পুণ্ড্রবর্ধন

প্রাচীন বাংলার একটি জনপদ

পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন যুগের উত্তরবঙ্গের একটি এলাকা যেখানে পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়রা বাস করত।[১][২][৩]

পুণ্ড্রবর্ধন
অজানা (?~1280 BCE)–অজানা (?~300 BCE)
রাজধানীমহাস্থানগড়
প্রচলিত ভাষাসংস্কৃত
পালি
ধর্ম
ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্ম
বৌদ্ধ ধর্ম
হিন্দুধর্ম
সরকাররাজতন্ত্র
ঐতিহাসিক যুগব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ
• প্রতিষ্ঠা
অজানা (?~1280 BCE)
• বিলুপ্ত
অজানা (?~300 BCE)
বর্তমানে যার অংশ বাংলাদেশ
 ভারত (পশ্চিমবঙ্গ)

প্রাগ আয' ভারতবষে' যে কয়েকটি শশক্তিশালী রাস্ট্র ও নগর-সভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হল- পুন্ড্রবধ'ন রাস্ট্র ও নগর। ইতিহাসের সেই উষালগ্নে পুন্ড্রবধ'নে দেখা দিয়েছিল এমন একটি শক্তিশালী রাজতন্ত্ররূপে যার খ্যাতি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পয'ন্ত প্রশারিত ছিল।

পুন্ড্রবধ'নের রাজ্য সীমা: "করতোয়া নদীর পশ্চিম পার থেকে কোশী নদীর পূর্ববতী' ভূখন্ড পয'ন্ত দীর্ঘ-জীবি রাজতন্ত্র ছিল পুন্ড্রবধ'ন নামে খ্যাত।

বত'মান বাংলাদেশের বগুড়া জেলার "মহাস্থানগড়" নামক স্থানে প্রাচীন পৌন্ড্র নগরের ধংসাবশেষ আাবিস্কৃত হয়েছে। এছাড়া গঙ্গারামপুরের বানগড়, মালদহের পান্ডুয়া এবং জগজীবনপুরে প্রাচীন পুন্ড্রবধ'নের ধংসাবশেষ আাবিস্কৃত হয়েছে।

পুন্ড্রবধ'নের উদ্ভব কাল: ঠিক কোন সময় পুন্ড্রবধ'নে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা আজও সঠিকভাবে নিণ'য় করা যায় নি।তবে বৈদিকগন ভারতবর্ষে এসেই প্রথমে যে রাস্ট্রশক্তিগুলোকে ভারতে প্রতিষ্ঠিত দেখেছিল- তার মধ্যে অন্যতম ছিল "পুন্ড্রবধ'ন"।

ঐতরের ব্রাহ্মণে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়- পুন্ড্ররাজ্য ও পুন্ড্রগনের। সেখানে- "পুন্ড্রগনকে দস্যু-জাতি বলে বন'না করা হয়েছে এবং অন্ধ্র, শবর, পুলিন্দ ও মুতিবগনের ভাই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। "

ঋগবেদের অনুযায়ী আয'রা ভারতের পূর্বাঞ্চলে বসতি বিস্তার কালে সব'প্রথম পুন্ড্রদেশে বসতি বিস্তার করে এবং রাজ্য স্থাপিত করে।সেই রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল 'পৌন্ড্রনগর'। রামায়ণ ও মহাভারতেরও এই রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতে এই রাজ্যের অধীবাসীদের "সুজাত ক্ষত্রিয়" বলা হয়েছে।

রায় সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বমা' প্রমাণ করিয়াছেন- পুন্ড্রবধ'নের অধীবাসি গন হলেন "ক্ষত্রিয়" এবং বত'মানে তাদের পরিচয় "রাজবংশী ক্ষত্রিয়" নামে।

1000 থেকে 900 খৃঃ পূর্বে বৈদিক সাহিত্য সংকলিত হলেও - বৈদিক সাহিত্য রচিত হয়েছিল আয'দের ভারতে প্রবেশের সময়কালে বা সামান্য পরবর্তী কালে; যদিও অনেকের অনুমান- "ঋক বেদের" অংশ বিশেষ ভারতে প্রবেশের আগেই রচিত হয়েছিল। যাইহোক সংকলনের কাল ছেড়ে রচনার কালকে ধরলে এবং তার পূর্বে পুন্ড্র জনপদকে খ্যাতিমান হতে গেলে- কমপক্ষে 1500খৃ:পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে পুন্ড্রবধ'নের প্রতিষ্ঠাকাল অনুমান করা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আনুমানিক 1200খৃ:পূর্বের কাছাকাছি সময়ে পুন্ড্রবধ'নে আয'সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে। পুন্ড্রদেশে আয'দের রাজ্যবিস্তারের এই ঘটনাবলী "শুক্ল-যজুবে'দের মাধ্যন্দিন শাখার অন্তগ'ত 'শতপথ-ব্রাহ্মণে' লিখত আছে।"

সম্ভবত: উত্তর-পূব' ভারতে আয'-সভ্যতা বিস্তারের নায়ক- "মহারাজ বিদেঘ মাথব"। তিনি ঐ সময় ব্রাহ্মাবতে' রাজত্ব করতেন। Saraswati নদীতীরবর্তী স্থানে তার রাজধানী ছিল। সেকালে সম্ভবত: Ashwamedh এর পরীবতে' যগ্যাগ্নির শিখা নিয়ে বিজয় পরিক্রমায় বেরোবার নিয়ম ছিল। অন্তত: মহারাজ বিদেঘ মাথব, তাই করেছিলেন এবং বিহারের কোশী নদী অতিক্রম করে করতোয়া নদী পয'ন্ত অগ্রসর হতে পেরেছিলেন; কিন্তু সদানীরা (করতোয়া নদী) তিনি অতিক্রম করতে পারেন নি। এই কথাগুলো লেখা আছে শতপথ ব্রাহ্মণে (4/1/14-17)।উক্ত শ্লোক চতুস্ঠয় থেকে একথাও জানা যায় যে, এই বিজয়াভিযানে মহারাজ বিদেঘ মাথব একা যাননি ; সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুরোহিত ও মন্ত্রী রাহুগণ গৌতম। আয'-যগ্যাগ্নির এই প্রতীকী বিজয়ে যে সব রাজ্যে তারা প্রবেশ করেছিলেন, তার জন্য দৃশদবতী ছাড়াও যমুনা, সরযু, গন্ডকী এবং কোশী নদী অতিক্রম করতে হয়েছিল। এই কোশী নদী হোল পুন্ড্রবধ'ন রাজ্যের পশ্চিম সীমানা। এ-থেকেই বোঝা যায় যে, 1200খৃ:পূর্বের কাছাকছি সময়ে "মহারাজ বিদেঘ মাথব" পুন্ড্রবধ'নের দ্রাবিড়দের পরাজিত করে পূব' ভারতে প্রথম আয' রাজ্য ও বসতি স্থাপন করেন।

পুন্ড্রবধ'নের উল্লেখযোগ্য মহারাজাগনের মধ্যে: মহারাজ বিদেঘ মাথব, মহারাজা বাণ, পুন্ড্ররীক বাসুদেব, মহারাজা বধ'ন।

খৃঃ পূর্ব চতুর্থ শতকে মহানন্দী নামক ক্ষত্রিয় রাজা মগধে রাজত্ব করিত। তাঁহার শুদ্রানী স্ত্রীর গভ'জাত পুত্র মহাপদ্ম নন্দ মাগধের রাজা হইলে তাঁহাকে ক্ষত্রিয় বলিয়া স্মীকার করা হয় নাই। এই কারনেই তিনি বৌদ্ধ ধম' গ্রহণ করেন এবং ক্ষত্রিয় নিধনে ব্রতী হন।ক্ষত্রিয়রা তাহাকেও পরশুরাম মনে করিত। পুন্ড্রবধ'ন রাজ্যও তাহার হাত হইতে রেহাই পায় নাই। পুন্ড্ররাজ বধ'নের সহিত মহাপদ্ম নন্দের লড়াই হইয়াছিল এবং সেই লড়াইয়ে মহারাজ বধ'ন পরাস্ত ও নিহত হইয়াছিলেন। এর পরে মহারাজ বধ'নের পাঁচ পুত্র- আত্মীয় স্বজন, গ্যাতীবগ' লইয়া করতোয়া নদীর পূব' পারের রাজ্য কামরূপের রত্নপীঠে আাসিয়া নিজেদের রাজবংশী হিসেবে পরিচয় দিয়াছিলেন। এর পর থেকে তাহারা বংশ পরম্পরায় রাজবংশী ক্ষত্রিয় বলিয়া পরিচিত। এই রূপে পুন্ড্রবধ'নের রাজপুত্রগনের পথ অনুসরণ করিয়া পুন্ড্রবধ'নের "সুজাত ক্ষত্রিয়গন (পৌন্ড্রক্ষত্রিয়গন)" নিজেদের রাজবংশী ক্ষত্রিয় বলিয়া পরিচয় দিয়াছিলেন এবং বত'মান সময়েও তাহারা রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিত।

এই রাজবংশী ক্ষত্রিয়গনই পরবর্তী সময়ে প্রাগজ্যোতীষপুরের কিরাত গনকে পরাজিত করে ইতিহাস খ্যাত কামরূপ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে 1228 সালে কামরূপের পতন হলে, কামরূপের শেষ মহারাজা পৃথু রায়ের পুত্র, সন্ধা রায় "কামতাপুর রাজ্য" প্রতিষ্ঠা করেন।

মহাপদ্ম নন্দের মৃত্যুর পরে পুন্ড্রবধ'নে পুনরায় "সুজাত ক্ষত্রিয়রা (রাজবংশী ক্ষত্রিয়রা)" ক্ষমতা লাপ করে। নানা ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, পুন্ড্রবধ'ন তার স্মতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল 320খৃস্ট্রাব্দ পয'ন্ত।

রাজবংশী ক্ষত্রিয় (পৌন্ড্রক্ষত্রিয়)জাতি ধর্ম পরিবর্তনের ফলে রাজবংশী জাতি এখন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। কিন্তু ভাষা একই।

নিম্ন আসাম, উত্তরবঙ্গ, পূর্ব বিহার, পূর্ব নেপালের তরাই অঞ্চল, বাংলাদেশ এবং ভুটানের অধিবাসী।

ব্যুৎপত্তি:

রাজবংশী (আক্ষরিক অর্থ: রাজকীয় বংশের ) সম্প্রদায় ১৮৯১ সালের পরে একটি জাতিগত পরিচয় থেকে নিজেকে দূরে রাখার এবং পরিবর্তে ক্ষত্রিয় হিন্দু বর্ণের উচ্চ সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আন্দোলনের পরে এই নামটি দেয়। ক্ষত্রিয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজবংশের সাথে সম্প্রদায়কে যুক্ত করার মাধ্যমে।

নামকরণ সম্পাদনা

পুণ্ড্র নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বেশকিছু মতবাদ আছে।একটি মতবাদ অনুসারে। পুণ্ড্র আখের একটি প্রজাতি। আর যেখানে আখের অত্যধিক ফলন হত তা পুণ্ড্রদেশ বা পুণ্ডভূমি নামের পরিচিত ছিল।অশোকাবদান গ্রন্থে প্রথমবার পুণ্ড্রবর্ধন নামে উল্লেখিত হয়। পুণ্ড্রদের আবাসস্থলই পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ‍দ্বিতীয় শতাব্দীর মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপিতে উল্লিখিত ‘পুদনগল’ (পূণ্ড্রনগর) ও বগুড়ার মহাস্থান যে অভিন্ন এবং পুণ্ড্রনগর যে পুণ্ড্রদের আবাসস্থল পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্র সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই।

পুণ্ড্রের জনগণ সম্পাদনা

পরবর্তী বেদবাক্য মতে পুণ্ড্র ছিল একটি জনগোষ্ঠী। মহাভারতের দিগ্বিজয় শাখায় তাদের আবাস রূপে মুঙ্গেরের পূর্বদিক এবং কোশীর তট(অন্য নাম সপ্তকোশী নদী) শাসনকারী যুবরাজের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।গুপ্ত শাসনকালে উৎকীর্ণ লিপি বা তাম্রশাসন এবং প্রাচীন চীনা লেখকরা পুণ্ড্রবর্ধনকে উত্তরবঙ্গের পৌন্ড্রক্ষত্রিয় এর স্থান রূপে উল্লেখ করে।

পৌরাণিক কাহিনী সম্পাদনা

মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত উপাখ্যান অনুযায়ী অসুররাজ বলির পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে ঋষি দীর্ঘতমার পাঁচ সন্তান অঙ্গ, বঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র, ও কলিঙ্গ জন্মলাভ করে। তারা তাদের নামে পাঁচটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

দীর্ঘতমা ধার্মিক ও বেদাদি গ্রন্থে বিদগ্ধজন ছিলেন। একদিন মাতার আদেশে দীর্ঘতমার পুত্রগণ তাঁকে ভেলায় ভাসিয়ে দিলে রাজা বলি তাঁকে ভেসে আসতে দেখেন। ভাসিয়ে দেয়ার কারণ ছিল তার অযাচিত যৌনাচার।রাজা বলি যখন তাকে ক্ষেত্রজ সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন তখন তিনি রানি সুদেষ্ণার গর্ভে অঙ্গ,বঙ্গ,কলিঙ্গ,পুণ্ড্র ও সূহ্মের জন্ম দেন।

সাম্রাজ্য সম্পাদনা

উত্তর ভারতে আর্য-ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার অনেক পরে বাংলায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলায় বসবাসকারী অনার্য ব্যক্তিরা অনেক ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য তারা আর্য সংস্কৃতির প্রভাবকে প্রতিহত করে। মৌর্যরাই প্রাচীন ভারতে সর্বপ্রথম বড় ধরনের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সমর্থ হয় যার প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্তমান পাটনার অন্তর্ভুক্ত পাটালিপুত্রা। পুণ্ড্রনগর থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় মৌর্যদের পুণ্ড্রবর্ধন অধিকার করার সম্ভাবনা ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫ সালের দিকে মৌর্যদের শাসনামল শেষ হয়ে যাবার পরে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে বেশকিছু ক্ষুদ্র সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ৪র্থ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্তদের পুনর্জাগরণের পরে। গুপ্ত আমলের ধাতব পাত্রে তাদের সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তের পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির কথা উল্লেখ আছে, যেখানে ভুক্তি বলতে সাম্রাজ্যের একটি বিভাগের কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের মুখে পড়ে এবং তাদের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ সম্ভবত ৫৬৭-৭৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রাজা সঙ্গতসেনের অধিকারে চলে যায়। বাংলা পূর্বে সমতট ও পশ্চিমে গৌড় নামক দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছু নির্দিষ্ট প্রাচীন নথিতে পুণ্ড্রবর্ধনকে গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বলা হয়েছে। ৭ম খ্রিষ্টাব্দে এটি শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।

পতন সম্পাদনা

চীনা পরিব্রাজক, হিউয়েন সাঙ ৬৩৯-৪৫ সালে পুণ্ড্রবর্ধন এলাকায় ভ্রমণ করেন। তিনি কাজানগালা থেকে কামরূপ হয়ে পুণ্ড্রবর্ধনে যান। তবে তার ভ্রমণ নির্দেশিকাতে তিনি সে সময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে কোন রাজা ছিল বলে উল্লেখ করেননি।

জুয়ানজাং পুণ্ড্রবর্ধন সম্পর্কে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি দেন:

"এখানে ২০টি বৌদ্ধ মঠ এবং ৩০০০ এরও বেশি ভিক্ষু ছিলেন যারা “মহাযান ও হীনযান”কে অনুসরণ করতেন; দেব-মন্দিরগুলোর সংখ্যা ১০০ ছিল এবং বিভিন্ন শ্রেণীর অনুসারীরা ছড়িয়ে থাকত, দিগম্বর নির্গ্রন্থের সংখ্যা ছিল অসংখ্য।"

নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, ৭ম-৮ম শতকে পুণ্ড্রবর্ধন তার প্রাচুর্য হারিয়ে ফেলেছিল। মহাস্থানগড়ের নৃতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে জানা যায়, পাল আমলের সময় ১২শ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দুর্গের ব্যবহার করা হয়েছিল, তবে এটি তেমন কোন শক্তি কেন্দ্র ছিল না। এটি চন্দ্রবংশের রাজাদের ও ভোজ ভার্মার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা হয়ত এটিকে শাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে তখন আর এর তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। এটি ক্রমশ তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং পারিপার্শ্বিক এলাকার একটি অংশে পরিণত হয়। পুণ্ড্রবর্ধননগর বা পুণ্ড্রবর্ধনপুর এর পরিচয় হারিয়ে মহাস্থান নামে সূচীত হতে থাকে।

ইসলামের প্রসার সম্পাদনা

মহাস্থানে শাহ সুলতান বালখি মাহীসওয়ার মাজহার যুদ্ধে মহাস্থানগড়ের রাজা পরশুরামকে পরাজিত করে এবং এলাকার মানুষকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে বসতি স্থাপন করে।[৪][৫]

সীমানা সম্পাদনা

বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের অন্তর্ভুুক্ত রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের দিনাজপুর পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বুধগুপ্তের সময় দামোদরপুর তাম্রশাসন শিলালিপি অনুসারে (আনুমানিক ৪৭৬-৯৪ খ্রিস্টাব্দ) পুণ্ড্রবর্ধনের উত্তর সীমা হিমালয় ছিল। পাল যুগে পুণ্ড্রবর্ধনের প্রশাসনিক ও আঞ্চলিক এখতিয়ার সম্প্রসারিত হয়। পাল, চন্দ্র ও সেন যুগে পুণ্ড্রবর্ধনে উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। [২] বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্রী-মণ্ডলা ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের একটি মহানগর জেলা। এটি বেশ কয়েকটি শিলালিপি দ্বারা সমর্থিত।[৩]বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রীর প্রাথমিকভাবে দশম শতাব্দী থেকে উল্লেখ পাওয়া যায়, যখন পুণ্ড্রবর্ধনের পতন হয়েছিল। [৬]

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গ মানেই পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি নয়, যাকে আমরা এখন পূর্ববঙ্গ বলি তাও পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অংশ ছিল। লক্ষ্মণ সেনের পুত্র কেশব সেনের শাসনামলের তাম্রশাসন শিলালিপি অনুসারে , দ্বাদশ শতাব্দীতে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তিতে বিক্রমপুর পর্যন্ত এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ”[৭] দক্ষিণে পুণ্ড্রবর্ধন সুন্দরবনের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।[৮]

এই অঞ্চলের অসংখ্য জলপথ ছিল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। প্রাচীন সাহিত্যে কিছু রাস্তার উল্লেখ আছে। সোমদেব কথাসরিতসাগরে পুণ্ড্রবর্ধন থেকে পাটলিপুত্র পর্যন্ত একটি রাস্তার উল্লেখ করেছেন। জুয়ানজং কাজাংলা থেকে পুণ্ড্রবর্ধন ভ্রমণ করেছিলেন, তারপরে একটি প্রশস্ত নদী অতিক্রম করে কামরূপে এগিয়ে যান। পুণ্ড্রবর্ধন থেকে মিথিলা পর্যন্ত একটি রাস্তা, তারপর পাটলিপুত্র এবং বুদ্ধগয়া হয়ে বারাণসী এবং অযোধ্যায় যাওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত সিন্ধু এবং গুজরাটের দিকে যাওয়ার রাস্তার উল্লেখ রয়েছে। এটি অবশ্যই একটি প্রধান বাণিজ্য রুট ছিল। [৯]

আচার্য ভদ্রবাহুর জন্মস্থান সম্পাদনা

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আধ্যাত্মিক শিক্ষক, জৈন আচার্য ভদ্রবাহু পুণ্ড্রবর্ধনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[১০]

ভাষা:

ইতিহাস:

কামতাপুরী-রাজবংশী ভাষা আয' গোস্ঠী ভুক্ত এবং জাতি গত ভাবে রাজবংশী (পৌন্ড্রক্ষত্রিয়) গন। খৃঃ পূর্ব চতুর্থ শতকে, মগধ রাজ মহাপদ্ম নন্দের নিকট পরাজিত হয়ে, এক বিরাট সংখ্যক পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, কামরূপের রত্নপিঠে, নেপালে এবং উড়িষ্যায় আশ্রয় নেন। তাই বত'মান সময়েও উড়িষ্যা রাজ্যের Sambalpur এলাকায় বসবাস করছেন এবং ভাষাও রাজবংশী।আধুনিক ভাষাবিদ গনের প্রমাণিত তথ্যের ওপরে, ভিত্তি করে এটা মেনে নিতে হবে যে, কামরূপী ভাষা এবং বরেন্দ্রী ভাষা বাংলা ভাষার উপভাষা নয়। এখানে মনে রাখা দরকার কামরূপী ভাষাটিই হোলো রাজবংশী / কামতাপুরী ভাষা এবং বরেন্দ্রী ভাষা হোলো পুণ্ড্রবধ'নের ভাষা। পৌন্ড্রক্ষত্রিয় গনই হলেন বত'মান সময়ের রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতি।কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের ফলে রাজবংশী জাতি এখন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। কিন্তু ভাষা একই।

বত'মানে আধুনিক গবেষণার মাধ্যমেই সবকিছু প্রমানিত যে, কামরূপী / কামতাপুরী /রাজবংশী / গোয়ালপাড়ীয়া / রংপুরী / তাজপুরী / সূর্যাপুরী / বারেন্দ্রী / বঙ-কামরূপী / বঙ-অসমীয়া ভাষা, একই ভাষা এবং স্থান ভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত।

এমনকি আন্তজা'তীক ভাষাবিজ্ঞানী গন এটাও প্রমাণ করেছেন যে, "বাংলা ভাষা এবং অসমীয়া ভাষা" - বঙ্গ-কামরূপী / বঙ্গ-অসমীয়া ভাষা থেকে সৃষ্টি হয়েছে”

বত'মানে রাজবংশী / কামতাপুরী ভাষা West Bengal and Nepalএ সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অথা'ৎ রাজবংশী ভাষা বত'মানে আন্তজা'তীক ভাষা।

রাজবংশীরা ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিজীবী ছিল, কিন্তু উত্তরবঙ্গে তাদের সংখ্যাগত আধিপত্যের কারণে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পেশাগত পার্থক্য ছিল। যারা প্রায়ই জমির চাষীদের জন্য কাজ করত, যাদেরকে দার-চুকানিদার বলা হয়। তাদের ওপরে ছিল  চুকান্দিয়ার  ও  জোতদার এবং ওপরে ছিল জমিদাররা। কিছু রাজবংশী ছিলেন জমিদার বা জোতদার।

সংস্কৃতি: ২০১৯ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, রাজবংশী সম্প্রদায়ের কৃষি, নৃত্য, সঙ্গীত, চিকিৎসা অনুশীলন, গান, বাড়ি নির্মাণ, সংস্কৃতি এবং ভাষার মৌখিক ঐতিহ্য রয়েছে। রাজবংশীরা প্রধানত শিবভক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী, দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, মনসাপূজা, গঙ্গাপূজা, বিষুয়াপূজা, তিস্তাবুড়ির পূজা, যাত্রাপূজা, ইত্যাদি পূজা করে থাকেন। পিতৃ-প্রধান পরিবার।খরা, অনাবৃষ্টি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ব্যাঙের বিয়ে, প্রভৃতি রাজবংশীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। পেশায় এরা প্রধানত কৃষক ও স্বাধীন কর্মে বিশ্বাসী। স্বাধীনচেতা মনোভাবের মানুষ।

পদবি: রাজবংশীদের পদবি গুলি হল- রায়, বর্মা, দাস, বর্মন, সিংহ, রাজবংশী, অধিকারী।

খাদ্যাভ্যাস: রাজবংশী সম্প্রদায় ঐতিহ্যগতভাবে একটি বৃহৎভাবে কৃষিজীবী সম্প্রদায় ছিল, তারা মূলত ধান, ডাল এবং ভুট্টা চাষ করত। অধিকাংশ জনসংখ্যার প্রধান খাদ্য ভাত। এমনকি ২১ শতকেও, এই সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ এখনও গ্রামীণ জীবনধারা মেনে চলে, যদিও নগরায়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, নেপাল, বাংলাদেশ খাবার এবং খাদ্যের ধরন একই রকম। শাকসবজি এবং ভাজি (ভাজা- প্রধানত আলু) সহ নিয়মিতভাবে চাল এবং ডাল খাওয়া হয়। সাধারণত শাক-সবজির প্রস্তুতি, বেশিরভাগই খুব অল্প তেল দিয়ে রান্না করা হয়। রান্না প্রধানত সরিষার তেল ব্যবহার করে করা হয়, যদিও কখনও কখনও সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। আমিষভোজী খাবারের ক্ষেত্রে, রাজবংশী জনগোষ্ঠী বঙ্গীয় অঞ্চলের অন্যান্য আশেপাশের জনগোষ্ঠীর তুলনায় প্রচুর পরিমাণে মাংস এবং ডিম খায়, যারা প্রচুর পরিমাণে মাছ খায়।হাঁস ও মুরগির ডিম খাওয়া হয়।

বাড়ি: একটি সাধারণ রাজবংশী বাড়ির নকশা আয়তক্ষেত্রাকার প্যাটার্নের হয়, মাঝখানে একটি খোলা জায়গা (আইগনা) থাকে। এটি বেশিরভাগ বন্য প্রাণী এবং শক্তিশালী বাতাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য করা হয়। প্রতিটি রাজবংশী বাড়িতে প্রবেশদ্বারে মনসার বা কালী ঠাকুর থাকে। উত্তর দিকে সুপারি এবং ফলের বাগান রয়েছে, পশ্চিমে বাঁশের বাগান রয়েছে যখন পূর্ব এবং দক্ষিণে সাধারণত খোলা রাখা হয় যাতে রোদ এবং বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে পারে। যদিও জমিদার ভদ্রলোকদের মধ্যে এই ধরনের প্যাটার্ন বেশি দেখা যায়।

পোশাক: রাজবংশীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে প্রধানত মহিলারা শাড়ি,চাদর,পাটানি প্রভৃতি ব্যবহার করেন এবং পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হল ধুতি,পাঞ্জাবী,লুঙ্গি, জামা, গেঞ্জি,চাদর।যদিও আধুনিক পোশাকগুলি ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়।

সঙ্গীত: সঙ্গীত রাজবংশী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজবংশী সংস্কৃতির সংগীতের প্রধান ধারাগুলো হল ভাওয়াইয়া, চাটকা, চোরচুন্নি, পালাটিয়া, লহনকারি, টুকখ্যা, বিষহরির পালা ইত্যাদি। এই ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, দোতারা, সারিন্দ্র ও বেনার মতো স্ট্রিং যন্ত্র, তাসি, ঢাক, খোল, দেশি ঢোল এবং মৃদঙ্গের মতো দ্বি-ঝিল্লির যন্ত্র, কাঁসি, খরতালের মতো গঙ্গা এবং ঘণ্টা এবং সানাই, মুখ বাঁশি এবং কুপা-এর মতো বায়ু যন্ত্র।

রাজবংশীদের জাতির মানুষ জনের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি রয়েছে। এদের ভাষা হল কামতাপুরী-রাজবংশী ভাষা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ভাষাকে স্বীকৃতি দিলেও, এই ভাষাটি ভারতের অষ্টম তপশিলে এখনও স্থান পায়নি। এদের ভাওয়াইয়া সংগীত ভারতবর্ষের অন্যতম সুনামধন্য সংগীত। ভারতের কোচবিহার থেকে রাজবংশী ভাষায় দোতরার ডাং নামের সাময়িকী প্রকাশ হয় ১৪১৭ বঙ্গাব্দ থেকে।

পশ্চিমবঙ্গে রাজবংশী ভাষা একাডেমী গঠন হয়েছে। কামতাপুরী-রাজবংশী ভাষায় লেখা কবিতা, গল্প, গান রচনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজবংশী গান ক্রমশ এতদ এলাকার মানুষের হৃৎস্পন্দন হয়ে উঠেছে। রাজবংশীর জাতির সমস্তরকম অনুষ্ঠানেই বাজে এসব মনোরম গান। তবে আজকাল বেশ কিছু আধুনিক গান সৃষ্টি হয়েছে যেগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। যেমন - 'ও মাই সুন্দরী ', 'ও মুই পাটানি পিন্ধিয়া', 'ভূমিপুত্র', 'হামার উত্তরবাংলা আসিয়া যাও', 'মনের হাউসে পিন্ধিনু পাটানি', 'সোনার জীবন', 'নদীর পাড়ত ঘর বান্দিয়া ', 'পিরিত নামের ফুল ফোটালু' "পরান কান্দে", "কি সুন্দর মুখখান তোর", 'ও সুন্দরী মনে মনে', ‘আজি কি বাও নাগিলেক গায় মোর’, ‘উজান ভাটি’|

বাংলাদেশে রাজবংশী: রাজবংশী লোকেরা বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চল, রাজশাহী অঞ্চল ও কিছু সংখ্যক লোকেরা বগুড়াময়মনসিংহ জেলাতেও আছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে এদের মোট জনসংখ্যা পাঁচ হাজারের একটু বেশি।

কামতাপুরী বা রাজবংশী (ভারত), রংপুরী বা রাজবংশী (বাংলাদেশে), রাজবংশী (নেপালে ) একটি ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত বাংলার ভাষা। এ ভাষায় বাংলাদেশের রাজবংশী সম্প্রদায়, রংপুর বিভাগ, ভারত এবং নেপাল এর রাজবংশী, তাজপুরিয়া, নস্যশেখ, নাথ-যোগী, খেন সম্প্রদায়ের লোকেরা কথা বলে। বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির ভিত্তি নদীয়া তথা পশ্চিমাঞ্চলীয় আঞ্চলিক বাংলা হওয়ায়, বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির সাথে এর কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে এই ভাষাভাষী জনগণ কার্যত দ্বিভাষী। ভারত এবং বাংলাদেশে তারা রাজবংশীর পাশাপাশি প্রমিত বাংলা অথবা অসমীয়া ভাষায় কথা বলে। 

রাজবংশী ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস:

খৃষ্টপূব' চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, মগধের মহারাজা মহাপদ্ম নন্দ পুন্ড্রবধ'ন আক্রমন করেন এবং সেই যুদ্ধে পুন্ড্রবধ'নের মহারাজা পরাজিত হয়েছিলেন। আমরা সকলেই জানি মহাপদ্ম নন্দ ক্ষত্রিয় নিধনে ব্রতী হয়েছিলেন।সেই কারনে মহাপদ্ম নন্দ "Sarva-Kshatrantaka" নামে অবিহিত হয়েছিলেন। সেই কারনে সেই সময় ক্ষত্রিয় জাতির জনগন মগধরাজ মহাপদ্ম নন্দের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন স্থানে চলে গিয়েছিলেন। যেমন: কামরূপের রত্নপীঠে, নেপালে, ওড়িশায় (বত'মান সময়েও উড়িষ্যা রাজ্যের Sambalpur এলাকায় পৌন্ড্রক্ষত্রিয়-রাজবংশী ক্ষত্রিয়)  গন বসবাস করছেন এবং ভাষাও রাজবংশী।)

এর ফলে সেইসকল স্থানের ভাষার সাথে পুন্ড্রবধ'নের ভাষার মিশ্রণ ঘটে। যাই হোক এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাষার খেত্রে। মহাপদ্ম নন্দ কতৃক পুন্ড্রবধ'ন মগধ সাম্রাজ্যের অন্ত:ভুক্ত হওয়ার দরুন, মগধের ভাষার সাথে পুন্ড্রবধ'নের ভাষার মিশ্রণ ঘটে এক নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়। কিছু ভাষাবিজ্ঞানী সেই ভাষার নাম দিয়েছেন মাগধী প্রাকৃত, আবার কিছু ভাষাবিজ্ঞানী সেই ভাষার নাম দিয়েছেন গৌড়ীয় প্রাকৃত। নন্দ বংশের পরে মগধ মৌয' সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দরুন পুন্ড্রবধ'নও মৌয' সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল (৩২২খৃস্টপূব' থেকে ১৮৪খৃস্টপূব' পয'ন্ত)।

পরবতী' সময়ে (আনুমানিক চতুর্থ শতকে) সেই মাগধী প্রকৃত বা গৌড়ীয় প্রাকৃত ভাষা অপভ্রংশ ভাষায় পরিবর্তীত হয়ে, নতুন তিনটি আলাদা আলাদা ভাষার জন্ম দেয়। (আনুমানিক পঞ্চম শতকে) ১)বিহারি (মৈথিলী), ২) পুরাতন ওড়িয়া, ৩) বঙ্গ-কামরূপী (রাজবংশী) ভষার। সেই সময় পুন্ড্রবধ'নে গুপ্তশাসন চলছিল (আনুমানিক ৩২০খৃস্টাব্দ থেকে ৬০০খৃস্টাব্দের কাছাকাছি সময় পয'ন্ত)।

এর পরে পুন্ড্রবধ'ন গৌড়ের মহারাজা শশাঙ্কের শাসনে চলে আসে (আনুমানিক ৫৯৩খৃস্টাব্দ থেকে ৬৩৮খৃস্টাব্দ)। সেই সময় পুণ্ড্রবধ'নের নাম হয় গৌড় এবং তারপর  পুন্ড্রবধ'নের নাম হয় বরেন্দ্র।

ঐতিহাসিক গনের মতে গৌড়ের মহারাজা শশাঙ্ক, হষ'বধ'ন ও কামরূপের মহারাজা ভাস্কর বম'নের নিকট পরাজিত হন এবং তার রাজ্য হষ'বধ'ন এবং ভাস্করবম'নের ভাগ হয়েছিল। গৌড় সহ বাংলার সম্পুর্ণ অংশ ভাস্কর বম'নের, কামরূপের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং মগধের পুরো অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয় হষ'বধ'নে সাম্রাজ্যে।বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প-এ পুণ্ড্রবর্ধনের যুদ্ধে হর্ষের হাতে শশাঙ্কের পরাজয়ের কাহিনী জানা যায়।

হর্ষবর্ধন প্রথমদিকে শৈব ধর্মের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের একজন মহান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। বৌদ্ধ ধর্মের একজন একান্ত অনুরাগী হিসেবে তিনি মহাযান মতবাদ প্রচারে কণৌজে এক বিশাল সংগীতি আহ্বান। অপরপক্ষে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হর্ষবর্ধনের অনুরাগ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব হিন্দুধর্মের অনুসারিগণকে হতাশ করে করেন।পরবর্তী সময়ে হষ'বধ'নের সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের বিরোধ বাঁধলে, হর্ষবর্ধন ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিলেন বলে কথিত আছে। ব্রাহ্মণগন বিপুল সংখ্যায় পূর্ব ভারতের দিকে অভিবাসন করে। হিউয়েন-সাং কামরূপে বেশ কিছু শিক্ষিত ব্রাহ্মণের চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বেশ কিছু ব্রাহ্মণ কামরূপে বসবাসের জন্য ভাস্করবর্মনের কাছ থেকে ভূমিদান লাভ করেন। কুলজি গ্রন্থে কণৌজের বেশ কিছু ব্রাহ্মণের গৌড়ে অভিবাসনের উল্লেখ রয়েছে। কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মনের নিধানপুর তাম্রশাসন থেকেও এই সম্পর্কে জানা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে গৌড়ে ও কামরূপে সাদরে গৃহীত হলেও এই বিপুল অভিবাসন শেষ পর্যন্ত এই দুদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে।

ব্রাহ্মণদের গৌড়ে অভিবাসনের ফলে, উত্তরভারতের ভাষা, মৈথীলি ভাষা এবং মগধের ভাষার সাথে গৌড়ের স্থানীয় ভাষার (পৌন্ড্রক্ষত্রিয় গনের ভাষার)সাথে সংমিশ্রণ ঘটে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়।এখানে উল্লেখ্য - ভাস্কর বমা' গৌড় দখল করে সেখানেই  অধিক সংখ্যায় ব্রাহ্মণগনকে ভূমি দান করেন।কিছু পরিমান শিক্ষিত মৈথীলি ব্রাহ্মণকে কামরূপে ভূমি দান করেন। পরবর্তী সময়ে এই সকল ব্রাহ্মণগনের বিরাট অংশ পূর্ববঙ্গে এবং রারবঙ্গে চলে যান।

এর ফলে Banga-Kamrupi এর সাথে Maithili and North Indian ভাষার মিশ্রনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে  "বাংলা ভাষার" এবং  Banga-Kamrupi + Maithili + Eastern Kamrupi + Bhotchinyo ভাষার মিশ্রনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে অসমীয়া ভাষার। 

ভাষাবিদ গনের মত অনুযায়ী বঙ্গ-কামরূপী/বঙ্গ-অসমীয়া ভাষা থেকে সরাসরি দুটি ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। ১) বাংলা ভাষা এবং ২) অসমীয়া ভাষা। পূর্বে ভাষাবিদগন বঙ্গ-কামরূপী/বঙ্গ-অসমীয়া বলে যে ভাষাকে চিহ্নত করেছিলেন, আধুনিক ভাষাবিদগন সেই ভাষাকেই রাজবংশী / কামতাপুরী ভাষা হিসাবে চিহ্নত করেছেন।                                    

বাংলা ভাষার ভাষাবিদ গনের মধ্যে কিছু ভাষাবিদ কামরূপী ভাষাকে এবং বরেন্দ্রী ভাষাকে বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেটাই এযাবতকাল মেনে চলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আধুনিক দেশি ও বিদেশি ভাষাবিদগন, আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন যে, কামরূপী ভাষা এবং বরেন্দ্রী ভাষা বাংলা ভাষার উপভাষা নয়। আধুনিক ভাষাবিদগন প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন শুধু নয়, ওনারা এটাও প্রমাণ করেছেন যে কামরূপী এবং বরেন্দ্রী একই ভাষা।

সুতরাং আধুনিক ভাষাবিদ গনের প্রমাণিত তথ্যের ওপরে, ভিত্তি করে এটা মেনে নিতে হবে যে, কামরূপী ভাষা এবং বরেন্দ্রী ভাষা বাংলা ভাষার উপভাষা নয়। এখানে মনে রাখা দরকার কামরূপী ভাষাটিই হোলো রাজবংশী / কামতাপুরী ভাষা এবং বরেন্দ্রী ভাষা হোলো পুণ্ড্রবধ'নের ভাষা। পৌন্ড্রক্ষত্রিয় গনই হলেন বত'মান সময়ের রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতি। এই রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতির ইতিহাস আমরা মেটামুটি ভাবে সকলেই জানি।কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের ফলে রাজবংশী জাতি এখন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। কিন্তু ভাষা একই।

এখানে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হোলো Western Kamrupi (Rajbanshi) ভাষা যদি আপনার জানা থাকে তাহোলে আপনি অতীসহজেই - বাংলা, ওড়িয়া, মৈথিলী, হিন্দী, নেপালী, অসমীয়া ভাষা বুঝতে পারবেন এবং একটু চেষ্টা করলে বলতেও পারবেন।

কিন্তু এই বাংলা ভাষা সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান যে দুটি ভাষার রয়েছে, সেই দুটি ভাষা হোলো ১)মৈথিলী ভাষা এবং ২)পশ্চিম কামরূপী (রাজবংশী) ভাষা।কিন্তু এই সুমধুর বাংলা ভাষার সৃষ্টিই হোতনা, যদিনা সপ্তম শতকে কামরূপের মহারাজা ভাস্কর বমা' দৃর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না নিতেন। ওনার সেই সিদ্ধান্তের জন্য মৈথিলী এবং পুণ্ড্রক্ষত্রিয় গনের ভাষা সংমিশ্রণের সুযোগ পেয়েছিল। তা নাহলে আজকে আমরা বাংলা ভাষায় কথাই বলতে পরতাম না।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের শাসনকালে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে মেলামেশা, আচার-আচরণ ও রীতি-নীতির ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা তেমন একটা ছিল না, কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদের গোড়া সমর্থক সেন রাজাদের সময় প্রবলভাবে এসকল বাধা বিদ্যমান ছিল। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। সমাজে নিম্ন ও অন্ত্যজ শ্রেণীর উত্থান ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে।

এরপর ভারতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটলে বঙ্গ অঞ্চলেও ইসলাম ধর্মে প্রসার ঘটে।বকতিয়ার খলজি নামে দিল্লি সুলতানির দাস রাজবংশের এক তুর্কি সেনানায়ক সর্বশেষ সেন রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাস্ত করে বঙ্গের একটি বিরাট অঞ্চল অধিকার করে নেন। এরপর কয়েক শতাব্দী এই অঞ্চল দিল্লি সুলতানির অধীনস্থ সুলতান রাজবংশ অথবা সামন্ত প্রভুদের দ্বারা শাসিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সেনানায়ক ইসলাম খাঁ বঙ্গ অধিকার করেন। যদিও মুঘল সাম্রাজ্যের রাজদরবার সুবা বাংলার শাসকদের শাসনকার্যের ব্যাপারে আধা-স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন। এই অঞ্চলের শাসনভার ন্যস্ত হয়েছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের হাতে।নবাবেরাও দিল্লির মুঘল সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে বঙ্গ অঞ্চলে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ঘটে। এই সব বণিকেরা এই অঞ্চলে নিজ নিজ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। অবশেষে 1757 সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করেন। এর পর সুবা বাংলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার কোম্পানির হস্তগত হয়। 1765 সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে সেন্ট্রাল প্রভিন্সের (অধুনা মধ্যপ্রদেশ) উত্তরে অবস্থিত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মোহনা থেকে হিমালয় ও পাঞ্জাব পর্যন্ত সকল ব্রিটিশ-অধিকৃত অঞ্চল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত হয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটে। 1772 সালে কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষিত হয়। বাংলার নবজাগরণ ও ব্রাহ্মসমাজ-কেন্দ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্কার আন্দোলন বাংলার রাজবংশী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

কিন্তু মজার বিষয় এত কিছু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও রাজবংশী ভাষা বত'মান সময়েও, তার প্রাচীন রূপ অনেকটাই ধরে রাখতে পারল কিভাবে?

সপ্তম শতক থেকে চতুরদশ শতক অব্দি উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলার কোনো শাসন কাজ পরিচালিত হোতো না এবং সেখানে বাংলা ভাষিও ছিলেন না। এখন যে সীমানাঃ উত্তর বাংলা, পূর্ব বিহার, পূর্ব নেপাল, উত্তর বাংলাদেশ এবং উত্তর-পূর্ব ভারত। তাহোলে Charja Pader ভাষা কি ভাবে বাংলা ভাষার প্রচীন রূপ হয়? এখন প্রচলিত বাংলা ভাষার সাথে Charja Pader ভাষার সে রকম মিল নেই, কিন্তূ এখনও প্রচলিত রাজবংশী ভাষার সাথে চযা'পদের ভাষার সরাসরি মিল রয়েছে, হাজার বছরের অধিক সময় পার করেও। 

            উদাহরণঃ টালত মোর ঘড়, নাহি পরবেশি। হাড়িত ভাত নাই, নিতি আবেশি”। 

কামরূপীর/রাজবংশী ভাষার নিমিত্তাথ'ক অনুসগ' 'বাদে' (তোর বাদে = তোর জন্য) সাধু বা চলিত বাংলায় অপ্রচলিত। কিন্তু এই ধরনের উপসগ' মাগধী-প্রাকৃতজাত অন্যান্য পূর্বী ভাষায় সমান্তরালভাবে প্রচলিত (তুলনীয়: ভোজপুরী নিমিত্তাথ'ক অনুসগ' 'বদে')এই অনুসগ'টি হয়ত অন্যান্য মগধীয় ভাষাগোষ্ঠীর সাথে বাংলার আত্মীয়তাবন্ধনের স্মৃতি।

শ্রীকৃষ্ণকীত'নের একটি বিখ্যাত শ্লোক 'বন পোড়ে আগ বড়ায়ি জগজনে জানী/মোর মন পোড়ে যেহ্ন কুম্ভারের পনী।।' উত্তরবঙের পল্লীরমণীর মুখে নিম্নরূপভাবে প্রতিধনিত হতে শোনা যায়: "বন পোড়া যায সোগ্গায় দেখে/মন পোড়া যায় কাহয় না জানে।"একটিমাত্র দৃষ্টন্ত থেকেই অনুমান করা যায় যে, সন্ধান করলে প্রাচীন ও মধ্যবাংলার অনেক প্রবচন ও ইডিয়মই উত্তরবঙের লোকোক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, এই সব মধ্যযুগীয় ভাষালখ্যণ একালের কামরূপীতে/রাজবংশীতে/কামতাপুরীতে রক্ষিত হল কি ভাবে? এর উত্তর পাওয়া যাবে ইতিহাসের পাতায়। উত্তরপূব' ভারতের প্রায় সব'ত্র বাংলা ভাষার বিস্তার থাকলেও উত্তর ও উত্তর-পূব'ঙের সাথে নিম্ন ও অন্য বঙ্গের রাজনৈতিক বিচ্ছেদ শুরু হয়েছিল মধ্যযুগে। ঐ সময় বাংলার অন্যত্র যখন একে একে পাঠান-মোগল ও সামন্ত রাজাদের আধিপত্য, এই স্থানে তখন অখণ্ড কামতারাজ্য। এই রাজনৈতিক অনৈক্যের সূত্র ধরে ভাষার বিকাশ ও অগ্রগতির ব্যাপারেও উভয় বঙ্গের মধ্যে ক্রমশ বৈষম্য সূচিত হয়েছিল।

মধ্য যুগেও রাজবংশী/কামতাপুরী/কামরূপী ভাষা কামতা রাজ্যের রাজভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমনকি কোচবিহার রাজ্য ভারতভুক্তির আগে পয'ন্ত।

১৫৫৫ খ্রীস্টাব্দে কামরূপী/রাজবংশী/কামতাপুরী ভাষায় যে চিঠি কোচবিহারে মহারাজা নরনারায়ণ, অহোমরাজ সগ'দেব চুকাম্ফাকে যে চিঠি লিখেছিলেন, সেই চিঠিকেই বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক/ভাষাবিদগন বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদশ'ন বলে উল্লেখ করে থাকেন। বলা বাহুল্য শুধু এই চিঠিটাই নয়, কামতারাজ্যের ও কোচবিহার রাজ্যের অন্যান্য রাজকীয় চিঠিপত্রও এই রাজবংশী/কামতাপুর/কামরূপী ভাষায় লেখা হয়েছে।  

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই রাজবংশী ভাষায় শুধু যে ব্যবহারিক চিঠপত্রই লেখা হয়েছে তা নয়, কামরূপ/কামতাপুর/কোচবিহারে এই ভাষায় রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের পদ্যানুবাদ করেছেন, বংশাবলী লিখেছেন, নাটকগীত ও পদাবলী রচনা করেছেন।

কিন্তু আধুনিক যুগে এই প্রাচীণ সমৃদ্ধশালী কামরূপী ভাষাকে অপাংন্তেও করে দেওয়া হয়েছিল, এটা বড় বেদনার। এই প্রাচীন ভাষাকে বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা আরও বেদনার। কিন্তু কথায় আছে না,  "ইতিহাস কোনো ভাবেই চাপা থাকে না। এক দিন না এক দিন প্রকাশিত হবেই।" এমনকি আরও অবাক করা বিষয়,  কামরূপী ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্য গুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বাংলা ভাষা এবং অসমীয়া ভাষার ভাষাবিদ গন। ঠিক যেমন পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী গনের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। কিন্তু সেটা সাধারণত হয়ে থাকে পিতা-মাতা যখন তার উত্তরাধিকারী গনকে চিরকালের মত ত্যাগ করে চলে যান। কিন্তু কামরূপী / রাজবংশী ভাষার (পৌন্ড্রক্ষত্রিয় গনের ভাষার)সাথে  সাথে যেটা হয়েছে, সেটাতো জীবিত পিতা-মাতাকে সম্পত্তির লোভে পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা।  

নাম: বত'মানে আধুনিক গবেষণার মাধ্যমেই সবকিছু প্রমানিত যে, কামরূপী / কামতাপুরী /রাজবংশী / গোয়ালপাড়ীয়া / রংপুরী / তাজপুরী / সূর্যাপুরী / বারেন্দ্রী / বঙ্গ-কামরূপী / বঙ্গ-অসমীয়া ভাষা, একই ভাষা এবং স্থান ভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত।

ত'মানে রাজবংশী / কামতাপুরী ভাষা West Bengal and Nepalএ সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অথা'ৎ রাজবংশী ভাষা বত'মানে আন্তজা'তীক ভাষা।

তথ্যসূত্র সম্পাদনা

  1. Hossain, Md. Mosharraf, Mahasthan: Anecdote to History, 2006, pp. 69-73, Dibyaprakash, 38/2 ka Bangla Bazar, Dhaka, আইএসবিএন ৯৮৪-৪৮৩-২৪৫-৪
  2. সুচন্দ্রা ঘোষ (২০১২)। "পুন্ড্রবর্ধন"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  3. Majumdar, Dr. R.C., History of Ancient Bengal, First published 1971, Reprint 2005, p. 10, Tulshi Prakashani, Kolkata, আইএসবিএন ৮১-৮৯১১৮-০১-৩.
  4. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Hossain 1 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  5. Khokon, Leaquat Hossain, 64 Jela Bhraman, 2007, p.129, Anindya Prokash, Dhaka.
  6. Roy, Niharranjan, p. 116.
  7. Bandopadhyay, Rakhaldas, p. 49
  8. Roy, Niharranjan, p.85,
  9. Roy, Niharranjan, pp. 91-93
  10. Majumdar, R.C. (১৯৭১)। History of Ancient Bengal (1971 ed.)। Calcutta: G.Bharadwaj & Co। পৃষ্ঠা 12, 13.। 

11. https://haamarkhabar.com/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%80-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8%E0%A7%87/

12. কামতাপুরী ভাষা সাহিত্যের রূপরেখা, 2000,ধর্মনারায়ন বর্মা

13. https://www.indiatoday.in/pti-feed/story/kamtapuri-rajbanshi-make-it-to-list-of-official-languages-in-1179890-2018-02-28