ইবনে রুশদ

মধ্যযুগীয় আরব পণ্ডিত

আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন রুশদ(আরবিঃأبو الوليد محمد ابن احمد ابن رشد‎, ১৪ এপ্রিল ১১২৬- ১১ ডিসেম্বর, ১১৯৮) ল্যাটিনকৃত নাম আভিরোস( Latinized: Averroes) একজন মুসলিম আন্দালুসীয় বহুবিদ্যাবিশারদ এবং আইনবিদ যিনি দর্শন ধর্মতত্ত্ব চিকিৎসাবিজ্ঞান জ্যোতির্বিজ্ঞান পদার্থবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞান গনিত ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং ভাষাবিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে লিখেছেন।তিনি শতাধিক বই এবং গবেষণাপত্রের রচয়িতা।[৬] তার দর্শন সংক্রান্ত কাজের মধ্যে আছে অ্যারিস্টটলের উপর বেশ কিছু ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যে কারণে তিনি পাশ্চাত্যে ব্যাখ্যাদাতা(The Commentator) এবং যুক্তিবাদের জনক হিসেবে পরিচিত।[৭] ইবন রুশদ আলমোহাদ খেলাফতের রাজসভার চিকিৎসক এবং প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে বহুদিন কাজ করেছেন।

ইবনে রুশদ (ابن رشد)
Averroes
Statue of Averroes (Córdoba) - BAE09705.jpg
স্পেনের করদোবায় ইবনে রুশদ এর প্রতিকৃতি
জন্ম(১১২৬-০৪-১৪)১৪ এপ্রিল ১১২৬
কর্ডো‌বা, আন্দালুস, আলমোরাভি খিলাফত (বর্তমানে স্পেন)[১][২][৩]
মৃত্যুডিসেম্বর ১০, ১১৯৮(1198-12-10) (বয়স ৭২)
মারাক্কেশ, আলমোহাদ খিলাফত, বর্তমানে মরক্কো
যুগমধ্যযুগীয় দর্শন (ইসলামী স্বর্ণযুগ)
অঞ্চলউত্তর আফ্রিকা/স্পেন
ধর্মইসলাম
ধারাএ্যাভেরজম
আগ্রহইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান
অবদানইসলামের সাথে সাংস্কৃতিক হাজার সামঞ্জস্যবিধান

তিনি কর্ডোবায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১১২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের প্রধান পেশা ছিলো বিচারকার্য—তাঁর পিতামহ ছিলেন শহরের প্রধান বিচারপতি.১১৬৯ সালে তাকে খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়, যিনি ইবন রুশদের প্রতিভায় বিমোহিত হন। তিনি তাঁর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিয়োজিত হন এবং ইবন রুশদের বিভিন্ন গবেষণা কর্মে সাহায্য করেন। ইবন রুশদ পরবর্তীতে সেভিল এবং কর্ডোবায় বেশ কয়েকবার প্রধান বিচারপতির পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১১৮২ সালে তিনি রাজ চিকিৎসক এবং কর্ডোবার প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।.১১৮৪ সালে আবু ইউসুফের মৃত্যুর পরেও তাঁর রাজসভার সুদৃষ্টি বজায় থাকে, তবে ১১৯৫ সালে তিনি রাজসভার রোষে পতিত হন। তাঁর প্রতি বেশ কিছু অভিযোগ ছিলো—খুব সম্ভবত এর নেপথ্যে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিলো—এবং এ কারণে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।.১১৯৮ সালে, তাঁর মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বেই তাঁকে আবার সসম্মানে রাজসভায় ফিরিয়ে আনা হয়।

ইবন রুশদ অ্যারিস্টললের মতাদর্শের এক তীব্র সমর্থক ছিলেন; তিনি অ্যারিস্টটলের মূল শিক্ষা হিসেবে যা বিশ্বাস করতেন তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেছিলেন। এবং পূর্ববর্তী মুসলিম চিন্তানায়কদের নিওপ্লাটনিস্ট প্রবণতার বিরোধী ছিলেন, যেমন আল-ফারাবি, ইবন সিনা প্রমুখদের ব্যাখ্যা। তিনি আল গাযালির মতো আশ'আরি ধর্মতত্ত্ববিদ্গণের সমালোচনার বিরুদ্ধে দর্শনের চর্চার সমর্থন করেন। ইবন রুশদ বলেন যে, দর্শোনের চর্চা ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে অনুমোদিত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতামূলক। তিনি আরো বলেন যে ধর্মীয় বইয়ের কোনো লেখা যখন যুক্তি এবং দর্শ্নের স্পষ্ট বিরোধী হবে তখন তা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ না করে রূপকার্থে নিতে হবে। তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্র সম্পর্কে বিদআত আল-মুজতাহিদ লিখেছেন, যা বিভিন্ন মাযহাবের আইনের মধ্যে ভিন্নতা এবং এর নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি স্ট্রোকের নতুন তত্ত্ব প্রদান করেন এবং প্রথমবারের মতো পারকিনসন রোগের বর্ণনা দেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ছিলেন যিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রেটিনা হচ্ছে আলোক্সংবেদনশীলতার প্রকৃত স্থান। তাঁর চিকিতসাবিজ্ঞানের বই আল-কুল্লিয়াত ফি আল-তিব্ব, যা ল্যাটনে কলিজেট (The Colliget) শিরোনামে অনূদিত হয়েছিলো এবং কয়েক শতক ধরে ইউরোপে শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়েছিলো।

তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়েছে তাঁর অবস্থানগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ভৌগলিক কারণে। পাশ্চাত্যে ইবন রুশদের পরিচিতির কারণ তাঁর অ্যারিস্টটলের উপর কাজ, যার সিঙ্ঘভাগ পরবর্তীতে ল্যাটিন এবং হিবরু ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। তাঁর অনুবাদকৃত এসব কর্ম পাশ্চাত্যে গ্রিক দর্শন এর উৎসাহ পুনঃজাগরণে ভূমিকা রেখেছিলো, যা রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার যে বন্ধ্যাকাল ছিলো তা দূরীভূত করে। তাঁর এসব লেখা ল্যাটিন খ্রিষ্টান সমাজে ব্যপক আলোচনা সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়, আভিরোসবাদ(Averroism) নামে এক দার্শনিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। তাঁর জ্ঞানের একতা তত্ত্ব, যা প্রতিটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্নতা দাবি করে থাকে,ইউরোপে অন্যতম বিতর্কিত এক তত্ত্বে পরিণত হয় । ক্যাথলিক চার্চ তাঁর মতবাদ সমূহের বিপক্ষে তীব্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। থমাস অ্যাকুইনাসের পরবর্তী সমালোচনায় এ মতবাদ ইউরোপে তার প্রভাব হারাতে থাকে।

জীবনীঃসম্পাদনা

শৈশব ও শিক্ষাজীবনঃসম্পাদনা

 
চতুর্দশ শতকের একটি চিত্রকর্মে ইবন রুশদ

মুহম্মদ ইবন আহমাদ ইবন রুশদ ১৪ এপ্রিল, ১১২৬ সালে(৫২০ হিজরী) স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার শহরের লোকপ্রসাশন সংক্রান্ত কাজ, বিশেষত বিচার ও ধর্মীয় বিষয়ে জড়িত থাকার কারণে সুপরিচিত ছিলো। তাঁর পিতামহ আবুল ওয়ালিদ মুহম্মদ (মৃত্যুঃ১১২৬)আল মোরাভি কর্ডোবার প্রধান বিচারপতি(কাজি) একর্ডোবার কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন।তাঁর পিতা আবিল কাসিম ও পরবর্তীতে কর্ডোবার প্রধান বিচারপতি ছিলেন,১১৪৬ সালে আল-মোহাদ রাজবংশ আল-মোরাভিদের স্থলাভিষিক্ত হলে তাকে পদচ্যুত করা হয়।

তার জীবনীকারদের মতে ইবন রুশদের শিক্ষা ছিলো অনন্যসাধারণ। হাদিসশাস্ত্র(নবী মুহম্মদ সা. এর আদর্শ) হতে শুরু করে, ফিকহ(ইসলামী বিচারব্যবস্থা), চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন।তিনি মালিকি ফিকহ শিখেছিলেন আবু মুহম্মদ ইবন ইযক এর কাছে, হাদিসশাস্ত্রের পাঠ নিয়েছেন তাঁর পিতামহের এক শিষ্যের কাছে। তাঁর পিতামহও তাকে ফিকহ এর জ্ঞান দিয়েছিলেন, বিশেষ করে ইমাম মালিকের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম মুয়াত্তার পাঠ দিয়েছিলেন। তিনি আবু-জা'ফর জারিম আল-তাজাইল এর নিকট চিকিৎসার জ্ঞান লাভ করেন, যিনি সম্ভবত তাঁকে দর্শন এর দীক্ষাও দিয়েছেন। তিনি দার্শনিক ইবন বাজা এর লেখনীর সম্পর্কেও অবগত ছিলেন, খুব সম্ভবত তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন অথবা তাঁর ছাত্রত্বেও থেকে থাকতে পারেন। তিনি নিয়মিতই সেভিল এ অনুষ্ঠিত দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ ও কবিদের সভায় উপস্থিত থাকতেন, এ সভা সেসময়কার বিখ্যাত দার্শনিক ইবন তুফায়েল ও চিকিৎসাবিদ ইবন যুহর অংশগ্রহণ করতেন। তিনি আশ'আরী মতের কালাম ধর্মতত্ত্ব পড়েছিলেন, যার সমালোচক হিসেবে পরবর্তী জীবনে তিনি অবতীর্ণ হন।

কর্মজীবনঃসম্পাদনা

 
আল-মোহাদ খেলাফতের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ইবন রুশদ অংশগ্রহণ করেছিলেন। খেলাফতের বিভিন্ন সময়কার সীমানার চিত্র এখানে প্রদর্শিত।

১১৫৩ সাল নাগাদ ইবন রুশদ আল-মোহাদ খেলাফতের রাজধানী মারাক্কেশ এ অবস্থান করছিলেন। কারণ নব্য প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের নতুন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ নির্মাণ কাজে কিছু জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত হিসাব নিকাশে তার কাজ করতে হচ্ছিলো। তিনি জ্যোতির্বিদ্যার সমসাময়িক গানিতিক নিয়ম গুলো নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না , তাই নতুন কিছু ভৌত সূত্র এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তবে তাঁর এ প্রচেষ্টা তখন ব্যর্থ হয়। সম্ভবত মারাক্কেশে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি বিখ্যাত দার্শনিক, হায়্যি ইবন ইয়াকযান এর রচয়িতা ইবন তুফায়েল এর সাথে দেখা হয়েছিলো। ইবন তুফায়েলও তখন মারাক্কেশে রাজসভার চিকিৎসক ছিলেন। তাঁদের দুজনার মতভিন্নতা থাকলেও তাঁরা একে অপরকে বন্ধুত্বে বরণ করেছিলেন।

১১৬৯ সালে ইবন তুফায়েল ইবন রুশদকে আল-মোহাদ খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের সাথে পরিচয় করান। ঐতিহাসিক আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশির এক জনপ্রিয় বর্ণনায় বর্নীত আছে যে খলিফা ইবন রুশদকে জিজ্ঞাসা করেন যে মহাবিশ্ব কি চিরকাল ধরে বিরাজমান নাকি এর কোনো শুরু ছিলো। এ মতবিরোধপূর্ণ প্রশ্নে ইবন রুশদ উত্তর দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। খলিফা তখন প্লেটো অ্যারিস্টটল এবং মুসলিম দার্শনিকদের এ বিষয়ে মতামতের বর্ণনা করলেন এবং ইবন তুফায়েলের সাথে আলোচনায় মগ্ন হলেন। জ্ঞানের এ প্রদর্শনীতে ইবন রুশদ আশ্বস্ত হলেন, ইবন রুশদ এ বিষয়ে তার মতামত ব্যক্ত করলেন; এতে খলিফা ইবন রুশদের উপর যারপরনাই সন্তুষ্ট হলেন। ইবন রুশদ ও ঠিক একইভাবে খলিফার পাণ্ডিত্যে অবাক হয়েছিলেন, বলেছিলেন "খলিফার জ্ঞানের আধিক্য এমন যে তা তিনি আশাতীত"।

 
১১৯৫ সালে কিছু সময়ের জন্য ইবন রুশদকে রাজসভা হতে বহিষ্কার করা হয়।

ইবন রুশদ এবং খলিফার পরিচিত হবার পরে ,১১৮৪ সালে খলিফার মৃত্যু পর্যন্ত তার একান্ত প্রিয় ছিলেন। খলিফা যখন ইবন তুফায়েলের নিকট ক্ষোভ প্রকাশ করলেন যে তিনি অ্যারিস্টটলের কিছু কাজ বুঝতে পারছেন না, তখন ইবন তুফায়েল খলিফাকে ইবন রুশদের অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যা সম্বন্ধে অবহিত করেন।সেই থেকে ইবন রুশদের বিখ্যাত কাজ, অ্যারিস্টটলের উপর সুবিস্তার ব্যাখাকর্মের সূচনা। এ বিষয়ে তার প্রথম লেখা লিখিত হয়েছে ১১৬৯ সালে।

সেই বছরই ইবন রুশদ কাজি হিসেবে সেভিলে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১১৭১ সালে তিনি তাঁর জন্মস্থান কর্ডোবায় কাজি হিসেবে নিয়োজিত হন। কাজি হিসেবে তিনি ইসলামি শরিয়াহ (আইনশাস্ত্র) মোতাবেক মামলা মোকদ্দমার বিচারকার্য পরিচালনা ও ফতোয়া(আইনানুগ সমাধান) দিতেন। এসময় নানা দায়িত্ব ও প্রসাশনিক কাজে ব্যপৃত থাকলেও এটা ছিল তাঁর জ্ঞান চর্চার শীর্ষ সময়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি এসময় সম্পন্ন করেন। আল-মোহাদ খেলাফতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সুবাদে তিনি নানা জ্যোতির্বিদীয় প্রকল্পেও অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেন.১১৮২ সালে তিনি রাজ চিকিৎসক হিসেবে তার বন্ধুবর দার্শনিক ইবন তুফায়েলের স্থলাভিষিক্ত হন, একই বছর তিনি কর্ডোবার প্রধান কাজি হিসেবে নিয়োজিত হন; সেই একই মর্যাদাপূর্ণ পদে যাতে এককালে তার পিতামহ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

১১৮৪ সালে খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ মৃত্যুবরণ করেন, খলিফার পদে অভিষেক ঘটে আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুর এর। এর পরেও ইবন রুশদ রাজসভার সুনজরেই ছিলেন, তবে ১১৯৫ সালে পাশা উলটে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথার বিরুদ্ধচারণের অভিযোগ সহ নানা আপত্তি তোলা হয়, কর্ডোবায় এক ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমে তার বিচার হয়। তাঁর কাজের প্রতি তীব্র নিন্দা করে বিচারসভা, তাঁর কিছু লেখা জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তাঁকে লুসেনায় নির্বাসিত করা হয়, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম এ বলা হয়েছে যে খলিফা গোঁড়াপন্থী আলেম-উলামার সমর্থন লাভ করতে ইবন রুশদকে নিজের থেকে দূরে সরাবার ব্যবস্থা করেন। কেননা ইবন রুশদের প্রথাবিরোধী কিছু মতের সাথে এসব উলেমার মতবিরোধ ছিলো, আর তাদের সমর্থন খলিফার দরকার ছিলো- খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো আক্রমণের জন্য।

কর্মসমূহসম্পাদনা

ইবন রুশদ একজন অত্যন্ত উতপাদনশীল লেখক ছিলেন, তাঁর জীবনীকারক মজিদ ফখরি্র মতে তাঁর প্রাচ্যের পূর্বসূরীদের যে কারো তুলনায় তাঁর কাজ বিস্তৃত ক্ষেত্রে বিচিত্ররকম বিষয় নিয়ে আলোচনা করে- এর মধ্যে আছে দর্শন, ঔষধ-পথ্য, আইনবিদ্যা অথবা আইনতত্ত্ব এবং ভাষাবিজ্ঞান। প্রাচ্যবিদ আর্নেস্ট রেনান এর মতে ইবন রুশদের অন্তত ৬৭ টি স্বতন্ত্র রচনা বিদ্যমান; তন্মধ্যে ২৮ টি দর্শন, ২০ টি চিকিৎসাবিদ্যা, ৮ টি আইনবিদ্যা, ৫ টি ধর্মতত্ত্ব ও ৪ টি ব্যকরণ নিয়ে, এর সাথে আছে অ্যারিস্টটলের সিংহভাগ কাজের উপর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং প্লেটোর রিপাবলিক এর উপর বক্তৃতা। ইবন রুশদের অনেক কাজের মূল আরবি পান্ডুলিপি পাওয়া যায় নি, বেশিরভাগই শুধুমাত্র হিব্রু এবং ল্যাটিন অনুবাদের পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ অ্যারিস্টটলের উপর তার দীর্ঘ ব্যাখ্যাগুলোর খুব কম অংশের মূল আরবি পান্ডুলিপি উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যাকর্মঃসম্পাদনা

 
তৃতীয় শতকের দার্শনিক পরফাইরি এবং ইবন রুশদের মধ্যকার কাল্পনিক বিতর্ক।
 
১২২০ সালের এ আরব চিত্রকর্মে অ্যারিস্টটলকে শিক্ষাদানরত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, ইবন রুশদ অ্যারিস্টটলের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকর্ম লিখেছেন

ইবন রুশদ সে সময়ে প্রাপ্তি্যোগ্য অ্যারিস্টটলের প্রায় সকল কাজে ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। শুধুমাত্র অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রনীতি বাদে, যেটা সম্ভবত তাঁর নাগালের মাঝে ছিল না। তিনি তাই প্লেটোর রিপাবলিক এর উপর ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তিনি তার ব্যাখ্যাগুলোকে কয়েকভাগে ভাগ করেছিলেন; যাকে আধুনিক পন্ডিতগণ দীর্ধ, মধ্যম ও সংক্ষিপ্ত তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর বেশিরভাগই কর্মজীবনের সূচনায় লিখিত, যেগুলো অ্যারিশ্তটলের নানা মতবাদের সারসংক্ষেপ বহন করে। তার মধ্যম বক্তৃতাগুলো অ্যারিষ্টটলের মূল বক্তব্যের উদ্ধৃতি বহন এবং এর বক্তব্যকে সরলীকরণের প্রয়াস করে। এ মধ্যবর্তী কাজ গুলো সাধারণত তার পৃষ্ঠপোষক খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ কর্তৃক অনুযোগের কারণে লিখিত; খলিফা বলেছিলেন তাঁর অ্যারিস্টটলের কাজ বুঝে উঠতে অসুবিধা হচ্ছিলো। তার দীর্ঘ ব্যাখ্যাতে প্রতি পংক্তির ব্যাখ্যা তিনি সংযোজন করেছেন, এবং এতে তার নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলনও দেখা যায়; স্বভাবতই এগুলো সম্ভবত সাধারণ্যের জন্যে লিখিত ছিলো না। অ্যাারিষ্টটলের প্রধান পাচটি কাজেরই এধরণের তিন প্রকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।





 
ইবন রুশদের আল-কুল্লিয়াত ফিত-তিব এর ল্যাটিন অনুবাদের প্রচ্ছদ









তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Liz Sonneborn: Averroes (Ibn Rushd):He is an Arab, Muslim scholar, philosopher, and physician of the twelfth century, The Rosen Publishing Group, 2005 (আইএসবিএন ১৪০৪২০৫১৪৪, আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪০৪২-০৫১৪-৭) p.31 [১]
  2. (Leaman 2002, পৃ. 27)
  3. (Fakhry 2001, পৃ. 1)
  4. "H-Net Reviews"। H-net.org। ২০০৭-১০-০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১০-১৩ 
  5. "Spinoza on Philosophy and Religion: The Averroistic Sources" (PDF)। ৩ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুলাই ২০১৪ 
  6. "Saudi Aramco World : Doctor, Philosopher, Renaissance Man"archive.aramcoworld.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২৮ 
  7. Gill, John (John Joseph) (২০০৯)। Andalucía : a cultural history। Oxford: Oxford University Press। আইএসবিএন 9780195376104ওসিএলসি 647042713 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

উইকিসংকলন-এ এই লেখকের লেখা মূল বই রয়েছে: