প্রধান মেনু খুলুন

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নির্ধারণ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে যে “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।”[১] বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে যে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।”[১]

ইতিহাসসম্পাদনা

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান বলবৎ হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের ১৪৯ নং আদেশ) জারি করে। এই আদেশের আওতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিরূপিত হদত থাকে। এ আদেশের ২য় বর্ণিত হয়েছে যে, “এমন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে গণ্য হবেন: (১) যিনি বা যার পিতা বা পিতামহ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এমন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এ এলাকার কোনো স্থানের স্থায়ী বাশিন্দা ছিলেন এবং এখনও বাশিন্দা আছেন; অথবা (২) যিনি বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্ভুক্ত এলাকায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্থায়ী বাশিন্দা ছিলেন, এখনও আছেন এবং দেশে বলবৎ কোনো আইনের দ্বারা নাগরিক হওয়ার অযোগ্য ঘোষিত হন নি। তবে শর্ত থাকে যে, যদি কোনো ব্যক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত কোনো এলাকার স্থায়ী বাশিন্দা হয়ে থাকেন এবং তিনি বা তার পোষ্য কোনো ব্যক্তি চাকরি বা অধ্যয়নের জন্য এমন কোনো দেশে বসবাস করতেন যে দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অথবা সামরিক অভিযানে লিপ্ত ছিল এবং যাদের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনে বাধা দেয়া হচ্ছিল, তবে তিনি বা তার পোষ্যগণ বাংলাদেশেই বসবাস করে আসছেন বলে গণ্য করা হবে।”

অধিকন্তু উক্ত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ ১৯৭২-এর ২(খ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে যে, “কোনো ব্যক্তি ভিন্ন কোন রাষ্ট্রের প্রতি প্রকাশ্যে বা আচরণের মাধ্যমে আনুগত্য পোষণ করে থাকলে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।”

উক্ত আদেশে প্রদত্ব ক্ষমতা বলে বাংলাদেশ সরকার যে কোন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে। এ আদেশের উদ্দেশ্য কার্যকর করার লক্ষ্যে “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) বিধি ১৯৭৮” জারি করা হয়।ক[›]

নাগরিকত্বের প্রকারভেদসম্পাদনা

বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন, ২০১৭ অনুযায়ী সাত ভাবে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব অর্জন করা যাবে। এগুলো হলো:—

  • ১. বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ বা বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস বা জাহাজ কিংবা বিমানে জন্মগ্রহণ
  • ২. বাংলাদেশী নাগরিকদের সন্তান ও তাদের সন্তান
  • ৩. দ্বৈত নাগরিক
  • ৪. অর্জিত নাগরিকত্ব
  • ৫. বৈবাহিক সূত্র
  • ৬. নতুন সংযুক্ত ভূখণ্ডের অধিবাসী ও বাংলাদেশের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ চেয়ে আবেদন করা ব্যক্তি এবং
  • ৭. সম্মানসূচক নাগরিকত্ব।

বংশসূত্রে নাগরিকত্বসম্পাদনা

কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোন দেশে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হবেন। তবে তার পিতা বা মাতা বংশসূত্র ছাড়া ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে এই আইন বলবত হওয়ার অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্য কোনভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকলে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হবেন। তবে কোন ব্যক্তির পিতা বা মাতা কেবল বংশসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার কারণে উক্ত ব্যক্তি এই আইনের অধীনে বাংলাদেশের নাগরিক হবেন না, যদি বাংলাদেশী কনস্যুলেট বা দূতাবাসে তার জন্মের এক বছরের মধ্যে নিবন্ধন করা না হয়; তিনি যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন সে দেশের নিয়ম অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন সনদপ্রাপ্ত না হন; অথবা জন্মকালে তার পিতা বা মাতা বাংলাদেশ সরকারের অধীনে কিংবা প্রেষণে/লিয়েনে অন্যত্র চাকরিতে না থাকেন।

দ্বৈত নাগরিকত্বসম্পাদনা

প্রবাসে অর্জিত নাগরিকত্বের কারণে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অবসান ঘটবে না। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদনের পর তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা যাবে। এটি দ্বৈত নাগরিকত্ব হিসেবে গণ্য হবে। কোন বাংলাদেশী নাগরিক কোন কারণে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অবসান ঘটানোর পর বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পন্থায় তার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করলে তা বিবেচনায় নিয়ে অন্য কোন আইন দ্বারা বারিত না হলে তার নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করা যাবে।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বসম্পাদনা

বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি জন্মসূত্রে নাগরিক হবেন। দুই বছর বয়স পর্যন্ত কোন শিশু বাংলাদেশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে এবং যদি সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু প্রকাশ না পায় তাহলে ওই শিশু বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে বলে ধরে নিয়ে তাকে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক করা যাবে।

বিবাহসূত্রে নাগরিকত্বসম্পাদনা

বাংলাদেশের কোন নাগরিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রেও আবেদনকারীকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কমপক্ষে তিন বছর বাংলাদেশে বসবাস করতে হবে। উক্ত তিন বছরের মধ্যে চিকিৎসা, শিক্ষা অথবা জরুরী প্রয়োজনে বাংলাদেশের বাইরে গমন করতে সাময়িক অবস্থানকাল পরবর্তীতে তাকে বাংলাদেশে অবস্থান করে প্রথম আগমনের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মধ্যে মোট তিন বছর পূর্ণ করতে হবে। এ সময়কে বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাসের আওতাধীন বলে গণ্য হবে। নাগরিকত্ব লাভের পর কোন কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণকারী স্বামী বা স্ত্রীর নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব বহাল থাকবে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

পাদটীকাসম্পাদনা

  • ^ ক:  বাংলাদেশ বনাম অধ্যাপক গোলাম আযম মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নাগরিকের সংজ্ঞায় বলেন, নাগরিক এমন এক ব্যক্তি যিনি একটি স্বাধীন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর সদস্য, যিনি সংবিধান এবং দেশের আইনে বর্ণিত অধিকার ভোগ করেন ও যার ওপর নৈতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে। আপিল বিভাগ তাদের রায়ে আরও বলেন যে, সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের নাগরিক বলে বিবেচিত কোনো ব্যক্তিকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে হবে না। তবে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত কোনো পদে নির্বাচিত হলে বা নিয়োগপ্রাপ্ত হলে তাকে আনুগত্যের শপথ নিতে হবে। রায়ে আরও বলা হয়, পাসপোর্ট আপাতদৃষ্টিতে নাগরিকত্বের প্রমাণ, তবে অকাট্য প্রমাণ নয়; কারণ অধুনা পৃথিবীর বহু দেশেই ভিন্ন দেশিয় লোকদের পাসপোর্ট দেয়ার প্রথা ব্যাপকভাবে চালু আছে। বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ ১৯৭৩ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭৩ সালের ৯নং আদেশ)-এর ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সরকার বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন ব্যক্তিকেও পাসপোর্ট বা ভ্রমণ দলিল প্রদান করতে পারেন।"