মদন কামদেব দেবালয়

মদন কামদেব দেবালয় [১] [২]হচ্ছে আসাম-এর কামরূপ জেলা-এর বাইহাটা চারিআলি থেকে তিনি কিলোমিটার দূরের দেওয়ানগিরি পাহাড়ে অবস্থিত একটি দেবালয়। সুন্দর নৈসর্গিক শোভা এবং চৌদিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকা অসংখ্য শৈল স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের ভগ্নাবশেষের জন্য এই দেবালয় আসামের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র। বিভিন্ন আসনবিশিষ্ট শৃঙ্গার রসপ্রধান মূর্তিরাজির জন্য মদন কামদেবকে আসামের খাজুরাহো[৩] আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

মদন কামদেব দেবালয়
Assam MK Lion.JPG
মদন কামদেব দেবালয়ে অবস্থিত নবম-দশম শতকের সিংহের মূর্তি
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিহিন্দুধর্ম
জেলাকামরূপ
অবস্থান
অবস্থানবাইহাটা চারিআলি
দেশভারত
স্থাপত্য
ধরনপাল, অসমীয়া
সৃষ্টিকারীপালবংশীয় শাসক

স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যসম্পাদনা

 
দেবালয়টির ভাস্কর্য

অনেক শতকে হাবি-জঙ্ঘলের মধ্যে লুকিয়ে থাকার পর বিশ শতকে মদন কামদেব দেবালয় পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। মূল শৈল নির্মিত মন্দিরটির ভগ্নাবশেষে চালি একটি দিয়ে পূজারী সেখানে পূজা-উপাসনা আরম্ভ করেন। আসাম সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ দেবালয়টি নিজেদের অধীনে এনে সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করেন। ১৯৭৭ সালে আসাম সরকার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের সহযোগিতায় প্রথমবার এবং ১৯৮২ সালে দ্বিতীয়বার খনন চালিয়ে অসংখ্য পাথরের মূর্তি এবং কুড়িরও অধিক গাঁথনি আবিষ্কার করেন।[৪] মন্দিরের বেড়ায় অসংখ্য মৈথুনরত নর-নারীর মূর্তি খোদিত করা আছে। চৌপাশে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে অনেক ভগ্নপ্রায় শৈল ভাস্কর্য। পোড়ামাটির ভাস্কর্যও দেখতে পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে যুদ্ধরত সিংহের, সঙ্গমরত পশু, স্বল্পবসনা নারী, বৃষভ, যোনীমণ্ডল, শিবলিঙ্গ, ছয়মূরীয়া ভৈরব, চারমাথা শিব ইত্যাদির মূর্তি প্রধান। নির্মাণ কার্যে মাত্র পাথর ব্যবহার হয়েছিল। অবশ্য মদন কামদেব নির্মাণ করা সময় আসামে পোড়া ইটের ব্যবহার হয়নি। প্রায় অনেকগুলি গাঁথনি মদন কামদেব টিলার উপর অবস্থিত। নরসিংহ নামের টিলাটিতে অনেকগুলি গাঁথনি দেখা যায়।[১]

নামকরণের বৈশিষ্ট্যসম্পাদনা

দেবালয়টির নাম মদন কামদেব যদিও এখানে মদন কামদেবের উপাসনা করা হয় না। দরাচলে এটি ভগবান শিব-এরই উপাসনাস্থল। কিছুজনের মতে শিবের ক্রোধাগ্নিত ভষ্ম হওয়া কামদেব এখানে পূর্বের রূপ ফিরে পান এবং পত্নী রতিদেবীর সাথে মিলিত হয়েছিলেন বলেই এই নাম হয়। কিন্তু এই মত তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়। সম্ভবতঃ মন্দিরের গায়ে খোদিত এবং চারপাশে বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকা শৃঙ্গাররত ভঙ্গিমার ভাস্কর্যসমূহের জন্য জনমানসে হিন্দুর প্রেম এবং যৌনতার দেবতা মদন কামদেবের নামে স্থান পায়।[১]


ইতিহাসসম্পাদনা

নির্মাণ শৈলী বিশ্লেষণ করে মদন কামদেব দেবালয় পাল রাজবংশ-এর অবদান বলে নির্ণয় করা হয়েছে। এই রাজবংশটি দশম শতকের (৯৯০ খৃঃ) থেকে দ্বাদশ শতকের মাঝভাগ পর্যন্ত কামরূপে শাসন করেছিলেন। প্রথমে তাঁদের রাজধানী ছিল প্রাগজ্যোতিষপুরে, অর্থাৎ বর্তমানের গুয়াহাটিতে। রাজা ধর্মপাল রাজত্বের অন্তিম ভাগে প্রদান করা পুষ্পভদ্রা তাম্রলিপিতে তাঁর রাজধানী কামরূপ নগরী বলে উল্লেখ করেছেন। এই তাম্রলিপিটি উত্তর গুয়াহাটিতে পাওয়া গিয়েছে। সম্ভবতঃ তিনি রাজধানী প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে কামরূপ নগরীতে স্থানান্তর করেছিলেন। বর্তমানের উত্তর গুয়াহাটি এবং তার আশে পাশে পাওয়া অসংখ্য দুর্গ, রাস্তা-ঘাট, ভবন, মন্দির, শিলালিপি ইত্যাদির ভগ্নাবশেষের জন্য বুরঞ্জীবিদরা উত্তর গুয়াহাটিকে তাহানির কামরূপ নগরী বলে মনে করেছেন। মদন কামদেবও কামরূপ নগরীর একটি অংশ ছিলেন। মদন কামদেব থেকে উত্তর গুয়াহাটি পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র দশ কিলোমিটার। অবশ্য কোন্ পাল রাজা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, সেই সম্পর্কে ইতিহাস নীরব।[১]

উপাসনাসম্পাদনা

মদন কামদেবে শিব-পার্বতীর যুগল মূর্তিকে উপাসনা করা হয়। অতি প্রাচীন কাল থেকে আসামে শৈব ধর্মের সূত্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। শিবকে দুটি রূপে উপাসনা করা হয়। প্রথমটি শিবের একক রূপ এবং দ্বিতীয়টি শিব-পার্বতীর যুগল রূপ। বর্তমান আসামের মাত্র কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরেই পরম্পরাগতভাবে শিব-পার্বতীর যুগ্ম রূপের উপাসনা চলে আসছে। যুগ্ম শিব-পার্বতী শৈব এবং শাক্তর সমন্বিত রূপ। এই দুটি রূপ পৃথক সত্তা হয় না। পুরুষ এবং প্রকৃতির মতো এটি একক এবং পূর্ণ সত্তা। কালিকা পুরাণ-এর মতে নরক কামাখ্যায় দেবীপূজা প্রবর্তন করার আগে কামরূপের অধিবাসীদের উপাস্য দেবতা ছিলেন শিব। নরকের সময়ে শক্তিবাদ বিশেষভাবে ওঠে যদিও দেশে থেকে শৈব ধর্মের প্রভাব কমে যায়নি। কামরূপে রাজত্ব করা পরবর্তী বর্মন,শালস্তম্ভ, পাল ইত্যাদি রাজবংশ শৈবপন্থী ছিল। ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত হওয়া বিভিন্ন তাম্রলিপির থেকে জ্ঞাত হয়েছে যে শালস্তম্ভ এবং পাল বংশ শিবের যুগ্ম রূপের উপাসক ছিল। বনমাল বর্মন (৮৩৫- ৬০ খৃঃ), ইন্দ্রপাল ইত্যাদি রাজা তাম্রলিপিতে তাঁদের ইষ্ট দেবতা 'কামেশ্বর-মহাগৌরী' বলে উল্লেখ করেছেন। পাল বংশীয় রাজারা শৈবপন্থী ছিলেন যদিও তাঁরা শক্তিবাদ-এরও যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষক ধীরে ধীরে আসামে শক্তিবাদের প্রভাব বাড়তে থাকলে শৈব-শক্তির যুগ্ম উপাসনা ক্রমশঃ হ্রাস হতে থাকে। সম্ভবতঃ এই উপাসনা পদ্ধতির জন্যই আসামের অনেক প্রাচীন মন্দির, যেমন কামাখ্যা, হয়গ্রীব ইত্যাদি পরবর্তীকালে কোচ, আহোম ইত্যাদি শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার মতো মদন কামদেব কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি এবং একদিন হাবি-বনানি সমগ্র অঞ্চল ঢেকে দেয়।[১]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "শিলেও যেখানে কথা বলে, মদন কামদেব দেবালয়"। আজির আসাম: বুধবরীয়া পরিপূরিকা পৃঃ খ। ১৯৯৩।  অজানা প্যারামিটার |month= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  2. "Places of Interest"। Kamrup District Authority। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ২৯, ২০১১ 
  3. "Khajuraho of Assam"। peperonity.com। জানুয়ারি ১৪, ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ২৯, ২০১১ 
  4. শান্তনু কৌশিক বরুয়া (২০১৬)। Master আসাম ইয়ের বুক। জ্যোতি প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৪৮৬। 

টেমপ্লেট:Hindu Temples in Assam