ব্রিজপোর্ট, কানেটিকাট

ব্রিজপোর্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি বন্দরনগরী ও বৃহত্তম শহর। [১] ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ব্রিজপোর্টের জনসংখ্যা ১,৪৪,৩১৯। [২] এটি জনসংখ্যায় নিউ ইংল্যান্ডের পঞ্চম বৃহত্তম শহর। শহরটি পেকুনোক নদীর তীরে ফেয়ারফিল্ড কাউন্টিতে অবস্থিত। ব্রিজপোর্ট ম্যানহাটন থেকে ৬০ মাইল ও দ্য ব্রংকস থেকে ৪০ মাইল দূরে অবস্থিত। এর উত্তরে ট্রামবুল, পশ্চিমে ফেয়ারফিল্ড ও পূর্বে স্ট্রাটফোর্ড শহর অবস্থিত।

বিনোদনকর্মী পি টি বার্নাম ব্রিজপোর্ট শহরের বাসিন্দা ছিলেন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এর মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। [৩] বার্নাম ব্রিজপোর্ট শহরে চারটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তিনি নিয়মিত সার্কাস আয়োজন করতেন। ১৯৬৫ সালে ব্রিজপোর্টের নর্থ এন্ড এলাকায় বিখ্যাত সাবওয়ে রেস্টুরেন্টের প্রথম শাখা খোলা হয়। [৪]দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিজপোর্ট শহরের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এখানে ফ্রিসবি পাই কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই শহরটিকে ফ্রিসবির জন্মস্থান অভিহিত করা হয়।[৫] দারিদ্র্য ও অপরাধপ্রবণতা বর্তমানে ব্রিজপোর্টের জন্য মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসসম্পাদনা

পাউগুসেট আদিবাসীরা ব্রিজপোর্টের আদি বাসিন্দা। ঐতিহাসিক স্ট্রাটফোর্ড এলাকায় ইউরোপীয়রা সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে। [৬] ঔপনিবেশিক যুগে স্ট্রার্টফোর্ড কিংস হাইওয়ে নামে পরিচিত ছিল।

ব্রিজপোর্ট শহরটি দ্রুতই ব্যবসা-বাণিজ্য, জাহাজনির্মাণ ও তিমি মৎস্য শিকারের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। পেকুনোক নদীর তীরে দ্রুতই কতগুলো ব্রিজ বা সেতু নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ থেকেই শহরটির নাম হয় ব্রিজপোর্ট। সত্তরের দশক পর্যন্ত উৎপাদনশিল্প ব্রিজপোর্টবাসীর আয়ের প্রধান উৎস ছিল।

১৬৪৪ সালে ইংরেজরা ব্রিজপোর্ট শহরের নর্থ অ্যাভিনিউ-য়ে বসতি স্থাপন করে। শহরটিকে তখন বলা হতো- "পেকুনোক।" পেকুনোক শব্দের অর্থ পরিষ্কারকৃত ভূমি। পাউগুসেটরা শহরের গোল্ডেন হিল এলাকাকে পবিত্র মনে করত। সেখানে তারা ফসল উৎপাদনসহ নানাবিধ কাজ সম্পাদন করত। [৭] উক্ত এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের কানেকটিকাট উপনিবেশ সরকার ১৬৩৯ সালে সংরক্ষিত ভূমি প্রদানের ঘোষণা দেয়। ১৮০২ সাল পর্যন্ত এই ঘোষণা কার্যকর ছিল।

১৭৬০ এর দশকে এখানে নিউফিল্ড নামক একটি গ্রাম গড়ে ওঠে। ১৬৯৫ (মতান্তরে ১৭০১) সালে এ এলাকাটি স্ট্রাটফোর্ড নামে পরিচিতি লাভ করে। আমেরিকান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নিউফিল্ড বন্দরে যুদ্ধজাহাজ ভাড়া করার ব্যবসা জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীসম্পাদনা

কানেটিকাট উপনিবেশ ১৭৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার পর নিউফিল্ড উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হতে থাকে। পেকুনোকের চারপাশ ব্যবসায়িক আবহে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ব্রড স্ট্রিটে চার্চ নির্মাণের কাজও এসময় শুরু হয়। ১৮০০ সালে এ অঞ্চলটি ব্রিজপোর্ট নামে পরিচিতি পায়। ১৮০৬ সালে ব্রিজপোর্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২১ সালে ব্রিজপোর্ট শহরাঞ্চল স্ট্রাটফোর্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়।

১৮২৪ সালে ব্রিজপোর্ট স্টিমশিপ(বাষ্পীয়পোত কোম্পানি), ১৮৩৩ সালে ব্রিজপোর্ট তিমি কোম্পানি ও ১৮৩৬ সালে হিউস্টনিক রেলসড়ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩৬ সালে ব্রিজপোর্ট কানেটিকাটের পঞ্চম শহর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৪৫ সালে ওয়াটারবুরি ও উইনস্টেড শহরকে ব্রিজপোর্টের সাথে সংযুক্তির লক্ষ্যে নাউগাতুক রেলসড়ক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়, যার কাজ ১৮৪৯ সালে শেষ হয়। নিউ ইয়র্ক ও নিউ হ্যাভেন রেলসড়কের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ব্রিজপোর্টের সাথে সংযুক্ত হয়।

আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পরে এটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি লাভ করে। ১৮৭০ সালে ব্রিজপোর্টের সাথে ওয়েস্ট এন্ড ও ব্ল্যাক রক এলাকা সংযুক্ত হয়। ১৮৭৫ সালে পিটি বার্নাম শহরের মেয়র নির্বাচিত হন।

১৮৮২ সালে এখানে হোমস অ্যান্ড এডওয়ার্ডস সিলভার কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৮৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল সিলভার কোম্পানির সাথে একীভূত হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ২০% করসেট ব্রিজপোর্ট শহরে উৎপাদিত হত।

বর্তমানসম্পাদনা

১৯১৫ সালে কতগুলো ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ ঘণ্টা সময় কর্মঘণ্টা হিসেবে নির্ধারিত হয়।

পরবর্তীতে ব্রিজপোর্টের অর্থনীতি ব্যাপক হুমকির মুখে পড়ে। শহরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ছিল প্রবল। ১৯৯১ সালে শহরটি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করলেও ফেডারেল আদালত এ ঘোষণা বাতিল করে দেয়।

তবে একবিংশ শতাব্দীতে ব্রিজপোর্টে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এমজিএম কোম্পানি শহরে একটি ক্যাসিনো ও বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

১৮৬০ সালের ১০ মার্চ আব্রাহাম লিংকন পুরাতন সিটি হল ভবনে এক স্মরণীয় বক্তৃতা প্রদান করেন। মার্টিন লুথার কিং শহরের ক্লেইন অডিটোরিয়ামে একাধিকবার বক্তৃতা দিয়েছেন। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ২০১০ সালে বারাক ওবামা এখানে বক্তৃতা দেন। একই অডিটোরিয়ামে ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তৃতা প্রদান করেন।

ভূগোলসম্পাদনা

ব্রিজপোর্ট শহরে অনেকগুলো পার্ক রয়েছে। এজন্য এর অপর নাম "পার্ক সিটি।" ১৮৬৪ সালে বার্নামসহ অন্যান্য বাসিন্দা সিসাইড পার্ক নির্মাণের জন্য ৪৪ একর জমি দান করেন। পরবর্তীতে বিচউড, বিয়ার্ডসলেসহ অনেকগুলো পার্ক এখানে গড়ে ওঠে।

জলবায়ুসম্পাদনা

ব্রিজপোর্ট গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত উষ্ণ থাকে। শীতকালে এর তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পায়। মধ্য এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এখানে গ্রীষ্মকাল থাকে। ব্রিজপোর্টে প্রতি বছর ৭৫ সেমি তুষারপাত হয়।

ব্রিজপোর্টে একাধিকবার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়।যথা- ক্যারল (১৯০৩,১৯৩৮,১৯৪৪,১৯৫৪), ডোনা (১৯৬০), গ্লোরিয়া (১৯৮৫) ও স্যান্ডি (২০১২)।

বছরে গড়ে ২৯ দিন এখানে তুষারপাত হয়। প্রতিবছর গড়ে ১,০৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

জনমিতিসম্পাদনা

২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী শহরের বাসিন্দা ১,৩৯,৫২৯। শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩,৩৬৭ জন। বাসিন্দাদের ৪৫% শ্বেতাঙ্গ, ৩০.৮% আফ্রিকান-আমেরিকান, ০.৫% আদিবাসী আমেরিকান ও ৩.৪% এশীয়। বাসিন্দাদের ৩৮.২% হিস্পানিক ও লাতিনো।

শহরের পরিবারগুলোর গড় আয় ৩৯,৫৭১ ডলার। পুরুষদের গড় আয় ৩২,৪৩০ ডলার ও মহিলাদের গড় আয় ২৬,৯৬৬ ডলার। ১৬.২% পরিবার ও ১৮.৪% পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এদের মধ্যে ২৪.৮% এর বয়স ১৮ এর নিচে ও ১৩.২% এর বয়স ৬৫ এর উপরে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Annual Town and County Population for Connecticut"CT.gov - Connecticut's Official State Website। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  2. Bureau, US Census। "Population and Housing Unit Estimates Tables"The United States Census Bureau। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  3. Andrews, Evan। "10 Things You May Not Know About P.T. Barnum"HISTORY। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  4. https://books.google.com/?id=6qSx2UrQ_H0C&pg=PA388
  5. "Central High School - Bridgeport Frisbie"web.archive.org। ১০ নভেম্বর ২০০৭। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  6. "Stratfield Historic District - Local Historic District and Property Commissions in Connecticut"lhdct.org। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  7. "The Encyclopedia Americana: A Library of Universal Knowledge"। Encyclopedia Americana Corporation। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ – Google Books-এর মাধ্যমে।