প্রথম মুয়াবিয়া

প্রথম উমাইয়া খলিফা (রাজত্ব.৬৬১–৬৮০) এবং উমাইয়া খলিফতের প্রতিষ্ঠাতা

আমির মুয়াবিয়া (আরবি: معاوية ابن أبي سفيان মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান ; ৬০২ – ২৭ এপ্রিল ৬৮০) (মূল নাম, মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান) ছিলেন উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও ৬৬১ থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত খলিফা ছিলেন।[১][২] তিনি ইসলামী নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-য়ের মৃত্যুর ৩০ বছর পরে এবং চারজন "সঠিক পথনির্দেশিত" (রাশিদুন) খলিফার রাজত্বের পর মুসলমানদের বাদশা হন।

মুয়াবিয়া
معاوية
রাজা
রাজত্ব২৮-০৭-৬৬১/২৭-০৪-৬৮০
উমাইয়া সম্রাজ্যের প্রথম রাজা
রাজত্ব৬৬১–৬৮০
পূর্বসূরিরাজবংশ প্রতিষ্ঠিত
ইমাম হাসান ইবনে আলী (অ-উমাইয়াখলিফা)
উত্তরসূরিইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ( দামেস্ক) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ( মক্কা)
সিরিয়ারগভর্নর
গভর্নর৬৩৯–৬৬১
পূর্বসূরিইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান
উত্তরসূরিপদ বন্ধ হয়েছে
জন্ম৬০৬ খ্রিষ্টাব্দ
মক্কা, হিজাজ
মৃত্যু২২ রজব ৬০ হিজরি
২৭ এপ্রিল ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দ
দামেস্ক, সিরিয়া
সমাধি
দাম্পত্য সঙ্গী
বংশধর
পূর্ণ নাম
মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান
(معاوية ابن أبي سفيان)
রাজবংশসুফিয়ান
রাজবংশউমাইয়া
পিতাআবু সুফিয়ান ইবনে হার্ব
মাতাহিন্দ বিনতে উতবা
ধর্মইসলাম
খিলাফতে রাশিদাহ এর সময় শাসনাধীন অঞ্চল। বিভক্ত অংশগুলো প্রথম ফিতনার সময়কার দৃশ্য।
  প্রথম ফিতনার সময় আলীর অধীনে খিলাফতে রাশিদাহ মূল শক্ত ঘাটি।
  প্রথম ফিতনার সময় 'আমির মুয়াবিয়া' কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।
  প্রথম ফিতনার সময় 'আমর ইবনে আস কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।

তিনি উমাইয়া গোত্রের দ্বিতীয় শাসক। উসমান গণি এই গোত্র থেকে প্রথম খলিফা হন।[৩] মুয়াবিয়া ও তার পিতা আবু সুফিয়ান তাদের দূরবর্তী কুরাইশিত আত্মীয় মুহাম্মদের বিরোধিতা করেছিলেন, ৬৩০ সালে মুহাম্মদ মক্কা বিজয় করার আগ পর্যন্ত, যার পর মুয়াবিয়া ও তার পরবার ইসলাম স্বীকার করে নেয়। তিনি খলিফা আবু বকর (র. ৬৩২-৬৩৪) সিরিয়া বিজয়ের সময় তার ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ানের সেনাবাহিনীর অগ্রদূতের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং খলিফা উসমানের শাসনামলে সিরিয়ার গভর্নর না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদমর্যাদায় উন্নীত হন (র. ৬৪৪-৬৫৬)।শেষে ইসলাম গ্রহণকারী হওয়ায় বাকি মুসলমানরা আবু সুফিয়ানের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতো না বলে একদা আবু সুফিয়ানের বিশেষ অনুরোধে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তাকে মুন্সি নিযুক্ত করেন।[৪] আবু বকর সিদ্দিকউমর ফারুক খিলাফতের সময় তিনি সিরিয়ায় মুসলমানদের পক্ষে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।

তিনি খলিফা আবু বকর (র. ৬৩২-৬৩৪) সিরিয়া বিজয়ের সময় তার ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন বলে শোনা যায় এবং খলিফা উছমানের শাসনামলে সিরিয়ার গভর্নর না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদমর্যাদায় উন্নীত হন (র. ৬৪৪-৬৫৬)।

প্রাথমিক জীবন

সম্পাদনা

মুসলিম ঐতিহ্যবাহী সূত্র দ্বারা উদ্ধৃত ৫৯৭, ৬০৩ বা ৬০৫ এর সাথে মুয়াবিয়ার জন্ম বছর অনিশ্চিত।[৫] তার পিতা আবু সুফিয়ান ইবনে হার্ব ছিলেন একজন মক্কার একজন বিশিষ্ট বণিক যিনি প্রায়শই সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্ব দিতেন।[৬] তিনি ইসলামিক নবী মুহাম্মদের সাথে বৈরীতার প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশদের উপজাতি বনু আব্দ শামস গোত্রের বিশিষ্ট নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।[৫] কুরাইশদের কাছ থেকে ও তাদের সাধারণ পিতৃপুরুষ আব্দ মানাফ ইবনে কুসাই-এর মাধ্যমে মুয়াবিয়ার সাথে দূরবর্তীভাবে সম্পর্কিত ছিল।[৭] মুয়াবিয়ার মা হিন্দ বিনতে উতবাও বনু আব্দ শামসের সদস্য ছিলেন।[৫] মুয়াবিয়া এবং তার পরিবার বনু উমাইয়া সর্বদাই মুসলমনদের বিরুদ্ধে তটস্থ ছিলেন এবং আবু সুফিয়ানই সব সময় কাফেরদের নেতৃত্ব দিয়ে মুসলমানদের উপর বার বার যুদ্ধ চাপিয়ে হাজারো মুসলমানকে শহীদ করেছেন।

৬২৪ সালে মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার অনুসারীরা সিরিয়া থেকে ফিরে আসার পর মুয়াবিয়ার বাবার নেতৃত্বে একটি মক্কার কাফেলাকে আটকানোর চেষ্টা করে, যার ফলে আবু সুফিয়ান কে শক্তিশালী করার জন্য কুরাইশদের আহ্বান জানানো হয়।[৮] পরবর্তী বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীকে পরাজিত করা হয়, যেখানে মুয়াবিয়ার বড় ভাই হানজালা এবং তাদের মাতামহ উতবা ইবনে রাবিয়া নিহত হয়। আবু সুফিয়ান মক্কার সেনাবাহিনীর নিহত নেতা আবু জাহলের স্থলাভিষিক্ত হন এবং ৬২৫ সালে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মক্কাবাসীদের বিজয়ে নেতৃত্ব দেন। ৬২৭ সালে খন্দকের যুদ্ধে মদিনায় ব্যর্থ অবরোধের পর তিনি কুরাইশদের মধ্যে তার নেতৃত্বের অবস্থান হারান।[৫]

৬২৮ সালে হুদায়বিয়ায় যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় মুয়াবিয়া এবং তার বাবা মুহাম্মদের সাথে সমঝোতায় উপনীত হন, এবং মুয়াবিয়ার বিধবা বোন উম্মে হাবিবা ৬২৯ সালে মুহাম্মদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৬৩০ সালে মুহাম্মদ যখন মক্কা বিজয় করেন, তখন তার পিতা, মুয়াবিয়া এবং তার বড় ভাই ইয়াজিদ জীবন রক্ষার্থে ইসলাম গ্রহণ করেন। [৫]মুসলিম সম্প্রদায়ে তাদের নতুন প্রভাব বজায় রাখতে পরিবারটি মদিনায় চলে যায়।[৯]

ইসলাম গ্রহণ

সম্পাদনা

ইমাম সুয়ুতি সহ অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মুয়াবিয়া(রা) ও তার পিতা আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন।[১০] তারিখুল ইসলামের (আরবি) ৪র্থ এ আছে, তিনি মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।[১১]

মুহাম্মদের (সা:) সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদের সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে মুহাম্মাদ তাকে আবু সুফিয়ান ও এজিদকে গনিমতের মাল থেকে ১০০ উট ও ৪০ উকিয়া (আউন্স) রূপা দিয়েছিলেন।[১২] এসময় কতিপয় আনসার সাহাবাগন এসম্পর্ক নবী (সাঃ)-কে প্রশ্ন করলে তিনি (সাঃ) বলেনআমি এমন লোকদের দিচ্ছি, যাদের কুফরীর যুগ মাত্র শেষ হয়েছে। তোমরা কি এতে খুশী নও যে, লোকেরা দুনিয়াবী সম্পদ নিয়ে ফিরবে, আর তোমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে সাথে নিয়ে মদিনা ফিরবে আর আল্লাহর কসম, তোমরা যা নিয়ে মনযিলে ফিরবে, তা তারা যা নিয়ে ফিরবে, তার চেয়ে উত্তম।’ (বুখারি ৩১৪৭)

ইসলাম গ্রহণের পর মুয়াবিয়া পরিবারের সঙ্গে মদিনায় চলে আসে। মুয়াবিয়া ও হুতাত ইবনে ইয়াজিদের মাঝে মুহাম্মদ ভ্রাতৃত্ব করে দেন।[১৩]

সিরিয়ার গভর্নর

সম্পাদনা

প্রাথমিক সামরিক পেশাজীবন ও প্রশাসনিক পদোন্নতি

সম্পাদনা
 
ইসলামিক শাসনের প্রথম দশকে সিরিয়ার মানচিত্র

৬৩২ সালে মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার পর আবু বকর খলিফা (মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা) হন।[১৪] মদিনার অধিবাসী আনসার, যারা মুহাম্মদকে তার পূর্ববর্তী মক্কান বিরোধীদের কাছ থেকে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করেছিল, এবং বেশ কয়েকটি আরব উপজাতির গণ দলত্যাগের চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই করার পর আবু বকর কুরাইশদের কাছে পৌঁছেছিলেন, বিশেষ করে এর দুটি শক্তিশালী গোত্র, বনু মাখজুম এবং বনু আব্দ শামস, খিলাফতের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর জন্য।[১৫] রিদ্দার যুদ্ধের সময় (৬৩২-৬৩৩) বিদ্রোহী আরব উপজাতিদের দমন করার জন্য তিনি যে কুরাইশিদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মুয়াবিয়ার ছেলে ইয়াজিদ, যাকে পরে তিনি আনু. ৬৩৪ সালে বাইজেন্টাইন সিরিয়ায় মুসলিম বিজয়ের দায়িত্বে থাকা চার কমান্ডারের একজন হিসেবে প্রেরণ করেন।[১৬] খলিফা মুয়াবিয়াকে ইয়াজিদের ভ্যানগার্ডের কমান্ডার নিযুক্ত করেন।[৫] এই নিয়োগের মাধ্যমে আবু বকর আবু সুফিয়ানের পরিবারকে সিরিয়া বিজয়ে অংশীদারিত্ব প্রদান করেন, যেখানে আবু সুফিয়ান ইতোমধ্যে দামেস্কের আশেপাশে সম্পত্তির মালিক ছিলেন, বনু আব্দ শামসের আনুগত্যের বিনিময়ে।[১৬]

আরও দেখুন

সম্পাদনা

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. Press, Oxford University (২০১০)। Caliph and Caliphate Oxford Bibliographies Online Research Guide। Oxford University Press। আইএসবিএন 978-0-19-980382-8। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০৪-৩০ 
  2. The Umayyad Dynasty at the University 0f Calgary ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০ জুন ২০১৩ তারিখে
  3. Morony, Michael G., সম্পাদক (১৯৮৭)। The History of al-Ṭabarī, Volume XVIII: Between Civil Wars: The Caliphate of Muʿāwiyah, 661–680 A.D./A.H. 40–60। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন 978-0-87395-933-9 
  4. Sahih Muslim, The book of (Virtues of the companions), narration no. [6409]:168-(2501) numbered by mohammad fo'ad abdul-baqi
  5. Hinds 1993, পৃ. 264।
  6. Watt 1960a, পৃ. 151।
  7. Hawting 2000, পৃ. 21–22।
  8. Watt 1960b, পৃ. 868।
  9. Wellhausen 1927, পৃ. 20–21।
  10. তারিখুল খুলাফা : ১৯৪)
  11. ফাতহুল বারী : ৩/৪৩৩
  12. মাহমুদ শাকের, আত-তারিখুল ইসলামী : ৪/৬৯
  13. সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৫৬০
  14. Lewis 2002, পৃ. 49।
  15. Kennedy 2004, পৃ. 54।
  16. Madelung 1997, পৃ. 45।

গ্রন্থপঞ্জি

সম্পাদনা