রবার্ট ক্লাইভ

বাংলার ইতিহাসের প্রথম ইংরেজ শাসক

রবার্ট ক্লাইভ (সেপ্টেম্বর ২৯, ১৭২৫ - নভেম্বর ২২, ১৭৭৪) ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী।[১] তিনি ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা করেন।[১] তার উপাধি ছিল পলাশীর প্রথম ব্যারনপলাশীর যুদ্ধে তার নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদল বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যদলকে পরাজিত করে।


ক্লাইভ

Robert Clive, 1st Baron Clive by Nathaniel Dance, (later Sir Nathaniel Dance-Holland, Bt).jpg
সামরিক পোষাকে লর্ড ক্লাইভ।
ন্যাথানিয়েল ড্যান্স আকা ছবি
ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সীর গর্ভনর
কাজের মেয়াদ
১৭৫৭ – ১৭৬১
পূর্বসূরীরজার ড্রেকে
রাষ্ট্রপতি হিসেবে
উত্তরসূরীহেনরি ভ্যান্সিটার্ট
কাজের মেয়াদ
১৭৬৫ – ১৭৬৬
পূর্বসূরীহেনরি ভ্যান্সিটার্ট
উত্তরসূরীহ্যারি ভেরেলেস্ট
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম(১৭২৫-০৯-২৫)২৫ সেপ্টেম্বর ১৭২৫
স্টেসি হল, মার্কেট ড্রেইটন, শরোস্পিয়ার, ইংল্যান্ড
মৃত্যু২২ নভেম্বর ১৭৭৪(1774-11-22) (বয়স ৪৯)
বার্কেলি স্কয়ার, ওয়েস্টমিনিস্টার, লন্ডন, ইংল্যান্ড
জাতীয়তাব্রিটিশ
প্রাক্তন শিক্ষার্থীমার্চেন্ট টেইলর্স স্কুল
পুরস্কারকেবি
সামরিক পরিষেবা
ডাকনামক্রিমিনাল অব ইন্ডিয়া
আনুগত্য যুক্তরাজ্য
শাখাব্রিটিশ সেনাবাহিনী
কাজের মেয়াদ১৭৪৬–১৭৭৪
পদমেজর-জেনারেলl
ইউনিটব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
কমান্ডভারতের কমান্ডার ইন চিফ
যুদ্ধঅস্ট্রিয়ান উত্তরাধিকার যুদ্ধ
মাদ্রাজের যুদ্ধ
দ্বিতীয় কর্নাটিকের যুদ্ধ
আর্কট অবরোধ
আর্নির যুদ্ধ
চিঙ্গলেপুতের যুদ্ধ
সাত বছরের যুদ্ধ
চন্দনগরের যুদ্ধ
পলাশীর যুদ্ধ
পলাশীর যুদ্ধের পর ক্লাইভের সাথে মীরজাফর দেখা করছেন, শিল্পী ফ্রান্সিস হেম্যানের আঁকা ছবি
লর্ড ক্লাইভের প্রতিকৃতি

ব্যক্তিগত জীবনসম্পাদনা

রবার্ট ক্লাইভ ১৭২৫ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডের একটি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মাতার ছোট ছেলে এবং ১৩ তম সন্তান ছিলেন। ক্লাইভের সাত বোন এবং পাঁচ ভাই ছিল। তাদের মধ্যে ছয় জন শিশু অবস্থায় মারা যায়। ক্লাইভের পিতা বদমেজাজি ছিলেন। তিনিও পিতার মতো বদমেজাজি হয়েছিলেন। ছোট থাকতেই তাকে ম্যানচেস্টারে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

সেখানকার স্কুলে ও এলাকায় প্রতিনিয়তই মারামারি এবং বিভিন্ন প্রকার সমস্যা সৃষ্টি করতেন ক্লাইভ। তাছাড়া তিনি পড়ালেখায় তেমন ভালো ছিলেন না। কয়েকবার স্কুল পরিবর্তন করেও তার স্বভাব এবং পড়ালেখার উন্নতি হয়নি। যে কারণে ক্লাইভের পিতা ১৭৪৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে তার জন্য কেরানির চাকরির ব্যবস্থা করেন। ১৭৪৪ সালে বছর ইস্ট কোম্পানির বাণিজ্যের কাজে তিনি ভারতে গমন করেন।

নবাবগঞ্জের যুদ্ধসম্পাদনা

দিল্লীর বাদশা পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি সনদ পাঠিয়েছিলেন। শওকত নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করেন। ইংরেজরা এই সংবাদ পেয়ে গোপনে শওকত জঙ্গের সাথে মিত্রতার করার চেষ্টা করতে থাকে। অপরদিকে মাদ্রাজের অপদার্থ ইংরেজ দরবার গরু গাধা বদমাস কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে প্রধান সেনাপতি করে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠায়। সিরাজদ্দৌলাও শওকত জঙ্গকে প্রতিরোধ করার জন্য রওনা হন। পথিমধ্যে নবাবগঞ্জ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে শওকত নিহত হন। সিরাজদ্দৌলা দেওয়ান মোহনলালের হাতে পূর্ণিয়ার শাসনভার অর্পণ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।

ক্লাইভ ও ওয়াটসন পলতায় পৌঁছেই কলকাতা অভিমুখে রওনা হন। প্রায় বিনাযুদ্ধে তারা কলকাতা দুর্গ জয় করে নেন। এর আগে ক্লাইভ ও ওয়াটসন কলকাতায় এসে সিরাজদ্দৌলার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এবং সিরাজদ্দৌলা তাতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা শর্ত ভঙ্গ করে কলকাতা আক্রমণ করে। সিরাজদ্দৌলা তার মন্ত্রীদের কুচক্রের বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং এ কারণে ইংরেজদের সাথে একটি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। তাই ইংরেজদের সকল দাবিতে রাজি হয়ে তিনি ১৭৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে এই সন্ধি 'আলিনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত। কিন্তু ইংরেজরা তাদের মতিগতির কোন পরিবর্তন করল না। মূলতঃ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ফরাসিদের সঙ্গে। কিন্তু সিরাজদ্দৌলা ফরাসিদে র বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। আলিনগরের (কলকাতা) সন্ধির প্রতিশ্রুতি পালনে নবাবকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।

পলাশীর যুদ্ধসম্পাদনা

১৭৫৭ সালের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলী, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথ রোধ করে নি। ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পারেন, তার সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল।

বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজ মীর জাফরকে বন্দি করার চিন্তা পরিত্যাগ করেন। তিনি লোভী বিশ্বসঘাতক মীর জাফরকে ক্ষমা করে তাকে শপথ নিতে বলেন। মীর জাফর পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না। গৃহবিবাদের মীমাংসা করে নবাব রায় দুর্লভ, ইয়ার লুৎফ খান, মীর জাফর, মীর মদন, মোহন লাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে সৈন্য চালানোর দায়িত্ব দিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেন।

২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। ১৭৫৭ সালের ২২ জুন মধ্যরাতে কুকুর ক্লাইভ কলকাতা থেকে তার ভেড়ার পালকে নিয়ে পলাশী মৌজার লক্ষবাগ নামে আম্রকাননে এসে তাঁবু গাড়েন। বাগানটির উত্তর-পশ্চিম দিকে গঙ্গা নদী। এর উত্তর-পূর্ব দিকে দুই বর্গমাইলব্যাপী আম্রকানন। বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লুৎফ খান ও রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীর মদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীর মদন এবং অপর সেনাপতি মোহন লাল ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীর মদন মারাত্মকভাবে আহত হন ও মারা যান। নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খান প্রমুখ গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধানও একইসাথে মৃত্যুবরণ করেন।

গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর সিরাজউদ্দৌলা মীর জাফর ও রায় দুর্লভকে তাদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীব্র বেগে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। কিন্তু উভয় সেনাপতি তার নির্দেশ অমান্য করেন। তাদের যুক্তি ছিল গোলন্দাজ বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী ব্যাপার। কিন্তু কোম্পানি ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে তখন দূরত্ব মাত্র কয়েকশত গজ। বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লাল নবাবকে পরামর্শ দেন যুদ্ধবিরতি ঘটলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী কিন্তু সিরাজ মীর জাফর প্রমুখের পরামর্শে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। বিকেল পাঁচটায় সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার করে। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপীয় এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য ২,০০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাকে সাহায্য করেনি। সিরাজউদ্দৌলা তার সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে পদ্মামহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন। তার আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সেনাপতি মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রাজা রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তার সে আশা পূর্ণ হয়নি। সিরাজ পথিমধ্যে বন্দি হন ও মিরনের হাতে বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।

রবার্ট ক্লাইভের প্রতিনিধিত্বকাল ও জীবনাবসানসম্পাদনা

চন্দননগর থেকে ফরাসিদের বিতাড়ন ও মীরজাফরকে সিরাজউদ্দৌলার স্থলাভিষিক্ত করা এ দুটি ঘটনার মূল্যায়ন করতে গিয়ে ক্লাইভ পলাশী যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্র কোর্ট অব ডাইরেক্টর্সকে লিখেছিলেন যে, ফরাসিদের পরাজিত ও বাংলা থেকে বিতাড়িত করা ছিল তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। ইউরোপ ও পৃথিবীব্যাপী সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মতামত সম্ভবত সঠিক ছিল। পলাশী যুদ্ধে তাঁর বিজয়কে ক্লাইভ আর্কটের ন্যায় শুধু একজন নওয়াবের পরিবর্তন হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ক্লাইভ শীঘ্রই অনুধাবন করেন যে, বস্ত্তত নীরবে তিনি প্রাচ্যে একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

দক্ষিণ ভারতে ধারাবাহিক বিজয় তাঁকে খ্যাতিমান করেছিল, কিন্তু সম্পদশালী করে নি। কিন্তু বাংলায় তিনি খ্যাতির সঙ্গে পর্যাপ্ত ধনসম্পদ লাভ করেন। পলাশী যুদ্ধের অব্যবহিত পরে মুর্শিদাবাদ কোষাগার লুণ্ঠনে তাঁর অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে পার্লামেন্টের একটি তদন্ত কমিটির সম্মুখীন হতে হয়। ক্লাইভকে প্রদত্ত মীর জাফরের ব্যক্তিগত উপহারের পরিমাণ ছিল অবিশ্বাস্যরূপে বিশাল। মীর জাফরের নিকট থেকে তিনি বার্ষিক বিপুল আয়ের জায়গিরও পেয়েছিলেন। ব্যবসায়িক লুণ্ঠনের অর্থে গভর্নর হিসেবে তাঁর প্রাপ্ত অংশের পরিমাণও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর জীবনী লেখক ম্যালকমের মতানুসারে, তিনি ১৭৬০ সালে অবসর গ্রহণ করেন এবং তাঁর পূর্বে ও পরে বাংলা থেকে প্রত্যাগত সকল ‘নওয়াব’-এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ‘নওয়াব’ হিসেবে লন্ডনে পৌঁছেন। ১৭৬২ সালে তাঁকে ‘ব্যারন ক্লাইভ অব পলাশী’ উপাধি দিয়ে আইরিশ অভিজাতমন্ডলীতে উন্নীত করা হয়। তা ছাড়াও ১৭৬৪ সালে তাঁকে ‘নাইট অব দি বাথ’ উপাধি দেয়া হয়। সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়) তাঁকে একগুচ্ছ উপাধিতে ভূষিত করেন। এগুলি ছিল ‘দিলার জং’ (রণক্ষেত্রে সাহসী), সাইফ জং (যুদ্ধের তরবারি), মামিরুল মামালিক (সাম্রাজ্যের অভিজাত), সাবদাতুল মুলক (রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তি) ইত্যাদি।

পলাশীর পট পরিবর্তন কোম্পানিকে ঘটনার পূর্বে ক্লাইভ কর্তৃক অনুমিত বিপুল পরিমাণ আয় দেখাতে পারে নি। বরং কোম্পানি বাংলায় ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর মুনাফা অর্জন করলেও, পলাশীর যুদ্ধের পর ব্যবসায়ে ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকে। প্রতি বছর কোম্পানির দেনা বাড়তে থাকে। কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স দেখতে পায় যে, কোম্পানির কর্মকর্তাগণ বাংলাকে তাঁদের ব্যক্তিগত ধনভান্ডারে পরিণত করেছে। কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার না দিয়ে তারা সবাই ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করেছে। ক্লাইভকে বাংলায় কোম্পানির বিনিয়োগকে লাভজনক করার সর্বাপেক্ষা কঠিন এক দায়িত্ব দিয়ে পুনরায় বাংলায় পাঠান হয়।

ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে কলকাতা পৌঁছেন। তিনি সমুদ্রপথে বাংলা অভিমুখে যাত্রাকালেই তাঁর অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপদ্ধতির পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল গভর্নর হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় শাসনকালকে যতখানি সম্ভব তাঁর জাতির জন্য অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করে তোলা। এ কাজে তিনি প্রত্যাশার অতিরিক্ত সাফল্য অর্জন করেন। তিনি এলাহাবাদ যান এবং খেতাবসার সম্রাটের নিকট থেকে বার্ষিক নিয়মিত ২৬ লক্ষ সিক্কা টাকার বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য বাংলা, বিহারউড়িষ্যার দীউয়ানি লাভ করেন। কোম্পানির নামে দীউয়ান এর পদ গ্রহণের সময় তিনি সম্পূর্ণরূপে এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, রাজকীয় ফরমান বলে এদেশে বাণিজ্যরত অন্যান্য সমুদ্রোপকূলীয় কোম্পানি স্বভাবতই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীউয়ানি এখতিয়ার মেনে নিতে অস্বীকার করবে; এর পরিণাম হবে যুদ্ধ এবং অবশ্যই তা পরিহার করতে হবে। ক্লাইভ এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোম্পানির কোনো অভিজ্ঞতা নেই এবং বাস্তবিকপক্ষে বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করার জন্য জনবলও কোম্পানির নেই। এ পরিস্থিতিতে দেশটি সরাসরি শাসন করা থেকে বিরত থেকে ক্লাইভ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি কোম্পানির পক্ষে রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সৈয়দ মুহম্মদ রেজা খান নামে একজন পারসিক ভাগ্যান্বেষীকে নায়েব দীউয়ান (ডেপুটি দীউয়ান) পদে নিয়োগ করেন। অন্য কথায়, সাধারণভাবে দ্বৈতশাসন (১৭৬৫) ব্যবস্থা নামে পরিচিত ক্লাইভ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় অর্থ বা জনবলে কোনো বিনিয়োগ ব্যতিরেকে এবং কোনো প্রকার দায়িত্ব গ্রহণ না করে কোম্পানি দেশের রাজস্ব ভোগ করবে। এটি হচ্ছে বিনিয়োগ ছাড়া আয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

কোম্পানির স্বার্থের দিক থেকে বিবেচনা করলে এ ব্যবস্থা তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় ক্ষেত্রেই ছিল বিস্ময়কর। এমনকি ক্লাইভ নিজেও কল্পনা করতে পারেন নি যে, তাঁর দীউয়ানি ব্যবস্থা শীঘ্রই একটি সাম্রাজ্যের রূপ পরিগ্রহ করবে। ক্লাইভ একজন জাতীয় বীরে পরিণত হন। তাঁর পূর্ণাবয়ব প্রতিমূর্তি ও আবক্ষ মূর্তিগুলি ইন্ডিয়া অফিস ও পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন প্রকাশ্য স্থানে স্থাপিত হয়। একজন অদম্য যোদ্ধা ও একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ক্লাইভ তাঁর জীবনে একটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কোনো পরাজয়ের সম্মুখীন হন নি। তিনি কখনও মনের বিষণ্ণতাকে অতিক্রম করতে পারেন নি। তাঁর প্রথম জীবনে আত্মহত্যামূলক প্রবণতার একটি প্রমাণ আছে। বিজয়ের রোমাঞ্চকর ঘটনাবলি, অভিবাদন ও গৌরবগাথা তাঁর ভারতীয় জীবনকে উচ্ছ্বসিত করে রেখেছিল। কিন্তু লন্ডনে শেষ বারের মতো প্রত্যাবর্তনের পর যখন তাঁর জীবন তুলনামূলকভাবে নিঃসঙ্গ ও নীরব হয়ে পড়ে তখনই সমস্যাটি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং পরিণামে তিনি এর শিকারে পরিণত হন। ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর ক্লাইভ নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

চরিত্রসম্পাদনা

রবার্ট ক্লাইভ বুদ্ধিমান, আবেগপ্রবণ এবং এক দুর্ধর্ষ ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারন করণিক থেকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্থান দিয়েছে। তিনি ছিলেন দাম্ভিক ও প্রচণ্ড অহমিকাপূর্ণ। যা সত্য বলে মনে করতেন সমস্ত রকম বাধা-বিঘ্ন সত্বেও তাই করতেন। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে তাঁর নীতিজ্ঞানের বালাই ছিল না। মিরজাফরের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্র করতে তাঁর বাধেনি। উমিচাঁদকে প্রতারণা করতে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। বরং মনে করতেন, যে যেমন লোক তার সঙ্গে সে রকম ব্যবহার করতে হবে। তাঁকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়তো একটু বেশি বলা হবে। কিন্তু তাঁকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অগ্রদূত নিঃসন্দেহে বলা যায়। পলাশি যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব তাঁর নয়, মিরজাফরের। তা তিনি নিজেও জানতেন। ঠিকই বলেছিলেন মিরজাফরকে, “এ জয় তো আমার নয়, এ জয় আপনার।” তা সত্ত্বেও তিনি যে একজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি-সম্পন্ন দক্ষ সেনাপতি এবং আত্মনির্ভরশীল পুরুষ তাতে সন্দেহ নেই। তিনি সাম্রাজ্য সূচনা করেছেন ঠিকই, আবার তিনি বাংলা লুণ্ঠনকারী, নানা সৎ ও অসৎ উপায়ে ঘুষ নিয়ে, ছলনা করে, ভয় দেখিয়ে এদেশ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে গিয়ে ইংলন্ডের ব্যারন অফ্ পলাশি হিসাবে গন্য হয়েছেন। ইংলন্ডে তিনি সুখে থাকেননি। সেখানকার ন্যায়পরায়ণ সুধী সমাজ ভারতবর্ষে তাঁর কৃতকর্মের মূল্যায়ন করতে বসেছিলেন। এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অন্যায়-ভাবে অর্থ উপার্জন, লুণ্ঠন ও অন্যায় প্রজাপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে কম চেষ্টা করেননি। তবু জীবন সায়াহ্নে চারিদিকের নিন্দা ও বিরোধিতায় তিনি নিজেকে অসহায় ভেবে আত্মহত্যা করে পরিত্রাণ পেয়েছিলেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Dalrymple, William (২০১৫-০৩-০৪)। "The East India Company: The original corporate raiders | William Dalrymple"The Guardian (ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0261-3077। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-১২-২১Robert Clive, was an unstable sociopath who led the fearsome East India Company to its conquest of the subcontinent. [রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন একজন অস্থিরমতি সামাজিক ব্যাধিগ্রস্থ লোক যে ভয়ঙ্কর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উপমহাদেশ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে।]