প্রধান মেনু খুলুন

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র হল ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শ্রীনগর জেলায় অবস্থিত একটি প্রত্নক্ষেত্র। পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে এখানে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ের চারটি প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির স্তর পাওয়া গিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় দুটি নব্যপ্রস্তরযুগীয় স্তর; তৃতীয় পর্যায়টি (বড়ো পাথরে তৈরি মেনহির ও চাকানির্মিত লাল মৃৎপাত্রের) মধ্য প্রস্তরযুগীয় স্তর; এবং চতুর্থ পর্যায়টি আদি ঐতিহাসিক যুগীয় (উত্তর-মধ্য প্রস্তরযুগীয়) স্তর। এই প্রত্নক্ষেত্রটি কাশ্মীরের প্রাগৈতিহাসিক মানব বসতির প্রমাণ বহন করছে। এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত সব রকমের প্রত্যক্ষ প্রমাণ (এর মধ্যে প্রাচীন উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ সংক্রান্ত অনুসন্ধানও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে) নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানব বসতির চারটি স্তর নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়েছে।

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র
Black earthenware. Pré-Indus civilization. Kashmir.JPG
বুরজাহোম থেকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্র
বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র ভারত-এ অবস্থিত
বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র
ভারতে এর অবস্থান দেখাচ্ছে
অবস্থানশ্রীনগর, জম্মু ও কাশ্মীর, ভারত
ধরনপ্রাগৈতিহাসিক জনবসতি
ইতিহাস
সময়কালনব্যপ্রস্তরযুগীয়, মধ্যপ্রস্তরযুগীয় ও আদি ঐতিহাসিক যুগ
স্থান নোটসমূহ
খননের তারিখ১৯৩৯ এবং ১৯৬০ থেকে ১৯৭১
প্রত্নতত্ত্ববিদডে টেরাপিটারসন, ইয়েল-কেমব্রিজ এক্সপেডিশ (১৯৩৯) এবং টি. এন. খাজাঞ্চি ও তাঁর দল, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (১৯৬০-৭১)

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রে খননকার্য চালিয়ে জানা গিয়েছে যে, নব্য প্রস্তরযুগে এই অঞ্চলের মানুষ মাটির তলায় গর্ত তৈরি করে বা মাটির উপর ছাউনি-জাতীয় আবাসস্থল নির্মাণ করে বাস করত। মধ্য প্রস্তরযুগের মানুষ বাস করত মাটির তৈরি বাড়িতে। এই অঞ্চলে প্রচুর হাড় ও পাথরের তৈরি যন্ত্রপাতিও পাওয়া গিয়েছে। এর থেকে অনুমান করা হয় যে, সেই সময়কার মানুষ শিকার ও কৃষিকার্যের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ করত।

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র থেকে যে প্রত্নসামগ্রীগুলি উদ্ধার করা হয়েছে, তার শিল্পকলা, স্থাপত্যশৈলী এবং সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত দিকগুলি নিয়ে গবেষণার পর অনুমান করা হয় যে, বুরজাহোমের প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের সঙ্গে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়া এবং গাঙ্গেয় সমভূমিভারতীয় উপদ্বীপের মানুষদের যোগাযোগ ছিল। এখান থেকে আবিষ্কৃত মৃৎপাত্র ও অন্যান্য শিল্পসামগ্রীর উপর খোদিত চিত্রকলায় এই অঞ্চলের শিল্প, স্থাপত্যশৈলী, ভাষা এবং রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত দিকগুলির মধ্যে স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রভাবের সংমিশ্রণ লক্ষিত হয়।

অবস্থানসম্পাদনা

কারাকোরামপিরপাঞ্জাল পর্বতমালার মধ্যবর্তী কাশ্মীর উপত্যকায় বুরজাহোম গ্রামে এই প্রত্নক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয়েছে। গ্রামটি নাসিম-শালিমার রোডের ধারে শ্রীনগর থেকে ১৬ কিলোমিটার (৯.৯ মা) দূরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই প্রত্নক্ষেত্রটির উচ্চতা ১,৮০০ মিটার (৫,৯০০ ফু)।[১][২] ভারতের যে কটি নব্যপ্রস্তরযুগীয় প্রত্নক্ষেত্র খননকার্যের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রটিই ভারতের সর্বাধিক উত্তরে অবস্থিত। এই প্রত্নক্ষেত্রটি একটি প্রাচীন প্লেইস্টোসিন হ্রদশয্যার উপর ঝিলম নদীর প্লাবন সমভূমির একটি উচ্চ ধাপে অবস্থিত।[৩] এই অঞ্চলের মৃত্তিকা কারেওয়া প্রকৃতির। ডাল হ্রদ বুরজাহোম থেকে ২ কিলোমিটার (১.২ মা) দূরে অবস্থিত। এখান থেকে ডাল হ্রদের একটি বড়ো অংশ দৃশ্যমান হয়। কাশ্মীরি ভাষায় ‘বুরজাহোম’ কথাটির অর্থ ভূর্জ নামে একপ্রকার গাছ। এই গাছ হিমালয়ের ৩,০০০ থেকে ৪,২০০ মিটার (৯,৮০০ থেকে ১৩,৮০০ ফু) উচ্চতায় জন্মায়। বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রের প্রাচীন জনবসতির আবাসস্থলগুলির ছাদ এই গাছ দিয়ে তৈরি হত। এর থেকেই বোঝা যায়, প্রাগৈতিহাসিক নব্যপ্রস্তরযুগেও এই গাছের অস্তিত্ব ছিল।[৪]

ইতিহাসসম্পাদনা

১৯৩৬ সালে বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রে খুব স্বল্প পরিসরে খননকার্য চালানো হয়েছিল। সেই খননকার্য পরিচালনা করেছিল হেলমুট ডে টেরাটমাস টমসন পিটারসনের নেতৃত্বাধীন ইয়েল-কেমব্রিজ এক্সপেডিশন। এরপর ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের ফ্রন্টিয়ার সার্কেল এই প্রত্নক্ষেত্রে বৃহৎ পরিসরে অনুসন্ধান চালায়। এই অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেন টি. এন. খাজাঞ্চি ও তার সহযোগীরা।[১][৫]

বুরজাহোমের প্রত্নক্ষেত্রেই কাশ্মীরের প্রথম বহুস্তরবিশিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রত্নসামগ্রীর ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল মর্টিমার হুইলার প্রথম অন্যান্য প্রত্নক্ষেত্রে ভৌগোলিক মডেলের ভিত্তিতে স্তরবিশিষ্ট পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য চালানো শুরু করেছিলেন। একই মডেলে বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘নর্দার্ন নিওলিথিক কালচার’ বা উত্তর নব্যপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতি। এই প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত হাড় ও পাথরের তৈরি যন্ত্রপাতি ও আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত প্রত্নসামগ্রীগুলির উপস্থিতি বিবেচনা করেই এই নামকরণ করা হয়েছিল।[৬]

বুরজাহোমে নব্য প্রস্তরযুগীয় মানুষের যে নরকরোটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তা সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পায় প্রাপ্ত নরকরোটির অনুরূপ। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন বৈদিক আর্য সভ্যতা কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। কিন্তু বুরজাহোমে পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য চালিয়ে যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে ‘কাশ্মীরে আর্য উপস্থিতি’র তত্ত্ব প্রমাণিত হয় না।[৭]

১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মারক ও প্রত্নক্ষেত্র আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুসারে, বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র ও তার মধ্যবর্তী স্থানগুলির ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ ও রাজ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগের হাতে ন্যস্ত।[৮]

২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রের নাম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির সাময়িক তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি এখনও বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে অনুমোদিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।[৮]

আবিষ্কারসম্পাদনা

 
বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র থেকে আবিষ্কৃত এই মৃৎপাত্রটির গায়ে দীর্ঘ শিং ও ঝুলন্ত কানওয়ালা একটি বুনো ছাগলের ছবি আঁকা রয়েছে।[৮][৭]

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রের গভীরতা অনুসারে উল্লম্ব ও আনুভূমিক খননকার্য চালানো হয়েছে। এই প্রত্নক্ষেত্রের গভীরতা থেকে বিভিন্ন স্তরগুলির বৈশিষ্ট্য এবং আনুভূমিক খননকার্যের ফলে স্তরগুলির সময়কাল জানা সম্ভব হয়েছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরের অনুসন্ধানের ফলে এই প্রত্নক্ষেত্রে চারটি অবিচ্ছিন্ন জীবিকাকেন্দ্রিক পর্যায়ের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে।[৯] এই চারটি পর্যায় হল:

  1. নব্যপ্রস্তরযুগীয় প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়: প্রথম পর্যায়টির নাম অ্যাসিরামিক বা মৃৎশিল্পবিহীন এবং দ্বিতীয় পর্যায়টির নাম সিরামিক বা মৃৎশিল্প সংক্রান্ত। এই দুটি স্তরই সর্বনিম্ন স্তর। এই স্তরদুটি মাটির নিচে সর্বাধিক ২.৭৪ মিটার (৯ ফু ০ ইঞ্চি) থেকে সর্বনিম্ন ৪.৭৫ মিটার (১৫.৬ ফু) গভীরতা পর্যন্ত ৩.৯৫ মিটার (১৩.০ ফু) গভীর।
  2. মধ্যপ্রস্তরযুগীয় তৃতীয় পর্যায়: এই পর্যায়ের মানুষ পাহাড় থেকে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে বড়ো বড়ো পাথর বয়ে এনে বৃহদাকার মেনহির প্রস্তুত করে স্থাপন করেছিল।
  3. আদি ঐতিহাসিক যুগীয় চতুর্থ পর্যায়: এই পর্যায়টি এই প্রত্নক্ষেত্রে আবিষ্কৃত শেষ পর্যায়।[৮][১০]

বুরজাহোমের মৃৎশিল্পে এই অঞ্চলের শিকারভিত্তিক সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যায়। এই শিল্পকলা চীনা নব্যপ্রস্তরযুগীয় মৃৎশিল্পের থেকে অনেকাংশেই পৃথক।[১১] এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি ছিল শিকার ও সঞ্চয়ভিত্তিক। কৃষিকাজ এই সময় সদ্য শুরু হয়েছিল।[১২] বুরজাহোমের মৃৎপাত্রগুলি অধুনা পাকিস্তানের সোয়াট উপত্যকায় প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলির অনুরূপ। বিশেষত উভয় অঞ্চলের পাত্রের আকার ও কালো মাটির অঙ্গসজ্জাগুলি অনেকটা একই রকমের। বুরজাহোমের মৃতদেহ সমাধিস্থ করার প্রথা ও নির্মিত যন্ত্রপাতিগুলির সঙ্গে উত্তর চীনের নব্যপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতির সাদৃশ্য লক্ষিত হয়।[১৩]

প্রথম পর্যায়সম্পাদনা

প্রথম পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল ভূগর্ভস্থ গর্তগুলি। এগুলিকে আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানকার শক্তপোক্ত কারেওয়া মাটিতে গোলাকার বা ডিম্বাকারে নির্মিত কোনো কোনো গভীর গর্তের নিচে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ি বা মই ব্যবহার করা হত। কোনো কোনো গর্তের স্তরগুলিতে ছাই ও কাঠকয়লার স্তরও পাওয়া গিয়েছে। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, এই সব গর্তে মানুষ বাস করত। গর্তগুলির উপরের স্তরের ধারে ধারে খুঁটি পোঁতার গর্ত আছে। এই গর্তগুলি আবাসস্থলের উপর ভূর্জনির্মিত ছাউনির অস্তিত্বের প্রমাণ। ঘরের গর্তগুলির লাগোয়া ৬০–৯১ সেন্টিমিটার (২৪–৩৬ ইঞ্চি) ব্যাসবিশিষ্ট গোলাকার নিচু গর্তগুলিতে জীবজন্তুর হাড়, হাড়ের তৈরি যন্ত্রপাতি (এগুলি অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য বারসিঙা হরিণের শিং দিয়ে তৈরি হত) এবং পাথর (হারপুন, ছিদ্রসহ সূচ বা ছিদ্রহীন সূচ, জুতো সেলাই করার সূচ জাতীয় বস্তু) পাওয়া গিয়েছে।[১][৮]

কার্বন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে যে, এই অঞ্চলের নব্যপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতিটি খ্রিস্টপূর্ব ৩য় সহস্রাব্দের সমসাময়িক। এখানকার প্রাচীনতম মানব বসতিটির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ২,৩৫৭ অব্দের পূর্ববর্তী।[১৪]

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলি আদিযুগের হাতে তৈরি মৃৎপাত্র। এগুলি অপকৃষ্ট প্রকৃতির। এগুলির রং ছিল ইস্পাত-ধূসর, হালকা লাল, বাদামি বা পীতাভ। পাত্রগুলির নিচে মাদুরের ছাপ দেখা যায়। এগুলির আকার বাটি, ফুলদানি বা গাছের ডালের মতো।[১] এই পর্যায়ের প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রীগুলি থেকে কোনো রকম সমাধিপ্রথার প্রমাণ মেলে না।[৮]

দ্বিতীয় পর্যায়সম্পাদনা

খননকার্যের ফলে জানা গিয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে মানুষ গর্তের বদলে ভূতলস্থ ছাউনি-জাতীয় আবাসস্থলে বাস করতে শুরু করেছিল। যদিও এই সময় গর্তগুলি ও সেগুলির লাগোয়া ঘরগুলি উপরের ছাউনির ভিত্তিতল হিসেবে ব্যবহার করা হত। গর্তগুলিকে ভরিয়ে ও কাদা দিয়ে মেঝে বানিয়ে এগুলি তৈরি করা হত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সব আবাসস্থলের মেটে লাল গিরিমাটি দিয়ে রঞ্জিতও করা হত। এই গর্তগুলির চারদিকে খুঁটি পোঁতার গর্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায়, ছাউনিগুলি শক্তপোক্ত করার জন্য কারেওয়া মাটির মেঝের উপর কাঠ দিয়ে আচ্ছাদন তৈরি করা হত।[১][৮]

এই পর্যায়েই নব্যপ্রস্তরযুগীয় মানুষের মধ্যে প্রথম মৃতদেহ সমাধিস্থ করার প্রথা চালু হয়। বসত-ছাউনিগুলির মেঝের নিচে বা তার কাছাকাছি জায়গাগুলিতে গভীর ডিম্বাকৃতি গর্তের মধ্যে মানুষ ও জীবজন্তুর কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গর্তগুলি ছাই, পাথর ও মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো দিয়ে ভরাট করা হত। এখানে প্রাপ্ত কিছু কিছু নরকরোটিতে গভীর গর্তের চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে। কোনো কোনো গর্তে আবার নরকঙ্কালের সঙ্গে কুকুর ও বারশিঙা হরিণের হাড়গোড়ও পাওয়া গিয়েছে। সমাধিগর্তে প্রাপ্ত নরকঙ্কালগুলি জীবজন্তুর কঙ্কালের সঙ্গে উপবিষ্ট অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।[১][৮]

এই পর্যায়ের মৃৎপাত্রগুলির মান আগের পর্যায়ের মৃৎপাত্রগুলির তুলনায় উন্নততর। এগুলি কালো মাটির তৈরি ও পালিশ করা। এগুলিও হাতেই তৈরি করা হত। এগুলির আকার ছিল আধার সহ থালা, বড়ো মুখওয়ালা বোতল ইত্যাদির মতো। এছাড়া চাকায় তৈরি একটি লালমাটির পাত্রে ৯৫০টি কার্নেলিয়ানঅকীক রত্ন পাওয়া গিয়েছে। মনে করা হয়, এগুলি বিক্রির জন্য সংগৃহীত হয়েছিল। সম্ভবত এই পাত্রটি এই পর্যায়ের পরবর্তী অংশের। [১][৮] এই পর্যায়ের সুন্দরভাবে চিত্রিত একটি মৃৎপাত্রও পাওয়া গিয়েছে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান বেদীর উপর নির্মিত লালমাটির তৈরি বটিকাকৃতি পাত্র। এই পাত্রের গায়ে দীর্ঘ শিং ও ঝুলন্ত কানওয়ালা একটি কালো বুনো ছাগলের ছবি আঁকা রয়েছে।[৮][১৫] আরও একটি উল্লেখযোগ্য মৃৎপাত্র পাওয়া গিয়েছে। এটিও কালোমাটির তৈরি পালিশ করা বটিকাকার মৃৎপাত্র। এই পাত্রটির গলাটি দীর্ঘ এবং মুখটি ছড়ানো।[১৬]

দ্বিতীয় পর্যায়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কৃত প্রত্নসামগ্রী হল দুটি পৃথক চ্যাপ্টা পাথরের ফলক। একটি ফলকের খোদাই চিত্রটি স্পষ্ট নয়। অন্য ফলকটির আয়তন ৪৮–২৭ সেন্টিমিটার (১৯–১১ ইঞ্চি)। এটির পালিশ করা দিকটিতে একটি শিকারের ছবি আঁকা রয়েছে। এই ছবিতে দেখা যায়, একজন শিকারী ‘কার’ নামক বর্শা দিয়ে একটি বারশিঙা হরিণ শিকার করছে এবং আরেকজন শিকারী তির ছুঁড়তে উদ্যত হয়েছে। এছাড়া দুটি স্তরে সূর্যের গতিও অঙ্কিত হয়েছে এতে। এই দ্বিতীয় খোদাইচিত্রটি বেশ স্পষ্ট।[১][৮][১৬][৫]

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে কৃষিকার্যের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এই সময় গম, যব ও মসূর উৎপাদিত হত। মসূরের উৎপাদন আবিষ্কৃত হওয়ায় এই অঞ্চলের নব্যপ্রস্তরযুগীয় মানুষের সঙ্গে হিমালয়ের ওপারে মধ্য এশিয়ার যোগাযোগ প্রমাণিত হয়।[৮] বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রের প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের ‘দীর্ঘ মাথাওয়ালা ডোলিকোক্র্যানিক’ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে পুরুষের করোটির থেকে পৃথক আকারের দুটি নারীর করোটিও চিহ্নিত করা হয়েছে। অনুসন্ধানের ফলে সমগ্র নব্যপ্রস্তরযুগে এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কোনো বহিরাগত জাতির মিশ্রণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে হরপ্পার মানুষের সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের সাদৃশ্য আবিষ্কৃত হয়েছে।[১৪]

তৃতীয় পর্যায়সম্পাদনা

নব্যপ্রস্তরযুগীয় গর্তগুলির কাছে কয়েকটি মধ্যপ্রস্তরযুগীয় মেনহির আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে অনুমিত হয় যে, দুই পর্যায়ের মধ্যে ক্রমিক বিবর্তন ঘটেছিল। পাহাড়ের উপরের আবহাওয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত বড়ো বড়ো পাথর কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে নামিয়ে এনে এই মেনহিরগুলি তৈরি করা হত। এগুলির স্থাপন করা হত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির স্মারক হিসেবে। মেনহিরগুলি ছিল বড়ো আর এবড়োখেবড়ো। এগুলির ওজন ও উচ্চতা যথেষ্ট ছিল। মেনহিরগুলি কোনো রকম ঠেকনা ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকত। এই পর্যায়ের শিল্পকলা ছিল উন্নততর মানের। এই সময়ের চাকানির্মিত শক্তপোক্ত লালমাটির মৃৎপাত্র, তামার প্রত্নসামগ্রী এবং হাড় ও পাথরের তৈরি যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে।[১][৫][৮] তামার তৈরি কয়েকটি তিরের ফলাও পাওয়া গিয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই সময় মানুষ ধাতুবিদ্যা সংক্রান্ত জ্ঞান আয়ত্ত্ব করেছিল।[১৭][১০]

চতুর্থ পর্যায়সম্পাদনা

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রের চতুর্থ পর্যায়টি (সময়কাল খ্রিস্টীয় ৩য়-৪র্থ শতাব্দ) হল এই অঞ্চলে মানব বসতির সর্বশেষ পর্যায়। এটি আদি ঐতিহাসিক যুগের সমসাময়িক। এই সময়কার স্থাপনাগুলি আগের পর্যায়ের স্থাপনাগুলির চেয়ে উন্নতমানের। এগুল মাটির ইঁট দিয়ে তৈরি। এই সময়কার মৃৎশিল্পও উন্নতমানের। এগুলি চাকায় লাল মাটি দিয়ে তৈরি। এগুলিতে একটি ঢালু অংশ যুক্ত হত। এই সময়কার কিছু লোহার প্রত্নসামগ্রীও পাওয়া গিয়েছে।[১]

সংরক্ষণসম্পাদনা

বুরজাহোম প্রত্নক্ষেত্রটি ঠিক যে রকম অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছে, সেই রকম অবস্থাতেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে নব্যপ্রস্তরযুগীয় মানুষের প্রাকৃতিক পরিবেশটি রক্ষিত হয়েছে। আবিষ্কৃত গর্ত ও স্থাপনাগুলি বর্তমানে সুসংরক্ষিত।[৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Excavations – Important – Jammu & Kashmir" (ইংরেজি ভাষায়)। Archaeological Survey of India। ২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ এপ্রিল ২০১৬ 
  2. "Burzahom Archaeological site, India:Neolithic Period finds"Encyclopedia Britannica (ইংরেজি ভাষায়)। 
  3. Kaw 2004, পৃ. 43।
  4. Singh 2008, পৃ. 111।
  5. Pande, B. M. (১৩ অক্টোবর ১৯৬৯)। "Neolithic Hunting Scene on a Stone Slab from Burzahom, Kashmir" (pdf) (ইংরেজি ভাষায়)। University of Hawaii। 
  6. Kaw 2004, পৃ. 12।
  7. Kaw 2004, পৃ. 42।
  8. "The Neolithic Settlement of Burzahom" (ইংরেজি ভাষায়)। UNESCO Organization। 
  9. Sopory 2004, পৃ. 78।
  10. Kaw 2004, পৃ. 14।
  11. Sopory 2004, পৃ. 81।
  12. Kaw 2004, পৃ. 39।
  13. Kaw 2004, পৃ. 40।
  14. Kaw 2004, পৃ. 43–44।
  15. Kaw 2004, পৃ. 40–41।
  16. Singh 2008, পৃ. 113।
  17. Sopory 2004, পৃ. 79।

গ্রন্থপঞ্জিসম্পাদনা