আলোর প্রতিসরণ

প্রতিসরাঙ্ক ও হল কোন আলোকীয় মাধ্যমের উপাদানের এমন একটি ধর্ম ,জার্মানের উপর ওই মাধ্যমে প্রবেশ ক
(প্রতিসরণ থেকে পুনর্নির্দেশিত)

আলোর প্রতিসরণ (ইংরেজি: Refraction of light, তুর্কি:Işığın kırılması ) হলো এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে আলো প্রবেশ করলে উভয় মাধ্যমের বিভেদ তলে এর দিক পরিবর্তিত হওয়ার ঘটনা।[১] এ ঘটনা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয় যখন আলোকরশ্মি ০° ও ৯০° ব্যতীত অন্য যেকোনো কোণে মাধ্যমদ্বয়ের বিভেদতলে পড়ে। মূলত মাধ্যমগুলোর ঘনত্বের পার্থক্যের জন্যই আলোর প্রতিসরণ ঘটে থাকে। আলো যদি হালকা মাধ্যম (যেমন বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (যেমন পানি) প্রবেশ করে, তাহলে আলোকরশ্মি বিভেদ তল হতে অভিলম্বের দিকে বেঁকে যায়। আবার যদি আলো ঘন হতে হালকা মাধ্যমে আপতিত হয়, তাহলে আলো বিভেদ তল হতে অভিলম্ব থেকে দূরে সরে আসে।

এখানে আলোকরশ্মি বায়ু থেকে প্লেক্সিগ্লাস মাধ্যমে প্রবেশ করছে।কিছু পরিমাণ আলো প্রতিফলিত হলেও তার অধিকাংশই প্রতিসরিত হচ্ছে।

প্রতিসরাঙ্কসম্পাদনা

 
আলোকরশ্মি x মাধ্যম থেকে y মাধ্যমে প্রবেশ করছে। যেখানে p আপতন কোণ এবং q প্রতিসরণ কোণ।

প্রতিসরাঙ্ক হলো কোন আলোকীয় মাধ্যমের উপাদানের এমন একটি ধর্ম যার মানের উপর ওই মাধ্যমে প্রবেশ করা অর্থাৎ প্রতিসৃত আলোকরশ্মির গতির অভিমুখে এবং ওই মাধ্যমের আলোর বেগের মান নির্ভর করে। দুটি সমজাতীয় রাশির অনুপাত হওয়ায প্রতিসরাঙ্ক একটি একক বিহীন সংখ্যা মাত্র

প্রতিসরাঙ্ককে দু ভাবে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা:

১। আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক:সম্পাদনা

কোনো নির্দিষ্ট রংয়ের আলো যখন এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে তখন আপতন কোণ ও প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাত যে ধ্রুবক সংখ্যা হয় তাকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (Relative Refractive index) বলে। উদাহরণস্বরূপ: যখন আলোকরশ্মি 'x' মাধ্যম থেকে 'y' মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন আপতন কোণের সাইন ও প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাতকে বলা হবে 'x' মাধ্যমের সাপেক্ষে 'y' মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক। এখন 'x' মাধ্যমে আপতন কোণ যদি p এবং 'y' মাধ্যমে প্রতিসরণ কোণ যদি q হয় তাহলে 'x' মাধ্যমের সাপেক্ষে 'y' মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক হবে:

  • xηy =  

২। পরম প্রতিসরাঙ্ক:সম্পাদনা

কোনো নির্দিষ্ট রংয়ের আলো যখন শূন্য মাধ্যম থেকে কোন স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে তখন আপতন কোণ ও প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাতকে উক্ত মাধ্যমটির পরম প্রতিসরাঙ্ক (Absolute Refractive Index) বলে। অর্থাৎ শূন্য মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট রংয়ের আলোকরশ্মির আপতন কোন p এবং অন্য মাধ্যমটিতে (ধরি, মাধ্যমটি y) প্রতিসরণ কোণ q হলে, উক্ত y মাধ্যমটির পরম প্রতিসরণাঙ্ক হবে:

  • ηy =  

আলোকরশ্মির বেগ ও প্রতিসরাঙ্কের সম্পর্কসম্পাদনা

আমরা জানি, শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সেকেন্ডে 2.99792458×108। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা সেকেন্ডে 3 লক্ষ কিলোমিটার বেগ ধরে নেই। এতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। যাই হোক,আমরা এক্ষেত্রে ধরে নেই, আলোর বেগ সেকেন্ডে 3 লক্ষ কিলোমিটার। শূন্য মাধ্যমেই আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি। আলোক রশ্মি শূন্য মাধ্যম থেকে কোনো মাধ্যমে প্রবেশ করলে আলোর বেগ কমে যায়। শূন্য মাধ্যম থেকে সেই মাধ্যমে আলোর বেগ যতগুণ কমে যায় সেটার পরিমাণই হচ্ছে শূন্য মাধ্যমের সাপেক্ষে সেই মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক।

ধরি, শূন্য মাধ্যম= a, অপর একটি মাধ্যম= b ।

তাহলে উপরের শর্তানুযায়ী,

aηb= ca / cb

অর্থাৎ, ηb/ηa = ca / cb

আমাদের জানামতে, শূন্য মাধ্যমের (a মাধ্যমের) প্রতিসরাঙ্ক 1

ηb= ca / cb

এই সূত্র ব্যবহার করে কোনো মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক নির্ণয় করা যায়।

এই থেকেও এটিও বোঝা যায় যে, আলোর বেগ ও প্রতিসরাঙ্কের মধ্যে পরস্পর ব্যস্ত সম্পর্ক বিদ্যমান।

প্রতিসরণের সূত্রসম্পাদনা

আলোর প্রতিসরণের ওপর দুটি সূত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যথা:

  • আপতিত রশ্মি, প্রতিসরিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে বিভেদতলের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে অবস্থান করে।[২]
  • একজোড়া নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর জন্য, আপতন কোণের সাইন (sin) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের (sin) অণুপাত সর্বদা ধ্রুবক থাকে। ১৬২০ সালে হল্যান্ডের বিজ্ঞানী স্নেল (Willebrord Snellius) সর্বপ্রথম এ সূত্র প্রকাশ করেন। তাই এ সূত্রটিকে স্নেলের সূত্রও বলা হয়।[২]

অর্থাৎ, আপতন কোন i, প্রতিসরণ কোন r হলে,   = ধ্রুবক। এই ধ্রুবক কে গ্রিক বর্ণমালার 'μ' দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।

  • প্রথম মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক n1, দ্বিতীয় মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক n2, আপতন কোণ θ1, প্রতিসরণ কোণ θ2 হলে,  

সংকট কোণ ও আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনসম্পাদনা

নির্দিষ্ট রঙের আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে প্রতিসরিত হওয়ার সময় আপতন কোণের যে মানের জন্য প্রতিসরণ কোণের মান এক সমকোণ হয় অর্থাৎ প্রতিসরিত রশ্মি বিভেদ তল ঘেঁষে চলে যায় তাকে ঐ রঙের জন্য হালকা মাধ্যমের সাপেক্ষে ঘন মাধ্যমের সংকট কোণ বা ক্রান্তি কোণ (critical angle) বলে।

সংকট কোণ বা ক্রান্তি কোণকে θc দ্বারা প্রকাশ করা হয়। θc = sin-121)

নিম্নে এর প্রমাণ দেওয়া হলো।

➤প্রমাণ:

আমরা জানি, পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হওয়ার জন্য আলোকরশ্মিকে ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করতে হয়।

ধরি, ঘন মাধ্যম = 1, হালকা মাধ্যম= 2 ।

আলোকরশ্মি 1 মাধ্যমে i কোণে আপতিত হয়েছে। এর ফলে প্রতিসরিত রশ্মিটি বিভেদতল ঘেষে প্রতিসরিত হয়েছে।

যেহেতু বিভেদতলে আলোকরশ্মি প্রতিসরিত হয়েছে, তাই প্রতিসরণ কোণের মান, r=90° এবং i কোণে আলো আপতিত হওয়ার কারণে এটি বিভেদতল ঘেষে প্রতিফলিত হয়েছে। সুতরাং i= θc

প্রতিসরণের সূত্র থেকে আমরা পাই,

প্রথম মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক × কোণের সাইন = দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক × কোণের সাইন

বা, η1 sin i = η2 sin r

বা, η1 sinθc = η2 sin90°

বা, η1 sinθc = η2 [∵ sin90°=1]

বা, sinθc = η2 / η1

বা, θc = sin−1 ( η2 / η1 )

সূত্র ব্যবহার করে সংকট কোণের মান নির্ণয় করা যায়।(প্রমাণিত)

পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হলো সেই ঘটনা ঘটে যখন আলো কেবলমাত্র ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে প্রবেশের সময়ে দুই মাধ্যমের বিভেদতলে অভিলম্বের সাথে সংকট কোণের চেয়ে বেশি কোণে আপতিত হয়ে সম্পূর্ণ আলো পূর্বের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। যেহেতু আলোর আপতন কোণ সংকট কোণের সমান হলে প্রতিফলিত রশ্মি দুই মাধ্যমের বিভেদতল ঘেঁষে যায়, সেহেতু আলো সংকট কোণের চেয়ে বেশি কোণে আপতিত হলে তা পরবর্তী মাধ্যমে প্রবেশ না করে পূনরায় পূর্বের মাধ্যমে ফিরে আসবে।

দৈনন্দিন জীবনে প্রতিসরণসম্পাদনা

 
জলে নিমজ্জিত অবস্থায় প্রতিসরণের জন্য একটি পেন্সিলকে বাঁকা মনে হয়। X বিন্দু থেকে আলো এলেও প্রতিসরণের ফলে অভিমুখ পরিবর্তিত হয়ে, মনে হয় যেন Y থেকে আলো আসছে।
  • জেলের মাছ ধরার ক্ষেত্রেও প্রতিসরণের জন্য অনেক সময় জেলে মাছ ধরতে ব্যর্থ হন। মাছ থেকে আলোকরশ্মি জল (ঘন মাধ্যম) থেকে বায়ুতে (লঘু মাধ্যম) আসার সময় প্রতিসরণ ঘটে ও আলোকরশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। সেই রশ্মি জেলের চোখে পৌঁছালে তিনি মাছকে আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা উপরে দেখেন। তাই মাছ যেখানে দেখতে পান তার কিছুটা নীচে বর্শি দিয়ে আঘাত করেন।
  • মরুভূমিতে মরীচিকা সৃষ্টি হয় প্রতিসরণের জন্যই। এছাড়া গ্রীষ্মে রাস্তা দূর থেকে দেখলে ভেজা মনে হয় একই কারণবশত।
  • সকালে সূর্য উঠার সময় পূর্ব আকাশে এবং দুপুরে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় পশ্চিম আকাশে লাল আভা দেখা যায়, তাতে প্রতিসরণ সাহায্য করে।
  • আকাশে তারার ঝিকমিক প্রতিসরণের ফলে সৃষ্টি হয়। আসলে বহু দূরের নক্ষত্রগুলির আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের চোখে আসে, তখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তর এর বিভিন্ন রকম উষ্ণতা হওয়ার জন্য প্রতিসরাঙ্কও বিভিন্ন হয়। এর জন্য সেই আলোর প্রতিসরণ ঘটে এবং বারবার প্রতিসরাঙ্ক পরিবর্তন হওয়ার ফলে বারবার প্রতিসরণ ঘটতে থাকে এবং আমাদের চোখে এসে পড়ে ও আমাদের মনে হয় তারাটি ঝিকমিক করছে।
  • আলোর বিচ্ছুরণ প্রতিসরণের ফলে সৃষ্ট। প্রিজমের মধ্যে বিভিন্ন আলোর প্রতিসরাঙ্ক ও বেগ বিভিন্ন হওয়ার জন্য বিচ্ছুরিত হয়ে যায়।
  • মানুষের চোখের লেন্স (প্রাকৃতিক লেন্স) আলোর প্রতিসরণ ঘটিয়ে রেটিনায় প্রতিবিম্ব উৎপন্ন করে। বিভিন্ন চশমায় ব্যবহৃত লেন্স প্রতিসরণ ঘটিয়ে দেখতে সাহায্য করে।

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ড. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ; ড. মমিনুল হক; রাশিদুল হাসান; মাহেরা আহমেদ (জুন, ২০০৫)। "আলোর প্রতিসরণ"। উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান বই (দ্বিতীয় পত্র) (ষষ্ঠ সংস্করণ)। ঢাকা: মেট্রো পাবলিকেন্স। পৃষ্ঠা ২৯৯–৩৬৪।  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য);
  2. M. Nelkon (১৯৯৩)। "Light"। Principles of Physics (10th সংস্করণ)। Singapore: SHING LEE PUBLISHERS PTE LTD.। পৃষ্ঠা 272–273। আইএসবিএন 9971616688