জয়নাব কোবোল্ড (১৮৬৭-১৯৬৩)[১] একজন স্কটিশ ডায়েরিস্ট, ভ্রমণকারী এবং অভিজাত মহিলা ছিলেন, যিনি ভিক্টোরিয়ান যুগে ইসলাম গ্রহণের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রথম মহিলা ছিলেন, যিনি পবিত্র হজ উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন। তাঁর জন্ম নাম ছিল লেডি ইভলিন মারে।[২][৩]

জয়নব কোবোল্ড
জন্ম১৮৬৭
মৃত্যু১৯৬৩
পরিচিতির কারণপ্রথম ব্রিটিশ নারী হিসেবে যিনি হজ করেছিলেন।
দাম্পত্য সঙ্গীজন ডুপুইস কোবোল্ড (বি. ১৮৯১–১৯২২)
সন্তান
পিতা-মাতাচার্লস মারে, লেডি গার্ট্রুড কোক

জীবনীসম্পাদনা

জয়নব ১৮৬৭ সালের ১৭ জুলাই স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে জন্মগ্রহণ করেন।[৪][৫] তিনি ছিলেন বিশিষ্ট স্কটিশ রাজনীতিবিদ,গবেষক, লেখক ও শিল্পী চার্লস অ্যাডলফাস মারে এবং লেডি গার্ট্রুড কোকের কন্যা।[৬][৭] জয়নব তার শৈশবের বেশিরভাগ সময় আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স এবং মিশরের রাজধানী কায়রোতে মুসলিম আয়াদের সাথে কাটিয়েছেন।[৫] তিনি অল্প বয়স থেকেই কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া নিজেকে একজন মুসলিম বলে মনে করতেন। তিনি শৈশবে যখন উত্তর আফ্রিকায় ছিলেন, তখন স্থানীয় মুসলমিদের সাথে মেলামেশার ফলে ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়।[৫]

তিনি ১৮৯১ সালের ২৩ এপ্রিল মিশরের রাজধানী কায়রোতে অল সেন্টস চার্চে জন ডুপুইস কোবোল্ডকে বিয়ে করেন।[৮] ১৮৯৩ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত এই দম্পতির তিনজন সন্তান হয়। উইনিফ্রেড ইভলিন (১৮৯২-১৯৬৫),[৯] ইভান কোবোল্ড (১৮৯৭- ১৯৪৪),[১০] ও পামেলা কোবোল্ড (১৯০০-১৯৩২)।[১১] তবে ১৯২২ সালে জয়নব তার স্বামী থেকে আলাদা হয়ে যান।[১২] পরবর্তীতে তিনি লন্ডন এবং গ্লেনকার্ন এস্টেটে থাকতেন।[১৩]

ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়াসম্পাদনা

জয়নব একবার তার একজন বন্ধুর সাথে ইতালিতে পোপের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তখন পোপ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি ক্যাথলিক কিনা। যদিও তিনি আগে ইসলাম সম্পর্কে সেভাবে কখনো ভাবেননি, কিন্তু তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি একজন মুসলিম। এর পরে তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরো পড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং অবশেষে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন।[৫][১৪]

তিনি ১৯১৫ সালে নিজের জন্ম নাম লেডি ইভলিন মারে পরিবর্তন আরবি নাম জয়নাব গ্রহণ করে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, তিনি ইসলামকে বিশ্বের অনেক বিভ্রান্তিকর সমস্যা সমাধান এবং মানবতার শান্তি ও সুখ বয়ে আনতে সবচেয়ে সফল ধর্ম বলে মনে করেন।[১৫]

মক্কায় হজযাত্রাসম্পাদনা

১৯২৯ সালে প্রাক্তন স্বামীর মৃত্যুর পর জয়নব হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি যুক্তরাজ্যে কর্মরত হেজাজ ও নজদ রাজ্যের রাষ্ট্রদূত হাফিজ ওয়াহহাবের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি এ বিষয়ে তৎকালীন হেজাজের বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদের কাছে একটি চিঠি পাঠান। কারণ তখন নিরাপত্তাজনিত কারণে ইউরোপীয়দের জন্যে হজ পালনে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা ছিল। তখন কিছু ইউরোপীয় অমুসলিম মক্কায় অনুপ্রবেশ করে এবং ইউরোপে ফিরে এসে তাদের হজ পালনের কথা অত্যন্ত সাহসী সাহসিকতার সাথে প্রচার করেছিল। এই কারণে ইউরোপীয়দের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধ ছিল।

অবশেষে ১৯৩৪ সালে ৬৫ বছর বয়সে মক্কা গিয়ে হজ পালন করে জয়নব একজন বিখ্যাত নারী হওয়ার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। কারণ এর মাধ্যমে তিনি মক্কায় হজকারী প্রথম ব্রিটিশ মুসলিম মহিলা হন।[৫][৬][১৬] ১৯৩৪ সালে তার ভ্রমণের একটি ব্যক্তিগত বিবরণ "পিলগ্রিমেজ টু মক্কা" শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।[৫][১৪] মাইকেল উলফের বই "ওয়ান থাউজেন্ড রোডস টু মক্কায়" তার হজের বিবরণ নিয়ে একটি অংশ রয়েছে।[২]

ডায়েরি ও লেখাসম্পাদনা

প্রথমবার কাবাঘরতাওয়াফ দেখে তার ডায়েরিতে বর্ণনা করেন: “আমরা মসৃণ মার্বেলের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি পবিত্র আল্লাহর ঘরের দিকে। মহান কালো ঘনকটি সরল মহিমায় উদিত হয়েছে, যা অর্জনের লক্ষ্যে লক্ষাধিক মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছে এবং আরো লক্ষাধিক লোক তা দেখার জন্য জান্নাত খুঁজে পেয়েছে …। 'তাওয়াফ' কবির শব্দগুলি ব্যবহার করার জন্য একটি প্রতীক কেবল। একজন প্রেমিক তার প্রেয়সীর ঘর প্রদক্ষিণ করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে দেয় এবং প্রিয়জনের জন্য তার সমস্ত স্বার্থ বিসর্জন দেয়। আত্মসমর্পণের সেই চেতনায় নিয়েই হাজীরা 'তাওয়াফ' করেন”।

১৯৩৪ সালে লিখিত তার "পিলগ্রিমেজ টু মক্কা " বইটি একজন স্কটিশ মহিলার প্রথম হজের বিবরণ এবং তার এই ডায়েরিটি হজসফরের সবচেয়ে পুরানো একটি রেকর্ড। তিনি সারাজীবন ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছেন এবং কেনিয়া: ল্যান্ড অফ ইলিউশন নামে আরেকটি বইও লিখেছেন। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে মুসলমানরা ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল তারা ওকিং মসজিদে তাদের ঈদের নামাজ আদায় করছিল; তিনি ওয়াকিং মসজিদে সেই ঈদের নামাজের আইকনিক ছবিতে কিছু অভিজাতদের মধ্যে ছিলেন। তিনি উইলিয়াম কুইলিয়াম এবং তৎকালীন অন্যান্য অভিজাত ইংরেজ পুরুষ ও মহিলাদের মতো দাওয়াতে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলেন।

তিনি একজন সাবলীল আরবি বক্তা ছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে, তিনি সারা জীবন মুসলিম ছিলেন এবং তার ধর্মান্তরিত হওয়ার কোনো অন্তর্নিহিত মুহূর্ত ছিল না। লেডি ইভলিনের জীবন, তার ধর্মান্তর এবং মক্কায় তার তীর্থযাত্রা সম্পর্কে সবই তার সেই ডায়েরিতে রেকর্ড করা হয়েছে যা সম্প্রতি পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে তার নাতি মেজর ফিলিপ হোপ-কোবল্ড বলেন, "তিনি একজন খুব প্রাণবন্ত, আশ্চর্য অ্যাংলো-স্কট মুসলিম ছিলেন, যিনি কাজ করতে পছন্দ করতেন এবং মানুষকেও ভালোবাসতেন"।

মৃত্যসম্পাদনা

লেডি ইভলিন ১৯৬৩ সালে মারা যান এবং ওয়েস্টার রসে তার গ্লেনকার্ন এস্টেটের একটি দূরবর্তী পাহাড়ের ধারে তাকে দাফন করা হয়েছিল। স্কটল্যান্ডে তার জানাযা করার জন্য কোন মুসলিম ছিল না। তাই তারা ওয়াকিং মসজিদের সাথে যোগাযোগ করেছিল এবং ইমাম তার জানাযা করার জন্য বরফের মধ্যে উপরে উঠেছিলেন।কারণ জয়নব শর্ত দিয়েছিলেন যে, তাকে যেন মক্কার মুখোমুখি একটি পাহাড়ে দাফন করা হয় এবং কবরের ফলকে নিম্নলিখিত শব্দগুলি লেখা: "আল্লাহু নুর-উস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ" (মহান আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর আলো)।[৫]

২০২২ সালে ইসলামে ধর্মান্তরিতদের পক্ষে কাজ করা একটি ব্রিটিশ সংস্থা "কনভার্ট ইসলাম ফাউন্ডেশনের" হজযাত্রীদের একটি দল তার কবর পরিদর্শন করেছিলন।[১৭] তারা গ্লেনক্যার্নের একটি গাড়ি-পার্ক থেকে দীর্ঘ ২০ কিলোমিটার হেঁটে সেখানে পৌঁছেছিলেন।[১৮] লেইলা আবুলেলার ২০১৯ সালে প্রকাশিত "বার্ড সামন্স" উপন্যাসটি জয়নব কোবোল্ডের কবরের সন্ধানে তিনজন মুসলিম মহিলার যাত্রার বর্ণনা দেয়।[১৯]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Sébastien SANCHEZ's family tree - Maud Evelyn Murray"Geneanet (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২২ জানুয়ারি ২০২০ 
  2. "The British Victorians who became Muslims"BBC News (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৯-০৫-১৮। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-১০-২৬ 
  3. "প্রথম ব্রিটিশ নারীর হজের সফরনামা | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। ২০২২-০৭-০৭। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-১০-২৭ 
  4. William Facey, Miranda Taylor, Introduction to 'Pilgrimage to Mecca', p 2. আইএসবিএন ৯৭৮০৯৫৫৮৮৯৪৩১
  5. O'Shea, Josef (জুন ১৫, ২০১৬)। "The Victorian Muslims of Britain"Al Jazeera। সংগ্রহের তারিখ মার্চ ২, ২০১৮ 
  6. Facey, William (2008). "Mayfair to Makkah", Saudi Aramco World, Vol. 59, No. 5, pages 18–23.
  7. William Facey, Miranda Taylor, Introduction to 'Pilgrimage to Mecca', p 3. আইএসবিএন ৯৭৮০৯৫৫৮৮৯৪৩১
  8. "Cobbold, John Dupuis"suffolkartists.co.uk। Suffolk Artists। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 
  9. "#450, Winifred Evelyn COBBOLD"Family Tree। The Cobbold Family History Trust। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০২২ 
  10. Cobbold, Anthony (২০২০)। "#448, John Murray (Ivan) COBBOLD"Family Tree। The Cobbold Family History Trust। 
  11. Dismore, Jane (ডিসেম্বর ২০০৯)। "#452, Pamela COBBOLD"Family Tree। The Cobbold Family History Trust – The Dorset Magazine-এর মাধ্যমে। 
  12. Russell, Steven (৮ মে ২০০৯)। "Mayfair to Mecca: plucky Lady Evelyn"East Anglian Daily Times (ইংরেজি ভাষায়)। East Anglian Daily Times। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  13. Cobbold, Anthony (২০০৬)। "#308, Evelyn MURRAY"Family Tree। The Cobbold Family History Trust। 
  14. Cobbold, Lady Evelyn (১৯৩৪)। Pilgrimage to Mecca। John Murray, Albemarle Street।  Republished 2009, ISBN=978-0955889431
  15. Cobbold, Lady Evelyn Murray; Alexander, Frances Gordon (১ জানুয়ারি ১৯১২)। Wayfarers in the Libyan Desert। Arthur L Humphreys।  Link is to full text of US version.
  16. William Facey, Miranda Taylor, Introduction to 2009 edition of 'Pilgrimage to Mecca', p 32. আইএসবিএন ৯৭৮০৯৫৫৮৮৯৪৩১
  17. "Home page" (ইংরেজি ভাষায়)। Convert Muslim Foundation। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২২ 
  18. Cox, Auryn (১৫ জুন ২০২২)। "Lady Evelyn Cobbold - why are Muslim pilgrims visiting her Scottish grave?"BBC News। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২২ 
  19. Cosslett, Rhiannon Lucy (১২ এপ্রিল ২০১৯)। "Bird Summons by Leila Aboulela review – lyrical examination of identity"The Guardian (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২২