গোপাল হালদার (ইংরেজি: Gopal Haldar ( ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯০২  - ০৩ অক্টোবর, ১৯৯৩) একজন বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক,সাহিত্যতাত্ত্বিক, চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক ও  স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা রাজনৈতিক কর্মী। [১][২]

গোপাল হালদার
জন্ম(১৯০২-০২-১১)১১ ফেব্রুয়ারি ১৯০২
বিদগাঁও, বিক্রমপুর ঢাকা,বৃটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু৩ অক্টোবর ১৯৯৩(1993-10-03) (বয়স ৯১)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
পেশাসাহিত্যিক, সাহিত্যতাত্বিক
ভাষাবাংলা
জাতীয়তাভারতীয়
নাগরিকত্বভারতীয়
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানস্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারডিলিট (সাম্মানিক)
দাম্পত্যসঙ্গীঅরুণা সিং

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

গোপাল হালদারের জন্ম ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ১১ই ফেব্রুয়ারি বৃটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা বিক্রমপুরের বিদগাঁও-এ। তাঁর পিতা সীতাকান্ত হালদার ছিলেন আইন ব্যবসায়ী। পিতার কর্মস্থল নোয়াখালীতে তাঁর স্কুল শিক্ষা। পরে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ইংরাজীতে প্রথম শ্রেণীতে অনার্স সহ বি.এ পাশ করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ এবং বি.এল পাশ করে কিছুদিন নোয়াখালীতে ওকালতি করেন। 

কর্মজীবনসম্পাদনা

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে 'বঙ্গবাসী' প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত 'ওয়েলফেয়ার' পত্রিকার সহ-সম্পাদকের চাকরি নেন এবং সেই সঙ্গে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় রত থাকেন। ১৯২৯ ও ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কর্মজীবন কেটেছে ফেণী কলেজে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ হতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগে গবেষণা সহকারী পদে, প্রবাসী, মডার্ন রিভিউ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে ও হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে ছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপসম্পাদনা

স্কুলজীবন থেকেই গোপাল হালদার বিপ্লবী যুগান্তর দলের কর্মী এবং ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। ১৯৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক  কংগ্রেস কমিটির সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৩৮ তিনি রাজবন্দি হিসাবে কারারুদ্ধ থাকেন। কারাজীবন তিনি অধ্যয়ন, গবেষণা, সাহিত্যসৃষ্টি ও মার্কসীয় মতাদর্শ চর্চায় অতিবাহিত করেন। কারামুক্তির পর  সুভাষচন্দ্রের সহকারী হিসাবে তিনি সাপ্তাহিক ফরোয়ার্ড পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি সারা ভারত কৃষকসভার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং ওই বৎসরেই তিনি দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপিকা অরুণা সিং কে বিবাহ করেন। কৃষকসভা ও কর্মচারী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সাথে তিনি ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘে এবং সোভিয়েত সুহৃদ সমিতিতে বুদ্ধিজীবী হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

সম্পাদনা ও সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

'পরিচয়' পত্রিকার সম্পাদনা করেন (১৯৪৪-৪৮, ১৯৫২-৬৭) দীর্ঘদিন। এছাড়া 'স্বাধীনতা' পত্রিকার সাংবাদিকতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানপরিষদে এবং নানা অনুষ্ঠানে-প্রতিষ্ঠানে দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। স্বাধীনতার পরও ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে চার মাসের জন্য কারাবাসে ছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দেও আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেছেন। আসলে মানুষের সামগ্রিক বিকাশের স্বার্থেই স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাথমিক গুরুত্ব দিয়েছেন আর আত্মপ্রকাশের অন্যতম পথ হিসাবে অল্পবয়স থেকেই গ্রহণ করেছেন সাহিত্যকে। মননশীল উপন্যাস রচনা করে বিশেষ খ্যাতিও অর্জন করেছেন। প্রখ্যাত সাহিত্য বিশারদ শিশির কুমার দাশের তাঁর রচনা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন  -

তাঁর উপন্যাসগুলি যেমন কলাকৌশলের দিক থেকে স্বতন্ত্র, তেমনি স্বতন্ত্র তাদের বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ ও চিন্তার প্রগাঢ়তায়।..... তাঁর প্রবন্ধগুলি তথ্য, বিশ্লেষণ ও মনীষায় সমৃদ্ধ। সংহতির রূপান্তর বাংলা চিন্তাশীল সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় রচনা

[১] তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল -

  • পঞ্চাশের পথ
  • তেরশ পঞ্চাশ (১৯৪৫)
  • অন্যদিন (১৯৫০)
  • আর একদিন (১৯৫১)
  • স্রোতের দীপ (১৯৫০)
  • ঊনপঞ্চাশী
  • বাঙালি সংস্কৃতির রূপ
  • বাঙালি সংস্কৃতির প্রসঙ্গ
  • বাংলা সাহিত্য ও মানবসংস্কৃতি
  • ভারতের ভাষা
  • বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা
  • রুশ সাহিত্যের রূপরেখা
  • ইংরাজী সাহিত্যের রূপরেখা

এছাড়া সম্পাদনা করেছেন বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু, দ্বিজেন্দ্রলাল, কালীপ্রসন্ন সিংহের রচনাসংগ্রহ। 

সম্মাননাসম্পাদনা

জীবনে বহু সম্মান ও পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য রবীন্দ্রভারতী, বর্ধমান, উত্তরবঙ্গ ও কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে।

জীবনাবসানসম্পাদনা

গোপাল হালদার ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩রা অক্টোবর প্রয়াত হন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. শিশিরকুমার দাশ সংকলিত ও সম্পাদিত, সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট  ২০১৯, পৃষ্ঠা ৬৭ আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-০০৭-৯ আইএসবিএন বৈধ নয়
  2.  অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, দ্বিতীয়  খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৯ পৃষ্ঠা ১১৩, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-২৯২-৬