স্বামী লোকেশ্বরানন্দ

স্বামী লোকেশ্বরানন্দ (১৯ এপ্রিল ১৯০৯ – ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৮) স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত রামকৃষ্ণ অনুশাসন তথা ভাবধারায় অনুপ্রাণিত সন্ন্যাসী ছিলেন। তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের পাথুরিয়াঘাটা শাখার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ও পরে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশন, নরেন্দ্রপুরের রূপকার হন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং ভারতীয় দর্শন ও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সাহিত্যের একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে  বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি  যথেষ্ট নৈতিক ও বৌদ্ধিকগুণে গুণান্বিত হয়েও মঠ ও মিশনের পদাধিকারী হননি। রোমান ক্যাথলিক গির্জার প্রধান পোপের কাছে প্রতিনিধিদলের সদস্যও হয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দর আদর্শে পশ্চিমবঙ্গে গ্রামগঠন, বস্তি উন্নয়ন এবং যুবশক্তির বিকাশের ক্ষেত্রেও তার অবদান অনস্বীকার্য। [১]

স্বামী লোকেশ্বরানন্দ
জন্মশিবপদ বন্দ্যোপাধ্যায়
(১৯০৯-০৪-১৯)১৯ এপ্রিল ১৯০৯
কেঁড়াগাছি, সাতক্ষীরা, বৃটিশ ভারত বর্তমানে বাংলাদেশ
মৃত্যু৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৮(1998-12-31) (বয়স ৮৯)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
ক্রমরামকৃষ্ণ সংঘ
গুরুস্বামী শিবানন্দ
দর্শনঅদ্বৈত বেদান্ত

জন্ম ও শিক্ষা জীবনসম্পাদনা

স্বামী লোকেশ্বরানন্দর জন্ম বৃটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের তৎকালীন খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার কেঁড়াগাছিতে তার মাতুলালয়ে। পিতৃপুরুষের বাসস্থান ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বারুইপাড়ায়। পিতা বসন্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা শিখরবাসিনী। পূর্বাশ্রমের নাম ছিল শিবপদ, ডাকনাম কানাই। তার নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা তালা-মাগুরার বি.দে ইনস্টিটিউশনে। রংপুর থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে আই.এ পড়া ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে নতুন নতুন ছেলেদের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। একসময় পুলিশের হাতে মারও খেয়েছেন। তবে স্বদেশী আন্দোলনে বিশৃঙ্খলা দেখে এক বছর পর তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি তার মা এবং গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রীশচন্দ্র সান্যালের প্রেরণায় রামকৃষ্ণ সংঘের সন্ন্যাসজীবনের প্রতি আকৃষ্ট হন। দ্বিতীয় বার পড়াশোনা শুরু করে পরীক্ষার আগে তিনি অদ্বৈত আশ্রমে থাকতেন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে বি.এ পাশ করেন। [২]

কর্মজীবনসম্পাদনা

রামকৃষ্ণ মিশনের দেওঘর স্কুলে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মঠে যোগ দেন। বার্মার জেডুবা দ্বীপে ভূমিকম্পবিধ্বস্ত এলাকায় মঠের কিছু সাধু ও ব্রহ্মচারীর দলনেতা হয়ে তিনি ছয় মাসের রিলিফের কাজে সেখানে যান। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে চেরাপুঞ্জিতে মিশনের স্কুলে কাজ করতে গিয়ে তিন মাসের মধ্যে খাসি ভাষা আয়ত্ত করেন এবং স্কুলের প্রভূত উন্নতি করে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে বেলুড় মঠে আসেন। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ মহারাজের কাছে সেসময় দীক্ষা নিয়ে তার নাম হয় ব্রহ্মচারী সুব্রতচৈতন্য। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে চেরাপুঞ্জি ছেড়ে চলে আসেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দেওঘর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সেখান থেকে মঠে ফিরে এসে তিনি বিরজানন্দ মহারাজের কাছে সন্ন্যাসদীক্ষা নেন -- নাম হয় লোকেশ্বরানন্দ। এরপর রহড়া বয়েজ হোম মিশনে কাজ করেন। [২]

পাথুরিয়াঘাটাসম্পাদনা

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় দুর্ভিক্ষের পরই রামকৃষ্ণ মিশনের পাথুরিয়াঘাটা শাখা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে লোকেশ্বরানন্দ পাথুরিয়াঘাটার ছাত্রাবাসের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। এখানে থাকতে তিনি রামবাগান বস্তিতে দরিদ্র মানুষের পুনর্বাসনের জন্য যে কাজ শুরু করেন তা' স্মরণীয়। পরিত্যক্ত, অনাথ এবং আর্থিকভাবে নিঃস্বদের একমাত্র বাড়ি তথা আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে এটির জন্য কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে 'উখিলা-পাইকপাড়া' গ্রামটিকে 'নরেন্দ্রপুর'-এ রূপান্তরিত [৩] করে শিলান্যাসের দিন থেকে নরেন্দ্রপুর আশ্রম গড়ে তোলার দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং তার হাতেই ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ হতে শুরু হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার দক্ষ প্রশাসনে ও যত্নশীল শিক্ষকতার জন্যই দেশে শুধু বিশাল আকারে নয়, গুণমানে প্রকৃতই শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।  [৪] তিনি একসাথে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়, নরেন্দ্রপুর এবং রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক কলেজ, নরেন্দ্রপুরের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি নরেন্দ্রপুর আশ্রমে ছিলেন।.

গোলপার্কসম্পাদনা

নরেন্দ্রপুর আশ্রমের পর তার কর্মক্ষেত্র হয় দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই সংস্কৃতি-কেন্দ্রের সম্পাদক হিসাবে বহু দেশে ভারতীয় দর্শন প্রচারের জন্য গিয়েছেন। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় সহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন সম্পর্কে ভাষণ দিয়েছেন।

রচিত গ্রন্থসম্ভারসম্পাদনা

তার রচিত ও সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল  -

  • চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ
  • তব কথামৃতম
  • শতরূপে সারদা
  • অনন্য পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ
  • উপনিষদ (১ম ভাগ, ৮ টি উপনিষদ)
  • ছোটদের সারদাদেবী
  • বিশ্ববরেণ্য শ্রীরামকৃষ্ণ
  • যুবনায়ক বিবেকানন্দ
  • প্র্যাকটিক্যাল স্পিরিচুয়ালিটি
  • রিলিজিয়ন অ্যান্ড কালচার
  • রামকৃষ্ণ পরমহংস
  • লেটারস্ ফর স্পিরিচুয়াল সিকারর্স
  • উপনিষদস্ (৯ খণ্ড)

জীবনাবসানসম্পাদনা

রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের অধ্যক্ষ থাকাকালীন ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে ডিসেম্বর স্বামী লোকেশ্বরানন্দজীর জীবনাবসান হয়। [৫]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Swami Lokeshwarananda (২০১৫)। Upanishad Vol.I। Amanda Publishers, Kolkata। আইএসবিএন 978-81-7215-898-9 
  2. অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৯ পৃষ্ঠা ৩৬৩,৩৬৪, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-২৯২-৬
  3. অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৯ পৃষ্ঠা ৪৩, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-২৯২-৬
  4. "Genesis"। Ramakrishna Mission Ashrama Narendrapur Website। ২০১২-০৫-২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  5. "Message"। Ramakrishna Mission Vidyapith Purulia। সংগ্রহের তারিখ ৩ আগস্ট ২০১৮