প্রধান মেনু খুলুন

ব্র্যাক

বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান

ব্র্যাক একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারিভাবে অলাভজনক উন্নয়নমূলক সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে অবস্থিত ২০১৬ইং সালের কর্মী সংখ্যা অনুসারে বেসরকারিভাবে এটি বিশ্বের একটি বৃহত্তম উন্নয়নমূলক সংস্থা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ইং সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাসহ এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার ১৩টি দেশে এটির কার্যক্রম রয়েছে। ব্র্যাক এর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে ০১ (এক) লক্ষ এর মত কর্মী কাজ করে থাকেন। তবে এদের মধ্যে ৭০ ভাগই নারী কর্মী। ব্র্যাকের পরিসেবার আওতায় আছে ১২৬ মিলিয়ন লোক। একটি সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্ব-তহবিলযুক্ত দুগ্ধ, খাদ্য, কৃষি, গবাধি পশুর খামার ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে।

ব্র্যাক
ব্র্যাকের লোগো
প্রতিষ্ঠাকাল১৯৭২
প্রতিষ্ঠাতাফজলে হাসান আবেদ
ধরণঅলাভজনক
অবস্থান
এলাকাগত সেবা
দক্ষিণ এশিয়া
আয়
বৃদ্ধি ৩০৮১,৬১,৭৬,৮৪৮ টাকা (২০১১)[১]
কর্মী সংখ্যা
১,০২,২৮১ (২০১২) [২]
ওয়েবসাইটব্র্যাক.নেট

পরিচ্ছেদসমূহ

ইতিহাসসম্পাদনা

বর্তমান সময়ের ব্র্যাক প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি নামে। মূলত এটি গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনার সহায়তার জন্য। শাহ ফজলে হাসান আবেদ তখন সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায় ছোট আকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই ত্রাণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুদ্ধের সময় ধ্বংস কবলিত হওয়া মোট ১৪ হাজার ঘরবাড়ি পুনর্নির্মিত করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি কয়েক শত মাছ ধরার নৌকা পুনর্নির্মিত করা হয়েছিল। ব্র্যাকের দাবি অনুযায়ী মাত্র ০৯ (নয়) মাসের মধ্যে এই উন্নয়নমূলক কাজগুলো করা হয়েছিল। এছাড়াও তখন বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানসহ চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়েছিল।

ব্র্যাক ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কৃষি উন্নয়ন, মৎস্য, সমবায়, গ্রামীণ কারুশিল্প, বয়স্কদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, নারীর জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামের উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সামাজিক উন্যয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং নির্দেশনা নির্ধারনের জন্য একটি গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ (রেড) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এছাড়াও ১৯৭৭ সালে ভূমিহীন, গরিব কৃষক, কারিগরি ও দুর্বল নারীদের সহায়তা করার জন্য গ্রাম সংগঠন (ভিও) তৈরি করা হয়েছিল। এরপর একই বছর আবার ব্র্যাক তার কার্যক্রমের অর্থায়নের জন্য একটি বাণিজ্যিক অর্থভাণ্ডার স্থাপন করেছিল। যা পরবর্তী বছর আড়ং নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যু একটি প্রধান কারণ ছিল ডায়রিয়া। ১৯৭৯ইং সালের ফেব্রুয়ারিতে শাল্লা উপজেলার ০২ (দুই) গ্রামে ব্র্যাক ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে প্রচারণার শুরু করে। প্রচারণাতে গ্রামীণ মায়েদেরকে তাদের ঘরে থাকা উপাদান থেকে কিভাবে ডায়রিয়া নিরাময়ের ঔষদ (ওআরএস) তৈরি করা যায় এবং ডায়রিয়া হলে কিভাবে ঔষধ সেবন করতে হয় তা শেখানো হয়েছিল। এই প্রচার করা হয়েছিল পোস্টার, রেডিও ও টিভির মাধ্যমে। প্রায় দশ বছরের এই কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল (বেসামরিক অস্থিরতার কারণে কাজ করতে অনিরাপদ ছিল) ব্যতীত বাংলাদেশের প্রতিটি অংশে ৭৫,০০০ গ্রামে এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ফলে বর্তমানে মায়েদের বেশিরভাগই এখন নিরাপদ ও কার্যকর ওআরএস তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে ওটিইপি শুরু হওয়ার সময় এই চিকিৎসাটি খুব কমই পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৫ বছর পরে গ্রামাঞ্চলে এটি ৮০% চেয়ে বেশি ক্ষেত্রে গুরুতর ডায়রিয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ হারের মধ্যকার একটি।

ব্র্যাক ১৯৮৫ইং সালে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষাদান শুরু করে, যা এখনও বিদ্যমান।

১৯৮৬ইং সালে ব্র্যাক তার গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচী শুরু করে যা চারটি প্রধান কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। সেগুলো হলো প্রাতিষ্ঠানিক ভবনে গঠনমূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ঋণ কার্যক্রম আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

১৯৯১ইং সালে তারা নারী স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করে। পরের বছর ব্র্যাক রাজেন্দ্রপুরে ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (সিডিএম) প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৯৬ইং সালে ব্র্যাকে সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আইনী সেবা কার্যক্রম চালু করে।

১৯৯৮ইং সালে ব্র্যাকের দুগ্ধ এবং খাদ্য প্রকল্প শুরু করে। এরপর ব্র্যাক একটি তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট চালু করে।

২০০১ইং সালে ব্র্যাক একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে যার নাম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

কার্যক্রমসম্পাদনা

ব্র্যাক এমন কিছু করেছে যা অল্প কয়েকজন করেছে - বিশ্বের অতি দরিদ্র মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য কর্মসূচি এনে তারা একটি বৃহৎ আকারে সাফল্য অর্জন করেছে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এমনকি সবচেয়ে অসাধ্য স্বাস্থ্য সমস্যাও সমাধানযোগ্য, এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মাধ্যমে তাদের সাফল্যের সাথে তাল মিলাতে আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

বিল গেটস, কো-চেয়ার, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য পুরস্কার ২০০৪।

অর্থনৈতিক উন্নয়নসম্পাদনা

ব্র্যাক ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প শুরু করে ১৯৭৪ সালে। এটি ব্র্যাকের পুরানো একটি কার্যক্রম যা বাংলাদেশের সকল জেলায় রয়েছে। এটি বেশিরভাগ দরিদ্র, ভূমিহীন, গ্রামীণ নারীদেরকে মুক্ত ঋণ সরবরাহ করে তাদের আয় করতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহযোগিতা করে। ব্র্যাকের মাইক্রোক্রেডিট প্রকল্প প্রথম ৪০ বছরে ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে নারী হলো ৯৫% এবং পরিশোধের হার ৯৮%। ১৯৮৮ সালে ব্র্যাক সারা দেশে কমিউনিটি কমিউনিকেশন প্রকল্প শুরু করে। ১৯৭৮ সালে খুচরা বিপনণ আড়ং প্রতিষ্ঠা করে। এটি প্রান্তিক পর্যায়ের জিনিস পত্র বাজারজাত করে। আড়ং প্রায় ৬৫,০০০ (পঁয়ষট্টি হাজার) কারিগরকে সেবাপ্রদান করে ও সোনার ও রূপার গয়না, চামড়া, কারুশিল্প ইত্যাদি বিক্রি করে।

শিক্ষাসম্পাদনা

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার সাথে যুক্ত বৃহত্তম এনজিওগুলির মধ্যে একটি হলো ব্র্যাক। ২০১২ সালের শেষের দিকের তালিকা অনুযায়ী ব্র্যাকের প্রায় ২২,৭০০টি আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এই বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৬৭,০০,০০০ শিশু পড়ালেখা করে। এই বিদ্যালয়গুলি দেশের সব এনজিও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির তিন চতুর্থাংশ। ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষ করে দরিদ্র, গ্রামীণ, ক্ষতিগ্রস্থ শিশুদের, এবং শিক্ষা হতে বাইরে থাকা ব্যক্তিদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা দেয়। সাধারণত এক কক্ষে একজন শিক্ষক এবং ৩৩জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি শ্রেণী গঠিত হয়। পাঠদানে মূল বিষয়গুলির মধ্যে গণিত, সামাজিক গবেষণা এবং বাংলা। সহশিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে তারা খাদ্য প্রদান করে থাকে। পড়ালেখার কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে তারা শিক্ষার্থীদেরকে আংশিক বৃৃত্তি প্রদান করে থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পুরুষদের চেয়ে মহিলা উপস্থিতি কম হওয়ায় তারা তাদের স্কুলগুলোতে নারী শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে থাকে। যার ফলে ৬০% নারী তাদের বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে।

জনস্বাস্থ্যসম্পাদনা

 
এক ব্র্যাক কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মী, বাংলাদেশের করাইল বস্তিতে একটি জরিপ পরিচালনা করছেন।

ব্র্যাক ১৯৭৭ সালে প্যারামেডিকেলের মাধ্যমে চিকিৎসাগত প্রাথমিক সেবা এবং একটি স্ব-অর্থায়ন স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সেবা প্রদান শুরু করে। ব্র্যাকের উত্তর-পশ্চিম মাইক্রোফিনান্স এক্সপোশন প্রজেক্টের ২০০৭ এর প্রভাবের মূল্যায়নে দেয়া যায় ব্র্যাক প্রকল্পগুলিতে নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিবাহ ও তালাকসহ আইনি বিষয়গুলি নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। এছাড়াও নারী অংশগ্রহণকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো হয়েছিল এবং ফলে তখন গৃহের ঘটনাগুলি ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। ২০০২ সালের আগে নারীদের প্রতি একটি সহিংসতার দিক ছিল অ্যাসিড নিক্ষেপ। যা প্রতিরোধের জন্য ব্র্যাক ২০০২ সালে অ্যাসিড নিক্ষেপ প্রতিরোধের আইন প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যারফলে বছরে অ্যাসিড নিক্ষেপ ১৫-২০% হ্রাস পায়।

ত্রাণসম্পাদনা

ব্র্যাক ২০০৭ সালের নভেম্বর এর মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের এলাকাগুলিতে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাত হানার সময় ত্রান বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্র্যাক ৯,০০,০০০ লোকের জন্য খাদ্য ও পোশাকসহ জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে এবং ৬০,০০০ এরও বেশি লোককে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। ব্র্যাক এখন দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের উপর মনোযোগ দিয়েছে। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কৃষি সহায়তা, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জীবিকা উপার্জন।

নাইকি ফাউন্ডেশনের সাথে অংশীদারিত্বসম্পাদনা

উগান্ডা ও তানজানিয়ার তরুণীদের কাছে ব্র্যাক পৌছানোর জন্য নাইকি ফাউন্ডেশনের সাথে অংশীদারিত্ব করে নাইকির গার্লস ইফেক্ট প্রচারণার আওতায় নতুন একটি কর্মসূচি চালু করে।

ব্র্যাকের দাতা সংস্থাসম্পাদনা

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য ২০০৬ সালে ব্র্যাকের সাধারণ-পরিচালকবর্গ (ডিজিআইএস) এবং নেদারল্যান্ডস সরকার/নেদারল্যান্ডস রাজ্যের দূতাবাসের (ইকেএন) কাছ থেকে অনুদান পেয়েছিল।

২০১১ সালে বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (বিএমজিএফ) ব্র্যাকের দাতাদের তালিকাতে যুক্ত করে।

২০১২ সালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধিদপ্তর (ডিএফআইডি), যুক্তরাজ্য সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক ও বাণিজ্য বিভাগের (ডিএফএটি), এবং অস্ট্রেলিয় সরকার (এসপিএ) কৌশলগত অংশীদারিত্বের ব্যবস্থার অধীনে ব্র্যাকের দাতাদের তালিকাতে যুক্ত করে।

দেশসমূহ যেখানে ব্র্যাকের কার্যক্রম আছেসম্পাদনা

সম্মাননা ও পুরস্কারসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. http://www.brac.net/latest-news/item/1145-brac-ranked-top-global-ngo-of-2018
  2. "NGO Advisor"NGO Advisor। ২০১৭-০১-১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ জানুয়ারি ২০১৭ 
  3. "BRAC ranked number one NGO in the world"BRAC Official Website। সংগ্রহের তারিখ ১০ জানুয়ারি ২০১৭