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের ডীন হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি স্থানীয় মদের কলগুলোতে গাঁজন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি দেখান অ্যালকোহল উৎপাদন ইস্টের পরিমানের উপর নির্ভর করে। তিনি আরও প্রমাণ করেন মদের অম্লতা তাতে ব্যাক্টেরিয়ার ক্রিয়ার জন্য ঘটে।

গবেষণাসম্পাদনা

মদ শিল্পসম্পাদনা

মদের অম্লতা ফ্রান্সের মদ ব্যবসাতে এক বিশাল সমস্যা ছিল। এর ফলে প্রতিবছর অনেক অর্থ গচ্চা যেত। পাস্তুর মদের স্বাদ ঠিক রেখে ব্যাক্টেরিয়া মুক্ত করার জন্য গবেষণা শুরু করেন। তিনি দেখেন মদকে গরম করলে ব্যাক্টেরিয়া মরে যায় এবং মদের কোন পরিবর্তন হয় না। পাস্তুর একই পদ্ধতি দুধের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন এবং ভাল ফল পান। পাস্তুরের এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। তার নামানুসারে এই পদ্ধতিকে পাস্তুরায়ন নামে নামাঙ্কিত করা হয়।

জীবনের উৎপত্তিসম্পাদনা

পাস্তুর এখন মদে ব্যক্টেরিয়ার উৎস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে অনেকে ধারণা করতেন ব্যাক্টেরিয়া নির্জীব বস্তু থেকে আপনা আপনি সৃষ্টি হয়। এর বিপক্ষেও অনেকে বিজ্ঞানী ছিলেন। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের সময় থেকেই এই বিতর্ক ছিল, কিন্তু কোন বিজ্ঞানসম্মত উত্তর ছিল না। পাস্তুর পরীক্ষার মাধ্যমে দেখান, নির্জীব বস্তু থেকে ব্যাক্টেরিয়া বা কোন রকম জীবনের সূত্রপাত হতে পারে না। তিনি প্রমাণ করেন, মদে বাতাস ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে ব্যাক্টেরিয়া আসে। পাস্তুর তার বিখ্যাত পরীক্ষার সাহায্যে যেটা দেখিয়েছিলেন তা হল, জীবাণুমুক্ত নিয়ন্ত্রিত (পাস্তুর প্রদত্ত) পরিবেশে প্রাণ আপনা আপনি জন্ম নেয় না; কিন্তু অন্য পরিবেশে অন্য ভাবে যে কখনই জন্ম নিতে পারবে না - এই কথা কিন্তু পাস্তুরের ফলাফল হলফ করে বলেনি

পাস্তুরের পরীক্ষা স্বতঃজননবাদকে (Theory of spontaneous generation) ভুল প্রমাণ করেছে। স্বতঃজননতত্ত্বের দাবীদারদের সবাই বিশ্বাস করতেন জটিল জীব তার পূর্ণ অবয়বে নিজে নিজেই 'সৃষ্টি' হয়। যেমন, এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন কিছু মাছ এবং পতংগের মত ছোট প্রানী স্বতঃস্ফুর্তভাবে উদ্ভূত হয় । ব্রিটিশ গবেষক আলেকজান্দার নীডহ্যাম (১১৫৭-১২১৭) বিশ্বাস করতেন ফার গাছ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে ফেলে রাখলে তা থেকে রাজহাঁস জন্ম নেয়। জ্যান ব্যাপটিস্ট হেলমন্ট (১৫৮০-১৬৪৪) ভাবতেন ঘর্মাক্ত নোংরা অন্তর্বাস ঘরের কোনায় ফেলে রাখলে তা থেকে ইঁদুর আপনা আপনিই জন্ম নেয়। বিজ্ঞানী পুশে (১৮০০-১৮৭২) বিশ্বাস করতেন খড়ের নির্যাস থেকে ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব স্বতঃস্ফুর্তভাবেই জন্ম নেয়[2]। পাস্তুরের গবেষণা মূলতঃ এই ধরনের 'সৃষ্টিবাদী' ধারণাকেই বাতিল করে দেয়। কিন্তু পাস্তুরের পরীক্ষা কিংবা জৈবজনির কোন সূত্রই বলে না যে, প্রাথমিক জীবন জড় পদার্থ থেকে তৈরি হতে পারবে না

রেশম শিল্পসম্পাদনা

১৮৬৫ সালে ফ্রান্স সরকার পাস্তুরকে ফ্রান্স রেশম শিল্পের সমস্যা সমাধানে আহ্বান জানায়। এক মহামারীতে রেশম পোকার উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল। পাস্তুর দেখেন রেশম পোকার এই সমস্যা বংশগত এবং মায়ের থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সংক্রামিত হতে পারে। তিনি প্রস্তাব করেন কেবলমাত্র রোগ মুক্ত গুটি বাছাই করার মাধ্যমেই রেশম শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব।

জীবানু তত্ত্বসম্পাদনা

পাস্তুর দেখান কিছু রোগ অণুজীব দ্বারা সংঘটিত হতে পারে, যারা পানি ও বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। তিনি তার জীবাণু তত্ত্বে দেখান যে অণুজীব বৃহদাকার জীবকে আক্রমণ করে রোগ সংঘটিত করতে পারে।

ভ্যাক্সিন আবিস্কারসম্পাদনা

অ্যান্থ্রাক্সসম্পাদনা

পাস্তুর প্রথম অ্যান্থ্রাক্স এর ভ্যাক্সিন আবিস্কার করেন। তিনি গবেষণার মাধ্যমে বুঝতে পারেন গৃহপালিত পশুতে অ্যান্থ্রাক্স ব্যাসিলি (Bacillus anthrasis)-এর আক্রমণেই অ্যান্থ্রাক্স হয়। তিনি রোগ সৃষ্টিতে অক্ষম অ্যান্থ্রাক্স ব্যাসিলি ভেড়ায় ইনজেকসনের মাধ্যমে প্রবেশ করান এবং দেখেন পরবর্তীকালে এগুলো আর রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ব্যাসিলি দিয়ে আক্রান্ত হয় না।

জলাতঙ্কসম্পাদনা

অ্যান্থ্রাক্স প্রতিরোধক আবিস্কারের পর পাস্তুর অন্যান্য রোগের প্রতিরোধের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তিনি জলাতঙ্ক নিয়ে কাজ করে দেখেন এটি নার্ভাস সিস্টেমের একটি রোগ এবং আক্রান্ত পশুর স্পাইনাল কর্ডের নির্যাস দ্বারা অন্য প্রাণিকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত করা যায়। এই পদ্ধতিতে তিনি রোগ প্রতিরোধে অক্ষম র‌্যাবিস ভাইরাস উৎপাদন করেন, যা জলাতঙ্কের ভ্যাক্সিন হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ১৮৮৫ সালে পাস্তুর প্রথম এক শিশু বালকের উপর এই ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করেন। ছেলেটি জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর কামড়িয়েছিল, তারপর ছেলেটির মা তাকে পাস্তুরের গবেষণাগারে নিয়ে আসেন। পাস্তুর ছেলেটিকে ভ্যাক্সিন প্রদান করেন এবং ছেলেটি ভাল হয়ে উঠে।

মৃত্যুসম্পাদনা

র‌্যাবিস ভ্যাক্সিন আবিস্কারের পরে ফ্রান্স সরকার পাস্তুর ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। এই ইনস্টিটিউটের পরিচালক থাকাকালীন ১৮৯৫ সালে লুই পাস্তুর মৃত্যুবরণ করেন।[৪]

সূত্রসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা