মুথুলক্ষ্মী রেড্ডী

সমাজ সংষ্কারক, লেখক ও নারী অধিকারবাদী

ডা. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডী (১৮৮৬-১৯৬৮) ভারতের এক চিকিৎসক ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি ভারতের প্রথম মহিলা বিধায়ক ছিলেন। ১৯২৭ সালে তাকে মাদ্রাজ বিধান পরিষদে মনোনীত করা হয়েছিল। এরপর থেকে সমাজ সংস্কার ও নারী অধিকার আদায়ের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রথম নারী, যিনি পুরুষদের জন্য কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি সরকারি মাতৃত্ব ও চক্ষুসংক্রান্ত হাসপাতালের প্রথম নারী সার্জন ছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতবর্ষের প্রথম নারী বিধায়ক, জেলা পরিষদের উপ-সভাপতি, রাজ্য সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা বোর্ডের প্রথম সভাপতি ও মাদ্রাজ পৌরনিগম অভয় হোমের প্রথম পৌরমাতা ছিলেন।

ডা. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডী
Muthulakshmi Reddy (ca 1912).jpg
মেডিকেল শিক্ষার্থী মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি
জন্ম(১৮৮৬-০৭-৩০)৩০ জুলাই ১৮৮৬
মৃত্যু২২ জুলাই ১৯৬৮(1968-07-22) (বয়স ৮১)
চেন্নাই
পরিচিতির কারণসমাজ সংস্কারক, নারীবাদী, লেখক
দাম্পত্য সঙ্গীড. সুন্দর রেড্ডী
সন্তানড. এস. কৃষ্ণমূর্তি, এস. রামমোহন
পুরস্কারপদ্মভূষণ (১৯৫৬)

প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

তিনি জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত দেশীয় রাজ্য পুদুকোত্তাইয়ে। তিনি শত বাধাবিপত্তি আসা সত্ত্বেও লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি অসাধারণ ফলাফল করেন। ১৯১২ সালে তিনি ডাক্তারি পাস করেন। তিনি ভারতবর্ষের প্রথম দিককার মহিলা ডাক্তারদের মাঝে অন্যতম। এরপর তিনি অ্যানি বেসান্তমহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হন।

তার পিতা এস. নারায়ণসামি, মহারাজা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তার মা চন্দ্রাম্মাল এস. নারায়ণসামি প্রথা ভেঙে তাকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছিলেন মুথুলক্ষ্মী রেড্ডী।

ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পরও তাকে মুখোমুখি হতে হয় সীমাহীন প্রতিকূলতার। তিনি কলেজে ভর্তি হন। কলেজেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

১৯০৭ সালে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন মুথুলক্ষ্মী রেড্ডী। ১৯১২ সালে তিনি ডাক্তারি পাস করেন। এরপর তিনি সরকারি মাতৃত্ব ও চক্ষুসংক্রান্ত হাসপাতালের প্রথম নারী সার্জন হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯১৪ সালে তিনি ডা. সুন্দর রেড্ডীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

মুথুলক্ষ্মী রেড্ডীর উপর বিভিন্ন ব্যক্তির প্রভাবসম্পাদনা

কলেজের সময়কালে মুথুলক্ষ্মী সরোজিনী নাইডুর সাথে দেখা করেছিলেন এবং মহিলাদের সভায় যোগ দিতে শুরু করেছিলেন। তিনি এমন নারীকে খুঁজে পেয়েছিলেন যারা তার ব্যক্তিগত উদ্বেগগুলি ভাগ করে নিয়েছিলেন এবং মহিলাদের অধিকারের ক্ষেত্রে তাদের সম্বোধন করেছিলেন। তার জীবনে যে দুটি দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়েছিল তারা হলেন মহাত্মা গান্ধী এবং ডাঃ অ্যানি বেসান্ত[১]। তারা তাকে উত্সাহিত করেছিল নারী ও শিশুদের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করতে। তিনি মহিলাদের মুক্তির পক্ষে এমন সময়ে কাজ করেছিলেন যখন মহিলারা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিল।

সমাজ সংস্কারমূলক কাজসম্পাদনা

তিনি উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত গিয়েছিলেন। মাদ্রাজ বিধান পরিষদে উপসভাপতি হওয়ার আগে চিকিৎসা করা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি ভারতবর্ষের প্রথম নারী বিধায়ক। তিনি বিধায়ক থাকাকালীন নারীদের জন্য অবদান রেখেছেন। পরিত্যক্ত নারীদের জন্য মাদ্রাজে বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়ার 'অভয় হোম' চালু করেছিলেন তিনি।[২]

তিনি নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল তৈরীর প্রস্তাব আইনসভায় এনেছিলেন। তার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

তিনি নিখিল ভার‍ত নারী কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি পতিতালয় এবং নারী ও শিশু পাচার বিরোধী একটি বিল আইনসভায় উত্থাপন করেছিলেন। বিলটি গৃহীত হয়েছিল। তিনি পতিতালয় থেকে আগত নারীদের পুনর্বাসনে নিয়েছিলেন বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি সমাজের বিভিন্ন প্রান্তের নারীদের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সরকারকে তিনি সুপারিশ করেন ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ ও মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ করার জন্য। এছাড়াও তিনি ক্যান্সার ইন্সটিটিউট চালু করেছিলেন। নারীদের জন্য শৌচালয় প্রতিষ্ঠা ও বস্তিবাসীদের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে, তিনি রেখেছেন অপরিসীম অবদান।

আশি বছর বয়সেও তিনি প্রাণচঞ্চল ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন।

রাজনৈতিক জীবনসম্পাদনা

১৯২৬ সালে তিনি মাদ্রাজ বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। তিনি ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা বিধায়ক ছিলেন। এছাড়াও উপমহাদেশের প্রথম হিসেবে তিনি বিধানসভার সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তিনি সমাজ থেকে দেবদাসী প্রথা উচ্ছেদে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীকে অন্যায়ভাবে কারান্তরীণ করার প্রতিবাদে তিনি আইনসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

পুরস্কার ও গ্রন্থসম্পাদনা

আইনপ্রণেতা থাকাকালীন তার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে তার রচিত মাই এক্সপেরিয়েন্স অ্যাজ আ লেজিসলেটর বইয়ে। ১৯৫৬ সালে ভারতীয় সমাজে তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করে ভারত সরকার[৩]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Madras medical college – history"। ১০ আগস্ট ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০১৯ 
  2. "Avvai Home"www.avvaihome.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০২-১৫ 
  3. "Padma Awards" (PDF)। Ministry of Home Affairs, Government of India। ২০১৫। নভেম্বর ১৫, ২০১৪ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ২১, ২০১৫